মসজিদে অচলাবস্থা নিরসনকল্পে একটি প্রস্তাবনা

প্রকাশিত: ১২:০০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২০

মসজিদে অচলাবস্থা নিরসনকল্পে একটি প্রস্তাবনা

গোটা বিশ্ব আজ আক্রান্ত এক মহামারীতে। করোনা ভাইরাস কভিড-১৯ অস্থির করে তুলেছে তাবৎ বিশ্বকে। এই ভাইরাসটির জন্ম, বিস্তার, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া, সংক্রমণ, প্রতিরোধ, প্রতিষেধক কোনকিছুই সুস্পষ্ট করে পৃথিবী বলতে পারছেনা। পৃথিবীর রথি মহারথী অনেক রাষ্ট্র মৃহুর্তেই জনপদের পর জনপদ ছাঁই করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ছোবল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেছেনা। এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট।

দিন তারিখ  ঠিক করে বলা যাচ্ছে না কবে নাগাদ এই পৃথিবী স্থীর হবে। মুক্ত হবে করোনা ভাইরাস থেকে। সম্ভাব্য কোন আভাস আসছে না কোথাও থেকে। ২০২০ সাল এই করোনায়, মৃত্যুর মিছিলে, করোনা জয়ের গল্পে, অনাহারে, অর্ধাহারে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতায় কাটাবে পৃথিবীবাসী।

বাংলাদেশ সরকার ধীরে চলো নীতিতেই এগুচ্ছে। খুব সম্ভবত ঈদ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে এই সাধারণ ছুটি নামক ‘লকডাউন’। যদিও এই ‘লকডাউন’ এর শতভাগ সুফল আমরা পাচ্ছি না।এই দায় আমাদের সাধারণ জনগণের। সরকারের নীতি নির্ধারকদের। এককভাবে কাউকে দোষ দেবার সুযোগ নেই।

সৃষ্টিকর্তার করুণা ছাড়া আমাদের দেশে করোনা মহামারিতে ব্যাপক প্রানহানি রোধ করবার কোন উপায় নেই।  সমীকরণ বলে ৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণহাণির আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশে।যদি আমরা সচেতন থাকি, সরকার প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চলি। ব্যতয় ঘটলে এদেশের ভাগ্যে কি আছে তা সমাজ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ধারণার বাইরে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের চেয়ে ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে এ জাতির। সমীকরণ ভুল হয়ে যাক এটাই আমরা একান্তভাবে কামনা করি।

কিন্তু কামনা, বাসনা, আকাঙ্খা, অভিলাষ, আশা, প্রত্যাশায় কোন সমাজ বা রাষ্ট্র চলতে পারেনা। সকল পরিস্থিতির আলোকেই বাস্তবতার নিরিখে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করতে হয়। যুদ্ধ, মহামারী এগুলো ভিন্ন কথায় রাস্ট্রব্যবস্থার একটি অংশ। মানুষ এককভাবে এগুলো মোকাবেলা করতে পারেনা। তা রাষ্ট্রকেই করতে হয়। আর রাষ্ট্রের প্রয়োজন এখানেই।

বাংলাদেশ সরকার চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাধ্যমত সচেষ্ট রয়েছে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, অভাব- অনটন, চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচরিতায় অভ্যস্থ একটা জাতির সামনে এধরণের মহামারী নতুন। মোকাবেলায় গৃহিত কর্মসূচীও নতুন। এগুলো জনগণের উপর প্রভাবিত করে রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ নয়। সরকার তাই কঠোরনীতি অবলম্বন করছেনা। সহযোগিতা ও সহনশীলতা দিয়ে করোনা মোকাবেলার বুদ্ধিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। নি;সন্দেহে তা ধন্যবাদের দাবীদার।

অতি জরুরী প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সরকার সচল রাখতে সচেষ্ট।করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। ব্যাংক বন্ধ হয়নি। নিত্যপণ্যের দোকান বন্ধ হয়নি। টিসিবি সচল রয়েছে। সরকারী জরুরী দপ্তরগুলো সীমিত পরিসরে পযায়ক্রমে চালু হচ্ছে। কিছু পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। এমনকি রেস্তোরায় ইফতারী সামগ্রী  বিক্রিরও অনুমতি দেয়া হয়েছে। এগুলো ভালো উদ্যোগ। প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

শুরুতেই বলেছি, দিনক্ষণ ঠিক করে বলা যাবেনা কবে হবে করোনামুক্ত পৃথিবী, করোনামুক্ত বাংলাদেশ। তাইতো সবকিছু ‘লকডাউন’ করে জীবন চলেনা, চলবেনা। জীবনের প্রয়োজনে, জীবনের জন্যই জীবনঝুঁকি নিতে হয়, নেয়া হয় এবং সেটাই হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায়ে সংখ্যার বাধ্যতা। এমন সিদ্ধান্তে বহু প্রশ্ন, অনেক উত্তর। বাংলাদেশের কোন মসজিদে কি কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছে? মসজিদ কি অপরিচ্ছন্ন জীবানযুক্ত কোন স্থান? মসজিদে কি মানুষ অপরিচ্ছন্নভাবে যায়? মসজিদে কি মানুষ দিনভর বা রাতভর পড়ে থাকে? মসজিদে কি জীবানু সংক্রমণের বিশেষ কোন কিছু আছে? এসব বহু প্রশ্নের অনেকে উত্তর অনেকের কাছে। সাধারণ বিবেক এ প্রশ্নগুলির উত্তরে ‘না’ বলবে। তাহলে মসজিদে জামায়াতে নামাজে সংখ্যার বাধ্যকতা কেন?

