শুধু ধর্ষকদের নয়ঃ আশ্রয়দাতা,মদদদাতাদের বিচার করতে হবে

প্রকাশিত: ২:৪০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২০

শুধু ধর্ষকদের নয়ঃ আশ্রয়দাতা,মদদদাতাদের বিচার করতে হবে

সিলেট এম সি কলেজের ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার(২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায়। স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ছাত্রাবাসে নিয়ে ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের কতিপয় নরপশু। কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরতে যাওয়া এ দম্পত্তির জীবনে ঘটে যাওয়া এ পৈশাচিকতা আজ শুধু সিলেট কিংবা বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের ভার্চুয়াল মিডিয়ার আলোচিত বিষয়। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিহিত গুহ চৌধুরী বাবলা’র প্রতিবাদী ভূমিকায় এ ঘটনা আলোর মুখ দেখে। অন্যথায় সন্ধ্যার ঘটনা রাতের আধারেই মিলিয়ে যেত। বাবলা চৌধুরী খ্যাত এ যুবক তাঁর ব্যক্তি রাজনীতির স্বার্থে হোক কিংবা বিবেকের তাগিদে হোক প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা তাঁর ’এই’ ভূমিকার সাধুবাদ জানাই, ধন্যবাদ জানাই তাকে। যদিও তাঁর নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড ইতোমধ্যে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে এবং হচ্ছে।

গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণকারী ৬ ছাত্রলীগ ক্যাডারকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রত্যেককেই রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আইনশৃংখলাবাহিনী তাদের পেশাদারিত্ব যোগ্যতা দিয়ে এ ঘটনার নায়ক, খলনায়ক, কুশীলব সবার মুখোশ উন্মোচন করবে। নিয়ে আসবে বিচারের আওতায়- এ প্রত্যাশা ও দাবী আমাদের।

গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণকারী ৬ জনই ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। ৬ জনই এমসি কলেজের বর্তমান বা সদ্যপ্রাক্তন ছাত্র। তাদের বাবা –মা বা অভিভাবক তাদের সন্তানকে একটা স্বপ্ন নিয়ে এমসি কলেজে ভর্তি পাঠিয়েছিলেন। অবশ্যই ধর্ষক হবার জন্য নয়। এই ধর্ষণকারীরাও একটা স্বপ্ন, প্রত্যাশা নিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠে পা রেখেছিল। কাউকে ধর্ষণ করবার জন্য নয় নিশ্চয়। একদিনেই তারা এমন দু:সাহসী হয়ে উঠেনি যে, স্বামীর কাছ থেকে বউকে ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। এসব তরুণদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আশ্রয়, মদদ, সহযোগিতা দিয়ে চরিত্র বিনষ্ট করা হয়েছে। মানুষ গড়ার আঙ্গিনা থেকে অপরাধ রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যেতে যেতে তারা আজ ধর্ষণকারী, আসামী, কারান্তরীণ। তাদের প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র অনুকম্পা নেই। আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই সকল ধর্ষকদের। সে প্রত্যক্ষ ধর্ষক হোক আর পরোক্ষ ধর্ষক হোক।

গ্রেফতারকৃত ধর্ষক ও ছাত্রলীগের নামে বেনামে অপকর্মকারীদের প্রধান মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্তাবধায়ক (হোস্টেল সুপার) জামাল উদ্দিন। তাঁর বাংলোতেই বসবাস করতো গৃহবধূ গণধর্ষণের ১নং আসামী সাইফুর রহমান। অপরাপররাও ছাত্রবাসে অবস্থান করতো। রাতে মদ, জুয়া, নারীর আসর বসাতো। দিনেদুপুরে গরু , খাসি, মুরগী ছিনতাই করে এনে ভাগ বাটোয়ারা করতো। এর সবই হোস্টেল সুপার জানতেন। তিনি নিজে ভাগ পেতেন , অধ্যক্ষ সালেহ আহমদকেও পৌঁছে দিতেন। এমন তথ্য খোদ ছাত্রলীগের।

