শুদ্ধতা ও শুভ্রতার কবি আহমদ ময়েজ

প্রকাশিত: ২:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০২০

শুদ্ধতা ও শুভ্রতার কবি আহমদ ময়েজ

শুদ্ধতা ও শুভ্রতার কবি আহমদ ময়েজ। সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক কবি আহমদ ময়েজ করোনা আক্রান্তের খবর পরিচিত মহলে দুর্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। দোয়া করি মহান আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন।

♦সাঈদ চৌধুরী♦
শুদ্ধতা ও শুভ্রতার কবি হিসেবে খ্যাত আহমদ ময়েজ একজন প্রজ্ঞাবান কবি। কাব্যকলার জীবনমুখীতা আর বাস্তব জীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ-পরীক্ষণের মাঝে তার কোন ফারাক নেই। কবি আল মাহমুদের অবুঝের সমীকরণ ‘কবিতা বোঝে না এই বাংলার কেউ আর/ দেশের অগণ্য চাষী, চাপরাশী/ ডাক্তার উকিল মোক্তার/ পুলিস দারোগা ছাত্র অধ্যাপক সব/ কাব্যের ব্যাপারে নীরব! …ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা/ সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে/ কবিতা বোঝে না!‘ এমনটি নয়। আহমদ ময়েজ জাগ্রত কবি। এই কবি তার জীবনমুখী কবিতায় বার বার নতুন ধারার ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
কবিতা বুকের ভেতর জ্বলে ওঠা স্ফুলিঙ্গ। আর ইন্দ্রিয় সচেতন মানুষই কবি। যারা শব্দের জ্ঞাত অর্থের অতিরিক্ত অর্থ জানে। কেবল চেষ্টা করেই কবি হওয়া যায়না। দিনে চাঁদ আর রাতে সূর্য উঠেছে বলে ভ্রান্ত শব্দমালা বসালে কবিতা হয়ে ওঠেনা। একজন মানুষ প্রবল বৃষ্টির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কী অনুভূতি লাভ করল তা আজ যেমন আছে, হাজার বছর আগেও তাই ছিল। সেকালের সাথে একালের লেখকের কবিতায় একই শিল্পিত চেহারা প্রতিবিম্বিত হবে। তফাৎ শুধু শব্দের বুনুন ও ছন্দের বাঙময়তায়।
কবিতার উৎকৃষ্টতার জন্যে ছন্দ কতটা উপজীব্য, আহমদ ময়েজের কবিতায় তা সহজে অনুমেয়। গানের মত তাল লয় সুর ইত্যাদির সংমিশ্রণে এই কবিতা ভিন্ন মাত্রার সৃষ্টি করে। তার পংক্তিমালা শুধু পদ্য নয়, আধুনিক মরমি কবিতার নতুন মাইলস্টোন। আহমদ ময়েজের কবিতায় পরিলক্ষিত হয় গনমানুষের আত্মিক প্রতিবাদী উচ্চারন- ‘হয়নি বলে আর হবে না/ আমরা বলি বাদ দে/ লক্ষ তরুণ চেচিয়ে বলে/ পাপ সরাবে হাত দে।’
কবির ভাষায় ‘তরুণ প্রজন্ম রা‌ষ্ট্রের পাপ সরা‌তে এম‌নি স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নে‌মে‌ছি‌লো। তা‌দের‌কে দানবীয় বা‌হিনী দ্বারা আক্রান্ত করা হ‌য়ে‌ছি‌লো। এম‌সি ক‌লে‌জের হো‌স্টে‌লে যে অনাচার সংঘ‌টিত হ‌য়ে‌ছে এসব এক‌দি‌নের জঞ্জাল নয়। যারা এস‌বের মদদদাতা তারা রাষ্ট্র‌কে জোর ক‌রে দখল ক‌রে রে‌খে‌ছে। বাংলা‌দে‌শের এক শ্রেণীর সাংবা‌দিক ও লেখক এসব আড়াল ক‌রে অন্যা‌য়ের প্র‌তিবাদ ক‌রে। তারা লে‌খে, শেখ হা‌সিনা খুব ভা‌লো, নামা‌জি, তস‌বিদানা প‌ড়েন। কিন্তু ছাত্রলীগ তার কথা শু‌নে না। এরা ভা‌র্সি‌টি‌তে ছাত্রী‌দের ওড়না টা‌নে। আব্রাহ‌ামকে হত্যা ক‌রে, বিশ্ব‌জিৎ‌কে হত্যা ক‌রে। রাষ্ট্র তথা মন্ত্রী এম‌পিরা তা‌দের বাঁচা‌তে তৎপর হয়। বু‌দ্ধিজীবী গাফফার চৌধুরী জয়নাল হাজারী‌কে আইকন হি‌সে‌বে প্র‌মোট ক‌রেন।
