,

অন্তহীন ভাবনা

আফতাব চৌধুরী

জীবনে যখন অশান্তি আসে, মন যখন বিরহের বেদনায় ভরে ওঠে তখন নজরুল সাহিত্য পাঠ করে সান্ত¦না পাই। জীবন ও মৃত্যু এবং সৃষ্টির রহস্য তাঁর অজ¯্র কবিতায় যেভাবে ফুটে উঠেছে তেমন একমাত্র শেক্সপীয়রের রচনাবলী ছাড়া আর অন্য কোন কবি-সাহিত্যিকের রচনায় এমন ব্যাপকভাবে ফুটে উঠে নি। তাই তো নজরুল একদিন বলেছিলেন, ‘‘আমাকে হারালে বাঙালি আপনাকে হারাবে” প্রবোধকুমার সান্ন্যাল বলেছেন, ‘‘লন্ডনের জাতীয় সংরক্ষণ শালায় একটি কাঁচের দেয়ালে শ্বেতবর্ণে আঁকা নজরুলের পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেখে আনন্দ পেয়েছিলাম। পাশাপাশি মোট ১০ টি মূর্তি আঁকা। সক্রেটিস হতে আরম্ভ। হাজার বছর ধরে মানব বংশ পরস্পরায় সভ্যতা বিস্তারের কাজে যাঁরা সহায়তা করেছেন, তাঁদেরই একজন হয়ে নজরুল যেন হিমালয়ের সর্বোচ্চ গিরিচূড়ার মতো উন্নতশির।” বিশ্বের মহৎ কবি সাহিত্যিক ও মনীষীদের তীর্থ ভূমি সুদূর ইংল্যান্ডের মহাকবি শেক্সপীয়রের জন্মভূমি অ্যাভন নদীর তীরে সম্প্রতি শেক্সপীয়রের পাশে নজরুলের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে এবং এরপর অন্য কারো মূর্তি স্থাপন করা হবে না বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। ভাষাচার্য ডঃ সুনীতি কুমার চ্যাটার্জিও বিশ্ব সাহিত্যের তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করে বলেছেন, মানব সভ্যতার হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে যাঁদের সাহিত্য-কীর্তি মানব সভ্যতা বিকাশে সহায়তা করেছে পৃথিবীর সে সব দশজন শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যকের গ্রন্থ-সম্পুটের মধ্যে আধুনিক ভারতের নজরুলের সাহিত্য-কীর্তি অন্যতম। নজরুল একবার তাঁর বন্ধু লোকেন পালিতকে লিখেছিলেন, মানুষের প্রবাহ হু হু. করে চলে যাচ্ছে। তার জীবনের সমষ্টি কেবল সাহিত্য ছাড়া আর কোথাও থাকছে না। সঙ্গীতে চিত্রে বিজ্ঞানে দর্শনে সমস্ত মানুষ নেই। এই জন্যই সাহিত্যের এত আদর। এ জন্যই সাহিত্য সর্বদেশের মানুষ্যত্বের অক্ষয় ভান্ডার। এই জন্যই প্রত্যেক জাতি আপন সাহিত্যকে এত বেশি অনুরাগ ও গর্বের সহিত রক্ষা করে। আসলে কেবল মানুষ হিসাবেই মানুষের যে চিরন্তর মহিমা, উত্তম ও অধম নির্বিশেষে যে কাহিনী তার জীবনের সত্যিকার ইতিহাস, সেই প্রতিদিনের হাসিকান্না, সুখ দুঃখই ধরনীকে চিরশ্যামল করে রেখেছে।

