এলাকার মানুষই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের দাওয়াতী টার্গেটঃ শাহবাগী হুজুর

প্রকাশিত: ৯:৫৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

এলাকার মানুষই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের দাওয়াতী টার্গেটঃ শাহবাগী হুজুর
(শাহবাগী হুজুরকে নিয়ে না বলা কথা-০৭))
মাওলানা মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কাতার:
এলাকার মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, মাদ্রাসার প্রভাব দিয়ে এলাকাকে প্রভাবিত করা এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন আমাদের উস্তাদ শাহবাগী হুজুর  মাওলানা আজিজুর রাহমান সাহেব। তিনি বলতেন, এলাকার মানুষই মাদ্রাসার সম্পদ। এলাকার মানুষই সব সময় মাদ্রাসায় সাহায্য করে  সার্বিক দিক দিয়ে। তাই এলাকার বাচ্ছাদের যেমন পড়াতে হবে, এলাকার সাধারণ মানুষকে সেই ভাবে প্রভাবিত করতে হবে, যাতে তারা দ্বীন মেনে চলে। সেই এলাকার মানুষের সাথে সুজাউল মাদ্রাসার সম্পর্ক হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়ে এক সময়। এলাকার মানুষ দলে দলে ঝাপিয়ে পড়তে উদ্ধত হয় মাদ্রাসার উপর। আল্লাহর রহমতে সে অবস্থা থেকেও আল্লাহ রক্ষা করেন একমাত্র শাহবাগী হুজুরের ব্যক্তিত্বের কারণে। সুজাউল এলাকায় এমন মুরব্বী যুবক বা ছাত্র কেউ আছে আমার জানা নাই, যে শাহবাগী হুজুরের কোন কথার বিরোধীতা সামনা-সামনি করেছে।
একটি ঘটনা, যা ঘটেছে ১৯৯৩ সালে। আমি তখন আমি সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসা ছাত্র সংসদের ভিপি। গিয়েছি সুজাউলে মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে। শীতের চাঁদমাখা রাত। সারাদিন ওয়াজ শুনে বা পুরাতন নিবাসে পূণর্মিলনী করে রাতে চলে গেলাম আমার লজিং বিছরাবন্দে আব্দুল মান্নান মেম্বার সাহেবের বাড়ীতে। আল্রাহ আব্দুল মান্নান মেম্বার ও উনার স্ত্রীর প্রতি রহম করুন-যারা অত্যন্ত আদর ভালবাসা দিয়ে, উপযুক্ত সম্মান দিয়ে উনাদের বাড়ীতে আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন। লজিং বাড়ীতে বাহারী খাবার খেয়ে আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছি। গভীর রাত। গভীর ঘুমে মগ্ন। হঠাৎ করে চুপি চুপি আওয়াজে কে যেন ডাকছে। নজরুল ভাই, নজরুল ভাই। ঘুম ভেঙে গেল। জিঞ্জেস করলাম কে? নজরুল ভাই, আমি বদরুল, সাথে মছরুল। বদরুল মছরুলের গলার আওয়াজ আমার চেনা। দরজা খোলার পর তারা যা বললো, তাতে আমার গা চমকে উঠলো। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, চান্দের গুল বা বড়গুল এলাকার একজন হুজুর, যাকে তারা সুজাউল মাদ্রাসায় পিটুনী দিয়েছে, কারণ সে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে প্রস্তাব দিয়েছিল। ঘটনার পর সারা এলাকার লোক জড়ো হয়ে মাদ্রাসায় আক্রমনের উদ্যোগী হয়। শাহবাগী হুজুর ফজর পর্যন্ত সময় নিয়েছেন, যাতে সফলভাবে ওয়াজটা শেষ হয়ে যায়।
