একুশের শিক্ষাঃ ৭০ বছরে বাস্তবায়ন কতটুকু ?

প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২

একুশের শিক্ষাঃ ৭০ বছরে বাস্তবায়ন কতটুকু ?

একুশের শিক্ষাঃ ৭০ বছরে বাস্তবায়ন কতটুকু ?

 

১৯৫২ থেকে ২০২২। দীর্ঘ সময়, প্রায় ৭০ বছর। আমাদের ভাষা আন্দোলনের বয়স। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্টিত করতে জীবন বিলিয়ে দেয়ার ৭০ বছর পেরিয়েছি আমরা। বাংলা আমাদের অহঙ্কার, বাংলা আমাদের চেতনা,আমাদের প্রেরণা। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙ্গালীই প্রথম জাতি যাঁরা ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রæয়ারী সালাম,বরকত,রফিক জব্বারসহ জীবন বিসর্জনকারী সকল ভাষা শহীদদের প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা। কায়মনোচিত্তে তাঁদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। একই সাথে স্মরণ করি সেই সব ভাষাসৈনিকদের যাঁরা মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন।

 

’২১ আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালী জাতিসত্ত¡ার অস্থিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। পাকিস্তানী শাসকগোস্টী তাদের শাসন পরিচালনার শুরুতেই বাঙ্গালী জাতি সত্ত¡াকে মেনে নিতে পারছিলো না। সেই মেনে নিতে না পারার নগ্ন পদক্ষেপ ছিল বাঙ্গালীর মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার উদ্যোগ। দটৎফঁ ধহফ ড়হষু টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ ঢ়ধশরংঃধহ’- মি. জিন্নাহর এই বক্তব্যই বাঙ্গালী জাতিসত্ত¡ার হৃদমন্দিরে চরম আঘাত করেছিল। সে আঘাতের প্রতিবাদে বাঙ্গালী জাতি রুখে দাঁড়াতে শিখেছিল। মাথা নত না করার মূল মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল। সেই ভাষা আন্দোলনই বাঙ্গালী জাতির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল। কালের পরিক্রমায় বাঙ্গালী স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ^মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নেয়।

 

বর্তমানে বিশ্বে বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ। ২০০২ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরালিওনে বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে বাংলা ভাষাকে সর্বাধিক প্রচলিত ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। বর্তমান বিশ্বে ১৮৮টি রাষ্ট্রে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। যা আমাদের জন্য নিশ্চয়ই গৌরবের।
প্রতি বছর ফেব্রæয়ারী এলেই আমরা এ মহান অর্জনকে স্মরণ করি সাড়ম্বরে। একুশের গৌরবে গৌরবানিত্ব হই। নগ্নপদে শহীদ বেদীতে পূস্পার্ঘ্য অর্পণ করি। সভা ,শোভাযাত্রায় বাঙ্গালিয়ানার মুন্সিয়ানা দেখাই। এরপর সারা বছর বেমালুম ভুলে যাই, ভুলে থাকি বাংলাকে। বাংলা ভাষার সংগ্রামকে। ভাষা সৈনিকদের, এমনকি ভাষা শহীদদেরও আমরা স্মরণ করিনা সারা বছর।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হচ্ছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখা। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। অন্যায়কে রুখে দাঁড়ানো। ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছরে আমরা জাতি হিসেবে এ শিক্ষায় কী শিক্ষিত হতে পেরেছি? জাতীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিজীবনে আমরা কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানি? প্রতিবাদ দুরের কথা। অন্যায়কে অন্যায়ই বলিনা। কথাই বলিনা। ‘দেখেও না দেখার ভান’- এটাকে নীতি বানিয়ে ফেলেছি।

 

আগেই উল্লেখ করেছি পৃথিবীর ইতিহাসে আমরাই প্রথম জাতি যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। অথচ এই ভাষার প্রতি আমরা কতটা যত্নশীল, শ্রদ্ধাশীল? দুঃখজনক হলেও সত্য ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর অতিক্রম হলেও এখনও সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে না। শুধু কী তাই? ভাষার বিকৃত প্রয়োগ ও চর্চার রীতিমত প্রতিযোগিতা চলছে সোনার বাংলায়। রেডিও এবং টেলিভিশনে বিকৃত ভাষাচর্চা হচ্ছে আধুনিকতার নামে। বিশেষ করে কিছু বেসরকারী রেডিও( ঋস জধফরড়) আঞ্চলিক ভাষার সাথে বাংলাকে মিশিয়ে যে বিকৃত উচ্চারণ চর্চা করে তা বাংলাকে রীতিমত অবজ্ঞার শামিল।

 

এখানেই শেষ না। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের সাধারণ নাগরিকের আন্তরিকতাও প্রশ্নের উর্ধে নয়। সন্তানকে বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা ও অনুশীলনে অভিভাবকরা অনেকটা সংকোচবোধ করেন। বিজাতীয় ভাষা বিশেষ করে ইংরেজী চর্চায় যতখানি আগ্রহ তার সিঁকিভাগ বাংলার ক্ষেত্রে নেই। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলগুলোর প্রতি অভিভাবকদের অতি উৎসাহ তা-ই প্রমাণ করে। অন্য ভাষা শিক্ষা বা জানার প্রতি আগ্রহ দোষের নয়, কিন্তু মায়ের ভাষাকে অবজ্ঞা করে,মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষা চর্চা ভাষার জন্য জীবনদানকারী জাতির ক্ষেত্রে মানায় না।

 

আরেকটি বিষয় আমাদের মর্মাহত করে। বাংলা ভাষার মধ্যে মুসলমানদের ব্যবহৃত শব্দ বাদ দেয়ার প্রবণতা। নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। আমরা লক্ষ্য করি,মরহুমের পরিবর্তে প্রয়াত,ইন্তেকাল বাদ দিয়ে পরলোকগমন, আল্লাহ হাফেজ বাদ দিয়ে শুভ বিদায়-বাই বাই, আসসালামু আলাইকুম এর পরিবর্তে হ্যালো,হাই । আব্বার পরিবর্তে ড্যাডি,আম্মার পরিবর্তে মাম্মি,মামার পরিবর্তে আংকেল,মামির পরিবর্তে আন্টি। অত্যন্ত কৌশলে একটা বিশেষ শ্রেণী বাংলা ভাষার সাথে ইসলামী তাহজিব- তমুদ্দনের যে সংশ্লিষ্টতা , সম্পৃক্ততা রয়েছে তা বিচ্ছিন্ন করে দেবার মানসেই এমন শব্দ অনুশীলনে উৎসাহ যোগাচ্ছেন। আমরা এসব শব্দ সংস্কৃতির ছোবল থেকে বেরিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানাই।

 

আমরা আরো বেশী বিস্মিত ও ব্যথিত হই, যে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই ভাষা সৈনিকদের এখনও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি। দেয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। ভাষা শহীদদের কবরগুলো সুরক্ষিত হয়নি। শহীদ পরিবার পায়নি যথাযথ সম্মান।
প্রতি বছর ভাষা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হলেও ভাষা সংগ্রামীরা বরাবরের মতোই অবহেলিত। মফস্বলের ভাষা সৈনিকদের স্থানীয় প্রশাসন ভাষার মাসেও খোঁজ নেয় না। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা যুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ফেবরুয়ারি মাসের উত্তাল দিনগুলোতে ভাষা সৈনিকদের বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের কারণেই একুশে ফেবরুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। তবুও ভাষা সৈনিকরা আজ চরমভাবে অবহেলিত।

আজ পর্যন্ত ভাষা সংগ্রামীদের কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো কেন ভাষাসংগ্রামীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় না ? নতুন প্রজন্মকে ভাষা সৈনিকদের অবদান সম্পর্কে জ্ঞাত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এতে করে জাতীয় যে কোনো সংকটে নতুন প্রজন্মও যে কোনও ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হতো।

আমরা মনে করি,১৯৫২-এর ভাষাসংগ্রামের চেতনাকে ধারণ করতেই হবে। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে যে স্বাধীনতা সেই স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও ভাষা সৈনিকদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান না করা জাতি হিসাবে আমাদের লজ্জা দেয়। ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান আজ সময়ের দাবীতে পরিনত হয়েছে। ভাষা শহীদদের স্মৃতি সুরক্ষা ও ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান সময়ের অপরিহার্য দাবী।

কবীর আহমদ সোহেল সম্পাদক দৈনিক প্রভাতবেলা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