ময়না যতই আল্লাহ ডাক শিখুক

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২২

ময়না যতই আল্লাহ ডাক শিখুক
জয়নাল আবেদীন জুয়েল ময়না যতই আল্লাহ ডাক শিখুক মৃত্যুর সময় আল্লাহ ডাক তার মুখে আসবেনা। আসবে বুনো ভাষা। মানুষও এরকম। সে সারাজীবন যে জিনিষের সাধনা করে মৃত্যুর সময় সেটাই তার সাথে থাকে।
এক পাগলখানায় গিয়েছিলাম। ওখানে বিভিন্ন পাগলের আচরণ দেখলাম। একজনকে দেখলাম সে বক্তৃতা দিচ্ছে। একজন কাগজ কলম নিয়ে কী যেন লেখার চেষ্টা করছে। আরেকজন খামাখা গালিগালি করে কার যেন চৌদ্দগোষ্টী উদ্ধারের চেষ্টা করছে। সাথে ছিলেন এক বড় ভাই, পেশায় ডাক্তার। তিনি বললেন- বুঝেছো কিছু? বললাম- না। তিনি বললেন- যে পাগল লোকটা নীরবে বসে কিছু লেখার চেষ্টা করছে ও একসময় সরকারী চাকুরীজীবি ছিলো। পাগল অবস্থায়ও তার আগের অভ্যাস ধরে রেখেছে। আর ঐ যে লোকটা বক্তৃতা দিচ্ছে, ও একসময় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। পাগল হওয়ার পরও তার পুরনো অভ্যাস রপ্ত করে যাচ্ছে। আর ঐ যে লোকটা গালাগালি করে যাচ্ছে সে পাগল হওয়ার আগেও বখাটে ছিলো। আর খামাখা গালাগালি করাতো বখাটেদের কাজ।
পাগল সম্পর্কে এরকম তথ্য জানার পর আমি পাগলদের সাথে কথা বলায় আগ্রহী হয়ে উঠলাম। এরপর জীবনে অনেক পাগলের সাথে কথা বলেছি। দেখেছি তাদের জীবনে পাগল হওয়ার আগের জীবনের ছাপ কতটা স্পষ্ট। একজন পাগলকে সালাম দেয়ার পরই ইংরেজী বলা শুরু করে দিতেন। আসলে লোকটা ছিলেন একজন শিক্ষক, তিনি ইংরেজী পড়াতেন।
আমার এই লেখাটা পাগল নিয়ে নয়, মানুষের অভ্যাস নিয়ে। মানুষের শেষ জীবনটা কেমন হবে, তা নিয়ে। তাই পাগল নিয়ে বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। একবার রাসুলুল্লাহ(দঃ) বিমর্ষ বদনে বসে আছেন। হযরত জিবরাঈল(আঃ) তার বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞ্যেস করলেন। রাসুলুল্লাহ(দঃ) বললেন আমার উম্মতের শেষ পরিণতি নিয়ে চিন্তায় আছি। হযরত জীবরাঈল(আঃ) রাসুলুল্লাহ(দঃ)কে একটা পুরনো কবরের কাছে নিয়ে গেলেন। আর একটা কবরে আঘাত করলেন। একটা লোক কবর থেকে বেরিয়ে এলো হায় আফসোস, হায় আফসোস বলে। জীবরাঈল(আঃ) বললেন তুমি চলে যাও, লোকটা কবরে চলে গেলো। এবার আরেক কবরে তিনি আঘাত করলেন। এক লোক কবর থেকে বের হলো। মুখে তার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। জীবরাঈল(আঃ) এর ইশারায় এই লোকটাও কবরে চলে গেলো। এবারে জীবরাঈল বললেন- হে আল্লাহর রাসুল, যার জীবন যে রকম হবে, তার মৃত্যুও সে রকম হবে। আর যে অবস্থায় যে মৃত্যুবরণ করবে তার পরবর্তী জীবনও সেরকম হবে।
একটা লোক সারাজীবন সৎ পথে ছিলো। অর্থ উপার্জনে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেনি। সে নামাজ ক্বাজা করেনি। রমজানের রোজা পুরোটাই রেখেছে। হজ্ব করেছে, জাকাত আদায় করেছে। নিজের সাধ্য মত আল্লাহর দ্বীন জমিনে প্রতিষ্টার চেষ্টা সাধনা করেছে। তার মৃত্যুও সুন্দর হবে, তার কবরের জীবনও সুন্দর হবে, সে কবর থেকে উঠার পর হাশরের ময়দানেও আনন্দিত থাকবে। মোতির মিম্বরে বসে বিচারকার্য পর্যবেক্ষণ করবে। দীর্ঘ বিচার দিবসের গ্লানি তাকে স্পর্শ করবেনা। তাকে হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করানো হবে।
