প্রসংগ ওয়াজ মাহফিলে হেলিকপ্টার বিলাস

প্রকাশিত: ১১:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

প্রসংগ ওয়াজ মাহফিলে হেলিকপ্টার বিলাস

ইকবাল হাসান জাহিদ : ওয়াজ মাহফিলে হেলিকপ্টার বিলাস, লেখক রশীদ জামীলের সত্যভাষণ ও দুই ব্রান্ডেড ওয়াজ-ব্যবসায়ীর গাত্রদাহ হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে আল্লামা আহমদ শফিকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করছে দেশের কতিপয় দালাল-ইসলমাস্টিরা। “আতুড়– ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না”, টাইপের এই ইসলামিস্টরা বিভিন্ন সময়ে ছয়-ছক্কা মেরে যখন হজম সমস্যায় ভুগতে শুরু করে, ঠিক তখনই আল্লামা আহমদ শফি ও হেফাজতে ইসলামকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করতে শুরু করে তারা। আজকাল হেফাজতের করুণ পরিণতির একমাত্র কারণ এটাই। বিশিষ্ট লেখক রশীদ জামীলের কলাম দেখে দুই ওয়াজ ব্যবসায়ী (মিস্টার হাবিবুল্লাহ মিসবাহ ও মিস্টার হাসান জামিল) তাকে মওদুদীর দোসর কিংবা ইনুর দালাল হিশেবে আবিষ্কারের চেষ্টায় ব্রত। নিজ বলয়ে খ্যাতিম্যান এই দুই কণ্ঠব্যবসায়ীর পরিপূর্ণ সমুঝ ও হেদায়ত কামনা করছি আমি।

হেফাজতে ইসলামের দুইচার দালাল কর্তৃক আল্লামা আহমদ শফিকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করে নীতিহীন নেতৃত্ব ও টাকা লোপাটের বিষয়টি মাথায় রেখে হেফাজতের প্রতি পূর্ণ দরদ নিয়ে জাগ্রত কবি মুহিব খান একটা কবিতা লিখেছিলেন কয়েক বছর আগে। সেই কবিতাকে বেনিফিশিয়ারিরা হেফাজতের বিরুদ্ধে উপস্থাপন করিয়ে স্বয়ং আল্লামা আহমদ শফির বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছিল। হেফাজতের কতিপয় ভক্তরা তখন সারা দেশব্যাপী মুহিব খানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেছিলেন। সময়ের পরিবর্তনে এই হেফাজতের নেতৃবৃন্দই মুহিবখানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এখন আসি মূল কথায়। রশীদ জামীল একজন লেখক। একজন ফ্রিল্যাংন্স সাংবাদিক। একজন চিন্তক। একজন দ্বীনদরদী। একজন আলেম। তিনি কোনো স্বঘোষিত দায়ী নয়। লক্ববধারী ও দাবীদার কোনো ইসলামের কন্ট্রাকটরও নয়।

উপরোল্লিখিত দুই ওয়াইজ ব্যক্তি কণ্ঠব্যাবসায়ী, বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন। মুখলেস দ্বীনদরদী। রাসুলের ওয়ারিস। বিশিষ্ট দায়ী। এর মধ্যে একজন আল্লাহ ও তার রাসুলের দ্বীন-ইসলাম প্রচারের জন্য নিজেকে নিবেদিত করেছেন টোটালি ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী-ওয়াইজ হিশেবে। আরেকজন নিজেকে চিন্তক ও গবেষক টাইপের ভাব নিয়ে শাইখ হওয়ার খাহেশে অনলাইনে অফলাইনে ফেইক আইডি ইউজ করে নিজেকে দ্বীন দরদী খোদাভীরু লেকচারার হিশেবে আত্মপ্রকাশ করার চেষ্টায় ব্রত। মাশাআল্লাহ। তাদের সকল প্রকার প্রচেষ্টায় আমরা আম জনতা আলোকিত। রশীদ জামীল তার কলামে বলেছেন- “লক্ষ টাকার হেলিকপ্টার চড়ে বক্তারা যখন মাহফিলে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন- আমার নাবীর ঘরে খেজুর পাতার ছাউনি ছিল। এক নাগাড়ে তিন দিন নবীর চুলায় আগুন জ্বলত না…ব্লা ব্লা। তখন তাদের লজ্জা করে না?”