এভা‌বে তারা প্রশ্রয় দেয় হন্তারক‌দের। তারা কৌশ‌লে লে‌খে ছাত্রলীগ‌কে ‘কল‌ঙ্কিত’ কর‌া হ‌চ্ছে। যে ছাত্রলীগ‌কে দমন কর‌তে শেখ হা‌সিনা অভিমান ক‌রে ব‌লেন, ‘ছাত্র লী‌গের কো‌নো দা‌য়িত্ব আমি নি‌তে পার‌বো ন।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প‌দ থে‌কে এমন উক্তি হাস্যকর শুনায়। তাহ‌লে দা‌য়িত্বটা কে নে‌বে? শেখ মু‌জিব‌কে এক‌টি পক্ষ ভগবান বা‌নি‌য়ে‌ছি‌লো তা‌দের নি‌জে‌দের স্বা‌র্থে। এখন এদেরই প্রেতাত্মা শেখ হা‌সিনা‌কে দেবী বা‌নি‌য়ে স্বার্থ হা‌সিল কর‌ছে। তরুণ প্রজ‌ন্মের কথাই সত্য, পাপ সরা‌তে হ‌লে হাতগলা‌তে হ‌বে। এসব পা‌পি ও পাপ‌কে চি‌হ্নিত ক‌রে যারা লিখবে তারাই প্রগ‌তির চাকা এগিয়ে নি‌য়ে যা‌বে। এবার সময় সহায়ক হ‌বে না জা‌নি কিন্তু অন্য‌কো‌নো সম‌য়ে সহায়ক হ‌বে – আমরা সেই দি‌নের অপেক্ষায় থাকলাম। বাংলা‌দেশ দীর্ঘজীবী হোক, বাংলা‌দেশ জিন্দাবাদ।‘
এমন সাহসী শক্তিশালী কথা একজন কবিই কেবল বলতে পারেন। কবিতা এক প্রকার আত্মদর্শন। লেখকের চিরাচরিত অভিজ্ঞতার সারাৎসার চিত্রিত হয় তার লেখায়, কবিতায়। ‘নব্যবর্গী‘ শীরোনামে কবি আহমদ ম‌য়েজের সাহসী উচ্চারণ- চিত্রপ‌তি শিবাজী/ রে‌খে‌ছি‌লো কী বা‌জি/ লুটপাট ক‌রে নি‌তে বাংলা/ বর্গার আকা‌রে চালা‌তো যে হামলা।/ বর্গিরা সব এলো ঐ/ ছে‌লে ব‌ুড়ো গে‌লে কই/ সু‌বেদার বাংলাটা কাঁপ‌ছে/ দিনে দিনে বর্গিরা চার‌দিক চাপ‌ছে।
যাপিত জীবনের টুকরো টুকরো দৃশ্যময়তা কী চমৎকার ভাবে কবিতার শব্দপুঞ্জে তুলে আনেন এই কবি। জীবন সৌন্দর্যের ব্যূহ নির্মাণ করতে ‘বিবাগীর মন‘ কবিতায় আহমদ ম‌য়েজ বলেন- এতো সুখ কোথায় রা‌খি, আগল খোলা চুম্বন/ রা‌শি রা‌শি সু‌রের বুরুজ সায়া‌হ্নে ধরে রাখা রথ/ আকাশসম উচ্চতা ভাঙ‌তে ভাঙ‌তে আরো দূর স‌রে যায়/ উগল মা‌ছেরা কি শুধু খুঁ‌জে ফি‌রে কাদাময় সুখ?/ আমা‌কে তা‌তি‌য়ে গে‌লো ডুগডু‌গির চপল গুঞ্জন/ যে বো‌ধির বহতা মে‌পে চোখ যায় অতল গহ‌নে/ আমি তা‌রে কী নাম ধ‌রে ডা‌কি?/ হ‌তে পা‌রে চন্দ্রামুখী/ সুহা‌সিনী, স্বপ্নচারী এক/ ধুলায় লুটিয়ে প‌ড়ে চান্দসুরুজ আলো/ আরো দূর শর‌মিন্দা ব‌নে ঘোর লাগা পাড়/ যে‌তে যে‌তে একবার শুধু ছু‌য়ে দিও বিবাগীর মন।
আহমদ ম‌য়েজের ক্ষুরধার শাণিত শব্দ-ছন্দ আমাদের ছড়ামনকে আন্দোলিত করে। তিনি যখন লেখেন, আবরার জন্য এক‌টি লি‌মে‌রিক – ‘এক‌টি সৌধ ভে‌ঙে দি‌লে কী আর হ‌বে/ লক্ষ‌কোটি সৌধ মিনার বু‌কে র‌বে/ একুশ যা‌দের মন রা‌খে‌নি/ কৃষ্ণচূড়ার রঙ মা‌খে‌নি/ এবার, রক্ত ঢে‌লে ফুল ফুটা‌বে ট‌বে।‘
কজন কবির প্রতিবাদ কীভাবে রক্তে শানিত হয় সংগ্রামের মর্মভেদী ঝংকার। আহমদ ম‌য়েজের ‘সু‌বো‌ধের কথা ম‌নে আছে? পালা‌তে পালতে যে আমা‌দের অন্য এক ভাষা শি‌খি‌য়ে গে‌লো‘ কবিতাই তার প্রমান। যেটি জাগ্রত করে লাখো কন্ঠস্বর!