মেরুদন্ডহীন অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ। একই অঙ্গে বহুরুপ। নিজের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যমে। যদি কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজেকে অসহায় মনে করেন বা অসহায় হয়ে পড়েন তবে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। না হয় তিনি অসৎ, অনৈতিক উদ্যেশে পদ আঁকড়ে আছেন মনে করাই স্বাভাবিক। আর এটাকেই অযোগ্যতা বলে। অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ। করোনাকালীন সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে ছাত্রাবাসে থাকতে দিয়ে  অপরাধীদের আশকারা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সুযোগে ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তরা ছাত্রাবাসকে মদ ও জুয়ার আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলে । সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা অধ্যক্ষের মৌখিক অনুমতিতে ছাত্রাবাসকে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে এমন দাবী তাদের। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সালেহ আহমদ ছাত্রবাসের দায়িত্বে ছিলেন। সঙ্গত কারণে ছাত্রাবাসের সব বিষয় ছিল তার নখদর্পনে। ২০১২ সালের ৮ জুলাই শিবির হঠানোর নামে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় ছাত্রাবাস। প্রায় অর্ধশত কক্ষ ভস্মিভূত হয় তখন। প্রকৃত কোন বিচার বা প্রতিকার হয়নি তখন। অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠেনের সহবস্থান নিশ্চিত কল্পে কোন পদক্ষেপ নেননি। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস ছাড়া ৮ বছর থেকে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষ হওয়ার পর নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে তিনি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রাবাসে ধর্ষণকাণ্ডে জড়িতদের কয়েকজনের সঙ্গেও ‘ভালো সম্পর্ক’ ছিল অধ্যক্ষের এমন তথ্য ছাত্রলীগের নেতারাই জানান প্রভাতবেলাকে।

আমরা শুরু থেকেই বলছি কেবল ধর্ষক নয়, তাদের মদদদাতা, আশ্রয়দাতাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সে দৃষ্টিকোন থেকে অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ ও হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন কোন অবস্থাতেই বিচারের বাইরে থাকতে পারেন না। দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়ে অনতিবিলম্বে তাদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবী আমাদের।

আশার কথা উচ্চ আদালত এ মর্মে তিন সদস্যের একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দায়িত্বে অবহেলা, অযোগ্যতা ও অনৈতিকতার দায়ে কেন হোস্টেল সুপার ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবেনা তা জানতে চান উচ্চ আদালত। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন আমরা আশা করি।

প্রসঙ্গত: এম সি কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ উল্লেখ সিলেট জেলা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ এমসি কলেজের অদক্ষ, দায়িত্বহীন অধ্যক্ষ ও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের পদত্যাগ দাবি করেছেন। আমরা এ দাবীর সাথে জোর সহমত প্রকাশ করছি।

প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়দাতা মদদদাতার পাশাপাশি রাজনৈতিক গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। নিতে হবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। এটা এম সি কলেজের স্বার্থে, সিলেটবাসীর প্রয়োজনে এবং আওয়ামীলীগের বেঁচে থাকবার জন্য। আজকের লেখায় পরিসর বড় করতে চাইনা। শুধু এইটুকুই বলবো শুক্রবার রাতে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রনজিৎ সরকার ও যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের নাম এসেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের সকলে নগরীর টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগ পরিচয়ে চাঁদাবাজি, জায়গা দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মে ব্যবহূত হয়। কারা তাদের ব্যবহার করে, কারা তাদের গডফাদার। কারা টিলাগড়, গোপালঠিলা, আলুরতল, বালুচর, আরামবাগ এলাকার দন্ডমুন্ডের কর্তা তা প্রশাসনের জানা। আওয়ামীলীগের জানা। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখনই সময়। একটি শান্তিপূর্ণ নগরীর সুনাম ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখবার স্বার্থে।

এই গৃহবধূর ইজ্জতহানিই যেন হয় শেষ ইজ্জতহানি এই ক্যাম্পাসে, এই ছাত্রাবাসে, এই সিলেটে। আমরা এমন কলঙ্কজনক ঘটনার পূণরাবৃত্তি আর দেখতে চাইনা। শুধু রাষ্ট্র, প্রশাসন নয়। আমরা প্রত্যেক অভিভাবক, প্রত্যেক নাগরিক, প্রত্যেক তরুণ যুবক অন্যায় অপকর্ম অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। এ উদাত্ত আহবান আমাদের।

কবীর সোহেল♦ সম্পাদক- প্রভাতবেলা♦ ১.১০.১০

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 109
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