জঙ্গি আস্তানা, আইনশৃংখলা বাহিনী ও মিডিয়ার ভূমিকা

প্রকাশিত: ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২, ২০১৭

‘জঙ্গ’। ফারসি ও উর্দু ভাষায় ব্যবহৃত একটি শব্দ। অর্থ যুদ্ধ। সে থেকে ‘জঙ্গি’। অর্থাৎ- যোদ্ধা। ইসলামের স্বর্ণালী যুগ থেকে শুরু করে কয়েক বছর আগ পর্যন্তও জঙ্গ বা জঙ্গি শব্দকে ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বিগত ১০-১২ বছর ধরে যখন বিশ্বের নানা দেশে; ‘সন্ত্রাস’ ও কথিত ‘জঙ্গিবাদ’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখন ‘জঙ্গ’ বা ‘জঙ্গি’ শব্দদ্বয়কে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত: ‘জঙ্গ’ বা ‘জঙ্গি’ শব্দ নিন্দনীয় নয়। যে, যারা কিংবা যে মহল এ শব্দদ্বয়কে নেতিবাচকের দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত তাদের রয়েছে ঘোলা জলে ফায়দা শিকারের সুক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারি নীলনকশা।
সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কথিত জঙ্গিবাদ- সোজা কথায় সন্ত্রাসবাদ একটি বার্নিং ইস্যু’তে পরিণত হয়েছে। সে ইস্যু আরো জোর আলোচনায় চলে আসছে বিশ্বের নানা স্থানে সুমহান ইসলামিয় শিক্ষা ও দীক্ষা বিবর্জিত, বিকৃত মস্তিষ্কের কতিপয় সন্ত্রাসীর আত্মঘাতি বোমা হামলা কিংবা বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা বুক নিয়ে লাশের মিছিল ভারী হওয়ায়।
সেই লাশের সারি লম্বা হতে হতে আজ এসে ঠেকেছে এ দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেটেও। গত ২৪ মার্চ থেকে সিলেটে বইছে ‘জঙ্গি’ উত্তাপ। সিলেট দক্ষিণ সুরমার ‘আতিয়া মহল’ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মৌলভীবাজারে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অভিযান। এরই মাঝে বয়ে গেছে রক্তের দীর্ঘ নহর। দু’চোখের কার্নিসে লোনাজলের প্লাবন বইছে কুল খালি হওয়া কিছু জন্মধারিণীর। সন্তান হারানোর নীল কষ্ট প্রতিরাতে দু:স্বপ্ন হয়ে তাড়া করবে কতক জন্মদাতাকে। জটিল পৃথিবীর যোগ-বিয়োগ বুঝে উঠার আগেই ‘জঙ্গির সন্তান’ তকমা নিয়ে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কিছু কোমলমতি শিশুকে ছাড়তে হয়েছে এ পৃথিবী।
আমরা জীবন দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে পরাজিত করেছি। দেশের দুর্যোগে দুর্বিপাকে আমাদের আইন-শৃংখলাবাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে, রাখছে। ভিন্ন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে বাংলাদেশের আইন শৃংখলা বাহিনী বিশে^র অন্যতম চৌকস বাহিনী। শান্তি, সমৃদ্ধি, যুদ্ধে বিশ^জুড়ে যাঁদের রয়েছে সুনাম। আজকের এই ক্রান্তিকালে এসে আমাদের বাহিনীকে আরো সজাগ সচেতন ও সতর্ক থাকা জরুরী। গুটিকতেক জঙ্গি প্রতিরোধে এসে র‌্যাব এর মত এলিট ফোর্সেও গোয়েন্দা প্রধানের মৃত্যু আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতাকে। তারচেয়ে ভয়ানক রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বহীন বক্তব্য বিবৃতি। মনে রাখতে হবে, বিশ^ মোড়লরুপী শকুনরা উড়ছে আমাদের মাথার উপর। খুঁজছে ছোবলের সুযোগ। আমাদের আইন-শৃংখলা বাহিনীকে ব্যর্থ প্রমাণ করে কোন ‘অতিথিবাহিনীর’ আগমনের সুযোগ আমরা দিতে পারিনা। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে পারিনা।
১৬ কোটি জনগণের দেশে প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংখ্যা অর্ধসহ¯্রাধিক। আরো রয়েছে কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল। সাংবাদিকতার অবারিত ক্ষেত্র বাংলাদেশে। নেই কোন শক্ত জবাবদিহিতা। অনৈতিক প্রতিযোগিতায় মত্ত অনেক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান। কার আগে কে প্রকাশ করবে। সত্য মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত সংবাদের দিকে খেয়াল নেই। সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জর্দার স্কচটেপে মোড়ানো জর্দার কৌটা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ধরন আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। সহযোগি প্রতিষ্ঠান সহকর্মী সাংবাদিকদের আরো দায়িত্বশীর হবার অনুরোধ আমাদের। মনে রাখত হবে, দেশ আমাদের। বানের ঢলের মত কোন শক্তি এদেশের স্বাধীতনতা সার্বভৌমত্বকে লুণ্ঠন করার সুযোগ আমরা দিতে পারিনা। জীবন রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ রক্ষায় নিজ নিজ অবস্থানে আরো দায়িত্বশীল হই, আরো সচেতন থাকি।

বাস্তবতার নিরিখে সাম্য, সুন্দর ও সার্বজনীন ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদি কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপই এই সন্ত্রাস বা কথিত জঙ্গিবাদের উত্থান। তারা ইসলামকে কলঙ্কিত করতে, সত্যিকার ইসলামপন্থি, ইসলাম প্রচারক ও ইসলামী আন্দোলনকারীদের বিতর্কিত করতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলো এবং অপার সম্ভাবনার সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পথ রোধ করতে এবং এসব দেশে তাদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে একে কাজে লাগাচ্ছে। তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কিছু ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষহীন বিভ্রান্ত মুসলিমকে কিনে নিয়েছে। পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের কারণে হোক কিংবা অন্য কোনো কারণে হোক- যারাই এই পথে পা বাড়িয়েছে তারা জঘন্যতম অপরাধে জড়িত হয়েছে- এটি চন্দ্র-সূর্যের মতো সত্য বিষয়।
সৃষ্ট এ সন্ত্রাসবাদ সমস্যায় আমাদের সরকার বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। যেটি প্রশংসার দাবিদার। কিছুদিন আগে আমাদের প্রধামনন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একটি বক্তব্যে বলেছেন- ‘ইসলাম কখনোই জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না’। এ কথাটিই যথার্থ।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কারন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা এবং দ্বীনি দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে মূল্যবান আলোচনা রয়েছে কুরআন-হাদিস ও ইসলামি গ্রন্থসমূহে। ইসলামের আলোকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে অত্যন্ত চমকপ্রদ বিশ্লেষণসহ মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে তাতে সুনির্দিষ্ট ধারনাও দেয়া আছে। ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে যারা সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত করে, তারা প্রিয় নবী (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শ থেকে অনেক দূরে। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের কোনো ধর্ম নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও আতঙ্কগ্রস্ত করে পার্থিব সম্পদ অর্জন, ক্ষমতা দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং সুমহান ইসলামকে কলুষিত করা।
আমাদের দেশে সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকার বলিষ্ট ভূমিকা পালন করবেন এটা আমাদের নাগরিক প্রত্যাশা ও বিশ্বাস। কথিত জঙ্গিবাদের মুলোৎপাটন করে এ দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকারের ভূমিকা হোক স্বচ্ছ, সুতীক্ষ্ম ও প্রশ্নাতীত।

সর্বশেষ সংবাদ