গওহরপুর জামেয়া : সুশিক্ষার সমুজ্জল দৃষ্টান্ত

প্রকাশিত: ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৭

রেজাউল হক ডালিম: জাতির মেরুদন্ড কিংবা হৃৎপিন্ড-; মূলত: সুশিক্ষার মধ্যেই তা নিহিত। সুশিক্ষাই একটি আদর্শিক জাতির উন্নতির সিঁড়ি, সুশীল সমাজ বিনির্মাণের চাবিকাঠি, সুন্দর সমাজ গড়ার পূর্বশর্ত এবং সব ধরনের আঁধার দূর করার মূলমন্ত্র। মহান আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে হেরা গুহায় ‘ইক্বরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক্ব’র দ্বারা যে শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা করে গিয়েছিলেন, সে শিক্ষাই প্রকৃতপক্ষে মানুষের ইহ ও পরকালীণ সফলতা আনতে পারে। বাংলাদেশের প্রচলিত কওমি মাদ্রাসা এ শিক্ষা ব্যবস্থারই বাস্তব নমুনা। আর এ শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় একটি মডেল মাদ্রাসা সিলেটের ‘জামিয়া হোসাইনিয়া গওহরপুর’।
উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার বরেণ্য বুযুর্গ শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফিজ নূরুদ্দীন আহমদ (গহরপুরী রহ.) প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গহরপুর জামিয়া বর্তমানে সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যপানে। দেশ, জাতি ও দ্বীনের কল্যাণে জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুরের কর্মকা- আজ নিরন্তর চলমান।

 ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘কওমি গ্রাজুয়েশন সম্মেলন’
দেশের অন্যতম দ্বীনি বিদ্যাপীঠ, বরেণ্য বুযুর্গ -শায়খুল হাদীস হাফিজ আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রাহ. প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী জামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর’র ৬০ বছর পূর্তি ও ৬ষ্ঠ দস্তারবন্দী উপলক্ষে গত ২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার জামিয়া ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় ‘কওমি গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠান- দস্তারবন্দী মহাসম্মেলন। এটি কওমি অঙ্গনে দেশে প্রথম এবং ব্যাপক নন্দিত একটি আয়োজন।
মাসাধিক আগে থেকে সম্মেলনকে সামনে রেখে চলে ব্যাপক প্রচারণা। প্রচারণার জন্য ছিলো নজরকাড়া নান্দনিক ডিজাইনের ব্যানার-ফেস্টুন, পোস্টার-লিফলেট। এর পাশাপশি সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকেই সিলেট শহর ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ সকল রাস্তায় নির্মাণ করা হয় আকর্ষণীয় তোরণ। শেষপর্যায়ে পিক-আপে ভ্যানে নান্দনিক স্টেইজ বানিয়ে, ‘কওমি গ্রাজুয়েশন-দস্তারবন্দী সম্মেলন’ খচিত সফেদ পোশাকে পরে তরুণ আলেমরা চালান ব্যাপক প্রচারণা।
এদিকে, সম্মেলন উপলক্ষে সিলেটসহ গোটা দেশে কওমি ঘরানার মানুষজনসহ সাধারন মানুষের মাঝেও আলাদা এক আনন্দের বাতাস বইতে থাকে। ইলমে দ্বীন ও আধ্যাত্মিক জগতে আল্লামা গহরপুরী’র রহ. সমান বিচরণ থাকায় এমনিতেই প্রতিবছর মাহফিল লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
তাঁরই সুযোগ্য সস্তান, তরুণ আলেম মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজুর সুদূরপ্রসারী চিস্তা, বিচক্ষনতা ও দক্ষতা দিনদিন জামিয়া গহরপুরকে আরোও অনেকটাই আলোকিত করে তুলছে। বিশেষ করে কওমি গ্রাজুয়েশন-দস্তারবন্দী সম্মেলন’র মতো ব্যতিক্রমি আয়োজন সর্বস্তরের আলেম-জনতার প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। জামিয়া থেকে উত্তীর্ণরাও ছিলেন এতে বেশ উদ্দীপ্ত ও আনন্দিত।
জানা গেছে, জামিয়া গহরপুর থেকে বিগত দশ বছর, যারা তাকমিল ফিল হাদীস (কওমি গ্রাজুয়েশন) ও কুরআন শরীফ হিজহ সম্পন্ন করেছেন তাদের সকলকে গ্রাজুয়েশন সম্মাননা স্বরুপ দস্তারে ফজিলত-পাগড়ি, বিশেষ পোষাক -এরাবিয়ান আবা, স্মারক, ব্যাগ, চাবির রিং, কলম, গিফট বক্স ইত্যাদি প্রদান করা হয়। সম্মেলনের আগে গ্রাজুয়েটকে চিঠি দিয়ে তা জানিয়ে দেয়া হয় এতে অংশগ্রহণ করার জন্য।
