স্বর্ণজয়ী সুপি’র এগিয়ে যাবার গল্প

প্রকাশিত: ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৯

স্বর্ণজয়ী সুপি’র এগিয়ে যাবার গল্প

কুশিঘাট, বুরহানাবাদ এক আলোকিত জনপদ। সিলেটের প্রথম মুসলমান গাজী বুরহান উদ্দিন ( রহঃ ) এর স্মৃতি বিজড়িত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী সুরমার তীরবর্তী এই এলাকা শহরের আর সবটা এলাকা থেকে একটু ভিন্ন। এই এলাকার আরো একটি পরিচয় রয়েছে তা হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির জন্য অন্যন্য। শান্ত সুরমার তীরবর্তী এই এলাকার মেয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্টি ও এনভায়রনমেন্ট সাইন্সের ছাত্রী রাহেলা খাতুন সুপি ২০১৭ সালের প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭জন শিক্ষার্থী এই পদক লাভ করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে গত ২৪.৭.২০১৮ তারিখে ঢাকাস্থ বঙ্গবন্ধু মিলনায়তন থেকে কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বর্ণপদক ও সনদপত্র বিতরণ করেন। রাহেলা সুপি তার পিতা-মাতাসহ উক্ত পুরষ্কার গ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক প্রাপ্ত এই মেধাবী শিক্ষার্থী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২৪ নং ওয়াডের কুশিঘাট বুরহানাবাদ এলাকার সাবেক মেম্বার জনাব আব্দুল মালেক (মনু) ও জনাব কমরুন নেছা- এর সুযোগ্য সন্তান। ইতোপূর্বে ২৪ নং ওয়াডের কোন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পেয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তবে যতদূর মনে পড়ে অন্যান্য বিভিন্ন পদক কুশিঘাট-নয়াগাও-সাদাটিকর- টুলটিকর-মিরাপাড়া-মেন্দিবাগ-মাছিমপুর এলাকার মধ্যে হয়তো এটাই প্রথম কোন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক লাভ করলেন, যা অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও গর্বের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক লাভ করার কারণে সুপি নিজ পরিবার, এলাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখ সুউজ্জ্বল করার দরুণ রাহেলা সুপিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
উল্লেখ্য যে, শাবিপ্রবির ফরেস্টি ও এনভায়রনমেন্ট সাইন্সের ছাত্রী রাহেলা সুপি স্নাতক ( সম্মান) শ্রেণীতে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হন। এবং বর্তমানে মাস্টার্স শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। কিন্ত তার শিক্ষা জীবনের বিদ্যাপীঠ সমূহ কিন্তু এতো নামকরা ছিলো না।

# পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়-‌‌‌
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানদের নামকরা স্কুলে ভর্তি করার জন্য প্রাণপণে দৌড়ঝাঁপ করেন, তার একেবারেই ব্যতিক্রম এই গোল্ড মেডেলিস্ট রাহেলা সুপি। তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু গাজী বুরহান উদ্দিন (রহঃ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেধাবী সুপি শৈশবকাল হতে মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রতিটি শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করে ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ সহ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। কিন্তু তখনো অনুধাবন করা যায় নি, এই ছাত্রী একদিন বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাবে।

#অখ্যাত হাইস্কুলে এ+ :
প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়ে অন্যান্য ছেলে মেয়েরা যেখানে শহরমুখী স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে,তখন একেবারে ব্যতিক্রমী রাহেলা সুপিকে ভর্তি করানো হয় এলাকার একটি সাধারন মানের হাইস্কুল হাজী মোহাম্মদ সফিক হাই স্কুলে। কিন্তু মেধা, পরিশ্রম আর সৃস্টিকর্তার হাত থাকলে স্কুল কোন বিষয় নয়, তা পুনরায় প্রমাণ করলো সুপি।
স্যারদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এই অখ্যাত স্কুল ২০০৯ ইং সালের এস,এস,সি পরিক্ষায় শহরের নামকরা স্কুল সমূহকে পিছনে ফেলে দেয় এবং স্কুলের ইতিহাসে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বপ্রথম এ+ লাভ করে।
যতদিন স্কুল থাকবে সুপির নামও লিপিবদ্ধ থাকবে বোর্ডের মধ্যে।

