,

মাহে রমজান ও আমাদের ঈদ প্রস্তুতি

মুফতি তাকি উসমানি : রমজান মাস মহান আল্লাহর অনন্ত রহমত ও বরকতের সেই ঋতুরাজ বসন্তকাল, যাতে বিশ্বচরাচরের মহান স্রষ্টার পক্ষ হতে দয়া ও অনুগ্রহের নানা বাহানা অন্বেষণ করা হয়, যে মাসে ঈমানের দৌলতে ধন্য মুমিনের উপর রহমতের বৃষ্টি মুষলধারায় বর্ষিত হয়।

যে মাসে ক্ষমাশীল প্রভূ স্বীয় বান্দাদের পাপ মোচনের লক্ষ্যে সর্বদা ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন। জানি না এ মসে কত অসংখ্য-অগণিত মানুষকে মাগফেরাত করে জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার শাহী ফরমান জারি করা হয়।

মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি, নূরের স্রোত আমাদের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রান্ত হয়, কিন্তু আমরা অজ্ঞতা-অন্ধতার কারণে তার মাহাত্ম ও গুরুত্ব বুঝি না। ফলে অতি বরকতপূর্ণ দামী মুহূর্তগুলোকে অবজ্ঞা-উপেক্ষা, গাফিলতি ও যাচ্ছেতাইভাবেই নিঃশেষ করে দিতে দ্বিধা বোধ করি না।

হাদীসে বর্ণিত-‘ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি যে রমজান মাস পেল তারপরও তার গুণাহ মাফ হল না।’ সবার জন্য ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত থাকার এই বিশেষ সময়েও যে ব্যক্তি নিজের গুনাহ ক্ষমা করাতে পারে না তবে তার অর্থ হবে এটাই যে, সে ব্যক্তি নিজেকে খোদার রহমত হতে (নাউযুবিল্লাহ) নিজেকে স্বাধীন ও অমুখাপেক্ষী মনে করে।

আর এই বেপরোয়া মানসিকতাই সবচেয়ে বিপদজনক বস্ত্ত, যার ব্যাপারে হযরত জিবরাঈল আ. ধ্বংসের বদদুআ করলেন আর নবীয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সমর্থনে আমীন বললেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আজকের মজলিসে সেই ধরনের কিছু অন্যায়-অবহেলার বিষয় উল্লেখ করাই উদ্দেশ্য, যা আমরা এই মুবারক মাসেও অব্যাহত রাখি। ভয় লাগে যে, আল্লাহ না করুক এই অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে সেই ভয়াবহ হুমকি ও বদদুআর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে না যাই। (আল্লাহ এমন ফয়সালা না করুন)

রমজানন মাসে আমাদের সবচেয়ে ব্যাপক ও সীমাহীন অনৈতিক কর্ম এটাই যে, এই মুবারক মাসে নিজেদের দুনিয়াবি চাহিদা ও খরচের পরিধি সঙ্কুচিত করার পরিবর্তে আরো অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি করে দেই।

ব্যবসায়ী মহোদয়গণ তো এই মাসকে বিশেষ উপার্জনের মাস ঘোষণা দিয়ে রাত-দিন সেই ধ্যানেই মগ্ন থাকেন। অনেক সময় এই ধ্যান-মগ্নতার কারণে নামাযও ‘কুরবান’ হয়ে যায়।

‘ঈদের প্রস্ত্ততি’ আমাদের জন্য এখন একটা বড় ধরনের ফিতনা। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা ‘ঈদুল ফিতর’কে মুসলমানদের জন্য আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সর্বজনীন বাৎসরিক আনন্দের বিশেষ দিবস হিসেবে মনোনিত করেছেন।

এমনকি এ বিষয়টিও শরীয়তে স্বীকৃত ও প্রমাণিত যে, এই দিনে কোনো উত্তম থেকে উত্তম পোশাক কেউ যদি সহজে লাভ করতে পারে সে যেন তা পরিধান করে।

