সবকিছুতে গেল গেল সোর চিৎকার কাদের স্বার্থে ?

প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২০

সবকিছুতে গেল গেল সোর চিৎকার কাদের স্বার্থে ?

সবকিছুতে গেল গেল সোর চিৎকার ইদানিং অনেকটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে। পশ্চাদ-সম্মুখ কোনকিছু না ভেবেই কোন ঘটনা ঘটবার সাথে সাথেই শুরু হয় এইসব চিৎকার চেঁচামেচি। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে সমানতালে এই প্র্যাকটিস চলছে। গুটিকতেক অতি উৎসাহী মানুষকে সামনে দিয়ে পেছনে কলকাটি নাড়ে বিশেষ মহল। হাসিল করে নেয় নিজেদের ফায়দা। আর অতি উৎসাহীরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলেন আমাদের দাবী বাস্তবায়ন হয়েছে, আমাদের আন্দোলন সফল। এমন বক্তব্য বিবৃতির ফুলঝুরিতে।

কস্মিণকালেও তারা বুঝতে সক্ষম হয়না কিসের আন্দোলন, কিসের দাবী ? কার স্বার্থে বা কেন করা হয়েছে? অনেকটা পাহাড়ী টিলার শেয়ালের মত। এক টিলা থেকে শেয়াল ‘কে কে হুয়া’  ডাক দেবার সাথে সাথেই অপর টিলার শেয়ালগুলো তৎক্ষণাৎ একইভাবে কখনো আরো জোরে ডাক দেয় ‘কে কে হুয়া’ বলে। তাদের বুঝবার দরকার,ক্ষমতা বা ইচ্ছে থাকেনা। সোর উঠছে তাই দিয়েই যাই। এমনটা পশু পাখির ক্ষেত্রে হতেই পারে। কারণ এরা তো বিবেকহীন।

সিলেটে সম্প্রতিএই গেল গেল চিৎকার বেশ জোরে সোরেই চর্চা হচ্ছে। কুরবানীর পশুর হাট নিয়েই এই সোরগোল, চিৎকার, মানববন্ধন! স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সিলেট নগর এলাকায় তিনটি অস্থায়ী কুরবানীর পশুর হাট ঘোষণা করে। করোনা মহামারীতে ক্রেতা বিক্রেতা যাতে শারিরিক- সামজিক দুরত্ব বজায় রেখে পশু কেনাবেঁচা করতে পারেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারেন এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে যত্রতত্র পশুর হাট না বসিয়ে খোলা পরিসরে তিনটি মাঠে পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেন। মাঠ তিনটি হচ্ছে, সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠ, এমসি কলেজ মাঠ ও দক্ষিণ সুরমা ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন জায়গা বা মাঠ।

প্রশাসনের এ ঘোষণার সাথে সাথে প্রথমেই  চিৎকার উঠে আলিয়া মাদরাসা মাঠকে পশুর হাট ঘোষণার প্রতিবাদে। চিৎকারকারীদের বক্তব্য, পশুর হাট বসলে মাদরাসার ঐতিহ্য নস্ট হয়ে যাবে। মাদরাসার মাঠে ঈদ জামাত হয়- তার বিরুদ্ধে এটা একটা ষড়যন্ত্র। মাদরাসার পাশেই শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল যেটা সিলেটের করোনা চিকিৎসা কেন্দ্র। মাদরাসা মাঠ এই হাসপাতালের একেবারে কাছাকাছি। পশুর হাট বসালে করোনা চিকিৎসা ও রোগী ঝুঁকিতে পড়বে, সংক্রমণ বাড়বে। তাই এখানে পশুর হাট বসানো যাবেনা, বসাতে দেয়া হবেনা। প্রশাসন নমনীয় হয়ে গেল। মাদরাসা মাঠে পশুর হাট বসাতে প্রশাসন আর উদ্যোগী হলোনা। কিন্তু চিৎকারকারীরা জানলো না কেন এই চেঁচামেচি। পশুর হাট না বসাতে কার লাভ কার ক্ষতি।

আলিয়া মাদরাসা মাঠের পার্শ্ববর্তি শামসুদ্দিন হাসপাতাল। এখানে করোনা আইসোলেশন কেন্দ্র। পশুর হাট বসলে এখানকার রোগী ও চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটতো এটা ঠিক। শুধু এই দাবী ছাড়া বাকীসব ছিল মানুষকে হুজুগী করে তোলা। দুই সপ্তাহ পশুর হাট বসলে ঐতিহ্যের কী ক্ষতি হতো? ঐতিহ্য কী মামার বাড়ীর মোয়া যে হাত থেকে পড়লেই শেষ? আসল স্বার্থ হাসিল কাদের?

