বাবাকে নিয়ে ফয়জুল্লাহ’র হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিচারণ

প্রকাশিত: ১১:২১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২০

বাবাকে নিয়ে ফয়জুল্লাহ’র হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিচারণ
সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার♦
——————————————————-
আজ আমার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী নয়। আজ বিশ্ব বাবা দিবস ও নয়। তথাপি আব্বাকে খুব মনে পড়ছে। ইচ্ছে করছে তাকে নিয়ে কিছু লিখতে। আব্বা ছিলেন আজন্ম সংগ্ৰামী এক পুরুষ। কষ্ট করেই তাকে বড় হতে হয়েছিল। জীবন যুদ্ধে অনেক প্রতিকূলতা ও ঘাত-প্রতিঘাত মাড়িয়ে তাকে অগ্ৰসর হতে হয়েছিল। তিনি ছিলেন খুবই পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। সে কারণে তার স্মৃতি আজো আমাকে প্রেরণা যোগায়।
আনুমানিক ১৯৩০ ঈসায়ী সালে বাবার জন্ম। তার নাম ছিল সৈয়দ আনওয়ারুল হক। ছোট বেলায় দাদী মারা যাওয়ায় আব্বা তার নানীর কাছেই লালিত-পালিত হন।
আব্বা কানাইঘাট মনসুরিয়া মাদ্রাসায় প্রখ্যাত আলেম, আধ্যাত্মিক রাহবার ও ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আব্দুর রব কাসেমী ও অন্যান্য বিদগ্ধ আলেমদের কাছে লেখা-পড়া করেন। প্রখ্যাত বুজুর্গ আল্লামা আব্দুর রহীম চরিপাড়ীর কাছে ও তিনি দীক্ষা গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি ভারত, নেপাল ও চীন ভ্রমনে বের হন। দীর্ঘ দিন পর তিনি দেশে এসে কাপড় ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রাইমারী স্কুলে চাকরির সুযোগ পান। প্রাইমারী স্কুল গুলো জাতীয় করণ করা হলে অন্য সবার মত তার চাকরি ও সরকারী করণ করা হয়।
আমার উপলব্ধি ম্যাচুরড হওয়ার পর থেকেই বাবাকে দেখে আসছিলাম অল্প বেতনে দিয়ে বড় একটি সংসার চালাতে। মা-বাবার সাথে আমরা ছিলাম ছয় ভাই, পাঁচ বোন। আমাদের অবশ্য পর্যাপ্ত জায়গা- জমি ছিল। আমাদের কৃষি ক্ষেত ছিলনা। জমি গুলো চাষীদের কাছে ভাগচাষে বার্ষিক বরাদ্দ দেয়া থাকতো। জমি থেকে আমরা যে ফসল পেতাম তা দিয়ে আমাদের সারা বছরের খাবারের চাহিদা পূরণ হয়ে আরো বেশ মূল্যের ধান বিক্রি করা যেত। আমরা সব ভাই ই তখনো বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় ছিলাম। কেউই চাকরি-বাকরিতে প্রবেশ করিনি। সে জন্য বাবা কিছুটা আর্থিক চাপে থাকতেন। আর্থিক অসুবিধা দূর করার জন্যে দু/ একজনকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিলে আব্বা বলতেন, ” আগে কামিল ও মাস্টার্স কমপ্লিট করো। ভালো রিজাল্ট করো। এপয়েন্টমেন্ট লেখার তোমার পেছনে ঘুরবে। টাকা অটোমেটিক্যালি আসবে।”
বাবা কানাইঘাটের খম্পুর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোরকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও টিলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সেকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিলনা বিধায় তাকে তিন/ চার কিলোমিটার দূরের স্কুলে হেঁটেই যেতে হতো।
পারিবারিক আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বিধানের জন্য বাবাকে সিজনাল কিছু ব্যবসায় করতে হতো। তিনি ধানের মৌসুমের শুরুতে অল্প দামে বেশ ধান ক্রয় করে রাখতেন এবং দাম বাড়লে পাইকারদের কাছে তা বিক্রি করে দিতেন। এতে ভালোই আয় হতো আমাদের।
বাবা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে আদায় করতেন। তিনি বাড়িতে একা নামাজ আদায় করা পছন্দ করতেন না। আব্বার উৎসাহে আমি ৩য় শ্রেণীতে পড়া কালেই মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে অভ্যস্ত হই। অন্যান্য ভাইদের অবস্থাও এ রকমই ছিল। আব্বা প্রতিদিন ফজরের নামাজ মসজিদে আদায় করে বাড়িতে এসে কুরআন তেলাওয়াতে বসতেন এবং একটানা এক- দেড় ঘন্টা তেলাওয়াত ‌করতেন। আমরা ভাই- বোনেরাও প্রতিদিন ফজর নামাজ শেষে অন্ততঃ এক পারা করে তেলাওয়াত করতাম। প্রায় বাড়িতেই ফজরের পর তেলাওয়াত হতো। বাংগালী গ্ৰামীন মুসলিম সমাজের সংস্কৃতির অংশ ছিল এটা। আজকাল তা তেমন দেখা যায় না। ব্যাপারটিকে দূ:খজনক বলতেই হয়।
