বঙ্গবন্ধু ও ড্রাইভার আজগরের সখ্যতা

প্রকাশিত: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২২

বঙ্গবন্ধু ও ড্রাইভার আজগরের সখ্যতা
এটি ১৯৭৪ সালের একটি ঘটনা। আমি তখন ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠেছি। তখন রাতের বেলায় আমি আমার বাবা মায়ের মাঝে শুতাম। আমি ভূত ভয় পেতাম তখন অনেক। তো বাবা মায়ের ছোট ছেলে হিসেবে আব্বা আম্মার মাঝে শুতাম। তখন যখন শুতাম তখন রাত হত অনেক তাড়াতাড়ি। এখন তো ১২টা কিংবা ১টা ছাড়া রাত হয় না। তখন আগেই ঘুমিয়ে যেতাম সবাই।
তো রাত ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে একটা ফোন আসলো। আমি গিয়ে ফোনটা ধরলাম। আব্বা-আম্মার শিক্ষা ছিল ফোন ধরেই সালাম দিতে হবে। তো আমি সালাম দিলাম, উনি সালাম না নিয়ে অপর প্রান্ত থেকে বেশ ধরাজ কণ্ঠে বললেন, ‘কে রে?’ আমি বললাম শামীম। সালামের উত্তর দিয়ে বললেন ‘তোর বাবারে দে’। তখন আমি এ কথা শুনে কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। বাবাকে (একেএম সামসুজ্জোহা) বললাম কে যেন ফোন করে বলছে তোর বাবাকে দে। আমার বাবা কথা শুনেই বুঝতে পারলেন।
বললেন, বঙ্গবন্ধু ,ফোনটা দাও। আমার বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন বঙ্গবন্ধু। পরে জানতে পারলাম কথার বিষয় ছিল মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশে আসবেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতেও হয়ত আসবেন তাই মাছ লাগবে, পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাবা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি।
নারায়ণগঞ্জ তখন মাছের জন্য বিখ্যাত। তাই বঙ্গবন্ধু আমার বাবাকে মাছ দিতে বলেছেন। তখন চান্দু সরকার নামে একজন ছিলেন, আমাদের চান্দু কাকা। আমার বাবা তাকে বললেন, বঙ্গবন্ধু ফোন করেছিলেন তাঁর মাছ লাগবে। কাকা বললেন, কোনো চিন্তা কইরেন না। সকাল বেলা মাছ পাঠাচ্ছি। চারার গোপে তখন মাছ উঠতো। আমার বাবা আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, তুমি যাবা মাছ নিয়ে? আমি বললাম হ্যা। আমি শুনে তো রক্ত গরম হওয়ার মত অবস্থা। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আমি একা মাছ নিয়ে যাবো সেটা শুনে তো সারা রাত আর ঘুমুতে পারি নাই।
ভোর ৪টার দিকে সাদা শার্ট আর সাদা প্যান্ট পড়ে আমি আর গাড়িচালক আজগর ভাই দুজন গেলাম ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দেখলাম মাত্র দুজন প্রহরী। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল রাষ্ট্রপতির বাসায় যাবো অনেক গার্ড থাকবে, বিশাল ঘর থাকবে। আমাদের গাড়ি চালক আজগর ভাইয়ের গলার কণ্ঠস্বর ছিল অনেক ভারী। তিনি বাড়ির সামনের গেটে দাঁড়িয়ে গেট খুলতে বললে পুলিশ খুলতে রাজী হচ্ছিল না।’
আজগর ভাই তখন ভারী গলায় বলেন, আমারে চিন না গেট খুল’। পুলিশ তখন জানায়, আপনাদের চিনে কাজ নাই সাহেব এখনও ঘুমে, পিএস আসে নাই। আমাদের কথা শুনে দেখলাম ভবনের দ্বিতীয় তলায় বঙ্গবন্ধু সাদা চেকের একটি লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পাইপ। দ্বিতীয় তলা থেকে ফরিদপুরের ভাষায় বঙ্গবন্ধু বললেন, এই কেডারে? আমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে আসছি বলে আজগর ভাই উপর দিকে তাকাতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, কেডারে আজগর? ঠিক এইভাবে। আজগর ভাই উত্তর দিলেন, হ, হ। এখন কী আর চিনতে পারবেন। এখনতো আপনি দেশের রাষ্ট্রপতি। আমি ভাবলাম অবস্থা মনে হয় খারাপ। বঙ্গবন্ধু বললেন, দাঁড়া আসছি।
ভিতর থেকে পাঞ্জাবী পড়ে এসে বলেন, মাছ নিয়ে এসেছিস? আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার মাথায় ছোট্ট একটা থাপ্পর দিয়ে বললেন, কিরে ভালো আছস? লেখাপড়া ঠিক মত করিস তো? আমি উত্তর দিলাম জ্বী করি। বঙ্গবন্ধু বললেন যা তোর চাচী রান্নাঘরে আছে মাছটি নিয়ে যা। তখন আমার এত রাগ উঠলো। আর মাছটির ওজন ছিল আমার চেয়েও বেশী। আমি হলাম মালিক আমাকে বলে মাছ নিয়ে যেতে আর ড্রাইভার আজগর ভাইয়ের কাধে হাত দিয়ে বললেন আজগর নাস্তা করছস? না বলাতে তাকে বললেন, চল নাস্তা করবি।
বঙ্গবন্ধুর কথায় পরে আমি পুলিশের সহায়তায় মাছ নিয়ে গেলাম রান্নাঘরে। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে আমি অবাক হয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখি বঙ্গমাতা রান্নাঘরে রান্না করছে। আমার মাছ নিয়ে তিনি নিজেই কাটতে শুরু করলেন। আমি আরো অবাক হলাম। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী নিজে রান্না করছে। আমাকে বসতে দিলেন একটি পিড়িতে। আমি তখন বাধ্য হয়েই সেখানে বসলাম। পরে আমাকে নাস্তা হিসেবে খেতে দিল মুড়ি ও খেজুরের গুড়। এটা দেখে আমার কান্না হওয়ার মত উপক্রম হলো।
অনেকক্ষন বসে থাকার পর সেগুলো খেলাম। তখন আমাকে আমার মায়ের খোঁজ খবর নিল। কারণ তিনি ও বঙ্গবন্ধু আমার মাকে ভালবাসতেন। যাওয়ার সময়ে আমাকে বঙ্গমাতা বললেন, ঠিক মত লেখাপড়া করিস। আমি চিন্তা করছিলাম বাড়িতে গিয়ে আব্বাকে বলবো আমাকে আর কখনও এ বাড়িতে পাঠাবেন না।’ ‘আমরা বের হওয়ার সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সালাম করলাম। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন ঠিকমত পড়ালেখা করিস কিন্তু। ওই সময়েও আজগর ভাইয়ের কাধে বঙ্গবন্ধুর হাত ছিল।
পরে গাড়িতে উঠার পর আজগর চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম নাস্তা করেছেন কী দিয়ে বললো পাউরুটি দিয়ে। বললাম আপনাকে এত বঙ্গবন্ধু ভালোবাসেন কেন। জানালেন, ৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকার কয়েকটি স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। তখন সঙ্গে ছিলেন আজগর। ৬৬ এর পর ৭৪ সালে প্রথম আজগরকে ভাইকে দেখেই চিনে ফেললেন। এটাই আসলে বঙ্গবন্ধু। তিনি কী জিনিস সেটা এখন বুঝেছি।’
__শামীম ওসমান. এর লেখা অনলাইন থেকে সংগৃহিত।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