অতএব, ফজরের পর বিরাট কিছু হবে। এখন এলাকার মানুষ বাজারে প্রস্তুতি নিয়ে আছে, আর ছাত্ররা মাদ্রাস ক্যাম্পাসে-বাজারের যাচ্ছেনা। যে কোন সময় একটা কিছু ঘটতে পারে। বিধায় আমাকে এখনই যেতে হবে। শাহবাগী হুজুর আমার নাকি অপেক্ষা করছেন। আর যাওয়ার সময় মূল সড়ক দিয়ে যাওয়া যাবেনা, কারণ রাস্তায় মানুষ মাদ্রাসা ছাত্রদের খুঁজছে। বাধ্য হয়ে আরামের ঘুমকে হারাম করে মুল পথ ছেড়ে ফাঁড়ি পথে মাদ্রাসায় পৌছলাম। অনেক বন-জঙ্গলের মাঝ দিয়ে যখন মাদ্রাসায় পৌছলাম, তখন শাহবাগী হুজুর অগ্নিশর্মা। বললেন, তোমার এই গুলো কি করেছে দেখো। এখন কি করবা করো। আমি ফজর পর্যন্ত সময় নিয়েছি। এর পর আমার কোন দায়দায়িত্ব নাই। উনি আরো বললেন, এলাকার মানুষ মাদ্রাসাকে সহযোগিতা করবে, মাদ্রাসা ছাত্রদের মহব্বত করবে। মাদ্রাসার ছাত্ররা এলাকার মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, সহযোগিতা নেবে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের পরিপুরক হবে। আর তোমার অনুসারীরা এলাকার মানুষের উপর হামলা করেছে। শুধু এলাকার মানুষের উপর হামলা করেনি, একজন আলেমের উপর হামলা করেছে। সেদিন আমি দেখেছিলাম হুজুরের পেরেশানী। ছাত্রদের উনি ছাড়তে পারছেন না। আর এলাকার মানুষের প্রতি উনার যে গ্রহণযোগ্যতা তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেলো, তাও তিনি সহ্য করতে পারতেছেন না। এমন কঠিন অবস্থায় তিনি কি করবেন বুঝতে পারছেন না।
মাদ্রাসার ছাত্র আর এলাকার মানুষের মাঝে যদি মারামারি ধরণের কিছু ঘটে যায়, তাহলে তা হবে লেজে গোবরে অবস্থা। কারণ শায়খ আজিজুর রাহমান শাহবাগীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুজাউল এলাকা হচ্ছে এমন একটি এলাকা, যার প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে ০১টি সন্তান সুজাউল মাদ্রাসায় পড়ে। এখন একই পরিবারের একজন আছে ক্যাম্পাসে আর আরেকজন বাজারে। আমি রীতিমতো সমস্যায় পড়ে গেলাম। একদিকে আমার রুদ্ররোষে বদরুল আর মছরুল আক্রান্ত, অপর দিকে আক্রান্ত ছাত্র সংসদের বর্তমান কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য যে, সুজাউল মাদ্রাসা ছাত্র সংসদে ভিপি পদটি একটি অলংকৃত পদ। সম্ভবত আমিই একমাত্র ভিপি, যে অলংকৃত পদটির পুরো ফায়দা নিয়ে এক্সিকিউটিভ পদের মতো দায়িত্ব পালন করেছি।
চিন্তা করতে করতে হঠাৎ আমার মাথায় আমার একজন মুরব্বির একটি অতিচমৎকার শব্দ মনে পড়ে গেলা। শব্দটির নাম “টাইম কিলিং”। অবশেষে আমি টাইম কিলিং এর সিদ্ধান্ত নিলাম।
সাধারণতঃ সুজাউল মাদ্রাসায় ওয়াজ মাহফিলে এলাকার মা বোনেরা মুক্ত হস্তে নানা ধরণের সামগ্রী হাদিয়া বা সাদাকা হিসাবে প্রদান করেন। যেমনঃ ঘরের মুরগি, কদু, লাউ, সবজি, নারিকেল, ডিম ইত্যাদি। যা ওয়াজ মাহফিল শেষ হলে নিলামে বিক্রি করা হয়।
ছাত্র সংসদের কর্মকর্তাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়ে বললাম, মাদ্রাসার একটা ছাত্রও যাতে ক্যাম্পাসের বাহিরে না যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এদিকে আমি চলে গেলাম মুরগি কদু তথা হাদিয়া সাদাকার জিনিসপত্র নিলামের নামে টাইম কিলিং এ। নিলামের জন্য মাইকটা দখল করে নিলাম কাজে অতিরিক্ত টাইম লাগাতে থাকলাম “টাইম কিলিং”এর অংশ হিসাবে। এদিকে শাহবাগী হুজুর আমার উপর রীতি মতো অগ্নিশর্মা হয়ে বসে আছেন। কোথায় সে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবে, তা না করে সে নিলাম বিনোদন করছে।
