অন্তহীন উদ্বেগ উৎকন্ঠা কোন পথে দেশ?

প্রকাশিত: ৯:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৩

অন্তহীন উদ্বেগ উৎকন্ঠা কোন পথে দেশ?

অন্তহীন উদ্বেগ উৎকন্ঠা কোন পথে দেশ? ২৮ অক্টোবর নানা সংশয় শঙ্কার দিন। গত সপ্তাহ খানেক ধরে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জনপদের মানুষের শঙ্কা, সংশয়,উদ্বেগ,উৎকন্ঠা । কি হবে, কি হচ্ছে? কোন পথে যাচ্ছে দেশ?

এই শঙ্কা উৎক›ঠার পেছনে কারণ একটাই। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে সেই ২০০৬ সালেই। এই ২৮ অক্টোবরেই। লগি বৈঠার পৈশাচিকতায় ঢাকার পল্টনে ঐদিনই প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন সম্ভাবনাময় তরুণ। লগি বৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে হত্যার পর লাশের উপর নৃত্য করে যে উল্লাসের দৃশ্য পৃথিবীবাসি দেখেছে তা বর্বর পৈশাচিকতাকেও হার মানিয়েছে। এখানে বলতে দ্বিধা নেই এই পৈশাচিকতাকারীরা আজকের শাসকদলের মদদপুস্ট। তখনকার বিরোধীদল আওয়ামীলীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই মানুষ হত্যা করে এমন বর্বরতা প্রদর্শন করেছিল। উদ্যেশ্য ছিল একটা প্রেক্ষাপট রচনা করা। তা-ই হয়েছিল। পরবর্তীতে ১/১১ সরকার নামে অভিহিত সামরিক সরকারের হাতে দেশ চলে যায়। দেশ সংস্কারে হাত দেয় মঈন উদ্দিন- ফখর উদ্দিন সরকার। বিএনপি আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দী করা হয়। পদ্মা মেঘনা যমুনা সুরমা কুশিয়ারা ব্রম্মপত্রে বহু জল প্রবাহিত হয়।

অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ ১৪দলীয় মহাজোট অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতের নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়।

এই নির্বাচনে তখনকার সদ্যপ্রাক্তন শাসকদল চারদলীয় জোটের ভরাডুবি ঘটে। চারদলীয় জোটের প্রধান দল বিএনপি মাত্র ৩০টি, জামায়াতে ইসলামী ২টি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ১টি আসন পায়। অন্যদিকে ২৬৩টি আসন পেয়ে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট মহাখুশীতে সরকার গঠন করে।
সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। কার্যত জাতীয়ভাবে বিভক্তির রাজনীতি শুরু হয়। বিএনপি জামায়াতের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়গ নামতে শুরু করে।

আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি ‘পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহ’ ঘটে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেবরুয়ারী রহস্যজনক এ ঘটনায় ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধেও এ পরিমাণ সামরিক কর্মকর্তার প্রাণহানি ঘটেনি।

 

এ ঘটনার বিচারের নামে ১৫২ জন বিডিআর সদস্যকে মৃত্যুদন্ড ও ১৬১জনকে যাবজ্জীবন আরো ২৫ জনকে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে দন্ড দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত এ দন্ডাদেশ দেয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্ট্রি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন অভিযোগ করে যে, এই বিচারগুলিতে আসামীদের পর্যাপ্ত সময়-সুযোগ দেয়া হয়নি। ‘ নিষ্ঠুর প্রতিশোধের আকাঙ্খাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিচার কাজ সাজানো হয়েছে’- বলে তারা অভিযোগ করে।

আরও পড়ুন  সবকিছুতে গেল গেল সোর চিৎকার কাদের স্বার্থে ?

 

এখানেই শেষ নয় বিচারের নামে হত্যা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, খুন , গুম, বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনে বাধা, মত প্রকাশে বাধা, গণমাধ্যমে বিধি নিষেধ আরোপ ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে শাসকদল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের দিকে এগুতে থাকে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশী রোষানলে পড়ে জামায়াত -বিএনপি। ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেয়া হয়। জামায়াত ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ফাঁসিকে ‘ জুডিসিয়াল কিলিং’- বলে অভিযোগ করে। শুধু তাই নয় হাজার হাজার জামায়াত শিবির নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করে কারান্তরীণ করা হয়। এমনকি গ্রেফতারের আগে পরে আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে বেধড়ক নির্যাতনের শিকার হন বহু নেতাকর্মী। পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনীর নির্যাতনে বহু নেতা কর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়।

শাসক গোস্টী থেমে থাকেনি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। এই দলের চেয়ারপারসান সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতির পত্নী বেগম খালেদা জিয়া। তাকে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল হোসেন রোডের বাড়ী থেকে বের করে দেয়া হয়। একের পর এক মামলা দিয়ে কারান্তরীণ রাখা হয়। এমনকি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি।

