" /> মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহানের দাফন সম্পন্ন – দৈনিক প্রভাতবেলা

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহানের দাফন সম্পন্ন

প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহানের দাফন সম্পন্ন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমীর ও ৫ বারের নির্বাচিত সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, সমাজসেবক, প্রবীণ জননেতা মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহান গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে অন্তরীণ অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কারা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মাওলানা আবদুস সোবহানের লাশ গ্রহণের পর পরিবারের সদস্যগণ পাবনার উদ্দেশে লাশ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। রাত ৩টায় মাওলানা আবদুস সোবহানের লাশ নিয়ে তার পরিবারের সদস্যগণ নিজ বাড়িতে পৌঁছেন। সকাল হতে না হতেই শিশু কিশোর, তরুণ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মাওলানা আবদুস সোবহানের লাশ এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসেন। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রতিষ্ঠিত দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দানে। হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে দারুল আমান ট্রাস্ট-এ লাশের সাথে যায়। সেখানে পূর্ব থেকেই অপেক্ষমান হাজার হাজার মানুষ লাশকে ঘিরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। চতুর্দিক থেকে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত মানুষের আগমন ঘটতে থাকে দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দানে। জানাযা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। জানাযা শুরু হয় দুপুর আড়াইটায়। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সালাতে জানাযায় ইমামতি করেন মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহানের ছোট ছেলে হাফিজ মুজাহিদুল ইসলাম। জানাযা পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহান শুধু পাবনাবাসীর নয়, সমগ্র বাংলাদেশের নেতা ছিলেন। আপনারা তাকে সবচাইতে ভালভাবে জানেন ও চিনেন। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়। বিচারে মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুস সোবহানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে আপীল করেন। তার আপীল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেন। আজ আমি পাবনার সর্বস্তরের জনতার সামনে তার লাশ দাফনের পূর্বে জিজ্ঞাসা করতে চাই, তিনি কী দোষী নাকি নির্দোষ? আমীরে জামায়াতের এ প্রশ্নে লাখো জনতা সমস্বরে জবাব দেন, তিনি নির্দোষ। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেকেই হু-হু করে কেঁদে উঠেন। আমীরে জামায়াত তার বক্তব্যে বলেন, হে আরশের মালিক! তুমি জনতার এ রায় কবুল করে নাও। আমীরে জামায়াত বলেন, মাওলানা আবদুস সোবহান আমাদের নেতা ও শিক্ষক। তিনি আজীবন হকের জন্য লড়াই করেছেন। তিনি কোনো দিন অন্যায় অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি। তার লাশ সামনে রেখে আমরা আল্লাহকে সাক্ষী করে শপথ করছি আমরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কোনো দিন বাতিলের সাথে আপস করব না। আমীরে জামায়াতের এ ঘোষণায় লাখো জনতা সমস্বরে চীৎকার করে ওঠেন। এ সময় দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দান জনতার আবেগ-অনুভূতিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। জানাযা পূর্ব সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, পাবনা জেলা আমীর আবু তালেব মণ্ডলসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
সালাতে জানাযায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ও মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন ও মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মোহাদ্দেস আব্দুল খালেক, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও রাজশাহী মহানগরির আমীর কেরামত আলী, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতা শিমুল বিশ্বাস, হাবিবুর রহমান হাবিব। সালাতে জানাযায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং লাখো মুসুল্লী অংশগ্রহণ করেন। জানাযা শেষে আরিফপুর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। লাখো মুসুল্লী দাফনে অংশগ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে বিদায় জানান। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