‘এমন গ্রা‌ফি‌টি ছাড়া গণতন্ত্র উদ্ধা‌রে আর কোন মাধ্যম তীব্রভা‌বে ব্যবহার হ‌তে পা‌রে। আমরা যে সম‌য়ে বসবাস কর‌ছি সু‌বোধ তারই প্র‌তি‌নি‌ধিত্ব কর‌ছে। সে ক্রমশঃ পালা‌চ্ছে। তাঁর খাচাবন্দী সূর্য‌টি হলুদ রং ধারণ ক‌রে‌ছে। সময় তার অনুকূ‌লে নয়।
গ্রা‌ফি‌টি এমন এক শিল্পমাধ্যম যা কেবল দেয়াল লিখন‌কে চি‌ত্রে তু‌লে আনে। রাষ্ট্র এটি পাঠ ক‌রে কেঁ‌পে ওঠে। আইন দি‌য়ে তা‌কে বাঁধ‌তে চায়।
আমা‌দের যেখা‌নে সব কথা ফু‌রি‌য়ে আসে সু‌বোধ সেখা‌নে এক প্রতী‌কী রূপ নি‌য়ে পলায়নমু‌খো হয়। সে সংঘা‌তে যা‌চ্ছে না। আত্মরক্ষা‌র্থে পালা‌চ্ছে। এক‌টি পলায়নমু‌খো মানুষ যে অন্যরকম প্র‌তিবা‌দের ভাষা নির্মাণ কর‌তে পা‌রে, সু‌বোধ আমা‌দের সেটা শি‌খি‌য়ে যায়।’
প্রতিবাদ হোক ব্যাক্তি আমির সাথে রা‌ষ্ট্রীয় আমি, মুক্তিকামী সকল মানুষ ‘রাষ্ট্র‘ কবিতায় আহমদ ম‌য়েজের প্রতিবাদের ঝংকার- ‘রা‌ষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র হামায়/ ক‌বিতার ভেত‌র ক‌বিতা/ বিশ্ব‌জি‌তের মগজ ঠু‌কিয়া/ রাষ্ট্র গি‌লে‌ছে সবই তা।/ ক‌বিতা আ‌ছে ঝু‌লির ভেত‌র/ খেতাব তকমা আঁটা/ আমার বু‌ঝি হ‌লোনা আজও/ রা‌ষ্ট্রের দি‌কে হাঁটা।/ আ‌মি যে অনাথ হ‌রিজন ফুত/ আমার লে‌গে‌ছে বাট্টা/ চে‌য়ে দেখো ঐ সু‌বোধ পালায়/ দেয়ালে লিখন ঠাট্টা।/ এই অনাচার কেউ কি থামায়/ গরজ বা র‌য়ে‌ছে কার/ সব দি‌য়ে‌ছি রা‌ষ্ট্রের হা‌তে/ অনির্বা‌চিত সরকার।
শেকড়ের রূপময়তায় আহমদ ম‌য়েজ নতুন এক কাব্য প্রচেষ্টা দাঁড় করান, যা শুধু আধুনিক নয়, ঐতিহ্য সমৃদ্ধও বটে। তার ছড়া ও কবিতায় এনে দেয় সমকালীন অন্যান্য কবিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্ন স্বাদ। কবির ভাষায়- ‘রাগ নি‌য়ে রাগ নয়/ কাজই সব সঞ্চয়/ হায় য‌দি ভা‌ঙে ভুল/ উত‌রোল উত‌রোল।/ দূ‌র দেশ শঙ্কা/ শ্রীমান লঙ্কা/ জীবনটা দশাসই/ দূর দে‌শে প‌ড়ে রই।/ দূর দেশে অ‌ভিশাপ/ ঠোঁট কাটা বেশী পাপ।
তোমরা কেবল হল্লাই করো উড়াও সুখের কেতন/ ট্রান্সপোর্ট, ট্যাক্স বাড়ছে রোজই বাড়েনা কেবল বেতন।/ গিন্নির মন এখানে ওখানে মার্কেট আর হলি ডে-ই/ দেনার দায়ে কাজ করে মরি সাতটা দিনই বলি দেই।/ পাউরুটি আর চকোলেট নিয়ে শিশুরাও নয় তুষ্ট/ তাদের দাবী, আরো বেশী চাই মানিব্যাগ পরিপুষ্ট।/ আমার এসবে রাগিলে কি চলে দায়ভার বড় বেশী/ গিন্নি-শিশুর লাল পাসপোর্ট আমি যে বাংলদেশী।
মৌটুসি টেনে আনে/ উঁচু বড় পিড়িটা/ উঁকি দিয়ে আকাশের/ খুঁজে নিতে সিঁড়িটা।/
আকাশটা মুঠো করে/ মন চায় ধরতে/ আম্মুর শাড়ীটার/ মতো সেটা পরতে।
পঞ্চঘোর কাটে না গো সাঁই/ এইবার খোলে দাও দানের সঙ্গীত/ নিরাকার হাত হোক বন্ধু-প্রতীম।/ মাত্ওয়ারা দিন বড় পেরেশান লাগে/ প্রভু! আমি দিনহীন;/ শূন্য হাত কেবল বন্ধক রাখি/ মানুষের লাগি।
যেদিন মরমকথা গেয়ে যা পথের ফকির/ ‘তওরাত-জবুর-ইঞ্জিন-কোরান/ হিন্দুলোকের পদ্ম-পুরাণ/ একই আদমের সন্তান, একই গঠন’/ অবাক শূন্যতায় ভাবি, পাতকির এতো কথা রচিল কেবা/ কোন মহাজন?/ নতুন সূর্য আসে প্রতিদিন, অমানিশা যায় না গো সাঁই/ এখনও কর্পোর ঘ্রাণে অনিন্দিতা হাসে/ স্পর্শ করেনি আজও বেদনার নীলাভ পাথর।/ দয়িতার হস্ত ধরে ফিরে আয়/ আনন্দঘন দিন।
স্পর্ধা খোলেছে দ্বার তাহাদের লাগি/ কল্যাণে বেঁধেছে ঘর ধর্ম-অনুরাগী।/ কথার কসরৎ/ তন্দ্রাভরা চোখ- রঙের বেলুন/ হাসির উড়না উড়ে বহু দূর/ জগত সৃজিল কেবা/ তার নামে এতো কী মধুর।/ পসিনা মানুষ ঝরায়/ ঝরোকায় উচ্ছ্বল হাসি/ সর্বনাশ যতোই বাড়ুক/ সহনেরে ভালোবাসি।/ ছলনা যেমনই হোক গুন কি মোটেও কম?/ কী অদ্ভুদ মানুষ এই/ স্পষ্টকে ভাবে, লজ্জা-শরম।
