লেখক আহবাব চৌধুরী খোকন এবং তার `কালের ভাবনা ‘

প্রকাশিত: ৫:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২০

লেখক আহবাব চৌধুরী খোকন এবং তার `কালের ভাবনা ‘

♦এমদাদ চৌধুরী দীপু, নিউইয়র্ক♦
যুক্তরাস্ট্রে বাংলা যে সব পত্রিকা প্রকাশ হয় সেই সব সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখকদের একজন এখন আহবাব চৌধুরী খোকন। ছোটবেলা থেকে লেখালেখীর যে চর্চ্চা সেটি অব্যাহত আছে এবং ইতিমধ্যে কালের ভাবনা নামে ্একটি বই নানা মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে,দিয়েছে লেখক খ্যাতি। বইটি আমি পড়েছি। মনে হলো বইটি নিয়ে একটা পর্যালোচনা তুলে ধরা দরকার। লেখক পরিচয়ের বাইরে আহবাবের পরিচয় দেশে-প্রবাসে একজন সফল সংগঠক হিসাবে, যুক্তরাস্ট্রের শীর্ষ দুই সংগঠন জালালাবাদ এ্যাসোসিয়েশনের,বাংলাদেশ-আমেরিকা কালচারাল এ্যাসোসিয়েশন এর শীর্ষনেতা তিনি। যুক্তরাস্ট্রের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটর প্রথম সারির নেতাদের একজন আহবাব।
সমাজকর্মী,সংবাদকর্মী,ভালো উপস্থাপক,রাজনৈতিক নেতা। সব পরিচয় এর বাইরে আমার কাছে যেটি বড় পরিচয় সেটি হলো আমার ভালো একজন বন্ধু সর্পোপরী একজন ভালো মানুষ।
আমি বইটির বিষয়ের আলোকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করতে পারি।এতে আমার জন্য সুবিধা হবে,আবার বইটি নিয়ে পাঠকের আগ্রহ সৃস্টি হতে পারে। সব পাঠক সব বিষয় পড়তে আগ্রহী নয়,তাই বইয়ের বিষয় বস্তু তুলে ধরলে বইটি সংগ্রহে রাখার এবং পড়ার জন্য অনেকে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন বলে আমি আশাবাদী।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে যার জন্ম এবং বেড়ে উঠা,নৌকায় করে স্কুলে যাওয়া,কুশিয়ারা নদীর ¯্রােত দেখা,পাহাড়ের মিতালী, বাড়ির পাশেই এশিয়ার বৃহৎ হাকালুকি হাওরের বিশালতা,আর ছোট্ট একটি উপজেলায় শিল্প-কারখানার মানুষের বসবাস আহবাবকে বানিয়েছে কথা শিল্পী।
কিশোর বয়সেই লেখার সাথে প্রেম হয়ে যায় তার,নেশা কিংবা পেশায় জড়িয়ে যায় এক সময় কাগজ-কলম আর এখন হাতের আঙ্গুল আর মোবইলে স্ক্রিন অথবা কম্পিউটার।
ফেঞ্চুগঞ্জ ছেড়ে আহবাবের কর্মস্থল এখন বিশ্বের রাজধানী নিউইয়র্ক এর ম্যানহাটনের টাইম স্কয়ারের কাছে। তবে আহবাবের ভাবনায় রয়েছে মাটি,মানুষ,হাওর,খাল,নদী,শৈশব,কৈশর,শিক্ষক,সহপাটি আর প্রিয় ক্যাম্পাসগুলোর স্মৃতি। এগুলো নিয়ে তার ভাবনার প্রকাশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। কখনো সাময়িকীতে,কখনো পত্রিকার পাতায়,কখনো স্মরণিকায়। পথচলায় যে সব বরেণ্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন আহবাব তাদের নিয়ে রয়েছে কিছু লেখা,ভ্রমন থেকে ফিরে আহবাব লিখেছেন স্মৃতিকথা,লিখনীতে রয়েছে সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ,আছে প্রিয়জন হারানোর অনুভ’তি বিষয়ক কিছু কলাম।
স্মৃতি রোমন্থন বিষয়কঃ শিরোনাম গুলো হচ্ছে মুছে যাওয়া স্মৃতিময় দিন,এমনতো হবার কথা ছিলনা,স্কুলের সেই নানা রঙ্গের দিনগুলো,কাশেম আলী মডেল হাই স্কুল শতাব্দীর মহীরুহ শিক্ষা প্রতিস্টান,স্মৃতিতে কাশেম আলী স্কুল,ব্যতিত অন্তর,বিপিএল স্কুলের দিনগুলো।
ভ্রমন বিষয়কঃ মক্কা-মদীনার স্মরণীয় দিনগুলো,কাতারের পথে পথে,আমার দেখা নায়াগ্রা ফলস।
স্বজন হারানো নিয়ে লেখাঃ আপন মানুষ,চলে গেলেন জাহেদ-নাজমুল,স্মৃতির আয়নায় কিছু মুখ।
বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লেখাঃ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জ্ঞানের বাতিঘর,শাহ আব্দুল করিম বাউল সঙ্গিতের কিংবদন্তি,চিরভাস্বর ওসমানী,সাইফুর রহমানকে যেমন দেখেছি,একজন গোলাম রহমান,কবি দেলওয়ার এবং তার সাহিত্যকর্ম।
বিভিন্ন দিবস নিয়ে লেখনীঃ এসো হে বৈশাখ,মার্চের আহŸান,শহীদ দিবস অমর হোক,খোশ আমদেদ মাহে রমজান,বিজয় দিবসের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি,ব্রংকসে পিঠা উৎসবে ফোটে উঠে শ্বাসত বাংলার রুপ,মে দিবসের প্রত্যাশা,আলবেনীতে বাংলাদেশ ডে,ঈদ প্রবাসে ও স্বদেশে।
সম-সাময়িক প্রসঙ্গঃ ভেজাল খাদ্য,সড়ক দূর্ঘটনা,বঞ্চিত মানুষের সহপাটি,সমকালীন প্রসঙ্গ,সমস্যা জর্জরিত পর্যটন শিল্প,বাংলাদেশের সম্ভানাময় ক্ষুদ্রশিল্প,মাধবকুন্ড চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র,রাজনীতি ঃ নির্বাচনের সাতকাহন,প্রবাসে পরবাসী।
কালের ভাবনা বইটির আকর্ষনীয় প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর,বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন বরেণ্য সাংবাদিক দৈনিক মানব জমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী,গুরুত্ব বাড়িয়ে বইকে এবং বইয়ের লেখককে সম্মানিত করেছেন মতিউর রহমান চৌধুরী,একজন লেখকের কাছে তার বই সন্তানতুল্য আর সে বইটির প্রকাশনা অনুস্টানে সাবেক ঢাবি ভিসি মরহুম এমাজ উদ্দিনের উপস্থিতি আহবাবকে এবং কালেরভাবনা বইকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা এবং লেখা অব্যাহত রাখার প্রেরণা। ১৬০ পৃস্টার মান সম্মত এই বইটির মুদ্রণ প্রতিস্টান ৮১/১ নয়াপল্টন ঢাকার সানজানা প্রিন্টার্স। সবমিলে ৩৭টি বিষয় শোভিত আহবাব চৌধুরীর প্রথম বই, একটি অনবদ্য সূচনা বলে আমি বিশ্বাস করি।
বইটির বিষয়বস্তুর বহুমাত্রিকতা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। যে কোন ধরনের পাঠককে এটি আনন্দ দেবে।
আহবাবের জীবনে স্মরনীয় দিন তার বড় ভাগনা বাবুকে হারানো,বাবুর মৃত্যুর পর যে স্মরণীকা বের হয় আমি সেটি দেখেছি,বেচে আছো হৃদয়ে”এই শিরোনামে ভাগনা ফয়সল আবিদ খান বাবুকে নিয়ে ১৯৯৫ সালের ১৫জুনের লেখা সংরক্ষন করে বইয়ে স্থান দেয়া হয়েছে। লেখার প্রতি কতটুকু আবেগ আর দরদ থাকলে এটি হয়। আপন মানুষ শিরোনামের লেখাটিও একটি অপ্রত্যাশিত মৃত্যু নিয়ে লেখা। বিদেশে বসে দেশে কারো মৃত্যু সংবাদ অনেক কস্ট দেয়,প্রবাস জীবনে মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর অনুভুতি নিয়ে আরেকটি লেখা মুছে যাওয়া স্মৃতিময় দিন।
মুছে যাওয়া দিনের স্মৃতি আকড়ে থাকার নাম প্রবাস জীবন,আর এই জীবনে স্বজন,সতীর্থের মত্যুর খবর দেশ থেকে আসলে যে অনুভুতি হয় তারই প্রকাশ এসব লেখা,লেখাগুলো সংশ্লিস্টদের স্মৃতির জগতে নিয়ে যাবে।এছাড়া চলে গেলেন জাহেদ-নাজমুল,স্মৃতির আয়নায় কিছু মুখ,সবই অভিবাসী মনের আবেগ-উপাখ্যানের প্রকাশ আর অতীত স্মৃতির বর্ণনায় ভরপুর।
কর্মময় জীবনে মানুষ বার বার যে স্থানটিতে ফিরে যেতে চায় সেটি তার প্রিয় ক্যাম্পাস জীবন। মনের সব রং দিয়ে আহবাব স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি গ্রন্থনা করেছেন বইটিতে,সে তালিকায় রয়েছে কাশেম আলী স্কুল এবং বিপিএল স্কুলের সহপাঠি, শিক্ষকদের তথ্য সমৃদ্ব কিছু লেখা।
লেখক এবং সংবাদকর্মী হিসেবে আহবাবের একটা অনিসন্ধিতসু মন আছে। যার কারনে ভ্রমনের লেখাগুলোতে রয়েছে নানা তথ্য,এবং সেখানে বাংলাদেশীদের চিত্র। মক্কা-মদীনার স্মরনীয় দিনগুলো,কিংবা কাতারের পথে পথে,কিংবা নায়াগ্রাফলস এসব বিষয় নিয়ে লেখা পড়লে সেসব এলাকার সুন্দর একটা চিত্রায়ন পাওয়া যাবে,নানা তথ্য উপাত্তের মিশ্রন রয়েছে সবগুলো বিষয়ে।
বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি,প্রবাসে যারা তাদেরকে স্মরন করতে চান এটি তাদের জন্য বড় একটা সংগ্রহ হবে। কারন আহবাবের বইয়ে তাদের সাথে শুধু স্মৃতিচারন নিয়ে লেখা হয়নি, আছে ইতিহাস,নানা অজানা তথ্য,রেফারেন্স বই হিসেবে অনেকে ব্যবহার এর সুযোগ রয়েছে কালের ভাবনা বইয়ের ব্যক্তিত্বদের ইতিহাস। একজন শক্তিমান লেখক পাঠকের প্রশংসা পাওয়ার জন্য যে শ্রম দিয়ে থাকেন আহবাবের লেখায় সেটির কমতি আমার মনে হয়নি। প্রবাসের প্রজন্মের কাছে এই বই সংগ্রহে রাখার মত,সাহায্য পাওয়ার মত।
সংবাদপত্রে বিভিন্ন দিবসের উপর লেখনী বেশ গুরুত্বপূর্ন।এ ব্যাপারে যে কোন প্রচারমাধ্যম কালের ভাবনা বইয়ে আহবাবের সমৃদ্ব লেখার উপর ভরসা করতে পারেন। এই প্রবাসে বাংলাদেশীরা কিভাবে বিভিন্ন দিবস উদযাপন করেন
সে সব বিষয়ে সুন্দর বর্ননা রয়েছে। বৈশাখ নিয়ে,পিঠা উৎসব নিয়ে লেখা আমি পড়েছি,ভালো লেগেছে । পাঠকদের এগুলো ভালো লাগবে। আছে আলবেনীতে বাংলাদেশ ডে পালনের বর্ননা। ঈদ,নববর্ষ,রমজান,জাতীয় দিবস,লেখাগুলোতে বৈচিত্র আছে।
সমসাময়িক প্রসঙ্গ এবং রাজনীতি নিয়ে লেখায় রয়েছে অনেক বিশ্লেষন,দেশ-আর প্রবাসের প্রেক্ষাপটে ভেজাল খাবার,সড়ক দূর্ঘটনা,পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা,মাধবকুন্ডের পর্যটন সম্ভাবনা ইত্যাদি লেখনী নিঃসন্দেহে বিভিন্ন বার্তা বহন করবে,আহবাব চৌধুরী এসব বিষয় নিয়ে তার ভাবনা তুলে ধরেছেন অভিজ্ঞতার নিরিখে,এতে মন্তব্য আছে,পরামর্শ আছে। এখানকার পরিবেশ আর বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা আছে এসব লেখনীতে। প্রবাসে থাকলেও মাটি,মানুষ,আর স্বজনদের ভুলে থাকা যায়না,তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবার এবং বিবেকের দায় থেকে কথা বলার তাগিদ অনুভুত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারনে এখন দ্রæত সবখানে লেখা পাঠানের একটা সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের কিছু সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যে গুলো আমাদের উদ্বেগ বাড়ায় সে সব বিষয় নিয়ে আহবাব চৌধুরীর নতুন-পুরাতন লেখা স্থান পেয়েছে নানা শিরোনামে।
তিন দশক থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত আহŸাব চৌধুরীর ছাত্ররাজনীতির জীবন,সাংবাদিকতা জীবন,প্রবাস জীবন,কমিউনিটি লীডার জীবন,নানা অভিজ্ঞতা আর পরিচয়ে সমৃদ্ব। ফলে এসব লেখনী তার কাছে স্মৃতির বাগান।
আমার আবেদন থাকবে বইটি পড়–ন,অন্যকে পড়তে বলুন। নিঃসন্দেহে বইটি আপনার জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা সমৃদ্ব করবে। নিজে কিনবেন অন্যকে কিনতে উৎসাহিত করবেন।
দারুন ভাবে উৎসাহিত এবং অনুপ্রানিত আহবাব আরো একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নিচ্ছেন। আমি তার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তার এই প্রয়াস অব্যাহত থাকুক। লেখক আহবাব এর জন্য শুভ কামনা,পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠবে বইটি এই কামনার পাশাপাশি বইটির ব্যাপক প্রচার –প্রসারসহ বেস্ট সেইল তালিকায় থাকবে বলে আশা করি, সংশ্লিস্ট সবার সহযোগিতা কামনা করি।

 

 

 

 

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 7
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