ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : কীর্তিমান অভিভাবকের চির বিদায়

প্রকাশিত: ৮:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : কীর্তিমান অভিভাবকের চির বিদায়

সাঈদ চৌধুরী :

আজ বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছি। আমার বাবার মৃত্যুর পর আমরা যেমন অভিভাবক শূন্য হয়েছিলাম, জাতি আজ তেমনি একজন কীর্তিমান অভিভাবককে হারিয়েছে। বাংলাদেশে এই সময়ের সবচেয়ে বরণীয় ব্যক্তিত্ব উপমহাদেশের স্বনামধন্য আইনবিদ, আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অক্ষুন্নতা রক্ষায় স্থির সঙ্কল্পের অধিকারী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ইন্না-লিল্লা-হি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রা-জিউ‘ন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জীবনের সমস্ত ভাবনা জুড়ে ছিলো এই দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তি। ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি সততার সেরা উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন। সরকারী কোন সুযোগ সুবিধা ভোগ করেননি। এমনকি তাঁর প্রাপ্য সম্মানীও গ্রহন করেননি।

আইনের অঙ্গনে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন নির্ভয়, নির্ভীক। অকুতোভয় সিপাহসালার। রাষ্ট্র ও সমাজকে দূর্নীতিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ছিলেন সরব ও সোচ্চার। ক্ষমতার মোহে দোদুল্যমান নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ও পক্ষপাতহীন। দেশের প্রধাণ দুই দল ও নেত্রীর প্রশংসা কিংবা সমালোচনা করেছেন অকুন্ঠ চিত্তে। দেশের স্বার্থে ও দেশের মানুষের পক্ষে নির্ভয়ে কথা বলেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের ভয়ানক চাপের মুখেও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় ছিলেন আপোষহীন। সেনাসমর্থিত সরকারের প্রেসার মোকাবিলা করেছেন দৃঢ়চিত্তে। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই করেছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার নিষ্পত্তি করেছেন সততা ও সাহসীকতার সঙ্গে।

অনেকবার তাঁর ৪৭/১ পুরানা পল্টনের বাসা ‘সুবর্ণা’য় গিয়েছি। বাসায় সব সময় দেশ বিদেশ থেকে মানুষজন আসতেন। অনন্য সাবলীলতায় সবাইকে তিনি গ্রহন করতেন। তাঁর আন্তরিকতায়, আতিথিয়তায় মুগ্ধ হতে হয়। সবার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলতেন। প্রচন্ড রসবোধ সম্পন্ন এই মানুষটি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। পাহাড় সমান ব্যক্তিত্বের সামনে কথা বলতে অনেকেই ভয় পায়। কিন্তু তিনি মূহুর্তেই আপন করে নেন। তারপর উপস্থিত সকলেই তাঁর সাথে আলাপে অংশ নিতেন। তিনি কথায় ও কাজে, চিন্তায় ও মননে ছিলেন একজন আপাদমস্তক পরিশীলিত মানুষ। এত ভদ্র ও মার্জিত বুদ্ধিজীবী সত্যিই বিরল।

১৯৬২ সালে বৃটেন থেকে সম্মানের সাথে বার এট ল‘ করা ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। অসামান্য মেধাবী মি. হক ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ক্রিমিনাল ল-তে প্রথম হয়ে স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন। হিন্দু ল’ নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়েছেন। সেখানেও ছিলেন প্রথম। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। বর্ণাঢ্য জীবনে আইন পেশায় দীর্ঘ ৬০ বছর পার করেছেন।

কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংস্পর্শে আসেন রফিক-উল হক। বেকার হোস্টেলে পাশাপাশি কক্ষে থাকতেন। আমাদের সিলেটের লুৎফুর রহমান জায়গীরদারও সে সময় ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়ন করতেন। তারা এক সাথে ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্বদ্যিালয়ে কারমাইকেল হোস্টেলেও বঙ্গবন্ধুর সাথে একত্রে ছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বাবা মুমিন উল হক একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক ছিলেন। তিনি কলকাতা শহর সহ চব্বিশ পরগনা মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি চব্বিশ পরগনা জেলা মুসলিম লিগের সভাপতি ছিলেন। তারই প্রতিষ্ঠিত ঢাকার ফার্মগেটে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল এখনো সুনামের সাথে চলছে। এরপর ঢাকা শিশু হাসপাতাল গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ব্যরিস্টার রফিক-উল। শিশু হাসপাতাল ছাড়াও সুবর্ণ ক্লিনিক, আদ-দ্বীন, বারডেম, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ অনেক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিজের ও স্ত্রীর উপার্জিত অর্থে গাজীপুরের চন্দ্রায় ১০০ শয্যার সুবর্ণ-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের স্ত্রী ডা. ফরিদা হক ২০১১ সালে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিম-উল হক আইন পেশায় যুক্ত। পুত্রবধূ রোকেয়া হকও যুক্ত রয়েছেন একই পেশায়।

ভীষন সমাজতিহৈষী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক জীবনের প্রায় সকল উপার্জন মানবতার সেবায় ব্যয় করেছেন। আজীবন সত্য সুন্দরের পক্ষে ছিলেন অটল, দৃঢ়চেতা। আদালতে, টক শোতে, সভা-সেমিনারে তাঁর সাহসিকতাপূর্ণ বক্তব্য জনমনে প্রাণ সঞ্চার করতো।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাথে ছিল তাঁর আত্মিক বন্ধন। অনেকের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। ক‘বছর আগে বিলেত সফরের পর এখানকার মানুষের কথা অমলিন ছিল তাঁর স্মৃতির পাতায়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের প্রস্থানে আইন ও বিচারাঙ্গনে বিশাল শূণ্যতার সৃষ্টি হল, যা সহজে পূরণ হবার নয়। তবে কীর্তিমান অভিভাবক হিসেবে আমাদের মানসপটে ও জাতীয় ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক: সম্পাদক- সময় (অনলাইন দৈনিক), ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরি, ইউকে এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি ও মুসলিম ইনডেক্স (ওয়ার্ল্ডওয়াইড)।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 247
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