‘ মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা নিষেধ ‘- ভিত্তিহীন নীতিবাক্য

প্রকাশিত: ৪:৩৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০২০

‘ মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা নিষেধ ‘- ভিত্তিহীন নীতিবাক্য

জয়নাল আবেদীন  জুয়েল ♦

“মসজিদের ভেতরে দুনিয়াবী কথা বলা নিষেধ” এরকম বাক্য আমার মনোযোগ কেড়েছে। অনেক মসজিদে এরকম কথা লিখে রাখা হয়েছে। আমি শত চেষ্টা করেও দুনিয়াবী কথা বলে তারা কি বুঝাচ্ছেন তার মানে খুঁজে পাইনি।

মসজিদে বসে কোন বিষয়ে আলোচনা করা যাবেনা? মদ নিয়েও আলোচনা করা যায়। জুয়া খেলা নিয়েও আলোচনা করা যায়। বেশ্যাবৃত্তি নিয়েও আলোচনা করা যায়। আমার কথায় চমকে উঠলেন?

পৃথিবীর সব ভালো আসবাব নিয়ে আলোচনা যেমন করা যায়, তেমনি আলোচনা করা যায় নিকৃষ্ট উপকরণ নিয়ে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সব বিষয়ের আলোচনা ইসলামে আছে। ইসলাম এবং দুনিয়া, দুনিয়া এবং আখেরাত বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়। ইসলামের কথা শুধুই কি কবর জীবনের কথা? ইসলামের কথা কি শুধুই হাশরের ময়দানের কথা? ইসলামের কথা কি শুধুই হুর-গেলমানের কথা?

এই কথাগুলি ঈমানের ভিত্তি, এতে বিশ্বাস না থাকলে ঈমানদারই নয়। কিন্তুু দুনিয়ার জীবন ছাড়া কি কেউ বেহেশতে যেতে পারবে? মদ খাওয়া হারাম, সুদ খাওয়া হারাম, ব্যাভিচার নিষেধ, কালোবাজারী নিষেধ, এগুলো তো মসজিদে বসেই আলাপ করতে হবে। একটা ভোট সেন্টার কুচক্রিরা দখল করে জাল ভোট দিলো। এটা যে কঠিন গোনাহের কাজ একথা তো মসজিদের ওয়াজেই বলতে হবে। নববর্ষ উদযাপন কোন গুনাহের কাজ নয়, কিন্তুু এর নামে যে বেলাল্লাপনা, তা যে কঠিন গুনাহের কাজ তা বলার জায়গাতো মসজিদ। নেতা নামধারীদের বাসায় অস্ত্র পাওয়া গেলে, মদ পাওয়া গেলে, তা কি বলতে হবেনা?

 

আরও পড়ুন: ‘আসসালামু আলাইকুম’ সম্ভাষণ

 

একজন মসজিদের ইমাম তো তার জুমা বারের বয়ানে এসব বিষয় তুলে আনবেন। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানির কথা তো ইমামরাই তুলে ধরবেন তাদের ওয়াজে। ধরুণ, একটা এলাকায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় আনন্দ মেলার নামে হাউজি খেলার ব্যবস্থা করা হলো। ঐ এলাকার ইমামরা কি এধরণের কাজ যে গুনাহের কাজ তা জনগণকে বুঝাবেন না? রাজনীতিবিদদের জন্য কি শরিয়তের বিধান শিথিল? তাদের অন্যায়-অপরাধের কথা মসজিদে বসে বললেই তা রাজনৈতিক আলাপ হয়ে যাবে?

ইসলাম ও দুনিয়াকে আলাদা ভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। যারা বলেন আমরা রাজনীতি বুঝিনা, আমরা নামায-রোজা আর তসবিহ-তাহলিল নিয়ে ব্যস্ত, তারা হলেন সন্যাসী। আর সন্যাসব্রত ইসলামে নাই। একজন খাঁটি মুসলমানকে অবশ্যই রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করতে হবে। একজন খাঁটি মুসলমানকে দায়ীত্ব নেয়া শিখতে হবে। খেদমতে দ্বীন দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্টা করা যায়না, যাবেনা। খেদমতে দ্বীন ও ইকামতে দ্বীনের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এই দুইটি ধারা সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাবে।

রাসুলুল্লাহ(দঃ) এর চাইতে আল্লাহ ভীরু আছে কি কেউ? তিনি বিয়ে করেছেন, ঘর সংসার করেছেন, সমাজ গঠণ করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধও করেছেন। তিনি একজন আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা, সফল সমাজপতি, সফল রাষ্ট্রনায়কও। তাঁর সাহাবাদের কেউ ছিলেন গভর্ণর, কেউ বিচারপতি, কেউ রাষ্ট্রনায়ক, আর সবাই ছিলেন সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ভীরু। তাঁরা মসজিদে বসে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। বনী ইসরাঈলরাও ছিলো ঈমানদার।

 

আরও পড়ুন: হাদিসের আলোকে সালামের ইতিহাস

 

তারা নিজের চোখে আল্লাহর কুদরত দেখেছে। বিশাল জলরাশির ভেতর দিয়ে তারা মিছিল করে পার হয়েছে। তারা নিজের চোখে ফেরাউনের পতন দেখেছে। তাদের ঈমান কি কম ছিলো? তারপরও তারা অন্যায়কারী আমলেকা গোত্রের সাথে মোকাবেলায় যায়নি। তারা হযরত মুসা(আঃ) কে বলেছে- এদের সাথে আপনি ও আপনার আল্লাহ মোকাবেলা করুন। তারা তাদের ভাগ্যকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি। যে কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছিলেন এবং তাদেরকে লাঞ্চনার জীবন দান করেছিলেন। আল্লাহর হাতে নিজের ভাগ্যকে ছেড়ে দেয়ার নাম তাওয়াক্কুল নয়। বীজ বপন করে আল্লাহর উপর নির্ভর করার নাম তাওয়াক্কুল।

মসজিদের ভেতর দুনিয়াবী কথা বলা নিষেধ না লিখে লিখতে হবে- মসজিদের ভেতর বাজে বা অনর্থক কথা বলা নিষেধ। অনর্থক কথার নিন্দা স্বয়ং আল্লাহ কোরআনে করেছেন।

অনর্থক কথার সামান্য উদাহরণ হলোঃ ভাই, গতকাল বাজারে দেখেছি বিশাল এক বাঘ মাছ, কলিমুদ্দীন ছাব্বিশ হাজার টাকা দিয়ে একটা ফ্রীজ কিনেছে, অমুকের বউ তার জামাইর সাথে ঝগড়া করে, এগুলো হলো অনর্থক বা বাজে কথা। রাজনৈতিক আলাপ কোন অবস্থাতেই দুনিয়াবী আলাপ নয়। কারণ ইসলামের সাথে রাজনীতির সু-গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

জয়নাল আবেদীন জুয়েল, বিশিষ্ট ছড়াকার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 115
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