ইলিয়াস আলী সহ বহু নেতাকে গুম করা হয়। সালাউদ্দিন আহমদের মত নেতা দেশান্তরী হতে বাধ্য করা হয়। সালা উদ্দিন কাদের চৌধরীকে ফাঁসি দেয়া হয়। নাসির উদ্দিন রহস্যজনক পিন্টুর মৃত্যু ঘটে কারাগারে। যুবদল ছাত্রদল সহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শত শত মামলা দেয়া হয়। হামলা মামলা আর পুলিশী বেপরোয়া ভ‚মিকায় বিরোধী দল গুলো রীতিমত বিভিষিকাময় জীবন যাপন করে।

এরই মাঝে আওয়ামীলীগ ২০১৪ সালে ১০ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে নেয়। বিএনপি জামায়াতের বর্জনের সুযোগে ২৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বিজয়ী হয়ে যায় আওয়ামীলীগ। ১৪৭ টি আসনে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্টতা লাভ করে আওয়ামীলীগ।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা আওয়ামীলীগকে অনেকটা বেপরোয়া করে তুলে। আইন শৃংখলা বাহিনী সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্টানে একদলীয় মনোভাব ও আচরণে রাষ্ট্রীয় কাঠামো অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। বিরোধী মতকে বল প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণের চুড়ান্ত রুপে পৌঁছে বাংলাদেশ।এই অবস্থার মধ্যে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও একতরফা করে নেয় আওয়ামীলীগ।

দেশ শাসনে বেপরোয়ামাত্রা স্মরণকালের সব ইতিহাস ব্যর্থ করে দেয় দলটি। জনজীবনে দুর্ভোগ চরমে পৌছে। নাগরিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার অনেকটা বিপন্ন হয়ে পড়ে। দ্রব্যমূল্যে সীমাহীন উর্ধগতি মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলে। গণমাধ্যমের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান রুপ নেয় শাসকদলের গুণকীর্তন মাধ্যমে। স্বপ্রণোদিত সেন্সর করে জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে না ধরে সরকারী পদলেহনে মশগুল হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন  জুড়ীর হাকালুকি পারে দূর্গতদের পাশে সেতুমন্ত্রী

জাতীয় জীবনের এই যখন অবস্থা তখন পরাশক্তির নজর পড়ে বাংলাদেশের দিকে। সুষ্টু অবাধ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তাগিদ দেয় বিভিন্ন রাষ্ট্র। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত মে মাস থেকে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠে।

সুষ্টু নির্বাচনে বাধাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্টানকে ভিসা নীতির নিষেধাজ্ঞায় নিয়ে আসে। আগামীতে আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন আভাস দেয়।

এই পরিস্থিতিতে সরকার কিছুটা উদার আচরণ শুরু করে। বিশেষ করে ধরপাকড় কমিয়ে আনে। মিটিং- মিছিলে বাধা দেয়ার মাত্রা কিছুটা নমনীয় করে।
এই চিত্র যখন বাংলাদেশে ঠিক তখনি এল ২৮ অক্টোবর ২০২৩। ১৭ বছর আগের চেতনায় বিএনপি জামায়াতসহ সরকার বিরোধী সবদল রাজধানীতে সমাবেশের কর্মসূচী ঘোষণা করে। পুলিশ প্রশাসন ও আওয়ামীলীগের কতিপয় নেতা আবার বেশামাল হয়ে উঠেন। শুক্রবার রাতে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিলেও জামায়াতকে দেয়া হবেনা মর্মে তারা ঘোষণা দেন।

জামায়াত যেকোন মূল্যে সমাবেশে করার ঘোষণা দেয়। জামায়াত ঘোষিত শাপলা চত্বরে শুক্রবার ভোর থেকে আইনশৃংখলা বাহিনী ঘিরে রাখে। র‌্যাব পুলিশের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেস্টনি ভেঙ্গে জামায়াত শিবির কর্মীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাপলা চত্বরে ঢুকে পড়ে। হাজার হাজার নেতাকর্মী চত‚র্দিক ঘিরে ফেলে। এক পর্যায়ে প্রশাসন মৌখিক অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। আরামবাগে জামায়াত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে।

কিছু বিশৃংখলার মধ্য দিয়ে নয়াপল্টনে বিএনপি সমাবেশ করে। আজ রোববার সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় বিএনপি। এখনো পর্যন্ত জামায়াতের কোন কর্মসূচীর ঘোষণা আসেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে সমাধান কি? দেশ কোন পথে? আমরা মনে করি সমাধান একটাই অবাধ গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। আর তা সম্ভব আলোচনার মাধ্যমে। সকল রাজনৈতিক দল মিলে একটা রুপরেখা প্রণয়ন এবং আওয়ামীলীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনই দেশকে রক্ষা করতে পারে দীর্ঘ মেয়াদী দুর্যোগ থেকে। যারা আজ গণতন্ত্রের ছবক নিয়ে দৌঁড়ঝাপ দিচ্ছে, তাদেল ছোবল অত্যন্ত ভয়াবহ তা বর্তমান শাসক গোস্টীর না জানার কথা নয়।

আমরা সুখ শান্তি সমৃদ্ধি নিরাপত্তা ও অধিকার পূর্ণ বাংলাদেশ দেখবার আকাঙ্খা পোষণ করি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

সর্বশেষ সংবাদ