বাবা মাদরাসা শিক্ষিত হলেও সমসাময়িক আর্থ -সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। তার বই পড়ার অভ্যাস ছিল। আমাদের কে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। তিনি ধর্ম বিহীন আধুনিক শিক্ষা কে পছন্দ করতেন না। আবার আধুনিক শিক্ষা বিহীন মাদরাসা শিক্ষা কেও সমর্থন করতেন না। আমাদের কে মাদরাসা শিক্ষায় চুড়ান্ত ডিগ্ৰী নেয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্ৰী নিতেও উদ্বুদ্ধ করতেন।
বাবা আমাদের কে নীতি, নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার শেখাতেন। এর ফলে ছোট বেলায় গ্ৰামীন পরিবেশের ভালো দিকগুলো রপ্ত করিয়েও এর কুপ্রভাব থেকে তিনি আমাদের কে মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। ফলে ছোট বেলার সাথীরা ধূমপান ও গালিগালাজে অভ্যস্ত হলেও আমরা তাতে আসক্ত বা অভ্যস্ত হইনি।
বাবা আমাদের কে শিখিয়েছেন যে, জীবন একটি যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে সৎ, যোগ্য, আত্মবিশ্বাসী ও কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তিরাই জিতবে। তিনি ভোরে ঘুম থেকে উঠা, নিয়মিত স্কুল বা মাদ্রাসায় যাওয়া, বিকেলে খেলাধুলা করা এবং মাগরিবের নামাজের পর পর পড়ার টেবিলে বসাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। তার অনুপ্রেরণায় বাড়ি থেকে ৭ কিলোমিটার দূরের প্রতিষ্ঠানে দুই বছর লেখাপড়া করেছি পায়ে হেঁটে। কেননা তখন চতুল-কানাইঘাট রাস্তা ছাড়া কানাইঘাটে আর কোন পাকা রাস্তা ছিল না।
বাবা খুবই সাদা মনের মানুষ ছিলেন। তিনি সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। কারো ক্ষতি করতেন না; বরং মানুষ কে সাহায্য করতেন। তখনকার গ্ৰামীন সমাজে আষাঢ় মাসে অনেকেই খাদ্যাভাবে পড়তো। তিনি তাদের কে ধান ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে তার একটা ভাবনা ছিল। আমাদের আর্থিক ‌স্বচ্ছলতা নিয়েও তিনি চিন্তা করতেন। আমি ফাজিল শ্রেণীতে অধ্যয়ন কালে নির্বাচনি বিষয় হিসেবে রাজনীতি বিজ্ঞান পছন্দ করাতে তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন: রাজনীতি বেশী শিখে লাভ নেই। উন্নয়নের জন্য দরকার। অর্থনীতির জ্ঞান।
শিক্ষক ছিলেন বিধায় বাবার অনেক ছাত্র-ছাত্রী দেশ- বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। তাদের অনেকেই হয়তো তার দ্বারা প্রভাবিত। কেননা, তাদের মানস গঠনে তিনি কাজ করেছেন। আমরা সন্তানরা তার দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত। এমনকি পেশা বাছাইয়েও আমরা সন্তানরা তার দ্বারা অনেক প্রভাবিত। বাবা শিক্ষক ছিলেন। তাই হয়তো আমরা তিন ভাই, এক বোন এখনো শিক্ষকতায় আছি। আরো এক ভাই এখন ব্যাংকার হলেও ইত:পূর্বে তিনি শিক্ষক ছিলেন। আর জ্ঞান গবেষণায় তিনি তো জড়িত আছেনই।
১৯৯৬ সালে আব্বা চাকরি থেকে অবসর নেন। সময় কাটানোর জন্য তার জন্য কাপড়ের ব্যবসার একটা বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই আব্বা ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।
সৈয়দ ফয়েজুল্লাহ বাহার♦ শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক♦ ভাইস প্রেসিডেন্ট ,সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ , সিলেট।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 6
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