এখানে রশীদ জামীলের কোন কথা আল্লামা আহমদ শফির বিরুদ্ধে গেলো? এখানের কোন বক্তব্য ইসলাম কিংবা মুসলমানের স্বার্থ বিরুধী হলো? আমি উপরোল্লিখিত দুই কণ্ঠব্যবাসায়ীদের কাছে জানতে চাই। এখনো এই দেশে আল্লার রাসুল সা.-এর নায়েবদের ঘর ভাঙাচোরা রয়েইে গেছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি, খলিফায়ে মাদানী আল্লামা শায়খ ইমাম বাড়ির হুজুরের ঘরের অবস্থা আমি নিজ চোখে দেখেছি। ঘরের ভেতরে বসে রাতের আকাশের তারা গুনা যায়। আমি আল্লামা গুণই পীর সাহেব হুজুরের বাড়িতে গিয়েছি। চট্টগ্রামের এক খলিফায়ে মাদানীর বাড়ির খবর শুনেছি। শেষমেষ আল্লামা আব্দুল জাব্বার সাহেবের বাড়ি দেখেছি। ওয়াজ করে যাওয়ার সময় আল্লামা গহরপুরী রহ. ভাড়া না নিয়ে চলে যেতেন। লোক পিছে পিছে হেটে টাকা দিতে সুযোগ পেতো না। আল্লামা আকবর আলী রহ. এর জন্য কোটি টাকার অফার নিয়ে পড়ে থাকতো লোক তার খানকায়। তিনি লাটি দিয়ে সরিয়ে দিতেন। কণ্ঠব্যবসায়ীদের ভাষায় তারা ইসলাম প্রচারক ছিলেন না? অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বার বার টাকা নিয়ে ঘুরে গেছেন আল্লামা আকবর আলীর দরবারে। টাকা দেয়ার সুযোগ পেতেন না। তারা বেতনের টাকাগুলোও অর্ধেক আল্লার রাস্তায় খরচ করে দিতেন। কিন্তু হেলিকপ্টার ওয়াইজারদের ইসলাম প্রচারের ধৃষ্টতা দেখে মনে হয় তারা সকলেই একেকজন উসমান রা.।

রশীদ জামিল বলেছেন – “হেলিকপ্টারে করে গিয়ে যাদের বয়ান করার শখ, তাদের বয়ান থেকে এক পয়সার হেদায়ত আশা করাও বোকামী”। তার এই বক্তব্যে আল্লামা আহমদ শফি কোনভাবে ঢুকলেন এবং কিভাবে তার শানের সাথে বেয়াদবী হলো আমি ঐ দুই কণ্ঠব্যবসায়ী শাইখদের কাছে জানতে চাই। হেলিকপ্টারে করে যাদের বয়ান করার “শখ”। আল্লামা আহমদ শফির কোন দিনের শখ হেলিকপ্টারে করে ওয়াজ করার আমার জানা নেই। সারা দেশের চোরেরা মিলে চুরি করলা। ডাকাতেরা মিলে ডাকাতি করলা। ধরা খেলে সরকারে দোষ দিলা। কণ্ঠব্যবসায়ীরা কন্ট্রাক করে ওয়াজ মাহফিলে হেলিকপ্টারে উড়ে গেলা। ধরা খেলে আল্লামা আহমদ শফিকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করলা। ৫০ হাজার টাকার কন্ট্রাক করে বরিশাল থেকে সিলেটে হেলিকপ্টারে এসে ১ লাখ তিরিশ হাজার টাকা নিয়া হাওয়া হইয়া চইলা গেলা বেশেতের সার্টিফিকেট দিয়া। এই টাকা লোপাটের কাম জেমসরা করলে বদমাইশি আর ওয়াজব্যবসায়ীরা করলে জায়েজ এবং ওয়াজিব। হেদায়ত কি আর দ্বীন প্রতিষ্ঠা কি নানাবাড়ির মিষ্টি-জিলাপী? তিনি বলেছেন- “কণ্ঠব্যবসায়ীদের আত্মীয় স্বজনদের কেউ কেউ বলেন, গান গাইতে আসা শিল্পীদের লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয়, সেখানে আমরা কিছু বলি না। আর কোরআনের কথা বলা বক্তাদের বেশি বেশি টাকা পয়সা দেওয়া নিয়ে আমরা কেনো চিল্লাই”।