এই হাউজে কাওসারের মালিকানা রাসুলুল্লাহ(দঃ) কে দেয়া হয়েছে। এই লোকটা বক্তৃতায় আল্লাহর কথা বলেছে, যেখানে গেছে আল্লাহর কথাই বলেছে। তার সব সময়ের শ্লোগান ছিলো আল্লাহু আকবর। তার জীবনের উন্নতির সময় সে বলেছে আল্লাহু আকবর, আর বিপদের সময় বলেছে ইন্নালিল্লাহ। আজ কেয়ামতের ময়দানে সে খুবই সম্মানীত, তার হাতে কোন হাতকড়া নেই। সে দুনিয়ার জীবনে তার প্রতিপালককে ভয় করতো। সে আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাস করতো, ভরসা রাখতো। পবিত্র কোরআনে এমন ব্যক্তি সম্বন্ধে বলা হয়েছে-” কিন্তুু যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য নির্মিত রয়েছে প্রাসাদের উপর প্রাসাদ, এগুলোর তলদেশে নদী প্রবাহিত। আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গ করেননা”।( যুমার-আয়াত-২০)
আরেক লোক সারাজীবন আল্লাহর নাম নেয়া থেকে গাফেল ছিলো। বুড়ো বয়সে চাইলেও সে আল্লাহর নাম নিতে পারবেনা। সে নামাজ পড়তে চাইলেও নামাজ পড়তে পারবেনা। সে সারাজীবন আল্লাহর নাম নেয়া থেকে গাফেল ছিলো, মৃত্যুর সময়ও তার মুখ দিয়ে আল্লাহর নাম বের হবেনা। সে জীবনে অনেক বক্তৃতা দিয়েছে। কিন্তুু একবারের জন্যও তার মুখ থেকে আল্লাহর রাসুলের কোন বাণী উচ্চারিত হয়নি। সে তার বক্তৃতায় বিভিন্ন বিজ্ঞানীকে রেফারেন্স হিসেবে এনেছে, এনেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বা সংষ্কারকের নাম। বিভিন্ন ধর্মের মহাপুরুষের নামও তার বক্তৃতায় ও লেখায় এসেছে। কিন্তুু কখনো সে একবারের জন্যও বলেনি আমাদের নবীজি এ কথা বলেছেন।
আল্লাহকে সে আল্লাহ বলেও ডাকেনি কোনদিন। অভ্যাস বশতঃ বা মুখ ফসকে হঠাৎ বলে ফেলেছে সৃষ্টিকর্তা। আরেকটু আধুনিকতার ভাব ধরে হয়তো কেউ বলেছে- প্রকৃতি, আল্লাহ বললে মান যাবে, তাই বলেছে প্রকৃতি। যে আল্লাহর নাম মুখে আনতে তার বাধে, যে রাসুলের নাম লইতে যে লজ্জা অনুভব করে, তার মৃত্যু কেমন হওয়া উচিত?সে বিছানায় কাত হয়ে পড়ার পর বলে- আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।
কী দোয়া করবো আমরা? সারা পৃথিবীর মানুষও যদি তোমার জন্য দোয়া করে তাহলে কী হবে? আল্লাহ কি তার বিধান পাল্টে দেবেন? পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন-” যখন কোন মানুষের প্রাণ তার কণ্ঠনালীতে এসে পৌঁছে যায়, তখন কেনো তোমরা অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকো, (এসময়তো বরং) তোমাদের চাইতে আমিই সেই মুমুর্ষু ব্যক্তির বেশী কাছে থাকি, তোমরা এর কিছুই দেখতে পাওনা, তোমরা যদি এমন অক্ষম না-ই হও, তোমরা যদি(তোমাদের ক্ষমতার দাবীতে) সত্যবাদী হও, তাহলে কেনো সেই (বেরিয়ে যাওয়া প্রাণ) কে ফিরিয়ে আনোনা। হ্যাঁ, যদি সে(মৃত) ব্যক্তিটি আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত একজন হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য থাকবে আরাম আয়েশ, উন্নত মানের আহার্য ও নেয়ামতে ভরপুর (এক চিরন্তন) বেহেস্ত। আর যদি সে হয় ডান পাশের কেউ, তাহলে তাকে অভিনন্দনজানানো হবে এই বলে যে-আপনার জন্য রয়েছে শান্তি আর শান্তি, কারণ আপনি ছিলেন ডানপাশের একজন। আর যদি সে হয় আল্লাহপাককে অস্বীকারকারী মিথ্যাবাদী পথভ্রস্ট দলের কেউ তাহলে ফুটন্ত পানি দ্বারা  তার আপ্যায়ন করা হবে। এবং সে দোজখের কঠিন আগুনে উপনীত হবে। (সুরা ওয়াকেয়া-৮৩-৯৪)
