বিয়ে হোক মানুষের সাথে , পণ্যের সাথে সাথে নয়

প্রকাশিত: ৬:০৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

বিয়ে হোক মানুষের সাথে , পণ্যের সাথে সাথে নয়

বিয়ে হোক মানুষের সাথে , পণ্যের সাথে সাথে নয়। আমরা নারী তাই যৌতুকের কাছে যেনো হার না|বিয়ে যদি করতেই হয় একজন নারীকে করুন তার কোন আসবাবপত্রকে নয়।

জুঁই ইসলাম♦
হ্যঁ বলছিলাম যৌতুকের কথা! ইসলাম অতি স^াভাবিকভাবেই পণ বা যৌতুককে হারাম ঘোষণা করেছে। পক্ষান্তর ইসলাম নারী জাতির মর্যাদা তথা স^াভাবিক বিকাশের লক্ষ্যে বিবাহে ‘মোহর’ বাধ্যতামূলক করেছে, যা পাত্রের পক্ষে ‘কবুল’ বলার সাথে সাথেই পরিশোধের বিধান রয়েছে । যদিও আমাদের বাঙালি মুসলমানদের ৯৫ শতাংশ বিবাহে বর কনেকে ছলে, কৌশলে মোহর না দিয়েই সংসার যাত্রা আরম্ভ করে দেন। অথচ এ দেন মোহর বিবাহে শুদ্ধ হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত যা অনাদায়ে বিবাহই অস¤পূর্ণ থেকে যায়।
লকডাউন চলাকালিন দেশে কিছু বিয়ে দেখলাম খুবই ছোট্ট আয়োজনে হয়েছে যা অন্যান্য সময়ের বিয়ের চেয়ে মাইল ফলক-ই বলা যায়। খুবই সাদামাটা, ছেলে ও মেয়ের পরিবারে কয়েকজনের উপস্থিতিতে, নেই কোন লেনদেন, নেই হাজার মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা, নেই আলোক সজ্জা, নেই বড় অংকের সোনা, মোহর,বিলাসি ফার্নিচার কোন যৌতুক নেই, নেই কোন ঝমকালো আয়োজন কত না সুন্দর ও পবিত্র ধর্মীয় অনুসারে বিয়েগুলো সম্পন্ন হয়েছে।
আজকাল বিয়ে মানেই এক গাধা টাকার খেলা। যার আছে সে তো বিলাসী মনে সমাজকে দেখিয়ে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন আর যার নাই সে তো মরেছে এটাই এখন বাস্তব সত্য। কেউ দাবি করে বলছেন আমার ছেলের বউয়ের সাথে এই চাই সেই চাই চিন্তা করুন- কতটুকু নির্লজ্জ হলে একজন মানুষ অপরজন মানুষের কাছে করে অমানবিকভাবে এ কথাটি বলে ? আবার কেউ মুখে বলছেন আমি কিছুই চাই না শুধু মেয়েকে চাই কিন্তু মনে মনে ঠিকই আশা করে বসে আছেন যে আমার ছেলের সাথে এক সেট র্ফানিচার আসবে না আসলে তো সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। এমন মনোভাবাপন্ন লোকের অভাব নেই এদেশে। যৌতুক কোন উপহার নয় এটা একটা পরিবারের অভিশাপ। যৌতুকের সাথে জড়িয়ে থাকে একজন বাবার উর্পাজিত অর্থে, কষ্টের ঘাম তারপরও যৌতুক ছাড়া বিয়ে হচ্ছে না এ সমাজে। যৌতুকের কারণে ভেঙ্গে যাচ্ছে বিয়ে। আমাদের সমাজে দেখা যায় পুত্রের বাবা মা আশা করেই বসে থাকেন যেনো ছেলের বউয়ের সাথে আসবাবপত্র আসবে। অনেকক্ষেত্রে এমনও বলতে শোনা যায় ছেলেকে বিয়ে দিলে তো খাট, টেবিল চেয়ার সব আসবে তাই ঘরের পুরানো বা ভঙ্গুর জিনিস দিয়ে কোনমতে চালিয়ে দিতে চান সেই আশাতে ছেলের বউ আসার পূর্ব পর্যন্ত।
অনেকে যৌতুক নেয়াকে অপরাধ মনে করেন না কিন্তু দেয়াকে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ মনে করা হয় হচ্ছে অথচ যৌতুক দেয়া এবং নেয়া দুটিই অপরাধ। যদি কোন ব্যক্তি যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করেন তবে আদালত কর্তৃক জেল, জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবে। এমনকি কোন ব্যক্তি যদি ছেলে বা মেয়ের পিতা-মাতা বা অভিভাবকের নিকট হতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবী করে সেক্ষেত্রেও জেল জরিমানা বা উভয়বিদ দন্ডে দন্ডনীত হবে আইন আছে অথচ এসবের প্রয়োগ কম বিধায় আমাদের সমাজের সচেতন লোকেরাও ঠান্ডা মাথায় উভয় পরিবারের প্রকাশ্যে বিয়েতে লেনদেন করে যাচ্ছেন। মেয়ের বাবা সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না বলে ছেলের বাবার কাছ থেকে দামী কাপড়, সোনা, কাবিন বাজিয়ে নিচ্ছেন যেমন তেমনি ছেলের বাবাও মেয়ের বাবার কাছ থেকে সংসারের টুকিটাকি জিনিস থেকে শুরু করে দামী ফার্নিচার হাতিয়ে যেমন নিচ্ছেন তেমনি নামকরা কোন সেন্টারে বিয়ের আয়োজনের দাবিও জানাচ্ছেন।
অনেক তথাকথিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে দেখা যায় বিয়েতে ওয়ালিমা খাওয়ানোর কোন ব্যবস্থা না রেখে শুধুমাত্র কনে পক্ষের উপর বর পক্ষের শত শত অতিথি আপ্যায়নে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য পরিবারেও বলতে দেখা যায়, “ছেলের জন্য কোন যৌতুক চাইনা-হাজার খানেক অতিথি ভালো করে আপ্যায়ন করে দিলেই চলবে।এটা এক অভিনব যৌতুকের নতুন ষ্টাইল বলা যায়। এ ধরনের ভদ্রবেশী যৌতুক লোভীদের বিরুদ্ধেও কিছু বলাও যায় না, আবার মেনে নেওয়াও যায় না। তাই তাদের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইন প্রয়োগ করা জরুরী বলে আমরা মনে করি।
‘ওয়ালিমা’কে আমাদের প্রাণপ্রিয় মহানবী (স.) গুরুত্ব দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়ালিমা করতে বলেছেন।আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমান ইবনু আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর গায়ে হলদে চি‎হ্ন দেখতে পেয়ে বললেন, কি ব্যাপার? তিনি বললেন, খেজুর বিচির পরিমাণ সোনার মোহরের বিনিময়ে আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ্ তোমাকে বরকত দান করুন। ওয়ালিমা কর, একটি বকরী দ্বারা হলেও।” (বুখারী: ১০৯৪)
অতএব আমরা বুঝতে পারলাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বিয়ের পর ওয়ালিমা করতে উৎসাহিত করছেন।