কিন্তু বর্তমানে এ উপলক্ষে ‘উত্তম পোশাকের’ অজুহাতে যে অসীম-অগণিত বেহুদা খরচের জোয়ার সৃষ্টি করা হয়, অন্যায়-অপব্যয়ের যে মহা প্লাবণ বইয়ে দেওয়া হয় এবং সেটাকে ঈদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয় তার সঙ্গে দ্বীন ও শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।

বর্তমান যুগে এ বিষয়টি ফরয-ওয়াজিব সাব্যস্ত করা হয়, (ঈদ পালনের জন্য) অতি আবশ্যকীয় জরুরি বিষয় মনে করা হয় যে, কোনো ব্যক্তির আর্থিক সচ্ছলতা থাকুক বা না থাকুক কিন্তু সে কোনো না কোনো উপায়ে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য নিত্য-নতুন ডিজাইন ও ফ্যাশনেবল পরিধেয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করবে।

ঘরের প্রত্যেক সদস্যের জন্য জুতা-টুপি থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস নতুন নতুন ক্রয় করবে। শুধু তাই নয় ঈদের প্রকৃত স্বাদ অনুভবের জন্য, ঘরের সাজ-সজ্জা ও শোভাবর্ধনের জন্য নিত্য-নতুন আসবাবপত্র ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের ফার্নিচারের ব্যবস্থাও করা হয়।

দূর-দূরান্তে অন্যান্য শহরে বসবাসকারী আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের নিকট মূল্যবান গিফট ও দামি ঈদকার্ড প্রেরণ করা হয়। আর এসব কাজ এমন এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে সম্পন্ন করা হয় যে, কেউ যেন কারো থেকে পিছে পড়ে না যায়। কেউ যেন কারো কাছে কোনো ক্ষেত্রে হেরে না যায়।

এসবের অনিবার্য পরিণতি এটাই হয় যে, একজন মধ্যম স্তরের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্য ‘ঈদের প্রস্ত্ততি’ একটি বাড়তি দুশ্চিন্তা ও আলাদা মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এরই ধারাবাহিকতায় যখন সে দেখে যে, হালাল উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের সবার চাহিদা ও আবদার পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং বৈধ টাকা-পয়সা তার জন্য পর্যাপ্ত হচ্ছে না, তখন সে অবৈধ পথের সন্ধান করে। বিভিন্ন পন্থায় অন্যের পকেট মেরে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে। যা দ্বারা সেই লাগামহীন চাহিদা ও অন্তহীন কুপ্রবৃত্তির পেট ভর্তি করে।

এসব বাদ দিলেও ‘ঈদের প্রস্ত্ততি’র সবচেয়ে ন্যূনতম ক্ষতি তো এটাই যে, মহামূল্যবান ও বিশেষ করে শেষ দশকের রজনীগুলো-যা একান্ত নীরবে, নিরালা পরিবেশে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা ও মুনাজাতের শ্রেষ্ঠতম সময়, খোদার সান্নিধ্য লাভের মোক্ষম সুযোগ ও অনন্য মুহূর্ত, তা বাজারের মধ্যে অতিবাহিত হয়ে যায়।

এসব আলোচনার উদ্দেশ্য-আল্লাহ না করুন-কাউকে তিরস্কার করা, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা কিংবা সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা করা নয়।

এই আলোচানার উদ্দেশ্য, অন্তরের দরদ ও সহানুভূতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে এ দাওয়াতী চিন্তা-চেতনা পেশ করা যে, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস আল্লাহ তাআলা কোন কাজের লক্ষ্যে সৃষ্টি করলেন, কী উদ্দেশ্যে এমন একটি শ্রেষ্ঠ মাস দান করলেন। আর আমরা সেটাকে কোন বেহুদা কাজে ব্যয় করি। অনর্থকভাবে সেটাকে বিনষ্ট করি।

যদি আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রদর্শিত পথ, শিক্ষা-দীক্ষা ও তার আদর্শের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও অনুরাগ থাকে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফায়াত লাভের তপ্ত বাসনা অন্তরে জাগ্রত থাকে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বদদুআকে সত্যিকারভাবেই বিপদজনক মনে করে ভয় করি তাহলে জামার আঁচলে মুখ ঢেকে আমাদের হিসাব করা উচিত।