কবির বিভিন্ন নাটক বসন্তের প্রশস্তি-সংগীত। ইহার মর্মবাণী কবি তাঁর অনবদ্য ভাষায় ও ভঙ্গিতে এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘‘জীবনকে সত্য বলে জানতে গেলে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার পরিচয় চাই। যে মানুষ ভয় পেয়ে মৃত্যুকে এড়িয়ে জীবনকে আকড়ে রয়েছে, জীবনের পরে তার যথার্থ শ্রদ্ধা নেই বলে জীবনকে সে পায়নি। তাই সে জীবনের মধ্যে বাস করেও মৃত্যুর বিভীষিকায় প্রতিদিন মরে। যে লোক নিজে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বন্দী করতে ছুটেছে, সে দেখতে পায়, যাকে সে ধরেছে সে মৃত্যু নয়, জীবন, যখন সাহস করে তার সামনে দাঁড়াতে পারিনি, তখন পিছন দিকে তার ছায়াটা দেখি। সেইটে দেখে ডরিয়ে ডরিয়ে মরি; নির্ভয়ে যখন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তখন দেখি যে সর্দার জীবনের পথে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়, সেই সর্দার মৃত্যুর তোরণ-দ্বারের মধ্যে আমাদের বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।” তাই তো মৃত্যুকে ভয় না করে, কীর্তির মধ্যে বেঁচে থাকতে চাওয়াই উত্তম। কবিগুরুর ভাষায় বলি, ‘‘মহাকাল প্রবাহিত হইয়া চলিয়া যাইতেছে, মানুষ তাহার কাছে নিজের সমস্ত কৃত-কর্ম কীর্তি সমর্পণ করিতেছে এবং মহাকাল সেই সমস্তই গ্রহণ করিয়া এককাল হইতে অন্য কালে বহন করিয়া লইয়া যাইতেছে, সেগুলোকে রক্ষা করিতেছে। কিন্তু যখন মানুষ মহাকালকে অনুরোধ করিল যে, এখন আমারে লহ করুণা করে তখন মানুষ নিজেই দেখিল যে,
‘‘ঠাঁই নাই, ঠাই নাই! ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়াছে ভরি!”

