তরুণ প্রজন্ম নিয়ে জুয়া খেলায় মোবাইল কোম্পানী

প্রকাশিত: 11:53 AM, January 24, 2017

তরুণ প্রজন্ম নিয়ে জুয়া খেলায় মোবাইল কোম্পানী

আহমদ মারুফ : রানীগঞ্জ একটি জনসভায় বিশেষ অতিথির মঞ্চে বসে আছেন ভদ্রলোক। আকষ্মিক একটি মোবাইলে চমকে উঠলেন। ঘাম ঝরা কপালে শরীরে অস্থিরতা বোধ করলেন। পাশের সঙ্গীর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন তুমি একটু বাইরে এসো। আমার খুব বিপদ। বাইরে এসে উৎসুক সঙ্গী কারণ জানতে চাইলে ভদ্রলোক করুণ সুরে জানালেন, ‘আমার নবম শ্রেণি পড়–য়া মেয়ে তানিয়াকে একটি বখাটে নিয়ে পালিয়ে গেছে’। কোনো কথা না বলে দ্রুত সিলেটের উদ্দেশ্যে ছুটলেন দু’জন। ভদ্রলোক বাসায় এসে ওই বখাটের সন্ধান নিয়ে থানায় পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলেন। পুলিশ আন্তরিকতার সাথে বিষয়টি আমলে নেয়। বিকাল ৪টায় গলফ ক্লাবের পার্শ্ববর্তী চা বাগান থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। ভদ্রলোক কাউকে না জানিয়ে চুপিসারে থানা থেকে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাতে মেয়েটিকে বেদম প্রহার করতে থাকেন। মারধরের এক মুহূর্তে তার বুক থেকে একটি মোবাইল ঝরে পড়ে। মোবাইল কোথায় পেলে জানতে চাইলে তানিয়া জানায়, ওই বখাটে ছেলে তাকে মোবাইলটি দিয়েছে। মোবাইলটি তার বুকে লুকিয়ে রাখতো এজন্য এতোদিন কেউ তা দেখতে পায়নি।
শুধু তানিয়া নন, গ্রীষ্মের দুপুরে ছাদের পানির ট্যাঙ্কের সামান্য ছায়ায় জবুথবু হয়ে বসে আলাপের বিরল চিত্র বা মধ্যরাতে নিজের অন্য কানকে ফাঁকি দেয়ার মতো অবিশ্বাস্য ক্ষীনতায় কথা বলার শৈল্পিক চর্চার নাম মোবাইল। আফিম তুল্য এই নেশা, যা কিশোরীকে গভীর রাতে প্রেমিকের অভিসারে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।
মোবাইলের ভয়াবহ অপব্যবহার ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে এক সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের কবলে পড়েছে সিলেট। মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের চিরায়ত মূল্যবোধ ও অহংবোধের অবস্থান থেকে সরে এসে দিন দিন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাচ্ছে। কোমলমতি তরুণ-তরুণীদের এ বিপর্যয় দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ভয়াবহ হুমকির মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। এতে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে সচেতন নাগরিক এমনকি জনসাধারণের মাঝে।
পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য, ধর্মীয় শিক্ষায় অশ্রদ্ধা, ডিস সংস্কৃতির আক্রমণ, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন না করে ছাত্র অবস্থায় অর্থের পেছনে বেপরোয়া ছুটে চলা, মোবাইল কোম্পানীগুলোর রাতের সাশ্রয়ী কর্মসূচির নামে যুবসমাজকে বিকৃতির সুযোগ করে দেয়া এবং সর্বোপরি ধর্মীয় মূল্যবোধে উদাসীনতাই সিলেটের সামাজিক বন্ধন এক নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে।
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রবীণ নাগরিকরা আমাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষায় এখনই সবাইকে সচেষ্ট হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেছেন, আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে বিকৃতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এখন তা বর্বরতা পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের পথে। অতীতে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তরুণরা কবি হয়ে যেত। আর এখন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে খুনি হচ্ছে। দৈনন্দিন কর্মকান্ড ও ব্যক্তিজীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা প্রাধান্য পাচ্ছে। পোশাক-আশাকে খোলামেলা চলার প্রবণতায় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের অবজ্ঞা ও অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্রই দিন দিন স্পষ্ট করেছে। তারা বলছেন, মা-বাবারা যদি এখনই তাদের সন্তানদের প্রতি যত্মবান না হন, তাহলে ভাগ্যাকাশে অতি শিগগিরই অমানিশার অন্ধকার নেমে আসবে।
সম্প্রতি সিলেটে ১৩ থেকে ২৩ বছর বয়সী ২৫ শিক্ষার্থীর উপর পরিচালিত এক জরিপে মোবাইল ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। জরিপের দেখা যায়, ১শ’ শতাংশ ছাত্রছাত্রীর মোবাইল আছে অন্তত একটি। ৫০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী দু’টি করে সেট ব্যবহার করে। ৮০ শতাংশ দুই থেকে তিন বা তার অধিক সিম ব্যবহার করে থাকে। ৫০ শতাংশ চার থেকে পাঁচ বা তার চেয়ে বেশি ঘন্টা সময় পার্টনারের সাথে কথা বলে। ৮০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এতে কমপক্ষে দুই ঘন্টা ব্যয় করে। ৪০ শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী মোবাইলের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কারণ এটি সামনাসামনি প্রপোজ করার চেয়ে নিরাপদ ও কম লজ্জার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সীও আছে। ৮৫ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে যার অধিকাংশ পর্ণোছবি এবং ভিডিও ডাউনলোডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ৬০ শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী মোবাইলে বিকৃত সেক্স করে।
আবার কোম্পানি ভেদে সিম পরিবর্তনের মাধ্যমে আছে মাল্টিপ্রেমের ব্যবস্থা। সিলেটের বেশির মোবাইলই প্রবাসীদের পাঠানো। শেকড়ের টানে মালয়েশিয়ার রাবার বাগানে কর্মরত বা সুউচ্চ টাওয়ারে ঝুলন্ত বা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির লু তপ্ত শ্রমিকের রক্তপাতি করা টাকায় পাঠানো মোবাইল নিয়ে তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাইবোন কী করে, তা কী তারা জানেন? তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে যেন জুয়া খেলায় মেতেছে মোবাইল কোম্পানিগুলো। ডিজুস জেনারেশন নামে নতুন এক প্রজাতির জন্ম দিয়েছে তারা? এতে বাড়তি সংযোজন এফএম রেডিও। মা-বাবার আকিকা দিয়ে রাখা সন্তানের এফএম নাম এখন ভাইরাস, ব্যাকহোল, বউপাগলা টাইগার মলম, সুপারগ্লু। নবপ্রজন্মকে এসব বিকৃত নাম দিয়ে দু’পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর এসএমএস’র লাখ টাকা সাদা চামড়াওয়ালাদের পকেটে পুরে দিচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