নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মনোরম আকর || টাঙ্গুয়ার হাওর

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২২

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মনোরম আকর || টাঙ্গুয়ার হাওর

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মনোরম আকর || টাঙ্গুয়ার হাওর

।। কবীর আহমদ সোহেল ।।আবহাওয়া পরিবেশ ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন মানবজীবনে প্রভাব পড়ছে মারাত্মকভাবে। নগরজীবনের যান্ত্রিকতা, অর্থনৈতিক অসম প্রতিযোগীতা , সামাজিক অস্থিতিশীলতা মানুষের যাপিত জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। সুখ, শান্তি, আর স্বার্থের পেছনে মানুষ কেবলি দৌঁড়াচ্ছে। মরিচিকাময় এ পৃথিবীতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাপিয়ে উঠছে গোটা মানবসভ্যতা।
আমরাও এর বাইরে নয়। ৩শ’ ৬০ আউলিয়ার স্মৃতিধন্য এই সিলেট। হযরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (র.) এর পদধূলিত এই সিলেট নগর। অপরুপ প্রকৃতিরাজির অনুপম ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ এই সিলেট। এক সময় সুখ, শান্তি আর সৌন্দর্যের প্রতিক ছিল এই শহর। পাখির কলরব,নদীর কলতান, সবুজ বৃক্ষের সমারোহ হৃদয়কে উৎফুল্ল করে তুলতো। সময়ের পরিক্রমার এসব আর নেই। নগর সভ্যতার ছোবলে আক্রান্ত এই পূণ্য নগরী। দালান – অট্রালিকার নগরীতে রুপান্তরিত এই জনপদেই আমাদের বসবাস।
নগর যান্ত্রিকতা,জীবন ব্যস্ততায় হাপিয়ে উঠছি আমরাও। বন্ধু-বান্ধব,স্বজন-পরিজন, পরিবেশ-সমাজ সভ্যতায় কমে আসছে হৃদ্যতা। প্রয়োজন খোলা আকাশের তলে বিস্তীর্ণ জলরাশির উপরে একটুখানি বয়ে চলা। টিলা পাহাড় ঘেরা সবুজের মাঝে কিছুটা সময় কাটানো। নির্মল বাতাসে গন্তব্যহীন পথ চলা। অথৈ জলে অবাধ সন্তরণ। ধূলো ধূসরিত আঁকাবাকা গ্রামেন পথে মোটরবাইকে দুরন্ত ছুটে চলা। একটুখানি ‘রিলাক্স’। একটা ‘রিফ্রেশমেন্ট’।
এটাই হবে। হওয়া দরকার। করা যায়। এমন অভিমত আসতে থাকলো। কাদে কাছ থেকে? এই যে আমরা যারা বন্ধুজন। যারা ব্যস্ততায় কিংবা অবসরে আড্ডা দেই। প্রয়োজনে-অপয়োজনে সময় কাটাই। কোন স্বার্থ ছাড়াই একে অপরের পাশে দাঁড়াই। দেখা না দেখায় খোঁজ নেই, খবর রাখি। এই আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম কোথাও ঘুরে আসা যায়।
মেঘালয়ের পাদদেশে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিটা পানির জলাভ‚মি ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’ ঘুরে আসবো আমরা। এ সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত।
আমাদের এই ভ্রমণসুচী আয়োজন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সোহেল আহমদ রিপন।

নৌকার ছাদে চড়ে যাত্রা

নৌকার ছাদে চড়ে যাত্রা

১৫ সদস্যের দল ♦ টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে ১৫ জন তালিকাভ‚ক্ত হন। তাঁরা হচ্ছেন (১) কাউন্সিলর সোহেল আহমদ রিপন (২) কবীর আহমদ সোহেল (৩) মোতাহির আলী (৪) বেলাল আহমদ (৫) আশিক আহমদ (৬) জাফর তুলু (৭) মাছুম আহমদ (৮) মুক্তাদির মুক্তা (৯) জয়নাল আবেদীন (১০) আসাদ (১১) আলমগীর (১২) জসিম উদ্দিন (১৩) সালাম (১৪) সুমন ও (১৫) তানহা।