আল-উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হিশেবে পরিচয় দিয়ে, দ্বিনে ইসলামের দায়ি হিশেবে লক্বব লাগিয়ে, আল্লাহ ও তার দ্বিনের প্রচার ও প্রসারের ফেনা মুখে আওড়িয়ে যদি জেমস আর আইয়ুব বাচ্চুর গানের কন্ট্রাকের সাথে দ্বীন ইসলাম প্রচারের সামঞ্জস্য খোঁজেন মাল কামানোর প্রতিযোগিতা করেন তাইলে লম্বা লম্বা জোব্বা খুলে আগে ঘোষনা দেন, আমরা দ্বীনের প্রচারের জন্য নয়, নায়েবে নবী হিশেবে নয়, আল্লার দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নয় ভন্ডামির জন্য নেমেছি রাস্তায়। আসুন আমাদের সাথে টাকা দিয়ে ওয়াজ মাহফিলে কন্ট্রাক করুন। তিনি আরো বলেছেন- “আর যদি হেদায়তই উদ্দেশ্য হয়, খোদার কসম বোখারি-মুসলিম যারা পড়ান তাদের কথায় মানুষের মধ্যে যে আসর পড়বে, গলাবাজ বক্তাদের ওয়াজে তার দশমিক শুণ্য একভাগও আসর পড়বে না”। —–মুখতাসার জামাতে ৮টা কিাতাবের মধ্যে ৭ টায় ফেল করেছে। মিশকাতে ফেল করে ৫টায়। দাওরায় ৭ টায়। এমন যাদের অবস্থা তারা যখন আল্লামা কেতরপুরী, শায়খ মুফতিয়ে জতরপুরী লক্বব লাগিয়ে উড়োজাহাজে উড়ে বাণিজ্যিক ওয়াজের কন্ট্রাকটরি করেন, তাদের জন্য দুই চারজোড়া জুতা নিক্ষেপণ ছাড়া আমার পক্ষ থেকে হাদিয়া এর চে য়ে বেশি কিছু দেয়ার সম্ভবই না। আল্লার জমিনে আল্লার দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীর কোনো খলিফা, কোনো নায়েবে নাবী, কোনো আল্লার খাস বান্দা টাকার ডিমান্ড করেনি করছেন না। আজকাল হাইব্রীড মুফাসসিরে কোরআন ও মিষ্টভাসী কণ্ঠব্যবসায়ীরা ওয়াজকে মেলার আসরের মতো বসিয়ে টাকা পাহাড়ে উড়তে যে কলাকৌশল অবলম্বন করছেন তাতে দ্বীনের লাভ হওয়া তো দূরের কথা দ্বীনের ক্ষতি সাধনের জন্য বুশ ব্লেয়ার কিংবা ট্রাম্পদের ভাড়া করে আনতে হবে না। আল্লাহ সকলকে হেদায়ত নসীব করুন।

আল্লাহপাক সরাসরি ওয়াজ মাহফিল সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে যে বর্ণনা দিচ্ছেন তার কিছু আয়াত তুলে ধরা হলো… ১) ياقوم لا أسألكم عليه أجرا إن أجري إلا على الذي فطرني হে জাতি আমি তোমাদরে কাছ(েওয়াজরে) বিনিমিয় চাচ্ছি না। আমার বিনিমিয় আমাকে আমার আল্লাহই দেবেনে। (সুরা হুদ, আয়াত-৫১)

২) : اتبعوا المرسلين اتبعوا من لا يسألكم أجرا নবীদরে অনুস্মরণ করো। অনুস্মরণ করো তাদের  যারা তোমাদরে কাছে কোনো বিনিময় বা প্রতিদান চান না (সুরা ইয়াসনি, আয়াত-২০,২১)

৩) قل ما أسألكم عليه من أجر وما أنا من المتكلفين বলুন, আমি তোমাদরে কাছে কোনো প্রতিদান চাই না আর আমি লৌককিতাকারীও নই। (সুরা সোয়াদ, আয়াত-৮৬)

৪) قل ما سألتكم من أجر فهو لكم বলুন, আমি তোমাদরে কাছে কোনো প্রতদিান চাই না। বরং তোমরাই রাখো। (সুরা সাবা, আয়াত-৪৭) ৫) : قل ما أسألكم عليه من أجر إلا من شاء أن يتخذ إلى ربه سبيل বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। যার ইচ্ছা সে তার পালনর্কতার পথ অবলম্বন করুক। (সুরায়ে ফুরকান, আয়াত-৫৭)

৬) قل لا أسألكم عليه أجرا إن هو إلا ذكرى للعالمين বলদেনি, আমি তোমাদের কাছে এ জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এটি সারা বিশ্বের জন্য উপদশে মাত্র। (সুরা আনআম, আয়াত-৯০)

৭) وما أسألكم عليه من أجر إن أجري إلا على رب العالمين আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার যা পাবার রাব্বুল আলামীনের কাছেই পাব। (সুরা শুয়ারা, আয়াত-১০৯)

লেখক: সাংবাদিক, স্বাধীন চিন্তক এবং আলেমে দ্বীন

( এ বিভাগের লেখা প্রতিবেদন লেখকের নিজস্ব অভিমত, সম্পাদক প্রকাশক দায়ী নন)

সর্বশেষ সংবাদ