সিলেট জামায়াত: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমীর ও  সাবেক এমপি মাওলানা আব্দুস সোবহানের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল করেছে সিলেট মহানগর জামায়াত। রবিবার বাদ আসর অনুষ্ঠিত মাহফিলে বিপুল সংখ্যক মুসল্লী উপস্থিত ছিলেন। মাহফিলে মাওলানা আব্দুস সোবহানের মাগফেরাত ও শাহাদাত কবুলিয়াত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।  মোনাজাত পরিচালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্র্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন, মহানগর নায়েবে আমীর হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, জেলা দক্ষিণের নায়েবে আমীর মাওলানা লোকমান আহমদ, মহানগর সেক্রেটারী মাওলানা সোহেল আহমদ, সহকারী সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জামায়াত নেতা মুফতী আলী হায়দার, উপাধ্যক্ষ আব্দুস শাকুর, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরী সভাপতি মামুন হোসাইন ও সেক্রেটারী সাইফুল ইসলাম প্রমূখ।
মাহফিল পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এ দেশ থেকে ইসলামী আন্দোলনকে নিমূল করতে সুদুরপ্রাসারি ষড়যন্ত্র চলছে। আদর্শিক মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে বিচারের নামে অবিচার চালিয়ে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক শীর্ষ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে শহীদ করা হয়েছে।  আল্লাহ পাক রাব্বুল আল-আমীন যেন মাওলানা আব্দুস সোবহানের মৃত্যুকে শাহাদাত হিসেবে কবুল করেন।বিজ্ঞপ্তি

সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও শৈশব : মাওলানা আবদুস সুবহান ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাবনা জেলার সুজানগর থানাধীন তৈলকুন্ডু (বর্তমান মমিনপারা) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলবী নাঈম উদ্দিন আহমেদ একজন দ্বীনদার পরহেজগার আলেম ছিলেন। ১৯৬৫ সাল থেকে পাবনা শহরের গোপালপুর (পাথরতলা) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। বর্তমানে তাঁর পরিবার-পরিজন সেখানেই বসবাস করছে।
শিক্ষা জীবন
তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সুজানগরের রামচন্দ্রপুর মক্তবে পরে তিনি মানিকহাট ও মাছপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন ১৯৪১ সালে তিনি উলাট মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং প্রায় সাত বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে ১৯৪৭ সালের জুনিয়র পাস করেন তিনি শিবপুর মাদ্রাসা থেকে। ১৯৫০ সালে আলিম পাস করেন তিনি সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে, ১৯৫২ সালে ফাজিল, ১৯৫৪ সালে কামিল পাস করেন। মাওলানা আবদুস সোবহান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি জুনিয়র মেট্রিকুলেশন আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। কামিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ড থেকে হাদিস গ্রুপে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
শিক্ষকতা
মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৫২ সালে হেড মাওলানা হিসাবে পাবনা আলিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন অতঃপর তিনি গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউট আরিফপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় সুপারিনটেনডেন্ট ও মাগুরা জেলার বররিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। সবশেষে তিনি আরিফপুর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি টেনে সক্রিয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবন
