৯ জুন: মুন্ডা বিদ্রোহের মহানায়ক বিরসা মুন্ডা’র মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশিত: ৫:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২০

৯ জুন: মুন্ডা বিদ্রোহের মহানায়ক বিরসা মুন্ডা’র মৃত্যুবার্ষিকী

মাসুদ আহমেদ :

ভারত উপমহাদেশে আদিবাসীদের মুক্তির জন্য হাতেগোনা যে ক’জন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে বিরসা মুন্ডা অন্যতম । তিনি ব্রিটিশদের দীর্ঘকালের অত্যাচার এবং অধীন থেকে মুন্ডাদের শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য জীবন উৎস্বর্গ করছেন। লক্ষ লক্ষ মুন্ডা তাকে অনুসরন করে মুক্তির আশা বুকে ধারণ করেছিলেন। বিরসা মুন্ডা বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশরা মুন্ডাদেরকে শোষণ করতে আসছে, মুন্ডাদের সম্পদ লুট করে বিদেশে নিয়ে যাবে। এজন্য তিনি মুন্ডাদের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হন।

 

ছোট নাগপুর অঞ্চলে তিনি অত্যাচারিত এবং অপদস্ত মুন্ডা আদিবাসীদের বিদ্রোহী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই এলাকার মুন্ডারা একদিকে জমিদার, জোতদার এবং মহাজনদের নিষ্পেশনে অতিষ্ঠ অন্যদিকে ব্রিটিশরা তাদের সর্বস্ব লুট করতে ব্যস্ত। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে আদিবাসীদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা সোচ্চার হতে থাকে। ১৮৯৫ সালে ছোটনাগপুর অঞ্চলে খাদ্যাভাব মহামারীর আকার ধারণ করলে প্রথম বারের মত বিরসা জমিদার, ভুমিদস্যু, মহাজন এবং ব্রিটিশদের কাছে জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের বাকিবকেয়ার জন্য প্রতিবাদী সংগ্রাম শুরু করেন তখন মৃর্ত্যু যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯০০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে এই বিদ্রোহী সংগ্রাম। এই সংগ্রাম প্রচুর রক্তপাত এবং বহু আদিবাসী মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে আদিবাসী বীরত্বের, আত্যোৎস্বর্গের এবং মহত্বের এক বিরল ইতিহাস তৈরী করে।

 

 

বিরসা মুন্ডা ১৮৭৫ সালে ১৫ই নভেম্বর তৎকালীন বিহার এবং বর্তমান ঝাড়খান্ডের খুঁটি জেলার উলিহাতু গ্রামের এক দারিদ্র পিড়িত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা সুগনা মুন্ডা এবং মা করমি হাতু। দারিদ্রতার কারনে বিরসা মুন্ডাকে তার মাসির বাড়ি খাতাঙ্গায় পাঠানো হয় লালন পালন করার জন্য। কিন্তু বিভিন্ন কারনে তাকে তার বাবার বাড়ি ফিরে আসতে হয়। লালন পালনে অসমর্থ বাবা এরপর বিরসাকে তার কাকার বাড়ি পার্শ্ববর্তী আবুভাতু গ্রামে পাঠান। কাকার বাড়িতে আগের চেয়ে বিরসার অবস্থার অনেক উন্নতি হয়। এখানেই বিরসাকে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। নিম্ন প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বুরজু মিশন স্কুলে বিরসাকে পাঠানো হয় উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য। বিরসার বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তরিক্ততা দেখে তাকে পার্শ্ববর্তী চাইবাসা শহরে জার্মান লুথারান মিশন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এখানে পাশ্চাত্য ইতিহাস এবং বিজ্ঞান শিক্ষা বিরসা’র মধ্যে নবজাগরনের ধারনা এবং নব চিন্তাচেতনার উদ্রেগ ঘটায় এবং ছোটনাগপুর এলাকার নিরক্ষর এবং অজ্ঞ আদিবাসীদের মধ্যে ব্রিটিশ শোষণ এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। তিনি রোগ নিরাময়ের জন্য গ্রামের বিভিন্ন কুসংস্কারাচ্ছন্ন অলৌকিক বিশ্বাস এবং চর্চাকে কঠোরভাবে বিরোধীতা করতেন।

