লো ব্লড প্রেসার হলে কী করবেন?

প্রকাশিত: ১০:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৩

লো ব্লড প্রেসার হলে কী করবেন?
কিছুদিন আগের কথা। আমার এক সাংবাদিক সহকর্মীর সাথে দেখা। তিনি বললেন শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে। তাকে নিয়ে আসলাম চেম্বারে। আসার পথে জানালেন তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। কয়েকদিনের মধ্যে বাচ্চা হবার তারিখ, কিন্তু বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছে। তার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ আমি খেয়াল করলেও তিনি নিজেকে এটা নিয়ে চিন্তিত নয় বলে প্রকাশ করার চেষ্টা করলেন, কিছুটা উৎফুল্লভাবও দেখালেন। তবে আমার পেশাদারী সাংবাদিকতা ও চিকিৎক চোখ তার দুশ্চিন্তা এড়িয়ে গেল না। আমার কাছে মনে হলো তার ব্লাড প্রেসার কমে গিয়েছে। তবে তিনি তা মানতে নারাজ কারণ তার বক্তব্য তিনি কোনো দুশ্চিন্তা করেন না আর বেশি চিন্তা থেকে হাই ব্লাড প্রেসার হয় লো হওয়ার তো কথাই না। কিন্তু আমি জানি লো ব্লাড প্রেসারের সবচেয়ে বড়ো একটি কারণ হলো দুশ্চিন্তা। অবশেষে তার প্রেসার মাপলাম এবং যথারীতি অনেক লো ব্লাড প্রেসার পেলাম। যেহেতু আমি হোমিওপ্যাথি চর্চা করি তাই তাকে সেই অনুযায়ী লক্ষণ অনুপাতে হোমিও ওষুধ দিলাম। তাকে বিদায় দেওয়ার পর একটা ব্যাপার মাথায় এলো। এরপর নিজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন জার্নাল ঘেটে ব্লাড প্রেসার নিয়ে কিছু তথ্য উপাত্ত নোট করলাম এবং কিছু নির্দেশনাও তৈরি করলাম।

 

আমাদের সমাজে উচ্চ রক্তচাপ (হাই ব্লাড প্রেসার) নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। কিন্তু এর তুলনায় নিম্ন রক্তচাপ (লো ব্লাড প্রেসার) নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না বললেই চলে। যা আমার এই সহকর্মীর সাথে অভিজ্ঞতাও বলে। কিন্তু এই সমস্যাটি অবহেলার সুযোগ নেই। লো ব্লাড প্রেসারকে হাইপোটেনশনও বলা হয়। সমস্যাটি অস্বস্তিকর উপসর্গ সৃষ্টি করে। এমনকি এটি জীবননাশেরও কারণ হতে পারে।

 

ব্লাড প্রেসারের রিডিং ৯০-৬০ থেকে ১২০-৮০ এর মধ্যে থাকলে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ব্লাড প্রেসারের রিডিং ৯০/৬০ এর কম হলে সেটি হাইপোটেনশন হিসেবে ধরা হয়। এটি ধীরে ধীরে হার্টের কার্যক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। যে কারণে আপনার ব্লাড প্রেসারের রিডিং ৯০-৬০ এর কম দেখালে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ।

আরও পড়ুন  ত্রিশের পর মা হতে চান?
বিছানায় দীর্ঘ বিশ্রাম, শারীরিক পানিশূন্যতা, সংক্রমণ, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, গর্ভাবস্থা ও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে। সমস্যাটির উল্লেখযোগ্য উপসর্গ হলো- মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, মনোযোগে সমস্যা, বমিভাব, ক্লান্তি, অলসতা, বুক ধড়ফড় এবং শ্বাসক্রিয়া ধীর বা কঠিন হওয়া। প্রেসার কমে গেলে তা বাড়াতে হয়। এখানে ব্লাড প্রেসার বাড়ানোর কিছু উপায় দেওয়া হলো।

 

 

পরিমাণ মেনে লবণ খান:

আমাদের শরীরে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন প্রয়োজনের চেয়ে কম লবণ খেলে ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে। আবার বেশি লবণ খাওয়াও উচিত নয়। আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস এক গবেষণায় বলছে, দৈনিক ২,৩০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে অথবা হাইপোটেনশনের উপসর্গে ভুগলে খাবারে লবণ বাড়িয়ে উপকার পেতে পারেন। ব্লাড প্রেসার বাড়াতে স্পোর্টস ড্রিংক, খাবার স্যালাইন অথবা সোডিয়াম-সুগার-পটাশিয়াম রয়েছে এমন পানীয় পান করতে পারেন।