হাওয়ার দখলে যেটুক থাকার থাকুক/ লজ্জাকে না হয় মনের রঙে ঢাকুক/ ভেতরটা যাদের ফাঁকা/ কিংবা কিছু তন্দ্রামাখা ঘোর/ তাদের জন্য রৌদ্র রেখেছি তুলে/ সময়ে ফিরবে ভোর।/ ছলনা নেই বলে এসব ছহিকথা/ ভাঙ ও রসে নয় সিক্ত/ জানার জন্য যেসব নিগূড়কথা/ চোখের গভীর থেকে পান হোক/ পান হোক আরো অতিরিক্ত।
এ উপচে যাবার নয় যে ঘাসফড়িং-এর হাল্কা পালক/ ভারবাহী বস্তু সেও নিয়তির চালক।/ মান্যবর কবিসদ মানবে কেন,/ আমারও কি দ্বন্দ্ব কম অতলে/ হাত বাড়িয়ে খানিকটা উজানও দেখি/ দেখতে দেখতে পঞ্চাশ প্রায় ছুঁই/ দ্বন্দ্ব আরো গভীরে জড়ায়/ জীবন এমনই মেঘ ও রৌদ্রময়।/ বুষ্টি ঝরাক, ঝরাক কাব্যগান/ রবীঠাকুরের কঠিনেরে ভালোবাসি/ অসুর রাজ্যে-আমি, হয়ে-রই অনাবাসি।
উৎসমুখ/ ক্রোধের আগুনে পুড়ছে লোকালয়/ টাওয়ারহ্যমলেটস-স্টেপনি গ্রিন/ পপলার হয়ে ছড়াচ্ছে সর্বত্র/ ফেনায়িত এই রোদ্রভাপ/ পাখিদের ডানায় ঝুলে আছে/ আগুন কী সর্বনাশা, কতো নির্দয়/ বন্ধুর মুখ অচেনা লাগে/ চেনা বৃত্তকে মনে হয় লক্ষ যোজন দূরের/ গতকাল কিংবা আজ/ মোটেই সমান নয়/ কম্পিত হাতগুলো উত্তোলিত হলে/ হৃদস্পন্দন থেমে যায়/ ভয়ের কাঁটা নিয়ে আরো দূরে সরে যাই/ দূরের গ্রামগুলো বন্ধুর উঠান বলে বিভ্রম হয়/ তবু অপরিচিত পদচিহ্নগুলো আপনার হোক।
পলায়নপর মানুষ যতোই ভীত বা সন্ত্রস্ত হোক/ যতোই দুঃস্বপ্নে কেঁপে উঠুক/ তারাও সময়ে সর্বব্যাপি হয়/ অসহায়ত্ব কখনো-সখনো/ শক্তির উৎসমুখ খোলে দেয়।/ গিঁট ও পাড় খুলতে খুলতে আমরা/ আরো কিছু পথ হেঁটে যাবো/ জং ধরা লোহার ভেতরেই লুকিয়ে আছে শানিত আলোর রশ্মি।
আহমদ ময়েজ আমাদের কাব্যভাষায় এক চমকপ্রদ নতুনত্বের আস্বাদ এনে দিয়েছেন। তার পংক্তিতে পংক্তিতে রয়েছে আগুনের ফুলকি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। সময়কে ধারণ করে যে কবিতা হয় শ্লোগান মুখর। কবি লিখলেন-
উদ্বেগহীন সমতল/ বোধের দরজায় এক-এক করে তালা ঝুলছে/ উপাসনাহীন মানুষ/ আকারে নিজের মুখ দেখতে ভয় পায়/ কারণগুলো যে পারো আজ উপড়ে দাও/ তাহলে আমাদের জীবন আরো দীর্ঘ হবে/ উদ্বেগহীন সমতল এখন অপরিহার্য।/
‘গাব্বারসিং’-এর ভয়ে এ তল্লাট তটস্ত/ কারোর মুখে কোনো রা নেই/ যাদের মুখগুলো এখনও কম্পনহীন/ পদক্ষেপে রয়েছে স্বার্থের ইচ্ছা-অনিচ্ছা/ এ তাদের নিরাপদ দূরত্ব/ এ তাদের ভালো মানুষির উৎকৃষ্ট উপাদান/ এ থেকে সবক নেয়া দুস্কর/ এর চেয়ে উৎকট আর কী হতে পারে/ শাটার আঁটা বোধের দরজায় আজ কষাঘাত করো/ তবেই ভয়ের জানাজা হবে।
বাংলার কাব্যগগনে কাজী নজরুল যদি সূর্যালোকের মত হন, তবে চন্দ্রলোকের সুষমা হলেন ফররুখ আহমদ। আর আহমদ ময়েজ আমাদের কাব্যকলার জগতে ফররুখ উত্তর এক অতি অনিবার্য সৃজন বিন্দু। আহমদ ময়েজ মানুষের মনোজগৎ ছুতে পারেন। ফলে তার সাহিত্য হয় বর্ণিল এবং সমৃদ্ধ। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তোলার মন্ত্র জানেন। তার ‘জন্মপরম্পরা‘য় কী উত্তুঙ্গ স্পর্ধায় আমাদের কইতে শেখালেন–
‘কেন যে মলিন রাখো এই মুখ – একবার ছুঁয়ে দিলে সাতরঙ ভেসে ওঠে ঈশান কোণায়; যা কিছু পুরান ছিল, তাড়িয়েছে আর্যদানব – গুহায়-গুহায়। পাহাড় মৌনতাসম আমার ভাষা, লুণ্ঠিত কথারা আজ ফিরে আসে বার বার। এখনও দানব আছে, উঠে আসে দাবড়িয়ে শহর। মোটেই কম্পিত নই, মলিন রেখো না আর এই মুখ – তুলে আনো বঙ্কিমরেখা, সেখানে মিলবে দেখা বীরাঙ্গনা কাঁকণবিবির; তার চোখে স্মিত হাসি, বাকা-চোরা হাসি – ম্লান করেনা মুখ, হাড্ডিসার মানুষটি আজও গুহারপ্রতীক। ঘোলা ঘোলা চোখ তার পাঠ করেছে যত, গতজনমের সুখ-দুখ, মেঘলা আকাশ, সাহসে রেখেছে কিছু সোনাররোদ উঠোনে উঠোনে। এই রোদ গায়েতে মেখো, কপালে রেখো – মুঠোয় ভরিয়া দিও জন্মপরম্পরা।