১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইনের ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি যৌতুক প্রদান বা গ্রহণে সহায়তা করলে সে নুন্যতম এক বছর এবং অনুর্ধ পাঁচ বছর কারাদন্ডে বা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের আরেকটি ধারায় উল্লেখ আছে, কোন ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কনে বা বরের পিতা-মাতা বা অভিভাবকের নিকট যৌতুক দাবী করলে সে নুন্যতম ১ বছর অনুর্ধ পাঁচ বছর কারাদন্ডে বা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। যৌতুক নিরোধ আইনের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার ১ বছরের মধ্যে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
যৌতুকের দাবীতে গৃহবধু হত্যার ঘটনা শোনা যায় প্রায়ই। এদিকে খুনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্বেও কিংবা আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ থাকলেও কিছু অসাধু থানা কর্তৃপক্ষ এগুলোকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র অপমৃত্যুর ডায়রী করে দায়সারা গোছের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় গৃহবধু হত্যাকান্ডের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা যা কোনভাবে কাম্য নয়।
‘যৌতুক কে না বলুন’ প্রচার করতে হবে বেশি বেশি করে। প্রয়োজনে যৌতুক বিরোধী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে সমাজে। যৌতুক বিরোধী সংগঠনের মাধ্যমে একটি জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথা সংবাদপত্র, নাটক, বিচিত্রানুষ্ঠান, ভিডিও, টিভি, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে যৌতুক বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করা দরকার খুবই দরকার। আর এ ক্ষেত্রে যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। ভ‚মিকা রাখতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোও, ভ‚মিকা রাখতে হবে দেশের সামাজিক সংগঠন সমূহকে। ব্যক্তিগত জীবনেও আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যৌতুক বিষয়ে বিদ্যমান আইনকে যুযোগপযোগী করে প্রয়োগ করতে পারলে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে যৌতুক আদান প্রদান কমে আসবে, আরও কমে আসবে নির্যাতিত নারীর সংখ্যাও। তাই আসুন, ডিজিটাল এ যুগে পুরনো সংস্কৃতির যৌতুককে ঘৃণা করতে শিখি, ঘৃণা করতে শিখি সকল যৌতুক দাতা ও যৌতুক গ্রহীতাকে। মানুষের সাথে বিয়ে হোক, পণ্যের সাথে সাথে নয়।

জুঁই ইসলাম,কবি-কলামিস্ট।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 238
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