সুনামগঞ্জ জেলাকে ‘বন্যাদুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করা হোক

প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

সুনামগঞ্জ জেলাকে ‘বন্যাদুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করা হোক

 

মোঃ আজিজুর রহমান:

সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ ও হাওরের রাজধানী অধ্যুষিত এলাকা সুনামগঞ্জ জেলা। এ জেলায় ১১টি উপজেলা, ৪ টি পৌরসভা, ১২ টি থানা, ৮৭ টি ইউনিয়ন, ২৮৮৭ টি গ্রাম, ৩৬ টি কলেজ, ২০৯ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯৭ টি মাদ্রাসা , ৮৫৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪ টি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২ টি সরকারি হাসপাতাল, ২২ টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৩০৮৩ টি মসজিদ, ৪৩০ টি মন্দির, ৯টি গীর্জা, ১১১টি ডাকঘর, ৯০ টি বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ও ৫ টি শিল্প কারখানা রয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলার আয়তন ৩৭৪৭.১৮ বর্গ কিঃ মিঃ এবং ২৪,৬৭৯৬৮(আদমশুমারী ২০১১) জন মানুষ বসবাস করে।

 

বৈশ্বিক করোনাভাইরাসে দেশ তথা সুনামগঞ্জ জেলাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৬ জন, আইসোলেশনে আছেন ৫৬৫ জন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন ৪১১ জন। এ ছাড়া প্রতিদিনও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

একদিকে করোনায় জর্জরিত, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যায় জেলাবাসীকে ফেলেছে চরম ভোগান্তিতে, এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র প্রতিচ্ছবি।

 

টানা দু’দিনের(রবি ও সোমবার)ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। সুরমা, চেলা, পিয়াইনসহ সকল নদ-নদীতে পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার অধিকাংশ বাড়ি-ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাসপাতাল, থানা, অফিস, পোষ্ট অফিস, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা, শিল্প কারখানা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ অফিস, বিভিন্ন দাপ্তরিক অফিস, মসজিদ, মন্দির ও বিভিন্ন বাজারের সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি হাওর ও খাল-বিলে থৈ থৈ করছে।পানি না কমলেও পানিবন্দি সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে।প্রায় সব সড়কই ৫ থেকে ১০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে।সাধারণ মানুষ সড়কের উপর দিয়ে নৌকায় যাতায়াত করছেন।ফলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ছাতক,তাহিরপুর,দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়াবাজার,জামালগঞ্জ ও সদর উপজেলার মানুষজন। জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, এই জেলার দুর্গতদের জন্য ১২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১২’শ পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৪১০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 

নদী দখলের কারণে বন্যার প্রকোপ প্রতিবছরই এ এলাকায় পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় লাখো মানুষ।কিন্তু এবারের বন্যা স্মরণকালের ভয়াবহ এবং সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের সামনে আবিভূত হয়েছে। বন্যার ভীষণতায় মানুষ শুধু আতঙ্কিত হয়নি,হয়ে পড়েছে হতবিহ্বল।নদীর পাড় ভেঙেছে, বৃক্ষ উপড়ে গেছে,রাস্তা ভেঙেছে,মাঠের পর মাঠ যেখানে ফলে সোনালী ফসল,সব ডুবে যায় বিশাল জলরাশির তলে।মনে হয় যেন দিগন্তজোড়া নদী,মাঝে মাঝে বাড়িগুলোকে দূর থেকে দেখে মনে হয় সমুদ্রের মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ।এ অবস্থায় মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই, প্রাণ বাঁচানোর মতো খাদ্য নেই,শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নেই,বিশুদ্ধ পানীয় জল নেই—-শুধু নেই আর নেই, যেন গগনবিদারী হাহাকার।

 

ভয়াবহ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে এ অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অত্যাধিক।অনেক ঘর- বাড়ি,পাকা রাস্তা ও কাঁচা রাস্তা ধ্বংস হয়েছে।গবাদিপশু ও মৎস খামারের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে।করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুরা বন্যার ধ্বংসলীলায় অনাহারে ও অর্ধাহারে জীবনযাপন করছে।বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া,আমাশয় ও উদরাময় রোগ দেখা দিতে পারে।গৃহহীন সাধারণ মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

 

ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও করোনায় অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের বড় অভাব।সরকারি সাহায্য সহযোগিতার নামে যে ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে তা খুব যথেষ্ট নয়।সুনামগঞ্জ জেলার বন্যাদুর্গত ও করোনায় কর্মহীন দিনমজুর মানুষের দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করার জন্য সমাজের বিত্তবান লোকদের নিকট অনুরোধ করছি।সুনামগঞ্জ জেলাকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণা করে,নিরন্ন মানুষের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও আর্থিক সহযোগিতা করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি।গৃহহীন মানুষের জন্য গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করা,রাস্তা-ঘাট মেরামত করে দুর্গত মানুষের জন্য পুনরায় যোগাযোগ স্হাপনের সুযোগ প্রদান করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

 

পরিশেষে,সুনামগঞ্জ জেলাকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণা করে,ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক ও সুনামগঞ্জের সকল সংসদ সদস্যবৃন্দের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

 

লেখকঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