মহাকাল মানুষের কর্ম কীর্তি বহন করিয়া লইয়া যায়, রক্ষা করে কিন্তু স্বয়ং কীর্তিমান মানুষকে সে রক্ষা করতে চায় না। হোমার বাল্মীকি ব্যাস কালিদাস শেক্সপীয়ার নেপোলিয়ন আলেকজান্ডার প্রতাপ সিংহ প্রভৃতির কীর্তিকথা মহাকাল বহন করিয়া লইয়া যাইতেছে, কিন্তু সেই সব কীর্তিমানদের মহাকাল রক্ষা করে নাই, যিনি প্রথম অগ্নি আবিস্কার করিয়াছিলেন, বস্ত্রবয়নের তাঁত ইত্যাদি আবিস্কার করিয়াছিলেন, তাঁহাদের নাম ইতিহাস রক্ষা করে নাই, কিন্তু তাঁহাদের কীর্তি মানব-সভ্যতার ইতিহাসে অমর হইয়া আছে।” প্রত্যেক মানুষ জীবনের কর্মের দ্বারা সংসারকে কিছু না কিছু দান করছে, সংসার তার সমস্তই গ্রহণ করছে রক্ষা করছে, কিছুই নষ্ট হতে দিচ্ছে না-কিন্তু মানুষ যখন সেই সঙ্গে অহংকেই চিরন্তর করে রাখতে চাচ্ছে, তখন তার চেষ্টা বৃথা হচ্ছে।” কিন্তু সত্যি কথাটি হলো যে “মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।” পৃথিবীতে মৃত্যু সব হরণ করে, তথাপি চিরজীবী প্রেম পরাভব মানিতে চাহে না। প্রেম মৃত্যু অভিমুখ। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য ক্ষণিক এবং ¯েœ্হ-প্রেমের সমস্ত সম্পর্ক অনিত্য। কিন্তু ভালোবাসা, পার্থিব প্রেম পরাভব মানতে চায় না। আপনজনকে কেউ বিদায় দিতে চায় না। ‘‘যেতে নাহি দিব’’ কবিতায় মানুষের চিরন্তর বিরহের করুণ সুর ফুটে উঠেছে। কবিতাটির যিনি বক্তা তাঁর চার বছরের কন্যাটি যেন পৃথিবীরই প্রতিনিধি, পৃথিবীর ¯েœহ-মমতার প্রতিচ্ছবি। যেতে নাহি দিব কবিতায় কবিগুরু একটি অতি সাধারণ বিদায়ের দৃশ্যের ভেতর হতে জগতের একটি চিরন্তর বেদনার পরিচয় উদঘাটন করে দেখিয়েছেন। প্রত্যেক বিদায়ের দৃশ্যের মধ্যে মৃত্যুর একটি ছায়াপাত আছে। চারি বছরের কন্যা যেন অবুঝ মানব, সে কিছুই বুঝতে চায় না শুধু বলে ‘যেতে নাহি দিব।’ ধরিত্রী, মাতার অসীম সৌন্দর্য ও বিপুল ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর দুঃখের অন্ত নেই কারণ তিনি সন্তানের অনন্ত ক্ষুধা মিটাতে পারেন না, সন্তানকে কাছে ধরে রাখতে পারেন এমন সামর্থ্য তাঁর নেই। তাই তো সমস্ত আকাশে বাতাসে একটি করুণ সুর ধক্ষনিত প্রতিধক্ষনিত হচ্ছে-
‘‘কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
সমস্ত পৃথিবী! চলিতেছি যতদূর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর,
যেতে নাহি দিব না তোমায়।”
কিন্তু মানুষের প্রেম কিছুতেই পরাভব মানতে চায় না-
‘‘—-যতবার পরাজয়
ততবার কহে, আমি ভালোবাসি যারে
সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।”
কিন্তু প্রিয়জনকে হারাবার পর ম্লান নির্বাক মুখে বসে থাকেন আর ভাবেন, ‘দিব না দিব না যেতে- ডাকিতে ডাকিতে
হু হু করে তীব্র বেগে চলে যায় সবে
পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত কলরবে।
‘‘স্বর্গ হইতে বিদায়” এর মর্মবাণীটি হলো, মানুষের জীবনটা তুচ্ছ নয়, মর্ত্য লোক হেলার সামগ্রী নয়, বরং মর্ত্যই স্বর্গ অপেক্ষা অনেক লোভনীয় ও সুন্দর। মর্ত্যরে সঙ্গে মানুষের সুখ-দুঃখ আশা-নিরাশা আনন্দ ব্যথার সম্বন্ধ, সে আমাদেরকে জন্মকাল হতে ¯েœহ দিয়ে আহার দিয়ে শিক্ষা দিয়ে বড় করে তুলেছে। এক ধারা অবিশ্রান্ত সুখ যেখানে, সেখানে সুখের কোন বিশেষত্ব নেই। মানব-মন পরিবর্তনের দ্বারা, বৈষম্য-বৈপরীত্য ও তারতম্যের দ্বারা সুখ ও আনন্দ উপলব্ধি করে মর্ত্য লোকের দুঃখের সঙ্গে ব্যথার সঙ্গে সুখ ও আনন্দ ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত হয়ে রয়েছে বলেই সুখের মাধুর্য এত প্রবল, আনন্দের মূল্য এত অধিক। দুঃখকে এড়াতে চাইলে চলবে না, সুখ, দুঃখকে সমভাবে বুকে চেপে ধরে জীবন পথে চলতে হবে তবেই সুখ-দুঃখ উভয়ে মিলে ঢেলে দেবে আবার আনন্দ। স্বর্গের অপসরা পৃথিবীর মানবের বুকে কেবল প্রেমহীন কামনার বহ্নি জ্বেলে তাকে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু পৃথিবীর কন্যা তার প্রেমাকাঙ্খী মানবকে বরণ করে নেয়, তার নিমিত্ত সর্ব দুঃখ গ্লানি অকাতরে সহ্য করে, পরের জন্যে আপনাকে দান করে দুঃখ বহন করাতে সে গৌরব ও আনন্দ অনুভব করে। তাই কবি-কল্পিত নিষ্ঠুর স্বর্গের প্রলোভন অপেক্ষা ধরনীর এই সহানুভূতিময় দুঃখপূর্ণ জীবন মানবের অধিক কাম্য; তাই সুখ-দুঃখ ভরা হাসি-কান্নায় পরিপূর্ণ পৃথিবীই কোন অচেনা অজানা স্বর্গ অপেক্ষা অধিকতর ইপ্সিত। পৃথিবী মাতৃভূমি। আর স্বর্গ মানবের প্রবাস।

