ছাত্রলীগ বনাম এমসি কলেজ: শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের আর্তনাদ

প্রকাশিত: ৩:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২০

ছাত্রলীগ বনাম এমসি কলেজ: শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের আর্তনাদ

মাসুদ আহমেদ ♦

সবুজ পাহাড়, সুবিশাল মাঠ আর নয়নাভিরাম প্রকৃতিঘেরা শতবর্ষী মুরারিচাঁদ কলেজ, যা এমসি বিশ^বিদ্যালয় কলেজ নামে খ্যাত। গত এক যুগে এ কলেজ ক্যাম্পাসে ঘটেছে আলোচিত-সমালোচিত নানা ঘটনা, যার মধ্যে ‘আগুন দিয়ে ছাত্রাবাস পোড়ানো’, কলেজ ছাত্রী ‘খাদিজাকে কুপিয়ে জখম’ আর হাল সময়ের ‘স্বামীকে বেঁধে রেখে বধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ’ দেশে-বিদেশে কলেজের সুনাম ক্ষুন্ন করেছে এবং প্রতিটি ঘটনায় এসেছে ছাত্রলীগের নাম । বর্বরোচিত এসব ঘটনার পর ক্ষোভ, নিন্দা আর ধিক্কারে সরব হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তি থেকে আপামর জনসাধারণ । কিন্তু বেপরোয়া ছাত্রলীগকে রুখতে পারেনি কেউ, না সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, না কলেজ প্রশাসন ।

আলোচিত গৃহবধূকে ধর্ষণ:  গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে যান এক গৃহবধূ । সন্ধ্যায় কলেজের প্রধান ফটকের সামনে নিজেদের গাড়িতে বসে গল্প করছিলেন স্বামী-স্ত্রী। এসময় গৃহবধূকে টেনে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের সামনে নিয়ে যান ছাত্রলীগ নামধারী কিছু দুর্বৃত্ত। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়।
এ ঘটনায় গৃহবধূর স্বামী ৬ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে আরও ৩ অজ্ঞাত সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন । ঘটনার পরপরই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড় উঠে, তৎপর হয় প্রশাসন । ঘটনার রাতেই ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে অন্যতম অভিযুক্ত সাইফুরের রুম থেকে পাইপগানসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ । এরপর একে একে ৮ অভিযুক্ত সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেক আহমদ, রবিউল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান মাসুম, আইনুল ইসলাম ও রাজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-পুলিশ । প্রত্যেককে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে চলে জিজ্ঞাসাবাদ, রিমান্ড শেষে সবাই ধর্ষণে জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন । আদালতের নির্দেশে ৮ অভিযুক্তের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় । ধর্ষণকান্ডে অন্যতম অভিযুক্ত সাইফুরকে গত ৮ অক্টোবর অস্ত্র মামলায় আবারো ৩ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে অভিযুক্ত ৮ ছাত্রলীগ কর্মীই এখন কারাগারে ।

আলোচিত-সমালোচিত ধর্ষণকান্ডে বেরিয়ে আসে ছাত্রাবাসের কথিত টর্চার সেলে সাধারন ছাত্রদের নির্যাতন, কলেজের পেছনের টিলায় ইভটিজিং, নারীদের যৌন হেনস্থা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ ছাত্রলীগের নানা অপকর্ম ।

ছাত্রাবাসে আগুন: ২০১২ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রশিবির তাড়িয়ে দেবার নামে ছাত্রলীগে ছাত্রাবাসে আগুন দেয় । এতে ৪২টি কক্ষ ভস্মীভূত হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ২৯ জনকে ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করে, যাদের সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী । ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনায় দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও এমসি কলেজের সাবেক ছাত্র নুরুল ইসলাম নাহিদ কলেজের পোড়া ছাত্রাবাস পরিদর্শনে গিয়ে কেঁদে ফেলেন । এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সবাই জামিন নিয়ে আবার ক্যাম্পাসে বেপরোয়া হয়ে উঠে।

কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে জখম: ২০১৬ সালের অক্টোবরে এমসি কলেজে পরীক্ষা দিতে আসা সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে এমসি কলেজ মসজিদের পেছনে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন শাবি ছাত্র বদরুল আলম । কলেজ ছাত্রীকে হামলার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ এবং হামলাকারী বদরুল আলমকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। খাদিজার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জীবন-মৃত্যুর সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ে জিতে গেলেও খাদিজা এখনও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেননি, মাঝে মাঝেই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন ।

খাদিজা কান্ডে জড়িত বদরুল আলমও ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক । যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত বদরুল এখন কারাগারে।

১২৪ একরের সুবিশাল ক্যাম্পাসে অপ্রতুল নিরাপত্তা দেয়াল, প্রশাসনের ব্যর্থতা, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য, ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীন গ্রুপিং, নিজেদের মধ্যে কোন্দল মিলিয়ে এক অরক্ষিত-অনিরাপদ ক্যাম্পাস । এ নিয়ে ঐহিত্যবাহী কলেজের শুভার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর সাধারন মানুষ উদ্বিগ্ন ।

বীর উত্তম আবু তাহের, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ও ব্রিগেডিয়ার এম এ মালিক, বুয়েটের প্রথম ভিসি এম এ রশিদ, সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতো গুণীরা যে বিদ্যাপীঠের ছাত্র ছিলেন, সে বিদ্যাপীঠে আজ কেবলই আর্তনাদ ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 18
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