#মহিলা কলেজেও গোল্ডেন এ+ :
হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়েও অদম্য মেধাবী রাহেলা সুপি ভর্তি হয় সিলেট শহরের স্বনামধন্য সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ। এই কলেজেও সে মেধার মুন্সিয়ানা দেখায়। প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ২০১১সালের এইচ,এস,সি পরিক্ষায় কৃতিত্বের সহিত গোল্ডেন এ+ লাভ করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করে। আশ পাশের সকলেই অনুধাবন করেন এই মেয়ে একদিন এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে।এবং সকলের অনুমানের ব্যতয় ঘটেনি।

#ওয়েটিং_লিস্ট থেকে গোল্ড মেডেলিস্ট:-
এইচ,এস,সি পাশের পর বুয়েট, সরকারি মেডিকেলের পরই বাংলাদেশের অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় তাকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়। জগৎখ্যাত এই বিদ্যাপীঠে ভর্তি হওয়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। একটি সিটের বিপরীতে লড়তে হয় ৩০/৪০ জনের সাথে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র জটিল হওয়ার কারণে অনেক গোল্ডেন এ+ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাও হার মেনে যায়। অনেক শানিত মেধাবীদের পাশ হওয়াতো দূরের কথা,অপেক্ষামান তালিকায়ও নাম থাকে না। তারই ফলশ্রুতিতে মেধাবী সুপির স্থান হয় ওয়েটিং লিস্টে এবং ভর্তি হয় ফরেস্টি ও এনভায়রনমেন্ট সাইন্সে। শানিত মেধা,অধম্য ইচ্ছাশক্তি প্রচণ্ড পরিশ্রম, আর সৃষ্টিকর্তার অপার দয়ায় এই বিভাগের ফাইনাল পরিক্ষায় সে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হয়।নিজের পরিশ্রমের কারণে ওয়েটিং লিস্টের সুপি হয়ে যায় গোল্ড মেডেলিস্ট, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলকে হতবাক করে দিয়েছে।

বর্তমান সময়ের অন-লাইন, ভার্চ্যুয়াল জগতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের কাছে সুপির এই সাফল্য জীবনে ঘুরে দাঁড়াতে টনিক হিসেবে কাজ করবে বলে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। বিরল প্রতিভার অধিকারী সুপি শুধু নিজেই মেধাবী নয়, তা পরিবারের অন্যান্য ভাই-বোনেরাও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের পুরো পরিবার যেন মেধার এক অপার আধার।

আজ থেকে ১০/১৫ বছর পুর্বে কুশিঘাট বুরহানাবাদ এলাকা অনার্স মাস্টার্স পাশ করা শিক্ষার্থী সংখ্যা হাতের আংগুলের কড়ায় গুনে বলা গেলেও, সময়ের স্রোতধারার শিক্ষার অসীম গুরুত্ব অনুধাবনে অভিভাবকগণ স্বক্ষম হওয়ার এখন শিক্ষার হারের চিত্রপট পাল্টে গেছে। এই এলাকার শিক্ষার্থীরা দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে বুয়েট সরকারি মেডিকেল সহ দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে। যা এলাকার জন্য গর্বের ও সম্মানের বিষয় বৈকি। এই এলাকার শিক্ষার্থীরা হয়তো একদিন প্রশাসনের সবোচ্চ আসনে থাকবে- এই কথাটা বলা অতিয়াশোক্ত হবে না। সুপির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও পিতামাতা সহ এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে এটাই প্রত্যাশা।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার মহানব্রত নিয়ে এগিয়ে চলা প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মেডেলিস্ট প্রাপ্ত, স্বকীয় মেধায় সমুজ্জ্বল রাহেলা সুপির অনাগত দিনগুলো সাফল্যের সোনালী পালকে আচ্ছাদিত থাকবে, সফলতার পালকে নতুন নতুন মেডেল, বৃত্তি যুক্ত হোক এটাই কামনা। সুপির মতো মেধাবীদের জয়গানে মুখরিত হবে এলাকা, আলোকিত হবে পিতা মাতার মুখ এটাই দৃঢ় বিশ্বাস।
———
– RA Ruhel ( আের এ রুহেল)
সদস্য-মনিপুরী ব্লাড ব্যাংক,পাঞ্জেরী ব্লাড ব্যাংক,সিলেট, এর টাইমলাইন থেকে

সর্বশেষ সংবাদ