সাংবাদিক-কলামিস্ট।

0Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল

সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ ১৪৯ আরামবাগ,ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কাযালয়: ২০৭/১ ফকিরাপুল, আরামবাগ , মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।

সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-০৩৩৭১৫,০১৭১২-৫৯৩৬৫৩

E-mail: provatbela@gmail.com,

কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম

শিরোনাম :
ক্রাইস্টচার্চ ট্রাজেডি: নিহতের সংখ্যা ৪৯ স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করলেন সিলেটের পারভীন হামলাকারী অস্ট্রেলিয়ান শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি বাংলাদেশ দল নিরাপদে ৫মিনিট আগে পৌঁছলে বাংলাদেশ দলের সর্বনাশ নিউজিল্যান্ডে মসজিদে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর গুলি: নিহত ৪০ ডায়াবেটিস কিডনির সমস্যায় কাঁচা পেঁপে ডাকসু ভিপি গণভবনে যাচ্ছেন শনিবার নাসিমা চৌধুরীর সম্মাননা, সংবর্ধনা মদিনা মার্কেটে ছাত্রলীগ কর্মী খুন ডাকসুঃ চমকের পর চমক টিএসসিতে ডাকসু ভিপি নুরুলের উপর ছাত্রলীগের হামলা মুফতি জাকারিয়ার জানাযায় লাখো মানুষের উপস্থিতি পারবে কি নুরু ইতিহাস হতে? এবার পুনর্নির্বাচনের দাবি ছাত্রলীগের ভিপি হওয়ার পর যা বললেন নুরুল নুরুল ভিপি, রাব্বানী জিএস ডাকসু : ১৫ হলের ফলাফল শামসুন্নাহার হলে ভিপি ইমি,জিএস ছপা কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ বরখাস্ত কুয়েত মৈত্রী হলে সিলযুক্ত ব্যালট রোকেয়া হল থেকে ট্রাঙ্কভর্তি ব্যালটপেপার উদ্ধার ভিপি প্রার্থী নুরের ওপর হামলা ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেলের ডাকসু বর্জন দরগাহ মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি জাকারিয়ার ইন্তেকাল ৭ মার্চের প্রাসঙ্গিকতা ও অনিবার্যতা ডিএনসিসি মেয়র আতিকের শপথ সুলতান মনসুর শপথ নিলেন হজ্ব পালনকালে সেলফি তোলা হারাম কানাইঘাট থানায় ফাহিমা- রেজওয়ানের বিয়ে বিএসএমএমইউতে নেয়া হবে খালেদাকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিচার হলে সব মক্কেল নির্দোষ হতেন দুনিয়ার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু আল্লাহর পথ সর্বদাই খোলা থাকে ‘রাজনীতি এখন মানুষের জন্য করা হয় না’ বাইপাস সার্জারি করা হবে কাদেরের কাদের আর খালেদার চিকিৎসা এক নয় মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে কাদের ইউনাইটেড হাসপাতালে মাওলানা হাবীব মাওলানা হাবীবের অবস্থা সংকটাপন্ন: ঢাকায় রওয়ানা সিসিকে পরামর্শক ব্যয়’র নামে লুটপাট: ক্ষুব্ধ পরিকল্পনামন্ত্রী বিজ্ঞাপনী পেরেকে আক্রান্ত নির্বাক বৃক্ষ ১০১ টাকা দেনমোহরে পলাশকে বিয়ে করেন সিমলা ঋতুস্রাবের পাঠ প্রাথমিক পর্যায় থেকে বাধ্যতামূলক ফুটবল তারকা সালাহ যেখানেই যান, সাথে থাকে পবিত্র কোরআন কাশ্মীরে বোমাবর্ষণ করেছে ভারত ডাকসু : ছাত্রদলের প্যানেলে নেই কেন্দ্রীয় নেতারা সুন্দরবনে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪ জলদস্যু নিহত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু ১ এপ্রিল ডাকসু নির্বাচনে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের প্যানেল ঘোষণা ডাকসু : ছাত্রলীগের বিদ্রোহী প্যানেল ঘোষণা