ঐতিহ্যবাহী মনিপুরি মহারাসলীলা উৎসব সোমবার

প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৮, ২০২০

ঐতিহ্যবাহী মনিপুরি মহারাসলীলা উৎসব সোমবার

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক:

 

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ বৃহত্তর সিলেট। সিলেটের অধিবাসীদের মধ্যে এক অনন্য ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হচ্ছে মণিপুরি। মণিপুরিরা এদেশের অন্যতম বিশ্বনন্দিত সংস্কৃতির ধারক। তাদের মধ্যে এক বিরাট সংখ্যক লোক হচ্ছে সনাতন ধর্মের অনুসারী। সনাতন ধর্মাবলম্বী মণিপুরিদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ৩০ নভেম্বর সোমবার ‘মহারাসলীলা’।

 

প্রতি বছর কার্তিকের পূর্ণিমা তিথিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মণ্ডপে এবং আদমপুর সানাঠাকুর মণ্ডপে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ণিমার দিন সকালে পাপমোচন ও পুণ্য লাভের আশায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দলে দলে পূজা-অর্চনা পাঠ ও পুণ্যস্নান করেন। মণিপুরি সনাতনধর্মের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও দিনে দিনে রাস উৎসব হয়ে উঠছে সর্বজনীন উৎসব।

 

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়ামণ্ডপ ও আদমপুর ইউনিয়নের তেতইগাঁও সানাঠাকুর মণ্ডপ প্রাঙ্গণে প্রতিবছর রাসোৎসব উদযাপন করে। উৎসব উপলক্ষে উভয় স্থানে বসে বর্ণাঢ্য মেলা। মণিপুরি সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেতে ওঠেন এই আনন্দ উৎসবে। মহারাত্রির আনন্দের পরশ পেতে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দেশি-বিদেশি পর্যটক, বরেণ্য ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণির লোকজনদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা উৎসব অঙ্গন। রাসলীলায় জমায়েত হয় লক্ষাধিক পুণ্যার্থী ও দেশি-বিদেশি পর্যটক।

 

মণিপুরি সনাতন পুণ্যস্থান হিসেবে বিবেচিত মাধবপুর ও আদমপুরে রাসোৎসবের জন্য তৈরি সাদা কাগজের নকশায় সজ্জিত মণ্ডপগুলো এই একটি রাত্রির জন্য হয়ে উঠবে লাখো মানুষের মিলনতীর্থ। মনিপুরী শিশু নৃত্যশিল্পীদের সুনিপুণ নৃত্যাভিনয় রাতভর মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের। রাত ভর চাঁদের আলোয় মায়াবী জোৎনায় নূপুরের সিঞ্চনে মুদ্রা তুলবে সুবর্ণ কঙ্কণ পরিহিতা রাধা ও গোপিনী রূপের মনিপুরী তরুণীরা। সুরের আবেশে মাতাল হয়ে উঠবে কমলগঞ্জের প্রকৃতি ও জনমানুষ। রাসোৎসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই রাসোৎসবের আকর্ষণ বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উৎসবে দর্শনার্থীর সমাগম।

 

 

তুমুল হৈচৈ, আনন্দ উৎসাহ ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল আর শঙ্খ ধ্বনীর মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মের অবতার পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ ও তার সখি রাধার লীলাকে ঘিরে এই একটি দিন বছরের আর সব দিন থেকে ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসে কমলগঞ্জবাসীর জন জীবনে।

 

কথিত আছে, রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র একদিন স্বপ্নে দেখতে পান রাধা ও কৃষ্ণের রাসলীলা। তারপর তিনি স্বপ্নের আলোকেই উপস্থাপন করেন রাসলীলার রাসনৃত্য। তিনি কয়েকজন কুমারী মেয়ে দিয়ে স্বপ্নের মতো রাসলীলা করান। তার নিজ মেয়ে কুমারী বিশ্বাবতীকে শ্রীরাধা এবং মন্দিরের শ্রীগোবিন্দকে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে রাসলীলা করেন এবং তিনি নিজেই ওই রাসে মৃদঙ্গবাদক ছিলেন। তাতে তিনি নিজস্ব তাল ব্যবহার করেন। তার সে তালই এখন পর্যন্ত চলছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৭৭৯ সালে মণিপুরের মহারাজ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে যে নৃত্যগীতের প্রবর্তন করেন তা-ই রাসনৃত্য। মহারাজার মৃত্যুর একশ বছর পরে মহারাজ চন্দ্রকীর্তির শাসনামলে গোটা রাসনৃত্য আচৌকা, বৃন্দাবন, খুডুম্বা, গোস্ট, গোস্ট বৃন্দাবন, আচৌবা বৃন্দাবনসহ নানা ভঙ্গির পর্যায়ে পড়ে। তার মৃত্যুর পর মহারাজ চন্দ্রকীর্তি এ উৎসবকে আরও বেশি জনপ্রিয় করতে উৎসবকে মণিপুরিদের মাঝে ছড়িয়ে দেন।

 

