দেখে এলাম ইকবাল মাহমুদকে

প্রকাশিত: ২:০৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

দেখে এলাম ইকবাল মাহমুদকে

কবীর আহমদ সোহেল: ২জুন থেকে ৭ জুন। দিনের হিসেবে ৫ দিনের ব্যবধান। ২০১৮ থেকে ২০২০ দু’বছর। ২০১৮ সালের ২জুন ইকবাল মাহমুদ আমাকে দেখতে এসছিল । আমি অসুস্থ ছিলাম। PLID সমস্যায় প্রায় ৪ মাস বেডে থাকতে হয়েছে আমাকে। অসম্ভব ব্যথা যন্ত্রণায় কাতর ছিলাম আমি। অনেকেই দেখতে এসেছিলেন আমাকে। কেউ দেখতে এলে অসুস্থ মানুষের কেমন লাগে, আমার জানা। বিশেষ কিছু রোগাক্রান্ত ছাড়া সকল রোগীই স্বজন পরিজনকে অসুস্থ সময়ে কাছে পেলে পুলকিত হন, সাহস পান, শক্তি পান।
ইকবাল মাহমুদ ১লা জুন থেকে অসুস্থ। করোনা আক্রান্ত। শুরুর দিন থেকেই আমি তাকে ভার্চুয়াল সান্নিধ্য দেবার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন কথা বলছি। অডিও কল, ভিডিও কলে শক্তি সাহস যোগাবার চেষ্টা করছি।
কিন্তু তার বাড়ীতে যাচ্ছিনা। যাব কি যাব না, এই মনস্থির করতে ৬দিন পার। করোনা আক্রান্তকে কাছে গিয়ে দেখা কি ঠিক হবে? আমার পরিবারে বয়োবৃদ্ধ, শিশু রয়েছেন। এসব ভাবনা যাবার বাসনাকে আগলে রাখে। আবার মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে। কবীর সোহেল তো ভীতু প্রকৃতির না। মনের ভেতর থেকে কে যেন আওয়াজ দেয়। মহল্লার এক বন্ধুর সাথে কথা বল্লাম। তারও কথা আপনি যান একবার। আমাকে সাথে নেবেন।
ইকবালের আপন কোন ভাই নেই। সে একা। তার কোন ভাই থাকলে কি করোনা ভয়ে দুরে থাকতো। গতরাতে যখন এই প্রশ্নটি আমার মাথায় আসে তখন থেকেই আমি অনেকটা অস্থির হয়ে উঠি।
সিদ্ধান্ত ফাইনাল। দেখে আসি ইকবালকে। বন্ধু সুজন কে সাথে নিয়ে কিছু ফলমূল আর বাচ্চাদের জন্য কিছু সুইট কিনলাম। সুজন তা প্যাকেট করলেন সুন্দর করে রেপিং পেপার দিয়ে মোড়ালেন। আমাদের বিশ্বস্থজন অটোরিকশা চালক সাগর ভাই। তাকে ডাকলাম। রওয়ানা দিলাম। শহরতলীর কুমারগাঁওয়ের উদ্যেশ্যে। আধাঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌছলাম। ইকবালের বাড়ীর সামনে। কল দিলাম। রিসিভ করলো ইকবাল। সে মনে করলো প্রতিদিনের রুটিন কল।
বল্লাম আমি তো তোমার গেইটের সামনে।
এক আকাশ ছোঁয়া হাসি নিয়ে দৌড়ে বেরুলো। ইয়া আল্লাহ, এত রিস্ক নিয়ে আপনি এলেন।
মুখের দিকে তাকালাম। মনে হলো আমার যাওয়াটা সার্থক। এ ৭ দিনে এমন হাসিমাখা মুখ তার কখোনো ছিল কি না জানিনা।
খালাম্মা( ইকবালের আম্মা) বেরিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন।
তাঁর অবয়বে হাসির ঝিলিক দেখলাম।
একমাত্র পুত্রধনের অসুস্থকালে দেখতে যাওয়ায় হয়তো তিনিও খুশী।

সিটিং রুমে বসলাম। সামাজিক দুরত্ব মেনেই। আমি সরকার প্রদত্ত পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস পরেই গেছি। সর্বোচ্চ সতর্কতা স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলনের চেষ্টা করেছি।
ঘন্টাখানেক বসলাম। শারীরিক অবস্থা জানলাম। গল্প গুজব হলো। চা- নাস্তা হলো। ভালই আছে ইকবাল। একবারে স্বভাবিক। উপসর্গ বলতে যেটা জ্বর ছিল, সেটাও সেরে উঠেছে। ফাঁকে একটা ফটোসেশনও হলো।
৮জুন সোমবার আবার টেস্ট করা হবে। ইনশাআল্লাহ রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে। আবার ফিরবে আমাদের মাঝে আগের মত। দোয়া করি। সবার কাছে ইকবাল মাহুমদের জন্য দোয়া চাই।
২০১৮ সালে আমাকে দেখতে আসা ইকবাল কি ভেবেছিল দুই বছর পর তাকে দেখতে যেতে হবে? সে অসুস্থ হবে? তা-ও কোন ঘাতক ব্যধিতে? নিশ্চয় না। আসলে আমরা আগামী দিন নয়, আগামী মূহুর্তটা কি হবে তাও জানিনা। এটাই বাস্তবতা।
২০১৮ সালে আমাকে দেখে যাবার পর আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।
লিখেছিলাম:

“দায়িত্ব যোগ্যতাকে বিকশিত করে
========================
আমার অসুস্থতার ১২ দিন গত হলো। স্বজন পরিজন বন্ধুজন সহকর্মী শুভানুধ্যায়ী পাড়া পড়শী প্রতিদিন আসছেন। আমাকে দেখতে। ভাল লাগে, মানুষের এত ভালবাসা আমার প্রতি। খারাপ লাগে, নিজের অসহায়ত্ব। আজ রাতের শেষ দর্শনার্থী প্রিয়ভাজন ইকবাল মাহমুদ (সেক্রেটারী সিলেট প্রেসক্লাব)। সাথে তার বন্ধু শাহজাহান।
অনেকক্ষণ অনেক কথা। পুরোনো দিনের কথা। একবারও অনুভূব করিনি ব্যথা। ইকবাল মাহমুদ আমি অসুস্থ হবার দিনই সম্ভবত ভারত চলে যায়। সেখান থেকেও আমার খোঁজ খবর নেবার ধরণ আমাকে বিমোহিত করেছে। আজ বাসায় এসে সে আর অনুজ প্রতিম ইকবাল নয় দায়িত্বশীল ইকবাল মাহমুদের পরিচয় দিল। দায়িত্ব মানুষের যোগ্যতাকে বিকশিত করে তার প্রমাণ মেলে ইকবাল মাহমুদের মাঝে। শুভ কামনা থাকলো ইকবালসহ সকল দর্শনার্থীদের প্রতি। যা শোধাবার নয়।”

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