সকালের সোনারোদে রওয়ানা♦ ৭ অক্টোবর শুক্রবার। সকাল সাড়ে ৬টায় আমাদের যাত্রা শুরুর নির্ধারিত সময়। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিপোর্টিংস্থলে হাজির হন বেলাল ভাই। দ্বিতীয় ব্যক্তি আমি। নির্ধারিত সময়ের ৫ মিনিট আগে পৌঁছি। একটু পরেই হাজির হন কাউন্সিলর রিপন ভাই। এরপর এক আসতে থাকেন আমাদের তালিকাভ‚ক্ত ভ্রমণ সঙ্গীগন। বাঙালীর সময়জ্ঞান নিয়ে যত প্রশ্ন তার সত্যতা প্রমাণ করলেন আমাদের দুই সহযাত্রী জাফর তুলু ও আসাদ। অপেক্ষার পর ফোন কল অত:পর একজন গিয়ে নিয়ে আসতে হয় তুলুকে। উদয় পরবর্তী সূর্যের রাঙ্গা আভায় রুপালী কিরণ ছড়াতে শুরু করছে পূব আকাশে। ঘড়ির কাটা ৭ পেরিয়ে যাচ্ছে আসাদের খবর নেই। ঘোষণা হলো আর ৫ মিনিট অপেক্ষা করে আমরা রওয়ানা হবো। কারো জন্য আর অপেক্ষা নয়। ৭ টা ২০ মিনিটে আমাদের যাত্রা শুরু। এসময়েই আসাদ এসে যোগ দিলেন। সোনাঝরা সকালে নির্মল হাওয়ার আবেশে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমরা রওয়ানা দিলাম।

৮ মোটরবাইকে ১৫ যাত্রী♦

আসাদ একা মোটরবাইকে। বাকী সবকটিতে দু’জন করে আমাদের পথচলা শুরু। শুক্রবার সকালের সড়ক মোটামুটি ফাঁকা। পিচঢালা পথ ধরেই চলছে আমাদের বাইক। মাঝারী গতিতেই ছুটছি আমরা। কোন বেপরোয়া গতি নেই কারো বাইকে। এ এক আদর্শ সমঝোতা। ৪০ মিনিটের মধ্যেই আমরা গোবিন্দগঞ্জ বাজারে পৌঁছে যাই। নাস্তা করার পূর্ব নির্ধারিত স্থান এটি। খুব কম সময়ে আমরা নাস্তা সেরে নেই এখানে। চা এখানে নয়। চা হবে জাউয়া বাজারে। মজাদার চা। মিনিট ১৫ এর মধ্যে জাউয়াবাজার আমাদের উপস্থিতি। কাঙ্খিত চা পান পর্ব সম্পন্ন হলো দ্রæততার সাথে।

জামালগঞ্জের পথে♦

জাউয়াবাজার থেকে আমরা ছুটছি জামালগঞ্জের পথে। এবার বাইকে গতি বেড়েছে কিছু। জুমআ’র আগেই পৌঁছতে হবে জামালগঞ্জে। এই টার্গেটে আমরা চলছি। বিস্তীর্ণ জমিন সবুজ বৃক্ষরাজির মাঝদিয়ে বিছানাসাদৃশ পিচঢালা সড়ক। মোটরবাইকের ড্রাইভ দারুণ লাগছে। উন্নত রাস্তায় সবারমুখে মান্নান সাব (পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান) করছেন। ‘না কাজ হইছে’- এসব উচ্চারণে আমরা মূল সড়ক অতিক্রম করে ফেলি কিছু বুুঝে উঠবার আগেই। এবার ডাইভার্সন পথে নেমে পড়লাম। প্রায় ১৩ কিলোমিটার গ্রামীন পথ। ভাঙ্গাচোরা, ইট কংক্রিট পাথরের খানা খন্দক। তারওপর সম্প্রতি বয়ে যাওয়া বন্যার তান্ডব চিত্রের সাক্ষী দিচ্ছে গাও- গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা এ পথঘাট। আমরা সকলেই চলছি আপনগতিতে। রাস্তার পাশে বাড়ী। বাড়ীর পাশে পুকুরে। পুকুরঘাটে গ্রামীন নারী শিশু। পুকুেের হংসরাজির অবাধ সন্তরণ। ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস প্রতিটি বাড়ীতে। রাস্তার ধারে ছাগল -গরুর অবাধ বিচরণ। গো-পাটে কাদাজলে মহিষের মাখামাখি। নিখাঁদ বাংলার বাস্তব দৃশ্য নয়ন জুড়ে যায়। দেখছি আর চলছি। কারো কন্ঠে সুর গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামটির পথ…. আমার মন ভুলায় রে..। এমন অপরুপ দৃশ্যে নিরুপম পথচলায় হঠাৎ বিপত্তি। আবার আসাদ! কি হয়েছে? গরু তার বাইকে লাথি মেরেছে। বাইকের সামনের চাকায়। অল্পের জন্য বড় দূঘর্টনা থেকে রক্ষা।