বাংলাদেশে বসবাসরত মণিপুরি সম্প্রদায়ের তিনটি জাতি- বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙাল। মণিপুরিদের মধ্যে একমাত্র মুসলমান হচ্ছে মণিপুরি মুসলিম ‘পাঙাল’। মণিপুরিদের বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতেই গোত্রের লোকরা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। এরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ মণিপুরিদের প্রধান বার্ষিক উৎসব রাসপূর্ণিমায় রাসলীলা।

 

কিছু তথ্য ও উপাত্ত মতে জানা যায়, ১৮৪২ সালে মাধবপুরের জোড়া মণ্ডপেই মণিপুরি রাজ্যের বাইরে প্রথম রাসলীলার সূত্রপাত। রস থেকেই রাস শব্দের উৎপত্তি। রাস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তম মধুর রস। আর লীলা মানে খেলা। অর্থাৎ রাসলীলার মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও তাদের সখা-সাথীদের লীলাখেলা। মণিপুরি সমাজে রাসনৃত্য আবার ছয়টি ভাগে ভাগ করা। এগুলো মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপীরাস ও উদখুলরাস। এর মধ্যে মহারাস হচ্ছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

 

রাসলীলায় মনিপুরি নৃত্য শুধু কমলগঞ্জের নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্য কলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সালের নভেম্বর মাসে সিলেটে বেড়াতে এলে প্রথমে মণিপুরি হস্তশিল্পের কাজ দেখে তিনি অভিভূত হন। পরে তিনি জানতে পারেন যে, এই হস্তশিল্পের কাপড় মণিপুরিদের তৈরি। তিনি সিলেটের মণিপুরিপাড়ার মাছিমপুরে গিয়ে মণিপুরী রাখালনৃত্য দর্শন করে মুগ্ধ হয়ে রাসলীলা নৃত্য দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কবিগুরু মণিপুরি রাসনৃত্যের সাজসজ্জা, সাবলীল ছন্দ ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হন এবং কলকাতার শান্তিনিকেতনে ছেলেমেয়েদের নৃত্য শেখাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

 

পরবর্তীতে কলকাতার শান্তিনিকেতনে প্রথমবারের মতো মণিপুরি নৃত্য ব্যবহার করে মঞ্চস্থ হয় ‘নটীর পুজা’ ও ‘ঋতুরাজ’। পরে কবিগুরুর আমন্ত্রণে যোগ দেন মণিপুরি রাসনৃত্যের গুরু মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের নীলেশ্বর মুখার্জ্জী। রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও কাব্যময়তার সাথে মণিপুরি নৃত্যের সাবলীল গতি ও বিশুদ্ধ নান্দনিকতার মধ্যে বিশেষ সামঞ্জস্য থাকায় শান্তিনিকেতনে উচ্চাঙ্গ নৃত্যধারার মধ্যে মণিপুরি নৃত্য সর্বাপেক্ষা সমাদৃত হয়। এরপর বাংলাদেশে এবং সারা ভারতে মণিপুরী নৃত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটে। কবিগুরুর ছোঁয়ায় মণিপুরি নৃত্য সারাবিশ্বে পরিচিত লাভ করে।

 

রাসপূর্ণিমায় রাসলীলা উৎসবের শুরুটা হয় গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য দিয়ে। এ নৃত্য হয় সকালে। যারা রাখাল নৃত্য করে, তারা প্রথমে মণ্ডপে গোল হয়ে গোপী ভোজন করে। গোপী ভোজন হলো বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি ও ভাত। এ খাবার খেয়েই রাখাল নৃত্য শুরু করে শিল্পীরা। সকালে শুরু হয় রাখাল নৃত্য একটানা চলে বিকেল পর্যন্ত। মণিপুরি শিশু-কিশোররা এ নৃত্য পরিবেশন করে। যারা নৃত্য করে, তারা এক ধরনের বিশেষ পোশাক পরে। ঝলমলে এ বিশেষ পোশাকের নাম ‘পলয়’। এ পোশাকের পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা ভাগ্যচন্দ্র। রাখাল নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো কৃষ্ণ ও তার সাথীদের নিয়ে। গোলাকার মণ্ডপে কখনও একক, কখনও দ্বৈত এবং কখনও দল বেঁধে এ নৃত্য পরিবেশিত হয়। রাখাল নৃত্যের পাশাপাশি দিনভর চলতে থাকে মণিপুরিদের নিজস্ব সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সন্ধ্যার পর শুরু হয় রাসপূর্ণিমার রাসলীলা বা রাসনৃত্য। মনিপুরি সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি কুমারী কিশোরদের রাসলীলায় অংশগ্রহণ করার জন্যে নৃত্য ও সংগীতের তালিম নেয়ার ধুম পড়ে যায়। এক্ষেত্রে তাবৎ বাড়িতে রাসধারী ও রাস লীলার উস্তাদ এনে শিক্ষা দেয়ার রেওয়াজ প্রচলিত। আনুমানিক ৪০/৫০ জন কিংবা ততধিক সংখ্যার কিশোরী এ রাস লীলায় অংশগ্রহণ করে থাকে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 16
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