 

 

ইতোমধ্যে, ১৮৯৪ সালে জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা এবং সাধারণ কৃষকদের জমি থেকে বঞ্চিত করতে পালামৌ, মানভুম, ছোটনাগপুর সহ বিভিন্ন বন এলাকায় সংরক্ষিত বন আইন-অষ্টম(১৮৮২) পাশ হয়। এই আইনের বলে জমিদাররা বন এলাকা থেকে আদিবাসী মানুষদেরকে উচ্ছেদ করতে শুরু করে। বিরসা মুন্ডা আশে পাশের ছয়টি গ্রামের কৃষকদের জড় করে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে চাইবাসা শহরে সরকারী কতৃপক্ষের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করলে কর্তৃপক্ষ সেটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের দাবিগুলো অস্বীকার করে। এই ক্ষোভ দিনে দিনে সাধারণ আদিবাসীদের মধ্যে তীব্র দানা বাধতে শুুরু করে। জঙ্গল মহলে একটি অগ্নিচুর্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসব উপলব্ধি করে বিরসা অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

 

 

কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং বিভিন্ন অলৌকিক চর্চায় বিশ্বাসী বিভক্ত মুন্ডাদের মধ্যে ঐক্য গড়তে তিনি সিং বোঙ্গা পুজার প্রচলন করেন। এর মাধ্যমে তিনি কোচাং, সিনজুরি, লোঙ্গা, কালমার, কাটোই, বীরবাঙ্কী, কুরুঙ্গার মত বিভিন্ন জঙ্গল এলাকার হাজার হাজার আদিবাসী মানুষদের একত্রিত করেন এবং সবাই ২০ বছরের যুবক বিরসাকে তাদের নেতা নির্বাচিত করেন। নেতা হিসেবে বিরসার উত্থান জমিদার, মহাজন এবং মিশনারীদেরকে ভীত করে। ফলে তারা বিভিন্ন অভিযোগ এবং চাপ প্রয়োগ করতে থাকে তার বিরুদ্ধে। হঠাৎ ১৮৯৫ সালের ২৪শে সেপটেম্বর বিরসা মুন্ডাসহ তার কিছু সহচোরকে গ্রেপ্তার করে সরকার। দীঘ ২ বছরের জেলহাজত মেয়াদ শেষে ১৮৯৭ সালে মুক্তি দেওয়া হয় বিরসাকে। তার মুক্তির পরপরই ছোটনাগপুর এলাকায় গুটিবসন্ত প্রাদুর্ভাবে চরম দুভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষে ত্রান সহায়তার কাজে তার রাতদিনের নিমগ্নতা তাকে অবিসংবাদিত নেতা বানিয়ে দেয়। দুভিক্ষ পিড়িত এবং রোগগ্রস্ত মুন্ডারা তাকে নিয়ে মুক্তির নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করে। মুন্ডারা একত্রিত হয় নব উত্থান প্রস্ততির জন্য-শুরু হয় উলগুলান, মুক্তির মহাবিদ্রোহ।

 

 