তক্তা বাঁশের সাঁকো,বড় ঝুঁকিতে আমি♦

জামালগঞ্জ পৌঁছতে আমরা মুখোমুখি হই কাঠের তক্তা আর বাঁশের তৈরী সাঁকোর। এবড়ো থেবড়ো বাঁশ আর দু’চারটি তক্তার নির্মিত দুটি সাঁকো পার হতে হয় আমাদের। স্থানীয় মোটরবাইকাররা দারুন এক্সপার্ট। অনায়াসে পাড়ি দেয় সাঁকো। পাড়ি দেয় নদী। তাদেও ড্রাইভ যেন রীতিমত এডভেঞ্চার। ভয় লাগে, আবার ভরসাও হয়। ওরা পারলে আমরা কেন পারবোনা। প্রথম সাঁকোটি আমরা পেরিয়ে যাই অনায়াসে। দ্বিতীয়টি পাড়ি দিতেই ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে আমি। বাঁশের উপরে দেয়া তক্তা থেকে আমার বাইকের সামনের চাকা আউট হয়ে দুই বাঁশের চিপায়। ডানে বামে দুটি কওে বাঁশ। বাইক আটকে যাওয়ায় উপর নীচে বাঁশ দুলছে। নীচে তাকাতেই ঘাবড়ে যাই। খাদ থেকে প্রায় ৪০ ফুট উপরে সাঁকো। তার উপরে বাইকের উপরে আমি। দোদুল্যমান ভারসাম্য নিয়ে আমি কাঁপছি। দৌঁড়ে আসে সহযাত্রী জয়নাল। বাইক ধরে আমাকে নামিয়ে দিয়ে সটানে পাড়ি দেয়। তক্তা আর বাঁশের চিপার ভয়াবহতার সময় মনে পড়ে বাঁশের চিপায় বানরের গল্পটি।

 

এডভেঞ্চার নৌকায় বাইক পার♦

এডভেঞ্চার নৌকায় বাইক পার♦

এডভেঞ্চার নৌকায় বাইক পার♦

সাঁকোর এডভেঞ্চার এর পর এবার নৌকায় বাইক পার করার এডভেঞ্চার। নৌকাঘাট ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। এখানেও স্থানীয়দের দুরন্তপনা ও সাহসিকতা অবাক কওে দেয়। জীবনের ঝুঁকি যেন তাদেও কাছে কোন ব্যাপারই না। আসলেই হাওর অঞ্চলের মানুষ যুদ্ধ করেই জীবন যাপন করে। তাদের কাছে ঝুঁকি আবার কী? স্বচক্ষে না দেখলে তা বুঝবার উপায় নেই। কোন ধরনের অঘটন ছাড়াই খেয়া নৌকায় বাইকসহ আমরা পেরিয়ে এলাম সুরমার একটা শাখা প্রবাহ। সবার মুখে শুকরিয় আলহামদুলিল্লাহ।

পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি, দুই ধার উচু তার, ঢালু তার পাড়ি♦ আমাদের ছোট নদী কবিতায় রবী ঠাকুরের অনবদ্য পংক্তিমালার বাস্তব দৃশ্যায়ন ভোগ করছি আমরা। ঢালু পাড়ি দিয়ে উচু ধার চড়ে আঁকাবাঁকা সরু পথে চলছি আমরা।
‘হায়রে আমার মন মাতানো দেশ
হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি
রূপ দেখে তোর কেন আমার
নয়ন ভরে না
তোরে এত ভালোবাসি তবু
পরান ভরে না’
গানের এই লিরিক্সগুলো কত যে বাস্তব তা আমরা আপন চোেেখ অবলোকন করছি। ঝুঁকি এডভেঞ্চার দুপুরের প্রখরতা ছাপিয়ে ক্লান্তিমাখা মুগ্ধতায় আমরা পৌঁছি জামালগঞ্জ সদরে।

জামালগঞ্জে কিছুক্ষণ♦

জামালগঞ্জে যখন পৌঁছি ঘড়ির কাটায় সাড়ে ১১টা। জামালগঞ্জে বাড়ী আমাদের ভ্রমন সহযাত্রী আশিক ভাইর। আগে থেকেই আমাদের অপেক্ষায় আশিক ভাইর স্থানীয় স্বজনরা। আমাদের পেয়েই আতিথেয়তায় ব্যতিব্যস্ত সবাই। কি করবেন, কি খাওয়াবেন কৃত্রিমতাহীন অনাবিল আন্তরিকতা যে কাউকে বিমোহিত করে তুলবে। আমাদের হাতে সময় কম। দ্রæত আমরা হালকা নাস্তা সেরে নিলাম। এখানেই আমাদের বাইক জার্নি শেষ। এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের কাঙ্খিত নৌকা ভ্রমণ। আশিক ভাই তার স্বজনদের দিয়ে বাজার সদাই করিয়ে নিয়েছেন আগেই। পরবর্তী রাত ও দুই দিন আমরা থাকবো হাওরে পানির ওপর নৌকায়। কাজেই খাবার দাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী এখান থেকেই কিনে নেয়া হলো। জামালগঞ্জ থেকে আমাদের সাথে সংযুক্ত হলেন বাবুর্চি , স্থানীয় গাইড হিসেবে আশিক ভাইর ৩ স্বজন। মাঝি মাল্লা আরো ৪ জন। আমাদের বহর এখন ২৪ জনের।
শুরু হলো স্বপ্নের জার্নি‘জার্নি বাই বোট’ – ইংরেজী রচনা পড়েনি এমন ছাত্র বিরল। কিন্তু বাস্তবে সবার কি জার্নি বাই বোট’র অভিজ্ঞতা হয়। বিশেষ বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের টিলা পাহাড় এলাকার মানুষের নৌভ্রমনের সুযোগ থাকে কম। আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। বিশাল ইঞ্জিন নৌকা জামালগঞ্জের ঘাটে আমাদের জন্য প্রস্তত। চাল ডাল তেল লবন সমেত বাজার সদাই নিয়ে নৌকায় চড়লাম আমরা। উচ্চাস আনন্দে আমাদের নৌকা চলতে শুরু করলো। বহমান সুরমার বুক চিরে আমাদের নৌকা চলমান। নৌকার নীচতলায় আমরা ব্যাগ ব্যাগেজ রেখে সবাই ছাদে। বিশাল সামিয়ানার তলে আমাদের আড্ডা। শুক্রবার তাই কিছুদুর যাবার পর তীরে নৌকা ভিড়ানো হলো। স্থানীয় একটি মসজিদে জুমআ’র নামাজ আদায় করে নিলাম। তড়িঘড়ি করে সবাই আবার নৌকায় চড়লাম।

আমরা যাচ্ছি টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি হাওর। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ হাওর। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন। নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের এক মনোরম আকর, টাঙ্গুয়ার হাওর। এ আপরুপ সৌন্দর্য অবলোকনের দুর্নিবার আকর্ষণে ছুটছে আমাদের নৌকা।

