করোনা : প্রতারণার আরেক নাম ডা. সাবরিনা

প্রকাশিত: ১১:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

করোনা : প্রতারণার আরেক নাম ডা. সাবরিনা

প্রভাতবেলা ডেস্ক: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীতেও থেমে নেই প্রতারকরা। করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্টসহ নানা অভিযোগ বন্ধ করা হয় ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালের দুটি শাখাই। আর এবার প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামীর নামে। এরা শুধু করোনা নিয়ে প্রতারণা করছে না, ডা. সাবরিনা অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠছে।

ক’রোনার ভু’য়া প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি জেকেজির প্রায় সব কর্মীর কাছে ওপেন সিক্রেট ছিল। তারা যাতে বিষয়টি বাইরে প্রকাশ করে না দেন সেজন্য ভিন্ন কৌশল হাতে নেন ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ। সূত্রমতে, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার পর একদিন ‌‘আনন্দ ট্রিপের’ নামে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে একজন নারী একজন পুরুষ কর্মীকে আলাদাভাবে পাঠানো হতো।এটার নাম দিয়েছিল ‘হানিমুন ট্রিপ’।

এমনকি মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের মাঠে জেকেজি যে বুথ স্থাপন করেছিলো সেখানে প্রায় প্রতি রাতে ম’দের পার্টি বসত। জেকেজির কর্মীরা রাতভর সেখানে নাচানাচি করতেন। এ নিয়ে তিতুমীর কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে জেকেজির কর্মীদের মা’রামা’রির ঘটনা ঘটে।

২৩ জুন (মঙ্গলবার) জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরীসহ পাঁচজনকে আ’টক করে পু’লিশ। এরপর একে একে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। জানা যায়, জেকেজি হেলথ কেয়ারের কোনো ল্যাব বা পরীক্ষাগার ছিলো না। কম্পিউটারে ফলাফল লিখে ই-মেইলে তা রোগীর কাছে পাঠিয়ে দিতেন।

সূত্রমতে, জেকেজি নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে করোনার টেস্টের ভু’য়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে। একটি ল্যাপটপ থেকে গুলশানে তাদের অফিসের ১৫ তলার ফ্লোর থেকে এই মনগড়া ক’রোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে হাজার হাজার মানুষের মেইলে পাঠায় তারা তাদের কার্যালয় থেকে জ’ব্দ ল্যাপটপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর করোনা টেস্ট জালিয়াতির এমন চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে। জানা যায়, টেস্টের জন্য জনপ্রতি নেয়া হতো সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা। বিদেশি নাগরিকদের কাছে জনপ্রতি এক শ’ ডলার।এ হিসাবে করোনার টেস্ট বাণিজ্য করে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে সাত কোটি ৭০ লাখ টাকা। করোনা মহামারীতে মানুষের জীবন নিয়ে এমন নির্মম বাণিজ্যের সঙ্গে জ’ড়িত জেকেজির চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী প্রতারক আরিফ চৌধুরী।

জেকেজির কে’লেঙ্কারিতে আরিফসহ কয়েকজন গ্রে’প্তার হলেও সাবরিনা পলা’তক। ক’রোনা হাসপাতাল হিসেবে রিজেন্টের অপকর্ম ঘিরে যখন নানামুখী আলোচনা তখনই জেকেজির চারটি মা’মলার ত’দন্ত করতে গিয়ে মিলল এমন তথ্য। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আরিফুল হক চৌধুরী গ্রে’প্তারের পর থেকেই অ’ভিযোগ ওঠে তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী জেকেজির সার্বিক কাজে শুরু থেকে তাকে সহায়তা করে আসছিলেন। সাবরিনা নিজে জানিয়েছেন তিনি তিতুমীরের স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যারা কিনা গ্রে’প্তার আ’তঙ্কে কলেজ ছেড়ে পা’লিয়েছেন।

অ’ভিযোগ রয়েছে ভু’য়া পরীক্ষা সনদ দিতেন এসব কথিত স্বেচ্ছাসেবীরাও। আর তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সাবরিনা আরিফ। বিষয়টি নিয়ে ত’দন্ত করছে প্রশা’সন। জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিক থেকেই জড়িত ছিলেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী।

