রায়হান হত্যাকান্ড: মোটা দাগে যত প্রশ্ন

প্রকাশিত: ১০:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২০

রায়হান হত্যাকান্ড: মোটা দাগে যত প্রশ্ন

মঙ্গলবার ♦ ২৭ অক্টোবর♦ ২০২০◊  সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী থানাধীন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশী নির্যাতনে রায়হান নিহত হবার আজ ১৭ দিন অতিক্রান্ত। ১৭ দিনেও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি রাষ্ট্রের কোন সংস্থা। গ্রেফতার তো দুরে, তার অবস্থানেরও সন্ধান নেই। অথবা সন্ধান প্রকাশ করা হচ্ছেনা। কাজের কাজ দুই পুলিশ কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুনুর রশীদ এবং রায়হানকে ছিনতাইকারী হিসেবে অভিযোগকারী সাইদুর রহমান নামে একজন গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই)। আইন শৃংখলা বাহিনীর সব কটি সংস্থা রায়হান হত্যাকান্ডে মুখ খুলতে নারাজ। অপরদিকে সরকারের একাধিক মন্ত্রী মন্তব্য বক্তব্য দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন রায়হান হত্যার প্রধান অভিযুক্ত শীঘগীরই গ্রেফতার হবে। অপরদিকে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০ অক্টোবর সিলেট সফরে গিয়ে পুলিশের পক্ষে সাফাই দেন। সাংবাদিকদের দোষ দেন। পুলিশের নানা অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে সাংাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানতে চান ‘ আপনী কি ফেরেশেতা? আপনার সাথের সবাই কি ফেরেশতা?’- পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে বিক্ষুব্ধ সিলেটের সাংবাদিকরা। আমাদের প্রশ্ন আইনশৃংখলা বাহিনী ও সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীবর্গ কি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন?

১০ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার নেহারী পাড়ার যুবক রায়হানকে ধরে আনে বন্দরবাজার পুলিশ। মধ্যরাতে ফাঁড়িতে চালায় নির্মম নির্যাতন। পুলিশের বুটের চাপে রায়হানের নাড়ি ভুড়ি দলিথ মথিত হয়ে যায়। বুকের পাঁজর ভেক্সেগ যায়। হাতের নখ প্লাস দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়। হাতের কনুই ভেঙ্গে দেয়া হয়। আঘাতে ক্ষত বিক্ষত রায়হানের পা থেতলে দেয়া হয়। পায়ের রগ ছিঁেড়ে ফেলা হয়। এটা রায়হানের মরদেহের সুরতহাল। ময়না তদন্তের রিপোর্টে এসেছে ভোতা অস্ত্রের ১১১ টি আঘাতে রায়হানের মৃত্যু ঘটেছে। ১১ অক্টোবর সকালে রায়হানের মৃত্যুও পরপরই পুলিশ প্রচার করে রায়হান একজন ছিনতাইকারী, গণপিটুনীতে আহত অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে, পরে তার মৃত্যু হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, রায়হানের শরীরের আঘাতের চিহ্ন আর ময়না তদন্ত রিপোর্ট কি প্রমাণ করে এটা গণপিটুনী?

১২ অক্টোবর পুলিশের তদন্তে বন্দর বাজার ফাঁড়ি পুলিশের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেল। বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকর হোসেন ভূইয়া সহ ৪ পুলিশকে বরখাস্ত ও ৩জনকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এর পরদিন থেকে এসআই আকবর লাপাত্তা। এসএমপি’র কর্তাদের রহস্যজনক ভূমিকা ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ করে দেয়? আমাদের প্রশ্ন , এসআই আকবর সহ অন্যান্যদের কেন সেদিনই গ্রেফতার করা হয়নি?

পিআিই’র হাতে মামলা হস্তান্তরের পর বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। বিশেষ করে সিসিটিভির হার্ডডিস্ক বদলে ফেলার ঘটনায় পুলিশ সদস্য হাসান উদ্দিন ও সাংবাদিক আব্দুল্লা আল নোমানের নাম আসে। হাসান উদ্দিনকে বরখাস্ত করা হলো, গ্রেফতার করা হচ্ছেনা,সাংবাদিক নোমানকে খুঁজে পাচ্ছেনা। মাহমুদুর রহমান, আবুল আসাদ, রুহুল আমীন গাজী, শফিকুল ইসলাম কাজলের মত সাংবাদিকদের গ্রেফতার করতে আমাদের আইন শৃংখলা বাহিনা বাহাদুরি দেখাতে পারে। আর কোম্পানীগঞ্জের নামধারী ঐ সাংবাদিককে খুঁজে পায়না। শুনতে ভাল লাগে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেফতারে আইন শৃংখলা বাহিনী কি আন্তরিক?

