কুররানী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী

প্রকাশিত: ১০:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০১৯

কুররানী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী

কবীর আহমদ সোহেলঃ
কুরবানীর ঈদে সবচেয়ে বেশী বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। ঈদ পূর্ববর্তি সময়ে বিব্রত হন একটি প্রশ্নে। পাড়া প্রতিবশী আত্মীয় স্বজন দেখা হলে বা মুঠো ফোনে কোন প্রসংগ ছাড়াই যখন জানতে চান, কুরবানী দিচ্ছেন? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঐ লোকটার সামনে তখন জীবন সংসারেে নানা দেনা পাওনার হিসেব উঠে আাসে। খানিকক্ষণ নিরব থেকে উত্তর দেন না ভাই এবার দিচ্ছিনা। জীবন সংসার টানপোড়েনের এক দীর্ঘশ্বাস তার শ্বাসনালী আটকে ধরে। পাশের বাড়ীর যে লোকটা বড় মাপের দুইটা বলদ কুরবানী দিচ্ছে তার কথা ভাবেন। কত ধানাই ফানাই আর বাটপারির জীবন ঐ লোকটার। লাখ লাখ টাকা মানুষের হাতিয়ে নিয়ে ব্যবসা করে। কত কথা বলে লোকজন। পাওনা টাকা চাইতে এসে লোকজন তার বউকেও কটু কথা শোনায়। ওরাই বড় দুটি ষাড় কুরবানী দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত জীবনে যাপিত জন নিজেকে ব্যর্থই ভাবেন। মূহুর্তেই নিজেকে ধন্য মনে করেন কারো খাইও না পরিও না এই ভেবে।
কুরবানির দিন। চারদিকে গরু ছাগল দুম্বা জবাইর সমারোহ। আত্মীয়দের অনেকে কুরবানী দিচ্ছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঐ লোক ঈদের আগের দিন বড় দুটি ফার্মের মোরগ কিনে এনেছেন। সাথে পোলাও চাল। বউকে বলেছেন মুরগী পোলাও রান্না করতে। স্বামী সোহাগী বউ তাই মেনে নিয়েছেন। মশলা বাটতে একটু বেশী করেই বেটেছেন। কেন জানেন? পাশের বাড়ীর ওরা তো কুরবানী দিচ্ছেন। ছোট মামা কুরবানী দিচ্ছেন। একটু গোশত যদি পাঠান। তাহলে একটু তাড়াতাড়ি যেন স্বামী সন্তানদের রান্না করে খাওয়ানো যায়। মনের ভেতর সুপ্ত একটা বাসনা বা চাওয়া। চারদিকে কুরবানির মহড়া দেখে ছোট মেয়ের প্রশ্ন, বাবা আমরা কুরবানী দেবনা? গিন্নির ঐ আগাম প্রস্তুতি মধ্যবিত্ত কর্তা উপলব্ধি করেন। আর যন্ত্রণায় ছটফট করেন। সন্ধ্যা হয়ে গেল। পাশের বাড়ীর লোকজন ধূয়া মুছা করছে। ততক্ষণেও একটু গোশতের দেখা পাননি মধ্যবিত্ত ঐ গৃহবধূ। ছোটমামাও না, স্বজনদের কেউও না। এটাই আজকালের কুরবানীর চিত্র। এখন কুরবানির আগেই কুরবানির গরুর পরিমাপেই ডিপ ফ্রিজ কেনেন বিত্তশালী জন।
দরজায় বা গেটে যারা আসে তাদেরকে এক দুই টুকরা গোশত দিয়েই সব ফ্রিজ ভর্তি করে রাখেন। গেইটে গিয়ে চেয়ে আনে নিম্নবিত্ত ও পেশাদার ভিক্ষুক। যেটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন পারেনা। তাদের রয়েছে আত্মসম্মানবোধ। অথচ বিত্তশালী জন তা ভাবেন না। শোর গোল করে ধমক ধামক দিয়ে ফকির মিসকিনকে গোশত বন্টনে তিনি কৃতিত্ববোধ করেন। প্রতিবশী আর স্বজন পরিজনের হক্ আদায় না করে কুরবানী দেয়ার কোন মাহাত্ম্য কী আছে?
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। মধ্যবিত্ত আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন লোকটির ঘরে কোন গোশত পৌছেনি। কর্তা বাসা থেকে বেরুলেন। কোন কিছু না ভেবেই। নগরীর মোড়ে মোড়ে মাংশের পশরা। দিনভর যারা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে গোশত সংগ্রহ করছিল তারাই এ পসরা বসিয়েছে। থলে বস্তায় ৫/১০ কেজি করে রাখা হয়েছে। কেজি এক’শ/ দেড়’শ টাকা। ডান বামে তাকিয়ে দেখলেন অনেকেই কিনছে। চোখে ভাসলো প্রিয়তমা বউর মুখ। কানে প্রতিধ্বনিত হয় ছোট্ট মেয়ের প্রশ্ন। আার সময় ক্ষেপন না করে ১০ কেজির এক বস্তা গোশত কিনে নিলেন মধ্যবিত্ত ঐ লোক। বাসায় ফিরে বেশ সুর করে বউ বাচ্চাদের ডাকলেন। এই নাও গোশত বলে বস্তাটি নামিয়ে রাখলেন মেঝে। আনন্দমাখা চোখ মুখ নিয়ে গৃহকর্তৃ বস্তাটি উপুড় করে ঢাললেন। বস্তার তলানীর প্রায় অর্ধেক চর্বি উপরে উঠে আসলো। ঈদের দিনে ফকিরদের কি প্রতারণা! মধ্যবিত্তের ই কেবল বিড়ম্বনা।

সর্বশেষ সংবাদ