তিতুমীর কলেজে নিজেদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ব্যবহারের সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় নিজের এই পরিচয় প্রকাশ করেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের এমডি আরিফুল চৌধুরী তার স্বামী। অনুস’ন্ধানে জানা যায়, জেকেজি হেলথকেয়ারের অনু’মতি পাওয়া থেকে শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অ’নৈতিক কর্মকাণ্ডেও জ’ড়িত এই চিকিৎসক।

এ বিষয়ে খোদ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মক’র্তা-কর্মচারীরাও নানা রকম অ’ভিযোগ করেছেন। তিতুমীর কলেজের হা’মলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডা. সাবরিনা আরিফ। তিনি তখন গণমাধ্যমেও বক্তব্য দিয়েছিলেন।গভীর রাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে কথিত হা’মলার বিচার চেয়েছিলেন সাবরিনা। সে ঘ’টনা ঘ’টে এ মাসের শুরুর দিকে। তার দা’বি তিনি গত দুইমাস ধরে এর সাথে সংশ্লিষ্ট নেই।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই কার্ডিয়াক সার্জন ও ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর উদ্যোগেই মূলত জেকেজি হেলথকেয়ার বুথ স্থাপনের কাজ পায়। তবে পরবর্তীতে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আরিফুল চৌধুরী আ’পত্তি জানালে সেখানেই শুরু হয় টানাপোড়েন। আর এসব বিষয়ে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই একাধিক অ’ভিযোগ যায়।

কিন্তু সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মক’র্তা গণমাধ্যমকে জানান, আমরা যারা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করি তারা কোনোভাবেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে থাকতে পারি না। কিন্তু হাসপাতালের একজন রেজিস্ট্রারড চিকিৎসক হয়ে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী কিভাবে এই পদের পরিচয় দিতেন বা চেয়ারম্যান পদে থাকেন তা বোধগম্য না।

জেকেজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়েই উঠে আসে এই দুই ব্যক্তির নাম। ডা. সাবরিনা চৌধুরী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ও জেকেজির চেয়ারম্যান। তার স্বামীর নাম আরিফ চৌধুরী।

ওই তদন্তের তথ্য মতে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে করোনার টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে। একটি ল্যাপটপ থেকে গুলশানে তাদের অফিসের ১৫ তলার ফ্লোর থেকে এই মনগড়া করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে হাজার হাজার মানুষের মেইলে পাঠায় তারা।

জেকেজি’র কার্যালয় থেকে জব্দ ল্যাপটপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর করোনা টেস্ট জালিয়াতির নানা তথ্য উঠে আসে। সেই তথ্য মতে, টেস্টের জন্য জনপ্রতি নেয়া হয় সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা। বিদেশি নাগরিকদের কাছে জনপ্রতি ১০০ ডলার। এ হিসাবে করোনার টেস্ট বাণিজ্য করে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে সাত কোটি ৭০ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরীর দম্পতির জীবন যেন রূপকথার মতো। আরিফের চতুর্থ স্ত্রী সাবরিনা। আরিফের এক স্ত্রী থাকেন রাশিয়ায়, অন্য একজন লন্ডনে। আর আরেকজনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তবে ছাড়াছাড়ির পরও সাবেক ওই স্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় আরিফের জন্য দেনদরবার করে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূলত সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি হাতিয়ে নেয় অখ্যাত প্রতিষ্ঠান জেকেজি। প্রথমে তিতুমীর কলেজে মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি মিললেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকা আর অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তারা। স্বামী-স্ত্রী মিলে করোনা টেস্ট করলেও তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। তাদের দুজনের নামে থানায় মামলাও রয়েছে। এছাড়াও বিএমএর নেতার পরিচয় ভাঙিয়ে চলাফেরা করেন ডা. সাবরিনা।

এদিকে গত ২৪ জুন প্রতিষ্ঠানটির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আরিফসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। দুই জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। অভিযানের সময় ল্যাপটপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়। সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি ছিল জেকেজির। পরে ওই চুক্তি বাতিল করা হয়।

 

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