হ্যাঁ কারণ হচ্ছে, আশঙ্কা। সংক্রমণের আশংকা। জনসমাগম যেখানে সেখানে করোনা সংক্রমণের একটা ঝুঁকি থাকে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিনা? তবে মসজিদে কেন নয়?

প্রশ্ন হলো মসজিদে সামাজিক দুরত্ব বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে? মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ এরকমই একটা প্রশ্ন ছুড়েন ইমাম উলামাদের প্রতি।তিনি বলেন পরীক্ষামুলক একটা মসজিদে সামাজিক দুরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে জামায়াতে নামাজ আদায় করে দেখানো হোক। রাষ্ট্রের এত জনবল নেই মসজিদে মসজিদে পুলিশী তদারকি করার। মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য উড়িয়ে দেবার মত নয়? আবার নিজে দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে ইমাম আলেমদের ঘাড়ে চাপানোও যুক্তিযুক্ত বলে আমরা মনে করিনা। দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বাস্তবায়ন করাতে হবে এইসব মৌলভী ,হুজুর, ইমাম, মুয়াজ্জিন আর মসজিদ কমিটিকে দিয়েই। প্রয়োজনে মসজিদ ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

আমরা মনে করি, সর্বাগ্রে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম অবারিত করে দেয়া দরকার। মসজিদের আয়তন অনুপাতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে যতজন নামাজ আদায় করতে পারেন ততজন অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ সংখ্যার তালিকা (— জন অংশ নেবেন) মসজিদের গেটে টানিয়ে রাখতে হবে। মসজিদে শুধু ১০ থেকে ১৫ মিনিটে ফরয জামায়াত হবে।  নিজ দায়িত্বে বাসা বাড়ী থেকে মুসল্লী অজু করে আসবেন। জামায়াত শুরুর ৫/৭ মিনিট আগে গেট খোলা হবে আবার জামায়াত শেষ হবার ৫/৭ মিনিট পর বন্ধ করে দেয়া হবে। মসজিদের গেটে , প্রবেশ পথে জীবানু নাশক স্প্রে করা যেতে পারে। পা পুশ ও মসজিদের ফ্লোর প্রতি ওয়াক্তের আগে ও পরে জীবানু নাশক দিয়ে পরিস্কার রাখতে হবে। বয়স্ক ও অপ্রাপ্তরা মসজিদে আসতে পারবেন না। অসুস্থ এমন কি যাদের হাঁচি কাশি আছে তারাও মসজিদে আসা থেকে বিরত থাকবেন। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে এ ব্যবস্থাপনা সরকারকে করতে হবে।

তারপর বিভাগীয় ও জেলা সদরে অন্তত একটি করে মসজিদে অনুরুপ ব্যবস্থাপনা সরকারী উদ্যোগে করতে হবে।

পরবর্তীতে পাড়া মহল্লা ও গ্রাম অঞ্চলের পঞ্চায়েতি মসজিদগুলোতে এ ব্যবস্থা নেয়ার উৎসাহ দিতে হবে। ঐসব মসজিদের কমিটি আগ্রহী হলে এ নিয়ম বিধি অনুসরণে সহযোগিতা দিতে হবে। অবশ্যই নিয়মের ব্যাপারে কঠোর থেকেই। আগেই উল্লেখ করেছি ইমাম মুয়াজ্জিন এবং মসজিদ কমিটিকে দায়িত্ব নিতে হবে।সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিষয়টি তদারকি করবে। সরকারের ওপর হাত পা ছেড়ে দিলে চলবেনা। সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ও সক্রিয়তা মসজিদে অচলাবস্থা নিরসন হতে পারে। এখানে আবেগতাড়িত হবার কিছু নেই। মসজিদ সচল করতেই হবে এমন ‘ফানাফিল্লা’ হবার সুযোগ নেই, ঠিক তেমনি মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেধে দিয়ে ‘বেগাফিল’ হয়ে যাওয়া কোন সমাধান নয়।

আমরা জানি, বৈশ্বিক মহামারী করোনা মোকাবেলোয় যেহেতু এখনো কোন প্রতিষেধক আবিস্কার করা যায়নি। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে চিকিৎসকনা আক্রান্তদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সফলও হচ্ছেন।

আমরা মনে করি, হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আর অভিজ্ঞতা হচ্ছে;, নিবিড় ধর্মীয় অনুশীলন মানুষকে প্রশান্তি দেয়। বিপরযয় থেকে রক্ষা করে।মুসলমানদের ধর্মীয় নিবিড় অনুশীলনের জায়গা হচ্ছে মসজিদ।মনে রাখতে হবে যত বড় ডাক্তারই হোননা কেন উন্নত চিকিৎসা সেবা তিনি হাসপাতালেই ভাল দিতে পারেন। যতই ইবাদত করিনা কেন ফরজ ইবাদাতের যথাযথ জায়গা হলো মসজিদ এবং মসজিদ।

আমাদের আপামর জনসাধারণ, আলেম, উলামা, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং সরকারের উর্ধতনমহল বাস্তবতা উপলব্ধি করে এ প্রস্তাবনার আলোকে আশু পদক্ষেপ নেবেন এ প্রত্যাশা আমাদের।

কবীর আহমদ সোহেল. সম্পাদক- প্রভাতবেলা।

২৯ এপ্রিল ২০২০

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