এমন মৌনতা জেনো ধ্যানের কথন, ধ্যানের ভাষা – সর্বনাশা আগাম বাণী, কেবল জেগেছে কিছু তড়পানি; তাতেই জেগেছে শহর, দোকানপাড়া, গঞ্জ আর সান্ধ্যসময়। কোনো কোনো বিটকবি ভয়েতে আড়ষ্ট আজ – এই বুঝি ছুটে যায় ছিদ্রপথে অটুটসম্মান। আর কোনো ভয় নেই-বিষ‌ণন রেখো না আর এই মুখ, চান্দের শহর। চান্দিঘাটে নৌকাগুলো হেসে উঠে তোমারই নামে, তোমার পছিনায় জ্যোৎস্নারা শরীর মাখায়, আদরে কঁকিয়ে উঠে পাহাড়ের ঘুম। এর চে’ নির্ভিক আর কোন সে প্রহর? পরম্পরা লেগে রবে গতরে গতর। আমিও তো জেগে উঠি; তোমার নামের ধ্বনি গলায়-রক্ত-তুলে এশক হই, সোয়ারঙে বান্দিয়া পিঞ্জির।
এ কোনো কথন নয় কিংবা প্রেমের বাখান, সত্যগ্রহ হয়েছে মানুষ, তাই আজ এমন বয়ান। শুনিয়া প্রীত হও গোস্বা হও, রাগ ঢাকিয়া রাখো পিতলের গড়ায়, সময়ে উগলে দিও সোনালি-নারায়; তাতেই তপ্ত হবে রাজপথ, সাজঘর বিলিন হবে তাপে ও দ্রোহে।
তোমাকে উজাড় করে যারা পদ্য লিখে কবি হতে চায়, আমি নই সেই প্রতারক। তোমার বিরহ লিখে চাই না হতে প্রগলভ-কবি; যদি কিছু দয়া করে, করুণা করে এই নাম লিখে রাখো নখের তলায় – তূর্য হাতে হেঁটে যাবো এই পথ আরো কিছু কাল।
আজ নিভৃতে যাবো, গায়ে মেখেছি কিছু আতরেরঘ্রাণ, ভাজ ভেঙে পড়েছি সফেদ আর মাড়মাড় গন্ধমাখা নতুন জামা। আমি কোনো বিপ্লবী নই কিংবা শাসক, নতুন প্রেমিক এক ভুলপথে এসেছে আজ শানাই-নগরে; প্রতারক হবার আগে ফিরে যেতে উদগ্রিব তোমার গহনে, তোমার স্পর্শে কেবল প্রেমিক নই, মানুষ হতে চাই – এ আমার অনন্তবাসনা।
এতো যে রচিল কারা পথে পথে সোনার হরফ, তাদের ত্যাগের কথা কহে নাই কেহ। গমকী-নৃত্যে যাহা নেমে আসে ঢালু পথে, বালির ধুলায় বাউরি কাটে হাওয়ার করাত; পথুয়া দালাল এই মাটি ও জরুর দাম বিকিয়ে দেয় জলের দামে, এইখানে তুমি এসে রুখিয়া দাঁড়াও – আমি খুব সাহস কুড়াই।
ও-মন কও, একবার শুধু কও, উতল পরানখানি কোনপাত্রে রাখিবার চাও – সহসা উত্তর আর মিলে না আমার। এমন প্রশ্নবাণে আমি শুধু বোকা হই, চেয়ে রই তোমার পানে। এভাবে অনেক কথার তরজমা হয়নি আজও। বহু চিত্রলিপি পাঠোদ্ধারে ব্যর্থ আমি; কেবল ব্রোঞ্জেই তুমি নির্মিত নও, এখনও ইতিহাস পাঠে ঋদ্ধ যারা, সকলেই তোমার দিকে ঝুকে রয় – মৃৎপাত্র শুকতে শুকতে কল্বের পছিনা বাড়ে।’
আহমদ ময়েজের ‘শতকের আবর্জনা‘ কবিতার ছত্রে ছত্রে ধ্বনিত হতে থাকে নিখাদ পরাবাস্তবচেতনা। তাই তার কবিতার বৈভব যেন ধুম লাগিয়ে দেয় হৃদকমলে।
‘জিলাস দাঁড়িয়ে আছেন, দন্ডপ্রাপ্ত চোখ বড় বেশি উজ্জ্বল, বেদনায় নীল/ অর্ধ-নমিত জনতার চোখ (তোমার সম্মানে কোনো পতাকা ছিল না)/ কম্ম্যু-ধর্মবাদীরা সহাস্যে উল্লাস করে প্রীত হয়/ মিলোভান-জিলাস ছড়িয়ে যান বিশ্বময়।
ভঙ্গুর লেলিনগ্রাদ/ তোমাকে বেত্রাঘাত করে একটি শতক গিলেখায় পৈরবি-দল/ নিজের ছায়াকেই শত্রুভেবে প্রতিদিন বিষ-বৃক্ষ রোপন করে/ লাল, কেবল লালই হয়ে উঠে প্রতীক এক/ পাঁজরের রক্ত ঢেলে আমাদের চৌকাঠ লাল হয়/ গ্রন্থগুলো লাল/ লাল কৃষ্ণচূড়া/ আগুনের রঙ লাল/ গণগণে সূর্য … আরও কত কী/ কেবল মনের ভেতর ধূসর পান্ডুলিপি পড়ে আছে-সে এক দীর্ঘ লাশ;/ রঙের স্পর্শ নেই।/ তবু জিঘাংসা মানুষের, কারা ছিল ঐ পথের উলঙ্গ দিশারী/ কারা শুধু মানুষের দোহাই দিয়ে মানুষকেই অপাঠ্য করে বেশি।
আবার সেই ভাঙনের দাগ ধরে দাঁড়িয়ে আছি,/ উল্কার মতো একটি ছবি ঘুরে যায়/ দেখো, এক হাতে কালো রাত নগ্ন-মুদ্রায়/ অন্য হাতে সূর্যের পাল।/ এ নয় মলয়ের অযাচিত গোঙানি/ নিজেরই পুরাণো ছাঁচে গড়ে ওঠা চিত্রালডানা।