ওয়াচ টাওয়ারে আমরা

ওয়াচ টাওয়ারে আমরা

আমাদের গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওর

এদেশের অন্যতম জলাভূমি যেটি আন্তর্জাতিকভাবেও বহুলভাবে সমাদৃত। প্রায় ৪৬টি গ্রামমসহ গঠিত এই হাওরের আয়তন ১০০ বর্গ কিলোমিটার। যার মধ্যে ২৮০২.৩৬ হেক্টর এলাকা হল জলাভূমি। এই জলাভ‚মি ধরেই চলছে আমাদের জার্নি বাই বোট। আধুনিতক কোন নেভিগেশন না থাকায় মাঝি পথ হারাচ্ছে মাঝে মাঝে। বাড়ছে ক্ষুধার যন্ত্রণা। গড়িয়ে যাচ্ছে বেলা। কপালে সবার বিরক্তি রেখা উঁকি দিচ্ছে বারবার। মাছুম , আসাদ, জয়নাল মাতিয়ে তুলছেন পুরো নৌকা। সবার লক্ষব্যক্তি মোতাহির ভাই। খুনসুঁটি, টিপ্পনী মাঝে মধ্যে সীমা অতিক্রমও করছে। রাগ বিরাগ আর অনুরাগেই চলছে ভ্রমণ, চলছে আনন্দ। সবকিছু ছাড়িয়ে আমি জানবার চেষ্টা করছি বিশাল হাওরের রুপ সৌন্দর্য, সম্পদ সমারোহ, প্রকৃতিরাজির বিচিত্রতা। আমাদের সহযাত্রী স্থানীয়রা খুব একটা ভালো তথ্য দিতে পারছেন না।
প্রায় ৪০হাজার মানুষ এই হাওরের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারনে সৃষ্ট নাজুক অবস্থার দরুন বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালে এই হাওরকে রামসার সাইট অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার কারনে সরকার এই হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে বাধ্য ।
১৪০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ: চলমান নৌকার প্রবাহে হাওরে ছড়াচ্ছে ঢেউ। নৌকার ছাদে বসে শাদা জলরাশির এ ঢেউ দেখে নয়ন জুড়িয়ে যায়। স্বচ্ছ জলরাশি টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভাল করে তাকালে একবারে তলদেশ দেখা যায়। ঢেউয়ের স্্েরাতে মাছের ছুটোছুটি সরাসরি দেখার মজাই আলাদা।মাছের অন্যতম উৎস টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের মাছের চাহিদার সিংহভাগ যোগান দেয় এই হাওর। এছাড়া মাছ চাষ বাবদ সরকার প্রতিবছর কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে এই হাওর থেকে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই হাওরে প্রায় ১৪০ প্রজাতির অধিক মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায় । যেগুলোর মধ্যে আছে, আইর মাছ, গাং মাগুর মাছ, বাইম মাছ, তারা মাছ, গুতুম মাছ, গুলশা মাছ, ট্যাংরা মাছ, টিটনা মাছ, গড়িয়া মাছ, বেটি মাছ, কাকিয়া মাছ ইত্যাদি।

