প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যাওয়া শহর

প্রকাশিত: ১২:০৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যাওয়া শহর

আহসান সাদী আল-আদিল:

নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়। সিলেট শহরের গুরুত্বপুর্ণ কিছু মোড়ে হঠাৎ করে কিছু ট্রাফিক লাইট লাগিয়ে দেয়া হলো। একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে লাল-সবুজ আর কমলা রঙের বাতি জ্বলে উঠতো। এই পুরো ব্যাপারটাতে শহরবাসী দুই ভাগ হয়ে গেলেন। কেউ কেউ লাল লাইট দেখে চুপচাপ রিক্সা বা মটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, সবুজ বাতি জ্বলার অপেক্ষা করেন; কেউবা আবার নিজের মতো করে এগিয়ে যান, ট্রাফিক লাইটের কোনো তোয়াক্কা না করেই।

সিলেট তখন একটা সাধারণ জেলা শহর। মাত্রই বিভাগীয় শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। এই নতুন সময়ে পদার্পণের উত্তেজনা সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন সিলেট পৌরসভাও এর বাইরে ছিলোনা সম্ভবত। শহরটাকে আধুনিক করার কাজে তারাও ঝাপিয়ে পড়লেন এবং এর ফলাফল হিসেবে আমরা পেয়ে গেলাম বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে সুদৃশ্য সেই ট্রাফিক লাইটগুলো। স্কুলপড়ুয়া বালক বয়সের আমাকেও ছুঁয়ে গেলো সেই উত্তেজনা। মনের ভেতর অনেক সম্ভাবনা আর প্রশ্নের সমাগম হতে লাগলো। কল্পনায় দেখতে পেলাম, সিলেট শহরটা আকারে অনেক বড় হয়ে গেছে; ঢাকার মতো। বিশাল বিশাল বিল্ডিং তৈরী হচ্ছে, চেনাজানা রাস্তাগুলো রাজপথ হয়ে গেছে। সারাদেশ থেকে মানুষ আসছে এই শহরে। চিড়িয়াখানা, পার্ক আর জাদুঘর গড়ে উঠছে!

আমাদের বাসা ছিলো সিলেট শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে। বাসার সামনের বিশাল মসজিদটা ছিল তিনতলা। মসজিদের ছাদে ঘুরে ঘুরে শহরটাকে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। বিল্ডিংয়ের চাইতে তখন গাছপালাই দেখা যেতো বেশী। শাহজালালের দরগা মসজিদের মিনারটাও দেখা যেতো। একদিন এলাকার এক বয়স্ক লোক কথা প্রসঙ্গে জানালেন দরগার মিনারটি হলো শহরের সবচাইতে উঁচু দালান। সিলেটে এর চাইতে উঁচু কোনো বিল্ডিং তৈরী করার অনুমতি কারো নেই! বালক বয়সে এরকম একটা কথা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। ভবিষ্যৎ সিলেটের অমিত সম্ভাবনা বিষয়ক সুখকল্পনার সেই সময়টাতে এটা ছিলো এক বিরাট আঘাত!

ওসমানী মেডিকেল ছিল সবচাইতে বড় হাসপাতাল এবং সেখানে ছিল পুরনো আমলের অনেকগুলো লিফট বা এলিভেটর। কখনো রোগী দেখতে হাসপাতালে গেলে আমার আগ্রহের সবটুকু জুড়ে থাকতো সেই লিফটগুলো। রেডিও বা টিভির চাইতেও প্রযুক্তির এই বিশেষ উদ্ভাবন আমাকে খুব বেশী মুগ্ধ করতো। লিফটের দরজা যখন বন্ধ হতো তখন একটা দৃশ্য, একটা বাস্তবতা, একটু পরে দরজা খুলে গেলেই আরেকটা দৃশ্য এবং সম্পূর্ণ আরেকটা ফ্লোরে চলে যাওয়া, কী অভাবনীয় একটা ব্যাপার! আমার জানামতে, সিলেটে তখন আর কোনো বিল্ডিংয়ে এই চমৎকার যন্ত্রটা ছিল না।