একদিন উড়াল দেব ঐ পথে যেখানে পড়ে আছে কঙ্কালস্তুপ/ নাই বা দৃশ্যমান হলো সুর ও গীতের বিতান/ শতকের আবর্জনা ঘেঁটে তুলে নেবো ইতিহাস লাল।’
আহমদ ময়েজের কবিতা বাঁধা হয়েছে ছন্দের শৃঙ্খলে। মাঝে মাঝে ভেঙেও দেয়া হয়েছে সেই শৃঙ্খল। কিন্তু ভাঙার সেই প্রক্রিয়ায় তৈরী করেছেন তিনি নতুন এক ধ্বনি মাধুর্য। বিষয় ও শব্দের একত্র মেলবন্ধনের সাথে যুক্ত হয়েছে উপমা, অনুপ্রাস ও চিত্রকল্প।
অসাধারণ ছড়াকার আহমদ ময়েজ শিশুতোষ ছড়া সম্পর্কে বলেন, ‘স্বাভাবিক ভাবে আমার মনে হলো ছড়ার আবার শিশুতোষ বিষয়টা কী। আবার মনে হলো রবীন্দ্রনাথ ছড়াকে ননসেন্স বলেছেন। সেটাও কোন ধরণের ভাবনা থেকে তিনি বলেছেন তা দেখার বিষয়ও বটে। আমরা যারা ৮০ দশকের তালমাতাল সময়ে ছড়ার জগৎকে বুঝার চেষ্টা করেছি তাদের কাছে ছড়া একটি হিরণ্ময় হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচিত। শিশুমনের ভাবনা থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা কেবল ঘুমপাড়ানির গান নয়।
যখন মারাঠা বর্গীরা আমাদের দেশে লুটতরাজ চালাতো সেই সময়কে খনারবচন শত শত বছর ধরে আমাদের মনজগৎকে এই ভাবধারায় তৈরী করেছে। আমরা খনাদের সন্তান। আমরা কী করে বংশপম্পরা বর্গীদের ভুলে থাকতে পারি? স্বদেশীয় বর্গীরা এখন আমাদের লুণ্ঠন করছে—ছড়া সাহিত্য আজ সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। দু’একজন যে তাদের ছড়ায় সময়ের যাতনাকে ধারণ করছেন না তা কিন্তু নয়। লিখছেন অনেকেই কিন্তু ৬৯, ৭০ কিংবা আমাদের সময়কাল সেই ৮০’র দশকের মতো ছড়াকারদের যেভাবে উন্মাতাল করে তুলেছিল সেটাই আজ রক্তশূন্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সেই জোয়ার আর ছড়াসাহিত্যকদের তাতাচ্ছে না। কেন? কারণ, এখন আর আমরা কাউকে কোনো ‘কমনশত্রু’ ভাবতে পারছি না। ছড়াকার, কবি, শিল্পীরা এখন সেই পুরানো ধারায় ফিরে গেছেন যেখানে রাষ্ট্র তাদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছে।
ছড়া সম্পর্কৃত প্রাণজ মানুষ অন্নদাশঙ্কর রায়ের বক্তব্যটিই চূড়ান্ত বলে আমার মনে হয়েছে। তিনি ছড়ার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ছড়া লেখা যায় না— ছড়া হয়ে ওঠে। বৃহৎ অর্থে সকল শিল্পমাধ্যমকেও আমরা এভাবে একটা ব্যাখ্যার আওতায় আনতে পারি। তবে ছড়ার বিষয়টিকে ভিন্নমাত্রায় বলার অন্যতম কারণ হলো, খনারবচন যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠেছে ছড়াকেও সেই স্বাভাবিকতার মধ্যদিয়ে বিচার করা হয়েছে। সে হিসেবে ছড়া লেখার চেষ্টা আমরা সকলেই করছি—হয়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার।’
আহমদ ময়েজ সাহসী, কুশলী, বহুমুখী লেখক। তিনি প্রতিবাদী ও মানবিক মানুষ। একটি অনুষ্ঠানের বর্ণনা থেকে এই কবি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে।
‘কবি আহমদ ময়েজ, কবি ও কবিতা: বিমূর্ত চরণে রাখি কালের ক্ষমা’ এর সফল মঞ্চায়নে তিল ধারণের ঠাঁই ছিলো না। পূর্ব লণ্ডনের সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র ব্রাডি আর্টস সেন্টারের নির্ধারিত সিটগুলোতে স্থান সংকুলানে ব্যর্থ হলে দর্শকরা মাটিতে বসে পড়েন। বসার স্থান না পেয়ে অনেককে পাশের রুম ও করিডোরে দাঁড়িয়ে থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে হয়। বিপুলভাবে দর্শক নন্দিত এই কাব্যসন্ধ্যার সামগ্রিক পরিবেশনার নিঃসঙ্কুচ প্রশংসা করেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। অনুষ্ঠানটি কবি ও কবিতা কেন্দ্রীক হলেও এতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