রায়হান ধরে আনতে দুটি অটোরিকশা(সিএনজি) ব্যবহার করা হয়। এর একজন চালক গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন রায়হানকে কাস্টঘর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাস্টঘরের সুলাইল নামের এক পরিচ্ছনতাকর্মীও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কথা বলছেন। যে ঘর থেকে রায়হানকে ধরে আনা হয়েছে তা দেখাচ্ছেন। অথচ আশপাশের কোন দোকানদার বা দায়িত্শীল কেউ এমন কথা বলছেন না। নেহারী পাড়ার রায়হান কাস্টঘরে কেমনে এলো? কাস্টঘর এলাকায় মদ কেনা বেঁচা হয়। মদ্যপরা এখানে যাতায়াত করেন। পুলিশ রায়হানকে মদ্যপ , চরিত্রহীন হিসেবে চিহ্নিত করবার লক্ষ্যে কি ্এই স্থান বেছে নিয়েছে? অটোরিকশা (সিএনজি) চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলাইল কি সঠিক বক্তব্য দিচ্ছেন না কারো শিখানো বুলি আওড়াচ্ছেন ? তাদের বক্তব্য সঠিক হলে তারা হতে পারেন এ মামলার রাজ সাক্ষী। আমরা জানতে চাই, অটোরিকশা(সিএনজি) চালক ও সুলাইল (পরিচ্ছনতাকর্মী) কে কেন আটক বা হেফাজতে নেয়া হচ্ছেনা?

রায়হানের পরিবারের ভাষ্যমতে বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকে মোবাইল কল করেছিলেন রায়হান। ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে। রায়হান তিন হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন তার চাচাকে। বাদ ফজর তিনি ফাঁড়িতে আসলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে ১০টার দিকে আসতে বলেন ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ। রায়হান ০১৭৮৩৫৬১১১১ নাম্বার থেকে কল দিয়েিেছলেন। জানা গেছে ঐ মোবাইল ছিল পুলিশ সদস্য তৌহিদের। তৌহিদকেও বরখাস্ত করা হলো, আইনের আওতায় আনা হলো না। মোটা দাগে আরেকটি প্রশ্ন জাগে, ৩ বা ১০ হাজার টাকার জন্য কি আকবর খুন করলো রায়হানকে? না নেপথ্যে কোন কারণ রয়েছে। পুলিশ বলছে সব ক্লু তাদের কাছে আছে। তাহলে আমরা জানতে চাই, রায়হান হত্যার নেপথ্যে কারা? এটা কি কন্টাক্ট কিলিং?

আমরা শুরুতেই বলেছিলাম ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রায়হান হত্যাকান্ড। ১৭ দিনে তা-ই প্রমাণ হচ্ছে। এসএমপি কমিশনারকে বদলি করা হলো। কোতোয়ালী থানার ওসির ছুটি বাড়ানো হলো। হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাবার পরও আকবরকে আসামী করা হচ্ছেনা। বরখাস্ত ও প্রত্যাহার করে নেয়া অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার দেখানো হচ্ছেনা। অদৃশ্য কোন্ সুতোর টানে চলছে রায়হান হত্যাকান্ডের তদন্ত। আমরা এ অবস্থার উত্তরণ চাই। দ্রুত সুস্টু তদন্ত সাপেক্ষে দৃশ্য, অদৃশ্য সকল হত্যাকারী, নেপথ্য কুশীলব সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবী জানাই।

আমরা শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সমবেদনা জানাই একজন মায়ের প্রতি। সেই ১১ অক্টোবর থেকে তিনি আর্তনাদ করছেন। বিলাপ করছেন। সন্তান হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবী করছেন, বিচার প্রার্থনা করছেন। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তাঁর। তিনি নিহত রায়হানের মা। সালমা বেগম। তিনি এখন শুধু রায়হানের মা নন, তিনি সিলেট মাতা’য় রুপ লাভ করেছেন। আমরা এই মায়ের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করছি। সিলেটবাসীর প্রতি গোটা জাতির প্রতি আহবান জানাই, আসুন রায়হান হত্যাকারীদেও সুষ্ঠু বিচারের আন্দোলনে শামিল হোন। একটি শান্তি সুখের নিরাপদ বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে সোচ্চার হোন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন।
আমরা স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি চাই। রায়হান হত্যার বিচার চাই।

কবীর আহমদ সোহেল, সম্পাদক, প্রভাতবেলা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 67
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