,

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এরশাদ, পাশে নেই রওশন

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা: নাম তার পেয়ারা। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি বিয়ের পর দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লিখতেন। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে সম্বোধন করতেন ‘হৃদয়ের রানী’ ‘হৃদয়ের ধন’ ‘ওগো মোর জীবন সাথী’ ‘খুশি বউ’ ‘খুশি পাগলী’ ‘সোনা বউ’ ‘খুকু বউ’ ‘ওগো দুষ্টু মেয়ে’ ‘নটি গার্ল’ ‘বিরহিনী’ ইত্যাদি অবিধায়।

স্ত্রীর ডাকনাম ডেইজী হওয়ায় ভালবেসে ডাকতেন ডেজু, ডেজুমনি, ডেজুরানী। চিঠির শেষে নিজের পরিচয় লিখতেন ‘পেয়ারা পাগল সাথী’ ‘বড্ড একাকী একজন’ ‘প্রেম-পূজারি’ ‘বিরহী’ ইত্যাদি। ৬২ বছরের সংসার জীবন। স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্বের বহুদেশ ঘুরেছেন। ৯ বছর দেশ শাসন করেছেন। স্ত্রীকে রাজনীতিতে এনে এমপি, মন্ত্রী এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতাও বানিয়েছেন। সেই স্ত্রী এখন অসুস্থ স্বামীর খোঁজ নেন না। গুরুত্বর অসুস্থ স্বামীকে দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না।

যাদের সম্পর্কে এই কথাগুলো বলা হলো তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বেগম রওশন এরশাদ। এরশাদের ডাক নাম পেয়ারা ও রওশনের ডাক নাম ডেইজি। ১৯৫৬ সালে বিয়ের পর সেনা কর্মকর্তা স্বামী এরশাদকে চাকরিতে এখানে সেখানে থাকতে হয়। আর পড়াশুনার জন্য স্ত্রী রওশন এরশাদ ডেইজিকে এক বছর থাকতে হয় বাবার বাড়ি ময়মনসিংহে। তখন এইচ এম এরশাদ দূরে থাকা স্ত্রীর বিরহে লেখা চিঠিতে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেন। স্বাম-স্ত্রীর সেই স্বর্ণালী দিনগুলো এখন যেন হয়ে গেছে তামাটে।

কবি এরশাদ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, বিয়ের পর সংসার করার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। রওশন ওদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছিল। চাকরির জন্য আমি আজ এখানে কাল ওখানে। সে সময় দূরে থাকা স্বামীরা স্ত্রীদেরকাছে চিঠি পাঠাতো। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বহু চিঠি লিখেছি; চিঠির প্রথমে রওশনকে অনেকভাবে ‘সম্বোধন’ করতাম।

সিএমএইচ থেকে শনিবার দুুপুরে এইচ এম এরশাদকে বারীধারার দূতাবাস রোডের বাসা প্রেসিডেন্ট পার্কে আনা হয়। গুরুত্বর অসুস্থ এরশাদকে চিকিৎসার জন্য রোববার দুপুরে নেয়া হয় সিংগাপুরে। রোগীর সঙ্গী হিসেবে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার, এরশাদের ছোট ভাই হুসেইন মোর্শেদ এবং হুসেইন মোর্শেদের স্ত্রী রুখসানা খান মোর্শেদ।

দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ এরশাদের পাশে থাকা দূরের কথা ৬২ বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী স্ত্রী রওশন গুলশানের বাসা থেকে কয়েক মিনিটের পথ বারীধারায় গিয়ে স্বামী এরশাদকে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