বৃত্ত-আবৃত্তি, গান এবং দর্শক প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নোত্তর পর্বের নান্দনিক উপস্থাপনায় মঞ্চায়ন হয় এই কাব্যসন্ধার। বোদ্ধা কবি ও সাহিত্যিক মহলে ইতোমধ্যে শুদ্ধতা ও শুভ্রতার কবি হিসেবে খ্যাত সাপ্তাহিক সুরমার সম্পাদক, কবি আহমদ ময়েজের কিছু নির্বাচিত কবিতা নিয়ে লণ্ডনের কবি-সাহিত্যিকদের নতুন প্লাটফরম অধ্যায় প্রথমবারের মতো এই আনুষ্ঠানিক কাব্যসন্ধ্যার আয়োজন করে। নির্দিষ্ট কোনো উপস্থাপক ছাড়াই একে একে মঞ্চস্থ হতে থাকে অনুষ্ঠানের নানা পর্ব। সব মিলিয়ে তৃতীয়বাংলা বলে খ্যাত বিলেতে সত্যিকার অর্থে একটি ব্যতিক্রমী কাব্যসন্ধ্যার উপহার দেয় অধ্যায়।
গণসঙ্গীতশিল্পী হিরা কাঞ্চন হিরকের কণ্ঠে কবি আহমদ ময়েজের ছড়াগান ‘দিন বদলের পালা, এখন দিন বদলের পালা’ পরিবেশনের মাধ্যমে সূচনা হয় মূল পর্বের। এর পর পিনপতন নিরবতায় বিলেতের সুপরিচিত বাচকশিল্পীবৃন্দের কণ্ঠে একে একে কোরাস ও এককভাবে আবৃত্ত হয় ‘ভাব ও বাজুবন্দনারী’ ‘পথের অসুখ …’ ‘রোদেলার উপাখ্যান’ এবং কথার কসরৎ’ শিরোনামের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নির্বাচিত কবিতা।
‘আগুনে পুড়িয়ে বাঁশি এতো সুর বাজে/ মাটির পরাণ পোড়ে/ যৈবতী কাঁদিয়া কয়, তার নামে আরো কিছু প্রতগীত বাঁধো/ … শোন প্রজনন প্রথিত হয়নি আজো এই কাল আলোর প্রমা/ গুরুভেদ ভাঙিয়া গেলে/ বিমূর্ত চরণে রাখি কালে ক্ষমা।’ ‘এতো ব্যথা রাখিব কোথায়/ বিষ নামাইয়া দেও।’ ‘উজাড় করিয়া নামো বাজুবন্দ নারী/ তোমার আঙ্গিনা হোক ভাবের মোরতি।’ ‘আমিতো আজন্মসই পথে পথে ঘুরি। বাঁধি গান/ স্নাত হই। ফেরার আশায় দেহজ নৌকা বানাই’ ‘কবির কোনো পোষাকী ঈশ্বর থাকতে নেই’ এধরণের অসংখ্য হৃদয়গ্রাহী কাব্যপংক্তিমালা ও ছড়াগানের ছন্দে এক অনন্য ভাবের সায়রে ভাসে হল উপচেপড়া দর্শক-শ্রোতাদের বিশাল সমাবেশ।
প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা বলেন, কবি আহমদ ময়েজ একজন শুদ্ধচারী মরমি কবি। কবিকে নিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি নান্দনিক ও ব্যতিক্রমী কাব্যসন্ধ্যা উপহার দেওয়ায় আয়োজক সংস্থা অধ্যায়কেও ধন্যবাদ জানান তারা।
কবি আহমদ ময়েজ তাঁর কাব্যচর্চা ও লেখালেখি বিষয়ে তাৎপর্যবহ বক্তব্যে বলেন, কবি যেখানে দাঁড়াবেন সেখান থেকে পথ নির্ণয় হবে। কবি যদি রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে দাঁড়ান তাহলে তিনি কবি নন, দলকর্মী। শেষ পর্যায়ে কবিকে তাঁর একটি কবিতা পড়ে শোনাতে অনুরোধ জানালে তিনি সুন্দর আয়োজনে মুগ্ধ হয়ে ‘তোমাদের এই মুগ্ধ সভায়’ শিরোনামের স্বরচিত কবিতাটি পাঠ করে শোনান এবং সব শেষেও কবির কণ্ঠে গান শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরেন সবাই।
কবির নির্বাচিত কবিতা থেকে আবৃত্তিতে অংশ নেন বিলেতের সক্রিয় ও সুপরিচিত আবৃত্তিকারদের অন্যতম তৌহিদ শাকীল, স্মৃতি আজাদ, মোস্তাফা জামান নিপুন, সোমা দাস, বর্ণালী চক্রবর্তী, সৈয়দ রুম্মান, সাগর রহমান ও উর্মিলা আফরোজ। প্রতিক্রিয়া পর্বে আবৃত্তিকার ও সংবাদ পাঠক মুনিরা পারভিন স্মৃতিচারণ করেন কৈশোরে তাকে লিখা কবির একটি ছড়া আবৃত্তি করে শোনান।
এক পর্যায়ে কবিকে মঞ্চে ডাকা হলে মুহুর্মুহু করতালিতে আবৃত্তিকারদের সারিতে আসন গ্রহণ করেন কবি আহমদ ময়েজ। এসময় কবিকে ফুল, অধ্যায় সম্মাননা ক্রেস্ট, মনোগ্রাম সম্বলিত মগ এবং উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করেন অধ্যায়ের সদস্যরা। কবিকে আনুষ্ঠানিক বরণের পর কবির সাথে কথোপকথনে জড়ান আবৃত্তিকার, কবি সৈয়দ রুম্মান।