২০০ প্রজাতির অতিথি পাখি

আমাদের নৌকা চলছে। সৌন্দর্যের বাহারে বিমুগ্ধ আমরা। হিজল ,করছ, গুল্ম লতার জলজ উদ্ভিদের গল্প আমরা শুনেছি। বইয়ের পাতায় পড়েছি। এবার তা সরাসরি দেখছি। নৌকার ফ্যান গুল্ম লতায় পেচিয়ে যায়। কিছু সময় পরপর মাঝি মাল্লা পানিতে ডুব দিয়ে তা পরিস্কার করে। স্বচ্ছ জলরাশিতে গুল্ম আর বালুয়া গাছগুলো যেন উঁকি মেওে স্বাগত জানাচ্ছে আমাদের। হিজল করছের সারি সারি গাছের পাশ চলছে নৌকা। নৌকার শব্দে দল বেঁধে থাকা পাখিদের উড়াল দৃশ্য। চমৎকার! কি অপরুপ সৃস্টি মহান রর’র। প্রাপ্ত তথ্যমতে প্রতি বছর শীত মৌসুমে প্রায় ২০০ প্র্রজাতির অতিথি পাখি এই হাওরে এসে থাকে। এই জলাভূমিতে বিভিন্ন প্রকার মিঠা পানির উদ্ভিদও জন্মে থাকে যেমনঃ হিজল গাছ, করছ গাছ, গুল্লি গাছ, বালুয়া গাছ, বন তুলশি গাছ, নলখাগড়া গাছ ইত্যাদি। এখানকার বেশ কিছু উদ্ভিদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে। ক্লেমাটিস ক্যডমিয়া, ক্রাটাভা নুরভালা, ইউরাইল ফেরক্স, নেলুম্ব নুসিফেরা, অট্টেলিয়া আলিস মইডস, অক্সিস্তেল্মা সেকামনভার, সেকামন, পঙ্গামিয়া পিনাটটা, রসা ক্লিনফাইলা, টাইফা ইত্যাদি।
টাঙ্গুয়ারর হাওরের জীববৈচিত্র: টাঙ্গুয়ারহাওরের জীববৈচিত্রের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন জাতের পাখি। স্থানীয় বাংলাদেশী জাতের পাখি ছাড়াও শীতকালে, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরও আবাস এই হাওর। পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল, বড় আকারের গ্রে কিংস্টর্ক রয়েছে এই হাওরে। স্থানীয় জাতের মধ্যে শকুন, পানকৌড়ি, বেগুনি কালেম, ডাহুক, বালিহাঁস, গাঙচিল, বক, সারস, কাক, শঙ্খ চিল, পাতি কুট ইত্যাদি পাখির নিয়মিত বিচরণ এই হাওরে। এছাড়া আছে বিপন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি কুডুল ।
টাঙ্গুয়ায় ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির সাপ, বিরল প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটিসহ নানাবিধ প্রাণীর বাস, এই হাওরের জীববৈচিত্র্যকে করেছে ভরপুর।

শেষ হচ্ছেনা পথ♦

বিকেল ৩টা। শেষ হচ্ছেনা পথ। শেষ হচ্ছেনা রান্না। বাবুর্চির উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন ভ্রমণার্থীরা।ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার ১৮টি মৌজার ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর। কত হাওর , কত বিল আমরা অতিক্রম করছি তার হিসেব কারো কাছে নেই। আমি বারবার সহযাত্রী স্থানীয়দেও কাছে তথ্য জানতে চাই। তাদের দেয়া তথ্যমতে আমরা
চটাইন্নার বিল, তার খাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই বিল, হাতির গাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, হালির বিল,বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিল অত্রিক্রম করে আসছি।

অবশেষে অকুস্থলে♦

অবশেষে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আমাদের পাতে দুপুরের খাবার। ডালচিনি,এলাচ, তেজপাতাসহ সবধরনের গরম মসলায় রান্না করা অদ্ভুত স্বাদের রুই মাছের তরকারী । ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। এ অবস্থায় আমাদের গোগ্রাসে ভক্ষণ। ৪টার দিকে আমরা পৌঁছলাম টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারে। নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকনে দিনের কøান্তি যেন ঝরে পড়লো। কেউ সাতার কাটলেন, কেউ গান গাইলেন এমনি কওে ওয়াচ টাওয়ার পর্ব শেষ কওে আমরা চল্লাম নিলাদ্রি সংলগ্ন ঘাটে। জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরণা) এসে মিশেছে এই হাওরে। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ গ্রামগঞ্জ ও কৃষিজমি।
ওয়াচ টাওয়ার থেকে আমরা ফিরে এলাম নিলাদ্রি সংলগ্ন ঘাটে। যেখানে শত শত নৌকার নোঙর আর আলো ঝলকানিতে প্রকৃতির মাঝে অন্যরকম ছোঁয়া। আমাদের নৌকা নোঙর করা হলো। আমরা নেমে পড়লাম। স্থানীয় বাজারে ঘুরলাম। রাত কাটলো নৌকায়, জলের ওপর। প্রকৃতির নয়নাভিরাম ছোঁয়ায় আনন্দের হিল্লোলে চলছে আমাদের ভ্রমণ।