 

অল্প অল্প খাবার খান:

কিছু লোকের বেশি করে কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ করে দ্রুত রক্তচাপ কমে যেতে পারে। বিষয়টি পোস্টপ্রান্ডিয়াল হাইপোটেনশন নামে পরিচিত। এটি লো ব্লাড প্রেসারের একটি ধরন, যা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের ক্যাটাগরিতে পড়ে। এ ধরনের লো ব্লাড প্রেসারের একটি কার্যকরী চিকিৎসা হলো, সারাদিন অল্প অল্প করে লো কার্বোহাইড্রেটের খাবার খাওয়া। এছাড়া একবেলা থেকে অন্যবেলার খাবারের মাঝখানে স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খাওয়ার চেষ্টা করুন। সারকথা হলো- যদি বুঝতে পারেন যে বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়ার পর ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে ঘন ঘন অল্প অল্প খাবার খেতে হবে।

 

ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করুন:

বসা বা শোয়া থেকে দাঁড়ানোর পর মাথা ঘুরলে, ঝাপসা দেখলে অথবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন মনে হলে এটি সম্ভবত অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন। ডা. জেলবম্যানের মতে, এসব উপসর্গ প্রতিরোধের একটি উপায় হলো অবস্থানের পরিবর্তন ধীরে ধীরে করা। শোয়া থেকে দ্রু বসবেন না বা দাঁড়াবেন না। প্রথমে বিছানায় পা রেখে ধীরে ধীরে বসুন। এভাবে ৬০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। তারপর বিছানা থেকে পা নামিয়ে এক-দুই মিনিট বসে থাকুন। অতঃপর ধীরে ধীরে দাঁড়ান।

আরও পড়ুন  রাজধানীর ১৪ হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ

 

অতিরিক্ত বালিশের ব্যবহার:

লো ব্লাড প্রেসার প্রতিরোধের একটি সেরা উপায় হলো অতিরিক্ত বালিশের ব্যবহার। ডা. জেলবম্যান বলেন, ‘একটি বালিশের ওপর আরেকটি বালিশ রেখে ঘুমালে মাথার অবস্থান হার্ট লেভেলের ওপরে থাকে। এটা মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব প্রতিহত করতে সাহায্য করে।

 

কফি বা পানি পান:

বিশ্বাস করুন অথবা না করুন, এককাপ কফি পান করেই ব্লাড প্রেসার বাড়াতে পারবেন। অথবা এর পরিবর্তে কোলা বা ক্যাফেইনেটেড টি পান করেও একই উপকার পেতে পারেন। গবেষণা অনুসারে, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় রক্তচাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অনেক হাইপোটেনশন এপিসোডের কারণ হলো শারীরিক পানিশূন্যতা। তাই লো ব্লাড প্রেসার এড়াতে প্রচুর পানি পানের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। পানি পানের পরিমাণ বাড়ালে অথবা ডাবের পানির মতো ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় পানে ব্লাড প্রেসার দ্রুত বাড়বে এবং ভবিষ্যতে হাইপোটেনশন প্রতিরোধ হবে।

 

কাঁচি কৌশল:

যদি উপসর্গ দেখে বুঝতে পারেন হাইপোটেনশন হয়েছে, তাহলে ব্লাড প্রেসার দ্রুত বাড়াতে কাঁচি কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। প্রথমে উরুদ্বয় ক্রস করে কাঁচির মতো করুন, তারপর এ অবস্থায় চেপে ধরুন। এটা ডা. জেলবম্যানের পরামর্শ। এছাড়া সমতলে শুয়ে গোড়ালিদ্বয় কিছুর ওপর রেখে হার্ট লেভেলের ওপর তুললেও ব্লাড প্রেসার বাড়বে।

 

কিছু পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন:

জেনে রাখুন, মানসিক অবস্থার অবনতিও ব্লাড প্রেসার কমাতে পারে। অমূলক ভয়ভীতি, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও অন্যান্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে টেম্পোরারি হাইপোটেনশন হতে পারে। তাই ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে জটিল পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন বিষয়ে নিজেকে না জড়ানোই ভালো।

 

লেখক: (মুনশী ইকবাল) সাংবাদিক, চিকিৎসক। চিফ কনসালট্যান্ট, রয়েল হোমিও ক্লিনিক, সিলেট।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

সর্বশেষ সংবাদ