মাওলানা আবদুস সুবহান ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার পাবনা জেলার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং পর্যায়ক্রমে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘদিন পাবনা জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য নির্বাচিত হন তিনি ১৯৬১ সালে গয়েশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দলের সিনিয়র ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা আদুস সোবহান ২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা কর্মপরিষদ নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালে বিপুল ভোটে পাবনা সদর আসনের এমপি নির্বাচিত হন। তিনি প্রথম সর্বোচ্চ ভোটে জয়লাভ করেন এবং সংসদে জামায়াতে ইসলামের উপনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আবারো এমপি নির্বাচিত হন। ছাত্রজীবন থেকেই মাওলানা আবদুস সোবহান সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৬ সালে তিনি  আঞ্জুমানে রফিকুল ইসলাম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ১৯৬৮ সালে তিনি জালালপুর জুনিয়ার হাই স্কুল ও বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ নামের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। মাওলানা আবদুস সুবহানের আরো একটি বড় অবদান হচ্ছে পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল। ১৯৬৭ সালে পাবনার জালালপুরে তিনি এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমানে স্কুলটি পাবনা ক্যাডেট কলেজে উন্নীত হয়েছে। তিনি পাবনা দারুল আমান ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত পাবনা ইসলামিয়া মাদ্রাসা ইসলামিয়া এতিমখানা ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ইমাম গাজ্জালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, কিন্ডার গার্ডেন স্কুল কলেজ, আল-কোরআন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি পাবনা সদর গোরস্থান কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহ-সভাপতি ছিলেন। উল্লেখ্য তিনি নিজের জমি লিখে দিয়ে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ, প্রাক্তন (ইসলামিয়া কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ সরকারি মহিলা কলেজ এবং ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ (প্রাক্তন জিন্নাহ কলেজ)সহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন । জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে পাবনার অসংখ্য রাস্তা-ঘাট ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ করে তিনি পাবনার মানুষের কষ্ট লাঘব করেছেন। তার গড়া দারুল আমান ট্রাস্ট বর্তমান শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত, সেখানে তার ব্যক্তিগত ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদের তাকওয়া নামে একটি অত্যাধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা
আরো অর্জন
পাবনা ক্যালিকো কটন মিল তাঁর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ সব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তিনি বহু মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আর্থিক সহযোগীতা দিয়েছেন। তিনি এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়নের কাজ করেছেন। পাবনা ক্যাডেট কলেজ হতে গয়েশপুরের রাস্তা, কালিদহ হতে ভাঁড়ারা রাস্তা, কুচিয়ামোড়ার তেমাথা হতে সাদুল্লাপুর রাস্তা, ৮ মাইল হয়ে টিকরী-দাপুনিয়া রাস্তা তাঁর কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর বহন করে। মাওলানা আদুস সুবহান পুরাতন পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে কোমরপুর পদ্মা নদীর তীর পর্যন্ত রাস্তা পাকা করেছেন, যা পাবনার চর এলাকার মানুষের কাছে একসময় ছিল কল্পনাতীত।
বাংলাদেশ চাষিকল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ তাঁতি কল্যাণ সমিতির তিনি বর্তমান সহ সভাপতি। তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি পাবনা মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। মাওলানা আদুস সুবহান ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির আজীবন সদস্য, ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি মুসলিম এইড লন্ডন এর বাংলাদেশ শাখার চেয়ারম্যান ছিলেন এবং ইসলামিক ‘ল’ রিসার্চ সেন্টার এবং লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ-এরও চেয়ারম্যন ছিলেন। তিনি জাতীয় শরীয়াহ কাউন্সিলের সদস্য এবং আল আমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্রিকা ইসলামী আইন ও প্রচার পত্রিকার তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক।