একসময় নিলাম কাজ শেষ হলো। ততক্ষণে সারা রাত অপেক্ষায় থাকা গ্রামবাসীর মাঝে যারা অতিউৎসাহী উশৃংখল ছিল, তারা ঘুমের জ্বালায় বাড়ী ফিরতে বাধ্য হয়েছে। বাজারে ইনফরমেশন নিয়ে জানা গেলো যে, পরিস্থিতি অনেক উন্নত হয়েছে। আমি প্রভাবশালী মুরব্বী আমীর মেম্বারের স্মরণাপন্ন হলাম।  টাইম কিলিং-এর অংশ হিসাবে বিষয়টাকে যে কোন ভাবে আজ থেকে সরিয়ে অন্য কোন এক তারিখে নিয়ে যেতে বললাম। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই কাজ করে দিলেন।
আমার টাইম কিলিং মিশন কাজ শুরু করেছে। সকল ছাত্রদের নিয়ে মিটিং করে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে বিদায় দিলাম। তখন গ্রামবাসী প্রায় সবাই চলে গিয়েছেন। ছাত্ররাও তাদের বাড়ীতে চলে গেলো।
ততক্ষণে আমি শাহবাগী হুজুরের কাছে হাজির। দেখা গেলো উনার রাগও অনেকটা কমে এসেছে। তিনি যেন মুচকি মুচকি হাসছেন। বললেন, তোমার সেই দুষ্টুমি এখনো গেলনা। জানতে চাইলেন, কি ভাবছো? কিভাবে ম্যানেজ করবে? আমি বললাম, টাইম কিলিং।
অবশেষে টাইম কিলিং করতে করতে আমরা বিষয়টাকে প্রায় ২মাস পর্যন্ত দীর্ঘ করলাম। পরে পুরো সুজাউল এলাকার মানুষকে নিয়ে মিটিং হলো। মিটিংএ যারা প্রধান ভূমিকা রাখবেন, তাদের অন্যতম মুরব্বীদের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করলাম। তাদেরকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হলাম।
এক সময় নির্ধারিত দিন চলে আসলো। শাহবাগী হুজুরের চেহারাতে আবার অন্ধকার নেমে আসলো। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। যদি কিছু ঘটে যায়। আমি তাকে নিশ্চয়তা দিলাম, দূশ্চিন্তা না করতে বললাম। সকল ছাত্রদেরকে ফায়সালার জন্য আয়োজিত সমাবেশে সামনের সারি দখল করালাম। বিচার ফায়সালা শুরু হবে হবে এমন অবস্থায় আমি মুরব্বীদের কাছে মাত্র ০৫ মিনিট সময় চাইলাম এই শর্তে যে, আমার বক্তব্য শেষ না হওয়া অবধি আমাকে থামাবেন না। তারা মনজুর করলেন। এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য  কাজী আব্দুশ শাকুর-যিনি আমাকে সুযোগ দিলেন-যিনি এই অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন। আমি বক্তব্য দিলাম। বক্তব্যের সারকথা হলো, যারা মেরেছে তারা আপনাদের এলাকার মানুষ। একজনের বাড়ী তারাদরম, অন্যজনের বাড়ী ঘোলসাতে। আর যে মার খেয়েছে সেও আপনাদের এলাকার মানুষ-তার বাড়ী চান্দের গোলে। আর ঘটনাটি ঘটেছে মাদ্রাসার বাহিরে আপনাদের এলাকা সুজাউলে। এখানে ঘটনার সাথে মাদ্রাসা বা মাদ্রাসা ছাত্রদের সম্পর্ক কি? আমি মনে করি বিষয়টা নিয়ে আপনারা এলাকাবাসী মাদ্রাসার বাহিরে বসুন, সমাধান করুন। এই বিষয়টা মাদ্রাসার সাথে জুড়ে দেয়া বা বিষয়টার সাথে মাদ্রাসা ছাত্রের সংশ্লিষ্টতা উদ্দেশ্য মূলক। আমরা তা গ্রহণ করিনা। তাই বিষয়টি সেই দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করার অনুরোধ করছি।
আমার বক্তব্য শেষ হলো। বিচার স্থলে পিনপতন নিরবতা। নিরবতা ভাঙলেন শ্রদ্ধেয় আমীর মেম্বার। বললেন, ‘মুল্লা বেটা তো বিচার খাইয়া ফালাইছে।’
এরপর আমীর মেম্বার নিজে বিষয়টা দেখার জন্য ৫মিনিট সময় চাইলেন এবং কয়েকজন মুরব্বীসহ আমাকে নিয়ে মিটিং করলেন এবং আপোষে বিষয়টি সমাধান করলেন।
যেখানে রক্তপাত এবং সংঘর্ষের আশংকা ছিল, সেখানে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে বিষয়টি শেষ হলো। ফেতনা ছাড়া বিষয়টির সামাধান হওয়াতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো আমাদের শাহবাগী হুজুরের চেহারাতে।
 লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আলেমে দ্বীন।

সর্বশেষ সংবাদ