১৮৯৯ সনের ২৪ ডিসেম্বর রাচি, সোনপুর, চাইবাসার মত গুরুত্বপুন স্থানে একযোগে একত্রিত উত্থান শুরু হয় এবং পরে ব্যপক এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই গণউত্থান ১৯০০ সালের ৭ই জানুয়ারী পর্যন্ত চলতে থাকে। এর জবাবে সরকার কর্তৃপক্ষ দুই দল সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। সামরিক বাহিনিকে মোকাবেলা করার জন্য হাজার হাজার মুন্ডা তরুন-তরুনী তীর ধনুক, বর্শাসহ বিভিন্ন প্রকার ঐতিহ্যগত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেইল রাকাব পাহাড়ে সম্মিলিত হয়। ব্রিটিশ জেনারেল বিরসা বাহিনিকে সমর্পন করতে নির্দেশ দিলে তারা আত্মসমর্পন না করে বরং উপদেশ দেয়, “কেন আপনারা বিদেশীরা আমাদের জমি এবং আমাদের দেশ লুন্ঠন করছো? চলে যাও এদেশ ছেড়ে”। ব্রিটিশ জেনারেল বিরসা মুন্ডা বাহিনির উপর গুলি করার নির্দেশ দিলে তারা তাদের ঐতিহ্যগত তীর এবং ধনুক দিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সাথে পেরে ওটা অনেক কঠিন ছিল। ফলে বিদ্রোহী বাহিনি পরাজিত হয়। তাতেও ব্রিটিশ বাহিনি সন্তুষ্ট হয় নি। তারা নির্বিচারে মুন্ডা নারী এবং শিশুদের গুলি করে হতা করতে থাকে। বিদ্রোহীদের, মৃর্ত্যুর এবং বর্বরতার খরব সম্পুর্নভাবে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। মৃর্ত্যু দেহ গুলো রাতারাতি গণকবরে পচানো হয় এবং বহু আহত বিদ্রোহীদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়।

 

 

ব্রিটিশ বাহিনি গ্রামের পর গ্রাম তল্লাসী চালাতে থাকে বিরসা মুন্ডাকে খুঁজে বের করার জন্য। বিরসা মুন্ডাকে না পেয়ে তার অনেক ঘনিষ্ট সহচরদের গ্রেপ্তার এবং হতা করে তাদের ঘরবাড়ি জালিয়ে পুড়িয়ে দেয় ব্রিটিশ বাহিনি। অনেক খোজা খুজির পর ব্রিটিশ বাহিনি বিরসা মুন্ডাকে ৩ই মার্চ ১৯০০ সালে গ্রেপ্তার করে। চাইবাসা জেলে বিরসা মুন্ডাকে কারারুদ্ধ করা হয়। এলাকার আশে পাশের হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ তাদের বিরসা ভগবানকে এক নজর দেখতে ভিড় জমান চাইবাসা জেলে। জেল কর্তৃপক্ষ বলে, বিরসা কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু বলা হয়, ফাঁসির প্রতিক্রিয়ায় আবার গণঅভুত্থান ঘটার সম্ভাবনা থাকায় তাকে বিষপানে হতা করা হয়। ৯ জুন ১৯০০ সনে বিরসা মুন্ডা রাঁচি কারাগারে শহীদ হন। কারন যেদিন বিরসার মৃত্যু খবর প্রকাশ হয় সেদিন ঐ জেলে কলেরায় আক্রান্ত কোন রোগীকে চিকিৎসা করা হয় নি।

 

 

বিরসা মুন্ডা মৃত্যুর ১২১ বছর অতিবাহিত হলেও তার নাম এখনো বেচে আছে। বিরসা মুন্ডা বেঁচে আছেন সমাজে অত্যাচার, শোষন এবং অবিচারের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের জন্য। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, অনাহার, বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু, নিরক্ষরতা এবং অজ্ঞতা বিরসাকে মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করতে উৎসাহ জাগিয়েছিল। এটার বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং মানুষকে সংগঠিত করা আজকের আদিবাসীদের জন্য অত্যান্ত অপরিহার্য। বিরসা মুন্ডার এই বীরের মত লড়াই এবং শহীদ বরণ আদিবাসীদের মুক্তির যেকোন লড়াই সংগ্রামে উৎসাহের আধার হিসেবে কাজ করবে।

 

উল্লেখ্য, জনপ্রিয় লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘অরন্যের অধিকার’ শহীদ বীরসা মুন্ডার জীবন নির্ভর।

 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ও ইন্টারনেট

  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