অতীত গাফিলতি হতে খাঁটি মনে তওবা করে এই অঙ্গীকার উচিত যে, এই পবিত্র মাসে সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকব। একনিষ্ঠ মনে আল্লাহর দিকে ফিরে আসব। রমযানের এই অতি মূল্যবান সময়গুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যেই ব্যয় করব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এ অঙ্গীকার পূরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
উৎস: মাসিক আল-কাউসার।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল

সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ ১৪৯ আরামবাগ,ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কাযালয়: ২০৭/১ ফকিরাপুল, আরামবাগ , মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।

সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-০৩৩৭১৫,০১৭১২-৫৯৩৬৫৩

E-mail: provatbela@gmail.com,

কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম

শিরোনাম :
সিলেটে ইয়াবাসহ যুবক আটক সিপিএল চ্যাম্পিয়ন ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স ৩২ ধারা বহাল রেখে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সংসদীয় কমিটি বাহরাইনকে ১০-০ গোলে উড়িয়ে শুভসূচনা বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে ঢাকাকে সমর্থন দেবে দিল্লিঃ শ্রিংলা ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডের চাকরিতে থাকছে না কোটা নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ ৫দফা দাবী উত্তরমুখী হয়ে লাভ নেই, ওখানে সাড়া দেওয়ার মতো কেউ নেই আইডিইবি সম্মেলন উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতলো মালদ্বীপ জুড়ীতে বাংলাদেশের খবর’র বর্ষপূর্তি উদযাপন মেডিকেল বোর্ডে খালেদার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের রাখা হয়নি শনিবার যুক্তফ্রন্ট-ঐক্য প্রক্রিয়ার যৌথ ঘোষণা আসছে সারাদেশে পালন করা হবে শেখ হাসিনার জন্মদিন সমাজসেবী আমিন আলীর ইন্তেকাল এবার স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন জগলুল হায়দার যশোরে সাবেক ফুটবল কোচ ওয়াজেদ গাজীর দাফন সম্পন্ন মন্ত্রণালয়ের কাছেই বিদ্যুৎ বিল পাওনা ৬৬৮ কোটি টাকা! কাভার্ডভ্যান পোড়ানোর মামলায় খালেদার জামিন নামঞ্জুর চলে গেলেন নওয়াজ শরীফের স্ত্রী কুলসুম রাজধানীর ১৪ হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ মৌসুমী, অপু ও ওমরসানি দুবাই যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে ড. কামাল সংবিধান অনুযায়ী ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে `এ কথা শুনেই মান্না, জুড়ে দেয় কান্না।’ বিকল্পধারা এখন স্বকল্প হয়ে গেছে ‘তিনিও আনকনটেস্টের এমপি’ আমরা তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ: ডা. বদরুদ্দোজা নির্বাচন নাও হতে পারে: ড. কামাল যাঁকে র‌্যাঙ্ক দিতে বাধ্য হন পাক জেনারেল “ কোনোরকম বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না’- হাসিনা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আশাজাগানিয়া বিএনপি হবিগঞ্জে আপত্তিকর অবস্থায় দেবর-ভাবী আমার মৃত্যু, বর্ষাদিন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী আর নেই নেপালকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের কিশোরীরা সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার চলে গেলেন রাজুর হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল সরকার ‘সংলাপে’ বাধ্য হবেঃ মওদুদ আহমেদ মেয়রের বাসার সামনেই ছাত্রদলের হামলায় রাজু খুন আরিফ সিসিক মেয়র নির্বাচিত “দায়িত্বশীল নেতার অডিও রেকর্ড পুলিশের হাতে” বিএনপি-জামায়াত ইতিহাসকে বিকৃত করছেঃ তথ্যমন্ত্রী স্বচ্ছ মন নিয়ে আলোচনায় আসুনঃ রিজভী আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আর নেই শনির আখড়ায় ট্রাকচাপায় আহত শিক্ষার্থী শঙ্কামুক্ত সিসিক’র স্থগিত ২কেন্দ্রের ভোট ১১ আগস্ট বৃহস্পতিবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাজশাহী ও বরিশালে নৌকা, সিলেটে আরিফ