সম্মেলনের দিন ২০০৭ ঈসায়ি সালের ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট গ্রাজুয়েট মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ্, যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসুরীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় জামিয়া গহরপুর আজ সফলতার উচ্চশিখরে। এ ধরনের অনুষ্ঠান দেশবাসী আগে কখনও লক্ষ্য করেননি। আমরা এতে আনন্দিত, গর্বিত। আল্লাহ তা’য়ালার কাছে মোহতামিম সাহেবের দীর্ঘায়ু ও গহরপুরী হুজুরের রাহ. উঁচু মাকাম কামনা করছি।’
সম্মেলনে দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও ইসলামি স্কলারগণ বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও বিশাল এ অনুষ্ঠানে আগত সব মানুষের জন্য ছিলো ব্যাপক আপ্যায়নের ব্যবস্থা।
দিবারাত্রি ব্যাপী এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানান।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর এই জামিয়া থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা সম্পন্ন করে ‘মাওলানা’ ডিগ্রি লাভ করেন। প্রতি ১০ বছর পরপর সম্মেলনের মাধ্যমে এই জামিয়া থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করা আলেমদের সম্মাননা স্মারক পাগড়ি প্রদান করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালে ১০ সালা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার মাদরাসার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ পাগড়ি প্রদান সম্মেলন।
প্রারম্ভিকতা :
ইসলামী ঐতিহ্যের নগরী বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী পূণ্যভূমি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুর এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরা বড়বাঘা নদীর তীরে ১৯৫৭ ইং সনে উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার বরেণ্য বুযুর্গ শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফিজ নূরুদ্দীন আহমদ (গহরপুরী রহ.) সীমাহীন এখলাছ-লিল্লাহিয়াতের সহিত এলাকাবাসীর আন্তরিক সহযোগীতায় প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী গহরপুর জামিয়া।
আদর্শ :
জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শভিত্তিক বৃহত্তর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :
এক) ইলমে দ্বীনের হেফাজত ও ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ও সুন্নাতে নববী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক তা’লীম ও তারবিয়াতের মাধ্যমে হক্কানী আলেম তৈরী করতঃ দেশ ও জাতির খেদমতে প্রেরণ করা।
দুই) আকায়েদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও ফিকহে হানাফির সংরক্ষণ এবং কুরআন ও হাদীসের সহীহ তা’লীম-তারবিয়াতের যথাযথ বাস্তবায়ন করা।
তিন) দ্বীন ইসলামের হিফাজত, দ্বীনের উপর আঘাতকারী সকল খোদা-দ্রোহীদের প্রতিরোধ করে সমাজ থেকে নস্তিক্যবাদ, শিরক, কুফুর, বিদ’আত ও পাপাচারের মূলোৎপাটন এবং “আমর বিল মা’রুফ ও নাহয়ি আনিল মুনকার” এর মাধ্যমে দ্বীনি তৎপরতা দ্বারা সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা ও সর্বস্তরে ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রচেষ্ঠা চালানো।
জামিয়ার শিক্ষাধারা :
জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া” কোন গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে জামিয়া সাজিয়েছে তার পাঠদান পদ্ধতি। সুবিন্যস্থ সিলেবাসের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে মৌলিকভাবে কুরআন, হাদীস, ফিক্হ, তাফসির, উসূল, আকাঈদ এবং বৈষয়িক পর্যায়ে আরবী সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ব্যাকরণ, নাহু, সরফ, বালাগাতসহ বাংলা, ইংরেজী, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ইত্যাদি সমুদয় বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়।
জামিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম :
কিতাব বিভাগ : এটি জামিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সর্বাধিক সমৃদ্ধ, বৃহত্তর ও প্রধান বিভাগ। এ বিভাগেই তৈরী হয় জাতির কান্ডারী- আধ্যাত্মিক রাহবার। দীনী শিক্ষার ক্রমমূল্যায়নের ভিত্তিতে কিতাব বিভাগটি মোট পাঁচটি স্তরে বিভক্ত। ইবতিদাইয়্যাহ (প্রাথমিক), মুতাওয়াসসিতাহ (মাধ্যমিক), সানুবিয়্যাহ উলয়া (উচ্চ মাধ্যমিক), ফযীলত (ডিগ্রি) ও তাকমীল (মাস্টার্স)। এ ৫টি স্তরে মোট ১৪ বছর সময়ে দ্বীনী শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য আলেম রূপে গড়ে তোলা হয় ও সনদ প্রদান করা হয়।
হিফজুল কুরআন বিভাগ : কুরআন শরীফ নাযেরা পড়তে সক্ষম শিক্ষার্থীদেরকে এ বিভাগে স্বল্প সময়ে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ শুদ্ধরূপে মুখস্থ করানো হয়।
ইফতা কোর্স : দাওরায়ে হাদীস (তাকমীল) সমাপনকারী মেধাবী আলেমদেরকে এ বিভাগে ফিকহ স্পেশালিস্ট হিসেবে যুগ সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে যোগ্যতা সম্পন্ন মুফতি রূপে গড়ে তোলা হয়।
আননূর ছাত্রকাফেলা :
দ্বীন ও সমাজের সকল পরিসরে জামিয়ার সন্তানরা যাতে ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য রয়েছে নানামুখী আয়োজন। এসব আয়োজনকে বাস্তব রূপদানের জন্য মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত হয়েছে “আন-নূর ছাত্র কাফেলা” নামক ছাত্র সংসদ।
জামিয়ার ছাত্র প্রশিক্ষণ কর্মসূচি :
ছাত্র পাঠাগার : জামিয়ার সিলেবাসভূক্ত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি ছাত্রদের জ্ঞানের পরিসীমা আস্তর্জাতিক অংগনে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সমকালীন অবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগতির জন্য তথ্যবহুল বই-পুস্তক সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার রয়েছে।
বক্তৃতা প্রশিক্ষণ : ইলম অর্জনের পাশাপাশি তা সুন্দর সাবলীল ভাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ছাত্র কাফেলা আয়োজন করে সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতা।
দেয়ালিকা : পাশ্চাত্যমুখী বিকৃত রুচির কলম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ইসলামী সাহিত্যের নির্মল জ্যোতি বিকিরণের মহান লক্ষ্য নিয়ে ছাত্রদেরকে কলম সৈনিক রূপে গড়ে তোলার জন্য বাংলা ভাষায় নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
দাওয়াত ও তাবলীগ : প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি নিজ আমল-আখলাককে আরো উন্নত এবং সকল স্তরের মানুষকে দ্বীনের প্রতি আহ্বান করতে নিয়মিত তাবলীগী কর্মসূচী পালন করা হয়। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও মহল্লায় সপ্তাহে একবার ২৪ ঘন্টার জামাত প্রেরণ করা হয়।
হাম্দ-না’ত প্রশিক্ষণ : আল্লাহ ও রাসূলপ্রেমের চির সুন্দর সুর ছড়িয়ে দিতে ছাত্র কাফেলার তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছে “আননূর সাংস্কৃতিক কাফেলা”। যেখানে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের রয়েছে পরিপূর্ণ সুযোগ। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
জামিয়ার সেবা প্রকল্প :
ফতওয়া বিভাগ : ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিভিন্ন ধরণের উদ্ভূত জটিল সমস্যার সমাধান দক্ষ মুফতি সাহেবগণ এ বিভাগ থেকেই দিয়ে থাকেন।
ফরায়েজ বিভাগ : মৃত ব্যক্তির স্থাবর- অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে শরীয়তের বিধান মোতাবেক সুষ্ঠু বন্টনের রূপরেখা এ বিভাগ থেকে প্রদান করা হয়।

সর্বশেষ সংবাদ