তখন ল্যান্ডফোন ছিলো এনালগ। আর ফোন নাম্বার ছিল মাত্র চার ডিজিটের। প্রতিটা নাম্বার আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়াল করতে হতো। বিদেশে কারো সাথে টেলিফোনে আলাপ করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পরিচিত অথবা অল্প-পরিচিত মানুষজন আমাদের বাসায় আসতেন। কথা বলার সময় প্রায়শই তারা অনেক উঁচু স্বরে কথা বলতেন এবং সরাসরি কথা বলতে পারার উত্তেজনায় নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে বসা অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে যেতেন! তখনকার দিনের ব্যাংকিং সিস্টেম ছিল আরো বেশি এনালগ। ব্যাংকে গেলে দেখতাম, প্রথমেই একজন কর্মকর্তার কাছে চেকবই জমা দিতে হয়। তিনি সেই চেকটা যাচাই করেন বিরাট বড় এক রেজিস্ট্রি খাতা দেখে। তারপর সেটা চলে যায় অন্য কর্মকর্তার কাছে। উনি আবার আরেকটা রেজিস্ট্রি খাতা দেখে যাচাই করেন। রেজিস্ট্রি খাতার পৃষ্ঠা ওলটানোর কাজে দুটো আঙুল একটু ভিজিয়ে নেয়ার জন্যে মুখের লালার ব্যাবহার মোটেই অস্বাভাবিক ছিলো না! এসব প্রক্রিয়ার পরে চেকটা ক্যাশ কাউন্টারে আসে এবং তারপরে ক্যাশিয়ার পান চিবানো মুখে কুশল বিনিময় করতেন এবং টাকা হাতে তুলে দিতেন।

আগেকার দিনের টেলিভিশন সংবাদ মানে ছিল বিটিভির সংবাদ। এসএসসি অথবা এইচএসসির রেজাল্টের দিন বিটিভিতে বেশ আয়োজন করে রিপোর্ট করা হতো। আমরা দেখতাম ঢাকার ভালো ভালো স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা অনেক আনন্দ উল্লাস করছে। তাদের গর্বিত অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে। আধা ঘন্টার সংবাদের মধ্যে দশ থেকে পনেরো মিনিট শুধু ঢাকার স্কুল কলেজের সাফল্যের খবর। ‘এছাড়াও ঢাকার বাইরের অনেক স্কুল-কলেজ খুব ভাল ফলাফল করেছে’, এরকম কিছু একটা বলে রেজাল্টের সংবাদগুলো শেষ করা হতো। জাতীয় পত্রিকা বলতে আমরা জানতাম ইনকিলাব, ইত্তেফাক, ভোরের কাগজ, বাংলা বাজার ইত্যাদি। প্রায় সব শহুরে বাসায় এরকম পত্রিকা রাখা হতো এবং এসবে আমাদের ছোট শহরের কোনো সংবাদ থাকতো না। আমরা খেলার খবর পড়তাম খুব আগ্রহ নিয়ে। আমাদের বাসায় রাখা হতো ইনকিলাব এবং পাশের বাসায় রাখা হতো ইত্তেফাক। ইত্তেফাকে প্রতিদিন টারজান কার্টুন ছাপা হতো। আমরা প্রতিদিন পাশের বাসায় গিয়ে টারজান পড়তাম। সিলেটের ডাক, জালালাবাদ, সিলেট কন্ঠ ইত্যাদি পত্রিকা ছিলো আমাদের ভাষায় লোকাল পত্রিকা। এই পত্রিকাগুলোতে স্থানীয় ব্রেকিং নিউজগুলো পাওয়া যেতো। বুধবার রাত নয়টায় টিভিতে দেখানো হতো ম্যাকগাইভার আর শুক্রবার বিকেল তিনটায় থাকতো বাংলা সিনেমা। এছাড়া সাদাকালো টিভিতে এক্স ফাইলস, সিনবাদ, রবিনহুড, ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট,টম এন্ড জেরি কার্টুন আর হানিফ সংকেতের ইত্যাদি ইত্যাদি আমাদের জীবনকে খুব রঙিন করে রাখতো।

আম্বরখানা থেকে সুনামগঞ্জের বাস ছেড়ে যেতো। শিবগঞ্জ থেকে ছাড়তো জাফলংয়ের বাস। রাস্তাঘাট ছিলো খুব সরু। মোটরসাইকেল বলতে ছিলো হোন্ডা আর ইয়ামাহা। ভারতীয় বাইক তখনো সেভাবে আসেনি। জিন্দাবাজারের শুকরিয়া মার্কেট আর সিলেট প্লাজা ছিলো ঈদ শপিঙের শ্রেষ্ঠ গন্তব্য। শুকরিয়া মার্কেট আর লতিফ সেন্টারের চটপটি ছিলো বিখ্যাত। স্টেডিয়ামের সামনে সৈকত রেস্টুরেন্ট ছিলো তরুণদের পছন্দের জায়গা। হোটেল অনুরাগের ভেতরে কংক্রিটের তৈরি বিশাল শাপলা ফুল ছিল আমাদের কাছে স্থাপত্যকলার এক অপরূপ নিদর্শন। রাস্তা থেকে এটি দেখা যেতো এবং স্কুলে যাওয়া আসার সময় খুব আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন দুইবার মুগ্ধ নয়নে এই শাপলার দিকে তাকানোর কোন ব্যত্যয় আমরা করতাম না।