একজন মানুষ উঠতে বসতে বলে আলহামদুলিল্লাহ, সোবাহানল্লাহ, ইন্নালিল্লাহ, এই লোকটা মৃত্যুর সময়ও এরকম শব্দ বলতে বলতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। আর যে ব্যক্তির মুখে ছিলো অন্য শব্দ, অন্য শ্লোগান, সে ঐ শ্লোগান দিতে দিতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। কত লাঞ্ছনার এই মৃত্যু। আল্লাহ বলেন- “যে ব্যক্তি মুমিন, সে নাফরমান ব্যক্তির মত হয়ে যাবে? (না) এরা কখনো এক সমান হতে পারেনা”। (সেজদা-১৮) এজন্য দুনিয়ার এই জীবনকে সাজাতে হবে কোরআনের রঙে। জীবনের প্রতিটা মুহুর্তের শ্লোগান হতে হবে আল্লাহু আকবার। বিচার দিবসে পতাকাধারীর অভাব থাকবেনা। বিভিন্ন মতাদর্শের নেতার পতাকা তলে তাদের ভক্ত ও সমর্থকরা সমবেত থাকবে। নবী ও রাসুলদেরও পতাকা থাকবে।
তাদের পতাকাতলে তাদের উম্মতরা থাকবে। এক পর্যায়ে নেতাদের সাথে তাদের কর্মী ও সমর্থকদের ঝগড়া শুরু হবে। কর্মীরা বলবে আমরা তোমাদের কারণে আল্লাহ স্মরণ থেকে গাফেল ছিলাম। আজ তোমরা আমাদেরকে রক্ষা করো। নেতারা তাদের কর্মীদেরকে বলবে আমরা নিজেরাইতো দোজখী, তোমাদেরকে বাঁচাবো কীভাবে? তারপর নেতা ও তার কর্মীরা মিলে শয়তানের কাছে যাবে। তারা শয়তানকে বলবে- আমরা আপনার পথ অনুসরণ করে আজ দোজখ বাসী, আপনি আমাদের রক্ষা করুন। শয়তান উত্তরে বলবে আমি কি তোমাদের বল প্রয়োগ করে আমার পথে এনেছিলাম?
আমি পৃথিবীতে বিভিন্ন মতবাদের জন্ম দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম নারীর মুক্তি উলংগপনায়, তোমরা নারী ভোগের জন্য নারীকে করেছো উলংগ, আমি বলেছিলাম অর্থনৈতিক মুক্তি ওখানে, তোমরা ওখানে ঝাপিয়ে পড়েছো। আমি বলেছিলাম মানুষের পূর্বপুরুষ বানর, তোমরা বিশ্বাস করেছো। আজ আমার করার কিছু নেই। কারণ তোমরা যখন সীমালঙ্গন করতে তখন আমি তোমাদের সাথে থাকতামনা। তোমরা কি কোরআন পড়োনি, যেখানে আল্লাহ বলেছেন-” এদের তুলনা হচ্ছে শয়তানের মত, শয়তান এসে যখন মানুষকে বলে আল্লাহকে অস্বীকার করো, অতঃপর (সত্যি) যখন সে (আল্লাহকে) অস্বীকার করে তখন (মুহুর্তেই) সে (বোল পাল্টে ফেলে এবং) বলে আমার সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি (নিজে) সৃষ্টিলোকের প্রভু আল্লাহপাককে ভয় করি। অতঃপর (শয়তান ও তার অনুসারী) এ দু’জনের পরিণাম হবে দোজখ, সেখানেই তারা চিরদিন থাকবে, আর এটাই হচ্ছে অত্যাচারীদের শাস্তি!”( হাশর-১৬-১৭)
এক লোক খুব পরহেজগার ছিলেন। মৃত্যুর সময় অচেতন পড়েছিলেন। শুধু আজান হওয়ার সাথে চোখ খুলতেন তারপর ইশারায় নামাজ পড়ার চেষ্টা করতেন। তিনি সারাজীবন হাতে তসবি গুনতেন। মৃত্যুর সময় দেখলাম তার বৃদ্ধাঙ্গুলি কনিষ্টাংগুলির সাথে লেগে আছে। বুঝলাম তিনি তসবি পড়তে পড়তেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। এমন মানুষও আছে যাদের মগজে শুধু জায়গা জমি আর ধনসম্পদের মহব্বত। তারা মৃত্যুর সময় টাকা পয়সা এবং ব্যাংক ব্যালেন্স এর কথা ভাবতে ভাবতেই পরপারে পাড়ি জমায়। তারপর? শেষ কথাটা কোরআনের বানী দিয়েই শেষ করছি। আল্লাহ বলেন-” তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা (দুনিয়ার ফাঁদে পড়ে) আল্লাহকে ভুলে গেছে এবং এর ফলে আল্লাহপাকও তাদের (নিজ নিজ অবস্থা) ভুলিয়ে দিয়েছেন, এরা হচ্ছে নাফরমান। দোজখের অধিবাসী ও বেহেসতের অধিবাসীরা কখনো এক হতে পারেনা। বেহেশতবাসীরাই সফলকাম”। (হাশর- ১৯-২০)।
জয়নাল আবেদীন জুয়েল, লেখক, ছড়াকার ও কলামিস্ট।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