উল্লেখ এইচ এম এরশাদ ও বেগম রওশন এরশাদ দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে আলাদা ভাবে বসবাস করছেন। রওশন এরশাদ গুলশানে আর এরশাদ থাকেন বারীধারার দূতাবাস রোডের ১০ নম্বর প্রেসিডেন্ট পার্কে। বিদিশার সঙ্গে বিয়ের পর এরশাদ গুলশানের বাসা চেড়ে প্রেসিডেন্ট পার্কে চলে যান। বিদিশার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও এরশাদ ও রওশন এক ছাদের নীচে আসেননি। তবে রাজনীতিটা এখনো এক দলেই করছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির বহুল আলোচিত চরিত্র এরশাদ। আনপ্রেডিক্টেবল, পল্ট্রিবাজ, ভেল্কিবাজ নানান নামে তিনি দেশের রাজনীতিতে পরিচিত। ’১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাপার সমর্থনে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে। এর কিছুদিন পর কারাগার থেকে মুক্তি পান এরশাদ। অতপর তার রাজনীতি ভেল্কিবাজী নিয়ে বছরের পর বছর চলছে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্কের ঝড়। কারাগারে থেকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীকে চিঠি লিখে রওশন এরশাদকে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য করেন। পর্যায়ক্রমে স্ত্রীকে কয়েকবার এমপি, মন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা করেন। বিদিশাকে বিয়ে করার কারণে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের পর তারা পৃথক বসবাস শুরু করেন।

স্বামী-স্ত্রীর রাজনীতি নিয়ে বিরোধের সুত্রপাত ঘটে ২০০৭ সালে। ২২ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে ইস্যু করে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক বিরোধ রাজনৈতিক বিরোধ রুপ নেয়। এরশাদ আন্দোলনরত আওয়ামী লীগের পক্ষ্যে অবস্থান নিয়ে মহাজোট আর রওশন এরশাদ বিএনপির ইচ্ছানুযায়ী প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে লাঙ্গলের প্রার্থী দেন। দেশের টলটলায়মান রাজনীতির মধ্যে সে সময় জাতীয় পার্টি থেকে স্বামী এরশাদকে বহিস্কার করে রওশন এরশাদ নিজে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও গোলাম মসিহ (বর্তমানে সউদীকে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) মহাসচিব করেন।

এরশাদও অনেকটা বাধ্য হয়ে ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। পরবর্তীতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ ও গাইবান্ধা থেকে তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে রওশন পরাজিত হন। এরশাদ রংপুরের চেড়ে দেয়া আসনে উপনির্বাচনে স্ত্রী রওশনকে এমপি করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের কাহিনী সবার জানা। এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বামীকে হাসপাতালে রেখে রওশন এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন। গুরুমারা শিষ্যের মতোই সংসদে নিজের অধীনে স্বামী এরশাদকে রাজনীতি করতে বাধ্য করেন।

গত কয়েক বছরে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধী বহুবার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা না করা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কয়েকবার ঝগড়া হয়। যা জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের বি-টীমে রুপান্তর ঘটানো হয়। জাতীয় পার্টি এখন কার্যত গল্পের গণিমিয়া। নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই; আওয়ামী লীগ যা বলে তাই তাদের করতে হয়।

এরশাদ অনেকদিন থেকে অসুস্থ। গত এক বছরে বেশ কয়েকবার সিংগাপুর গেছেন চিকিৎসা নিতে। কয়েক মাস থেকে বাসায় থাকার চেয়ে হাসপাতালেই তিনি বেশি নিরাপদবোধ করেন। তারপরও স্ত্রীর মন গলেনি! স্বামী-স্ত্রীর সবশেষ বিরোধ বাধে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ভাই জিএম কাদেরকে দলের কো চেয়ারম্যান করায়। এই সিদ্ধান্তে স্বামী এরশাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রওশন। ভাঙ্গনের মুখে পড়ে দল। শেষ পর্যন্ত রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়।

সম্প্রতি এরশাদ তার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যান পদ জিএম কাদেরের নামে ‘উইল’ করে দেন। গত ১৮ জানুয়ারীও এক বার্তায় জিএম কাদেরকে তার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন এরশাদ। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা গেছে এরশাদ পরিবারের সব সদস্যই এরশাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। আত্মীয়-স্বজন ও দলের নেতাকর্মীরা খোঁজখবর নিচ্ছেন। কিন্তু রওশন এরশাদ অসুস্থ স্বামী এরশাদকে দেখতে যাননি।

0Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল

সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ ১৪৯ আরামবাগ,ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কাযালয়: ২০৭/১ ফকিরাপুল, আরামবাগ , মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।

Designed by ওয়েব হোম বিডি

সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-০৩৩৭১৫,০১৭১২-৫৯৩৬৫৩

E-mail: provatbela@gmail.com,

কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম

শিরোনাম :
আজ জাতীয় শোক দিবস চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে হামলা, বাড়িতেও শঙ্কায় নুর ইটের জবাবে পাটকেল দেয়া হবে- মোদিকে ইমরান রাজধানীর লালবাগে প্লাস্টিক কারখানায় আগুন চামড়া শিল্প কোন্ পথে? আ ন ম শফিকের ইন্তেকাল: কাল জানাযা নিজ এলাকায় হামলার শিকার ভিপি নুর: হাসপাতালে অচেতন কুররানী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী ‘লঙ্কাওয়াশ’ হলো টিম টাইগার আখেরাতের ভয় দেখিয়ে মাদ্রাসায় ১১ ছাত্রীকে ধর্ষণ সিলেট কারাগারের ডিআইজি আটক, ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার আ ফ ম কামাল স্মরণে প্রেসক্লাবে দোয়া মাহফিল বৈঠকে মিয়ানমার, নাগরিকত্ব ছাড়া ফিরতে নারাজ রোহিঙ্গারা যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার ‘বড় হুজুর’ আটক কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এস কে সিনহা ডেঙ্গুতে জাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু, ক্যাম্পাস জুড়ে আতঙ্ক পেস বোলিংয়ে ল্যাঙ্গাভেল্ট, স্পিনে ভেট্টরিকে কোচ নিয়োগ যুবলীগের সভাপতি মুক্তি, সাধারণ সম্পাদক মুশফিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কের নামফলক উন্মোচন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনসনের দায়িত্ব গ্রহণ এবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রিয়া সাহা রাজশাহীতে সাঈদী মসজিদের বারান্দায় মুশফিকের পড়াশোনা ছবি ভাইরাল ৭২ বছর পর সিসিক’র ১০ কোটি টাকার জমি উদ্ধার শ্রীলংকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পাচ্ছে টাইগাররা মা ও স্বামীর সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার ধূমপান, সমালোচনার ঝড় বিয়ের প্রলোভন দৈহিক মিলন, স্কুলছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা বিপদসীমার উপরে সুরমা-কুশিয়ারার পানি ভিডিও বার্তায় যা বললেন প্রিয়া সাহা প্রিয়া সাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ তরুণীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক ও ভিডিও ধারণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার  পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম বাড়ছেই রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার মিন্নির গাইবান্ধায় ৪ লাখ পরিবার পানিবন্দি, ৪’শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ প্রেমের টানে আমেরিকান নারী এখন লক্ষ্মীপুরে মাছ উৎপাদনে আমরা প্রথম হবো : প্রধানমন্ত্রী জিএম কাদের জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৭৩.৯৩ এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ আজ কারও যোগসাজসে আমার মেয়েকে গ্রেফতার করা হয়েছে: মিন্নির বাবা জামায়াত নিয়ে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করে তারা জাতীয় ঐক্য চায় না: কর্ণেল অলি বৌভাতের দিন দাফন হলো বর কনেসহ ১১ জনের রংপুরে এরশাদের দাফন সম্পন্ন রিফাত হত্যা: জিজ্ঞাসাবাদের পর স্ত্রী মিন্নি গ্রেফতার তিন পদ নিয়ে বিপাকে জাতীয় পার্টি মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুতের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর ‘২১ সাল থেকে বিদ্যালয়-মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক: দীপু মনি এরশাদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত: ৪র্থ জানাযা ১৬ জুলাই রূপকথার ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড