দেশের প্রথম নারী ইউরোলজিস্ট তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী

প্রকাশিত: 9:07 PM, August 9, 2016

দেশের প্রথম নারী ইউরোলজিস্ট তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী

দেশের প্রথম নারী ইউরোলজিস্ট তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী। তার বাবা মোহাম্মদ শাহেদ কৃষিবিদ। পেশাগত কারণেই তাকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয়েছে বদলির কারণে। অর্থাৎ এ কারণে এক বিদ্যালয়ে বেশি দিন পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি তাজকেরা সুলতানার। ফলে ইচ্ছা ও মেধা ভালো থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ে প্রথম, দ্বিতীয়- এ রকম প্লেসে থাকতে পারতেন না। এ কারণে তার খুব খারাপ লাগত। তিনি মনে করতেন, এখন ( সেই সময়ে) পড়ালেখায় তেমন ভালো করতে না পারলেও আমাকে (তাজকেরা) ভবিষ্যতে বড় হতে হবে। মানবসেবা অর্থাৎ সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। এমন ব্রত বা ইচ্ছা থাকার কারণে বেশ ভালোভাবেই এসএসসি পাস করেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে। চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ভালো ফল নিয়ে। চট্টগ্রামে চলে আসার কারণ তার বাবা খামারবাড়ি থেকে অবসরে গিয়ে ১৯৮৪ সালে চলে যান পরিবারের কাছে। দুই পরীক্ষায়ই তার আশানুরূপ ফল হওয়ায় মাথায় ঢুকে যায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। সাধ জাগে চিকিৎসক হওয়ার। কেননা সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা রয়েছে তাজকেরার। দিলেন চিকিৎসক হওয়ার পরীক্ষা। সেখানেও কাক্সিক্ষত ফল। ভর্তি হওয়ার সৌভাগ্য হলো কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে। তার পর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি হবু চিকিৎসক তাজকেরা সুলতানার। অবশ্য প্রথমে তার বাবা চাননি মেয়ে দূরে চলে যাক। মেয়ে তাজকেরা ও আত্মীয়স্বজনের বুদ্ধি পরামর্শের কারণে শেষ পর্যন্ত রাজি হন বাবা। অবশ্য তখন ভর্তির সময়ও প্রায় শেষ হয়ে আসছিল।

এবার শুরু তাজকেরার জীবনের আরেক মোড়। শেষ বর্ষের পরীক্ষা শেষ হলো ১৯৯৯ সালে। এরপর চিন্তা করেন আরো উন্নতির, আবেদন করেন বিসিএসে। সেবার চিকিৎসক কোটার আসনসংখ্যাও ছিল সীমিত। তারপরও বেশ ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলেন তিনি, টিকেও গেলেন তাতে। তারপরও তিনি চিন্তা করলেন বিসিএসে ডাক্তারি করলে বেশি মানুষের সেবা হবে, নাকি অন্য ভালো কোথাও ডাক্তার হলে বেশি মানুষের কাজে আসবে।
বিসিএস চাকরি না নিয়ে ঢাকায় এসে চেষ্টা চালাতে লাগলেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের জন্য। ২০০০ সালের দিকে তার পরিচয় ঘটে বিএসএমএমইউতে এক ইউরোলজিস্ট বা মূত্ররোগ বিশেষজ্ঞের সাথে। তিনি তাজকেরাকে বলেন, মেয়েদের ডাক্তারি যদি করতে হয় তবে তাদের বেশির ভাগের আসা উচিত ইউরোলজিতে। এ সংক্রান্ত নানা উদাহরণও দেন তিনি। এসব পরামর্শ গুরুত্ব পায় তাজকেরার। দেরি না করে বারডেমে আউটডোর মেডিক্যাল অফিসার বা ইউরোলজি পদে আবেদন করেন মেধাবী ধৈর্যশীল তাজকেরা। তবে এ নিয়ে একটি হোঁচট খেতে হয় তাকে। হাসপাতাল প্রশাসন তার কাগজপত্র দেখে বলে দেয়, এ পদে মহিলা চিকিৎসক নেয়ার প্রয়োজন নেই আমাদের। এ কথা শুনে তার মন খারাপ হয়ে যায়। তাজকেরা তার পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত নানা যুক্তিও দেন প্রশাসনের কাছে। কিন্তু তাকে কোনো কাজ হলো না। উপায়ান্তর না দেখে তাজকেরা সেখান থেকে বের হয়ে পড়েন। তখন তার মনে চ্যালেঞ্জ জাগে যে করেই হোক ইউরোলজিস্ট হওয়ার। যেমন ইচ্ছা তেমন কাজ। সোজা ফের চলে যান পরামর্শ প্রদানকারী সেই চিকিৎকের কাছে। তিনি স্যার বা চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলেন, আমি (তাজকেরা) কি ইউরোলজিতে এমএস বা মাস্টার অব সায়েন্স করতে পারব? তিনি উৎসাহ দিয়ে বলেন হ্যাঁ, অবশ্যই পারবে। অন্যেরা পারছে না! এমন কথা শুনে তাজকেরা দেরি না করে ভর্তি হয়ে যান এমএস কোর্সে (২০১০ সালে)। পড়ালেখা চালিয়ে যেতে থাকেন ভালোভাবেই। এভাবে কেটে যায় তিন বছর। অতঃপর ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি হাসপাতালে (খিদমাহ হাসপাতাল) প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন ২০১৩ সাল থেকে। এখন তাকে একজন নামকরা ইউরোলজিস্ট হিসেবে দেখা যায় জেনারেল সার্জন আর ইউরোলজিস্ট হিসেবে বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে।
ভালো খবর হচ্ছে, দেশের প্রথম নারী ইউরোলজিস্ট বা মূত্র রোগ বিশেষজ্ঞ এখন ডা: তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী। এখন সরকারি হাসপাতালের সার্জন বা শল্য চিকিৎসক। ব্যক্তিগতভাবেও চিকিৎসাসেবা দেন মূত্ররোগীদের। তবে তার বেশি ভালো লাগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খুঁজে খুঁজে রোগী শনাক্ত করা। এসব নারীদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায় মূত্রনালিতে পাথর, প্রস্রাবের সমস্যা ইত্যাদি।
তাজকেরা আমন্ত্রণ পান আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে যা বেশ পুরনো একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে তিনি এ সংক্রান্ত অনেক পরামর্শ দেন। যশোরের জয়তী সোসাইটির (মহিলা ও শিশু উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান) সাথেও নানাভাবে জড়িত তিনি। শুধু বাংলাদেশ নয় বরং গোটা বিশ্বই তাকে এখন চেনে একজন নামকরা ইউরোলজিস্ট হিসেবে। তার সাফল্যের পেছনে অবশ্য তার বাবা ও স্বামীর উৎসাহ কাজ করছে। টেলিভিশনে বিশেষ সাক্ষাৎকারেও তিনি এ রোগের নানা দিক সম্বন্ধে আলোকপাত করেন। যাতে সাধারণ জনগষ্ঠেী এ ব্যাপারে সচেতন হয়। সূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত অনলাইন

সর্বশেষ সংবাদ