রিকশার পাশাপাশি শহরে চলাচল করতো টেম্পু, বেবিটেক্সি এবং মিশুক নামের ছোট্ট এক প্রকার বাহন। হরতালময় সেইসব দিনগুলোতে মোটরসাইকেল আর বাইসাইকেল ছিলো রাস্তার রাজা। হরতালের প্রতিটা দিন আমাদের কাছে ছিল আনন্দ আর উৎসবের।

রাস্তায় রাস্তায় ক্রিকেট খেলা হতো। ব্যাবসায়ীরা দোকান অর্ধেক খোলা রেখে রাস্তায় চেয়ার নিয়ে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন, দেশ-বিদেশের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতেন। নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়টাতে মোটামুটি এই ছিলো সিলেট শহর।

কালের আবর্তনে সেই সিলেট বদলে যেতে থাকলো। এই পরিবর্তনটা ঘটতে থাকলো খুব দ্রুত। বিশ বছরের মধ্যেই বিশ তলা উঁচু বিল্ডিং তৈরী হয়ে গেলো অনেকগুলো। সিলেটের স্কাইলাইন গেলো পাল্টে। শাহজালালের দরগার উঁচু মিনারটা হয়ে গেলো সাধারণ ছোট্ট এক টাওয়ার। বাসাবাড়ির ধরণটা আগেরমতো রইলো না। এপার্টমেন্ট তৈরী হলো সর্বত্র। এসব এপার্টমেন্টে লিফট একটা বাধ্যতামূলক বিষয়। প্রায় প্রতিটা গলির মাথায় এটিএম বুথ চলে আসলো। সুপারমার্কেটগুলো নাগরিক জীবনটা অনেক বদলে দিলো। দেশের প্রথম শহর হিসেবে সিলেটে বৈদ্যুতিক তার মাটির নিচ দিয়ে টেনে নেয়া হলো।

সিলেট পৌরসভা ততোদিনে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সিলেট এয়ারপোর্ট ইন্টারন্যাশনাল হয়ে গেলো। নতুন রেলস্টেশন তৈরী হলো। বাসস্ট্যান্ডগুলো চলে গেলো শহরের বাইরে। সরকারি বেসরকারি মেডিকেল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ইত্যাদি তৈরী হলো অনেক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিংমল আর জনপ্রিয় বুটিকের আউটলেট খোলা হলো পুরো সিলেটজুড়ে। একটা মেট্রোপলিটন সিটি হিসেবে সিলেট শহর আত্মপ্রকাশ করলো বেশ আয়োজন করেই।

আমাদের পরিচিত ছোট শহরটার বদলে যাওয়ার দিনগুলোতে পুরো পৃথিবীটাই আসলে বদলে যাচ্ছিল। বদলে যাওয়ার মূল কারণটা ছিল ইন্টারনেট। কম্পিউটার সহজলভ্য হয়ে যাবার পর ইন্টারনেটও ছড়িয়ে গেলো সর্বত্র। স্মার্টফোনের হাত ধরে ইন্টারনেট হয়ে গেলো মানুষের মৌলিক চাহিদার কাছাকাছি কিছু একাটা। ই-কমার্স, সামাজিক যোগাযোগ, লাইভ স্ট্রিমিং ইত্যাদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে গেলো। তথ্য বা ডেটার সাগরে ডুবে গেলো পুরো পৃথিবী। যতো বেশী তথ্য তৈরী হবে, ততো বেশী করে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আবিষ্কার হতে থাকবে। ইন্টারনেটের সাগরে আমরা আরো বেশী তলিয়ে যেতে থাকবো। মানুষের জীবন এখন শৈশব থেকে শেষ দিন পর্যন্ত ইন্টারনেটের জালে বন্দী। আমাদের প্রজন্মটাই ডিজিটাল প্রযুক্তির কোনরকম সংস্পর্শ ছাড়া শৈশব কাটানো সর্বশেষ প্রজন্ম।

সিলেট শহরের সিটি করপোরেশন হিসেবে বেড়ে ওঠা আর আমাদের আটপৌরে জীবনটার বদলে যাওয়া, এই দুটো প্রক্রিয়া খুব সমসাময়িক। ছোটবেলায় দেখা সেই ট্রাফিক লাইটগুলো তাই এখানে খুব প্রতীকী একটা ঘটনা। সবুজ লাইট জ্বলে ওঠার সাথে সাথে আমরা নতুন একটা সময়ে, ভিন্ন একটা পৃথিবীর পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 157
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