নীলাদ্রি লেকে এক সকাল ♥

নীলাদ্রি লেকে এক সকাল ♥

নীলাদ্রি লেকে এক সকাল ♥
শনিবার দিনের প্রথম প্রহরে টেকেরঘাটের নীলাদ্রি লেক পরিদর্শন ছিলো আমাদের ভ্রমনসূচীতে। যথারীতি সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই আমরা বেরিয়ে যাই নীলাদ্রি লেকের উদ্যেশে।আমাদের শীপ তীরে ভীড়ানো নিয়ে সারেংদের সাথে বিতন্ডা য় দিনের শুরুটা ভাল হয়নি।
উচু নীচু ঢালু টিলার পাদদেশে স্বচ্চ টলটলে পানি অনেকটা হ্রদের মত। তবে আমাকে খুব টানেনি জায়গাটা। আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের গ্রামন্চলের টিলার নীচের ‘ গাত’ বা ‘ খান্জার’ মত।
মূলতঃ তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাটের চুনাপাথরের একটি পরিত্যাক্ত খনির লাইম স্টোন লেক। এর পানি অনেক নীল হওয়ার কারণে এর নাম দেওয়া হয়েছ নিলাদ্রী লেক। লেকের পাড়ে অনেক টিলা রয়েছে। এটিকে অনেকে বাংলার কাশ্মীর বলেও অভিহিত করেন।
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে টেকেরঘাট এলাকায় অবস্থিত এ লেকটির মুল নাম শহীদ সিরাজ লেক। কিন্তু ভ্রমন কমিউনিটিতে এটি নীলাদ্রি লেক নামেই পরিচিত।
স্থানীয় লোকজন এটাকে টেকেরঘাটের পাথর কোয়ারী হিসেবে চেনেন।
আমাদের ভ্রমন সাথী জয়নালের মগ্ন হয়ে ভিডিও চিত্র ধারন ছাড়া আর কারোরই কিছুতে আগ্রহ ছিল না তেমন। তা-ই সাক্ষী হিসেবে লেকের পারে ফটোসেশান।

শিমুল বাগানে কিছুক্ষণ♥

শিমুল বাগানে কিছুক্ষণ♥

শিমুল বাগানে কিছুক্ষণ♥ আমাদের ভ্রমন সূচীতে শিমুল বাগান ঘুরে দেখা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের ব্যাঘাত ঘটায় দেখা না দেখার দ্বিধা- দ্বন্দে পড়েন টিম সদস্যরা। অবশেষে শনিবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে আমরা পৌঁছে যাই কাংখিত শিমুল বাগানে।সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর তীর ঘেসে গড়ে উঠেছে এ বিশাল বাগান। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন ১শ’ বিঘার উপরে জায়গায় এ শিমুল বাগান। দুপুরের কাঠফাটা রোদ আর ভ্রমনের যথাযথ সময় না হওয়ায় প্রকৃত অর্থে দেখবার মত চিত্তাকর্ষক তেমন কিছু নেই।
শিমুলের ফুল ফুটেনি। লাল রঙের বাহারি ছোঁয়ায় আমরা বিমোহিত হয়নি।তবে ১০০ বিঘার বেশী জায়গায় এক প্রজাতির শুধু শিমুল গাছ আমার জীবনে আর কখনো দেখিনি।
গাছের সংখ্যা জানেন? সাড়ে ১৪ হাজারের কাছাকাছি। পরিকল্পিত ভাবে রোপিত শিমুল গাছগুলোর কাছে গেলে মনে হয় আসলেই আমরা সোনার বাংলার নাগরিক। (অসপাপ্ত)
ফাল্গুনেই শিমুল বাগান রং ছড়ায়। আশ্বিনের এই ঘর্মাক্ত দুপুরে সবুজের সমারোহ আর প্রবাহিত বাতাস কিছুটা হলেও প্রশান্ত করে তোলে মন।
স্থানীয় প্রভাবশালী জয়নাল আবেদীন চেয়ারম্যান এই বাগানটি গড়ে তুলেছেন।দেশের দুর দুরাšত থেকে শত শত পর্যটকের পদচারণায় মূখর থাকে সারা বছর দূর্গম এলাকার এই শিমুল বাগান। ফেব্রুয়ারিতে অযুত দর্শক পর্যটকের পদচারণ ঘটে এখানে।
আমরাও গেলাম, দেখলাম, ঘুরলাম। ছবি না উঠিয়ে কি আসা যায়। (অসামাপ্ত)

 

 

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