প্রথমত একটি মহল এখানে ঈদ জামাতের আয়োজন করে আসছে বিশেষ স্বার্থে। পশুর হাট বসলে মাঠটি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, তাদের এই উদ্বেগ।(যদিও এবার ঈদ জামাত মাঠে হবেনা)  তাই প্রতিবাদে তারা সম্মুখ সারিতে। আরেক শ্রেণী কায়েমী পশুর হাট যাদের। মাদরাসা মাঠে পশুর হাট বসলে তাদের ব্যবসার ক্ষতি তাই মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন। ফলাফল নিজের স্বার্থ হাসিল। স্বার্থান্বেষীরা সাধারণ জনতার পাশাপাশি মাদরাসার ছাত্রদেরও কাজে লাগালো। মাদরাসার ছাত্র সংসদের সাবেক নেতৃবৃন্দও ঐতিহ্য রক্ষার দাবী তুললেন , মানববন্ধন করলেন।

কিন্তু তারা মুসলিম জাতি সত্বার ঐতিহ্য কুরবানীকে সমুন্নত রাখবার কথা ভাবলেন না। তাঁরা বলতে পারলেন না, আমরা মাদরাসা ছাত্ররা এখানকার পশুর হাট নির্বিঘ্ন নিরাপদ রাখতে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো। কুরবানীর পশু ক্রয়-বিক্রয়ে আমরা(মাদরাসা ছাত্ররা) আমাদের শ্রম মেধার কুরবানী করবো। হ্যাঁ মাদরাসার মাঠকে ঈদ জামাতের নামাজের উপযুক্ত করে ফিরিয়ে দেবার দাবী তা করতেই পারতো। না শুধু ‘গেল গেল চিৎকার’। আর ‘হতে দেবনা’ এই দাবী, আন্দোলন।

এরপরে একইভাবে আন্দোলনের নামে মাঠে নামলো এমসি কলেজের কতিপয় ছাত্র ও শিক্ষক । এমসি কলেজের হাজার বছরের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। মাঠ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই এখানেও পশুর হাট বসতে দেয়া হবে না। এমসি কলেজের শত বর্ষের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাস জ্বলে পুড়ে ছারখার হলো, ঐতিহ্য রক্ষায় এদেরকে দেখা গেলোনা। কলেজ ক্যাম্পাসের গাছ বৃক্ষ নিধন হয়,জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন ঐতিহ্য যায়না। কলেজের পুকুরের মাছ দিনে দুপুরে লুটে নেয়া হয়। তখন প্রতিবাদী কাউকে দেখা যায়না। কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ছাত্রীকে কূপিয়ে হত্যাচেষ্টা করা হয়, ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। এসবে ঐতিহ্য কী যায়না? এসময় এই সব ছাত্র-শিক্ষকরা কোথায় থাকেন? শুধু পশুর হাটের প্রতিবাদে তারা সরব? এরাও সাধারণ ছাত্রছাত্রীর আবেগকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চান। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব তলিয়ে দেখবার সুযোগ পায়না। তাদেরকে এই চিন্তায় আলোকিত করা হয়না যে, আসো এমসি কলেজ মাঠের পশুর হাটকে দেশের সেরা স্বাস্থ্যবিধি পালনকারী হাট হিসেবে গড়ে তুলি। এমসি কলেজের ছাত্র-শিক্ষক মিলে মুসলমানের ঐতিহ্যবাহী কুরবানীকে সমুন্নত করে তুলি। কুরবানীর পশু কেনাবেচাকে আমরা নিরাপদ  করে তুলি। মহামারী করোনাকালে এটাই করা উচিত ছিল ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের।

এমসি কলেজ মাঠে পশুর হাট বসলে, যারা রাস্তাঘাটে কিংবা সড়কের মোড়ে হাট বসিয়ে পকেট ভারী করেন তাদের স্বার্থ হাসিলে কাজ না করাই ছিল তাদের নৈতিকতা।কিন্তু কতিপয় ছাত্র-শিক্ষক ‘ম্যানেজ’ হয়ে আন্দোলনে নামলেন।পশুর হাট বেপারীদের ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুঝালেন ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন।আসলে যেটা স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন।

আমরা, এসব অনৈতিকতার অবসান চাই। সাধারণ শিক্ষার্থী- সাধারণ জনতার প্রতি আহবান জানাই যেকোন কিছু গেল গেল এসব ক্ষেত্রে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নিন। আসাধু চক্রের ফায়দা হাসিলে ব্যবহৃত হবেন না।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 1
    Share

সর্বশেষ সংবাদ