লেখক, বহুভাষাবিদ ও সংস্কৃতিসেবী মাওলানা আদুস সুবহানঃ- একজন সুলেখক হিসেবেও মাওলানা আদুস সুবহানের পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি চিন্তাশীল প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। একসময় তিনি সাংবাদিকতার সাথেও জড়িত ছিলেন। মাওলানা আদুস সুবহান বাংলা ছাড়াও আরবী, উর্দু, ফার্সি, ইংরেজি সহ বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। একজন সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংস্কৃতিসেবী হিসেবেও মাওলানা আদুস সুবহানের সুনাম রয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলেন। গান ও বক্তৃতা প্রতিযোগীতায় পুরষ্কারও পেয়েছেন বহুবার।
মাওলানা আদুস সুবহানেবর কৃতিত্ব বলে শেষ করার মত নয়। তিনি তথাকথিত মানবতা বিরোধী মামলায় ফাঁশির রায়ে দন্ডিত হয়ে দির্ঘদিন কারাগারে আবদ্ধ থেকেও তিনি কল্যাণময় কাজে পিছিয়ে ছিলেননা। তিনি তার সমুদয় সম্পত্তির অংশ বিশেষ বিক্রয় করে পাবনার প্রাণ কেন্দ্র দারুল আমান ট্রাস্ট তথা ইসলামিয়া মাদ্রারাসা সংলগ্ন ৩কোটি ৮২লক্ষ টাকা ব্যয়ে আধুনিক সাজে সজ্জিত একটি মসজিদ নির্মান করেন। যে মসজিদের নাম নিজের নামে নামকরন না করে নিজেই মাসজিদটির নাম দিয়েছেন, মাসজিদে তাক্বওয়া। মসজিদটিতে একই জামায়াতে একই সাথে ৩ হাজার মুসুল্লি নামাজ আদায় করতে পরে।
শুধু তাই নয় মাওলানা সাহেবকে কারাগারের মধ্যে যে ভাইটি সেবা যত্ন করতেন তার ব্যাপারে তিনি সন্তানদের কাছে অসিয়ত করে গেলেন – মামুন নামের ছেলেটি কারাগার থেকে বের হলে আমি জিবীত থাকি আর মারা যায় তোমরা আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলেটিকে ওমরা হজ্জ পালন করার ব্যাবস্থা করে দিবে।
বিদেশ সফরঃ
একজন জাতীয় নেতা এবং বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের প্রথম কাতারের নেতা হিসেবে জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে এবং ইসলামের দাওয়াত ও রাষ্ট্রীয় কাজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন মাওলানা আবদুস সুবহান। তিনি এ পর্যন্ত ৮ বার পবিত্র হজব্রত পালন করেছেন।
তাঁর কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ নিম্নরূপঃ
১. বিশ্ব পার্লামেন্ট এসোসিয়েশনে প্রতিনিধি হিসেবে চীন সফর করেন।
২. আঞ্চলিক পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে শ্রীলঙ্কা সফর করেন।
৩. স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া গমন করেন।
৪. সরকারী প্রতিশ্রুতি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডনের হাউস-অব-কমন্স ও হাউস-অব-লর্ডস –এ যোগদান।
৫. মুসলিম এইডের চেয়ারম্যান হিসেবে মালয়েশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও জাপান সফর করেন।
৬. পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত রাবেতার সম্মেলনে যোগদান।
৭. নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব হজ্ব সম্মেলনে যোগদান।
৮. বসনিয়ার মুসলিম হত্যার প্রতিবাদে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন পর্লামেন্টে যোগদান উপলক্ষে ব্রাসেলস গমন এবং ভাষণ দান।
৯. ১৯৭৩ সালে লিবিয়ার বেনগাজীতে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করেন।
১০. স্পিকার ডেলিগেসনে জার্মানিতে যান। এছাড়াও তিনি ইসলামী দাওয়াত ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে চারবার যুক্তরাজ্য, দু’বার যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, সৌদীআরব, ইরাক, আরব আমীরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, লিবিয়া, হংকং, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, পাকিস্তান, নেপাল, ভারত সফর করেছেন।
শেষ কথা
মাওলানা আবদুস সুবহান এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ইতিহাস। ১৯৬২ সাল থেকে এ জনপদের জনগণ তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন, যা পাবনার অন্য কোন নেতার ক্ষেত্রে হয়নি। তাঁর জীবনের মিশনই হচ্ছে জনকল্যানমূলক কাজ; শিক্ষা, সেবা ও বৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকার জনসাধারনকে শিক্ষিত করে তোলা এবং বেকারত্ব দূর করা। এ কাজ করার মাধ্যমে তিনি যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেছেন, তেমনি পাবনার জনগনের মন জয় করেছেন।
আজ তিনি সারা বাংলাদেশ নয় সারা পৃথিবীর ইসলাম প্রিয় মানুষগুলোকে কাঁদিয়ে তথাকথিত মানবতাবিরোধী মামলায় দীর্ঘদিন জালিম সরকারের মিথ্যা রায়ে কারাগারে আবদ্ধ থেকে হাজারও ঈমানী পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান রবের মন জয় করে সেই মাবুদের সাথে সাক্ষাতের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।

 

  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