কবি আহমদ ময়েজ ও তাঁর কবিতা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যায়ের সভ্য, কবি সাইম খন্দকার। তিনি তাঁর প্রবন্ধে বলেন, কবির সমাজভাবনা শ্লোগান-সর্বস্ব নয়। কারণ, জীবন-ঘাটে নাইতে গিয়ে হরহামেশাই তিনি দেখেছেন কীভাবে শ্লোগান-সর্বস্বরা কবিতাকে বিকিয়েছে চালাকির হাঁটে – নষ্ট হয়ে যাওয়া রাজনীতির দামে। তিনি আরো তুলে ধরেন, আহমদ ময়েজ বিশ্বাস করতে চান কবিতা নির্মাণের প্রধানতম উপকরণ হল: ছন্দ এবং ভাষা। তাই ছান্দিক সৌকর্যই হয়ে উঠেছে তাঁর কাব্যধারার উপভোগ্য আকর। সাইম খন্দকার কবির গদ্য সম্পর্বে আলোকপাত করে বলেন, কবিতার মতোই গদ্য কিংবা ছোট গল্পেও সমান পারদর্শী তিনি।
অনুষ্ঠানে শেষ পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়াপর্বে বক্তব্য রাখেন উপস্থিত দর্শকশ্রোতাদের অনেকে। সার্বিক বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কবি ও কলামিস্ট ফরীদ আহমদ রেজা বলেন, আমি আশা করি, আহমদ ময়েজ নাম অর্জনের কবিতা লেখেন না এবং কবিতার তিনি সাধনা করেন। আর তাঁর লেখায় আছে সমসাময়িক মরমী ধারার সাথে সংমিশ্রণ।
কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজিবুল হক মনি বলেন, কবি আহমদ ময়েজের ভেতরে বাউল ভাবধারা সবসময় কাজ করে। তিনি কবিতার প্রতি খুবই যত্নশীল তাই আমাদেরকে বাবার বার যত্নশীল হওয়ার তাগিদ দেন। সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ বর্তমান ফনোমাণ্টিক যুগে এধরণের আয়োজনকে খুব চমৎকার উদ্যোগ আখ্যায়িত করে বলেন, দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করার সুবাদে কবি আহমদ ময়েজকে অসম্ভব একজন গুণি মানুষ হিসেবেই দেখেছি। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আজমল মাসরুর আয়োজনকে চমৎকার মন্তব্য করে বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে আসায় চমৎকার একটি অনুভূতি নিয়ে যেতে পারছি। ব্যারিস্টার নাজির আহমদ বলেন, একজন কবিকে নিয়ে এমন আয়োজনে আমি অভিভূত। সাংবাদিক মাহবুব রহমান বলেন, কবিকে জানতাম তিনি মরমি ধারায় আপ্লুত হন। তিনি কবি না হলে সম্ভবত বাউল হতেন। আমরা হয়তো একজন কবি ময়েজের মাঝে বাউল ময়েজকে হারালাম।
ব্রিটিশ মূলধারার লেখক, কাউন্সিলার রাবিনা খান বলেন, তিনি তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে বাংলা ভাষা শেখার জন্যে উৎসাহিত হয়েছেন এবং কৈশোরে তাদের মুখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের নাম শুনেছেন। তিনি কবির প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, কবিতার সৌন্দর্য চিরকাল বেঁচে থাকে। কবি সৈয়দ ইকবাল বলেন, এই বিলেতেও অনেক কবিতাপ্রেমিক আছেন আজকের অনুষ্ঠান তার প্রমাণ। কবি শাহ শামীম আহমদ বলেন, বিলেতে আসার পর আমি কবিতা লেখা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম। কবি আহমদ ময়েজের অনুপ্রেরণায় আবার তা শুরু করি। এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে, সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেকের ক্ষেত্রে তিনি উৎসাহদাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন এবং রেখে যাচ্ছেন।
কাউন্সিলার আয়শা চৌধুরী বলেন, ময়েজ ভাইর কবিতা ও ছড়া লেখার চমৎকার একটি প্রতিভা রয়েছে। নিজে লেখালেখির পাশাপাশি অন্যদেরকেও উৎসাহিত করে যাওয়ায় তিনি তাকে ধন্যবাদ জানান।
সংস্কৃতিকর্মী নুরুর চৌধুরী বলেন, আমাদের বাচ্চাদের বাংলা শেখানো কিংবা বাংলাভাষা এখানে ঠিকবে কিনা সে ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলাম। আজ কবি ও কবিতা তথা বাংলাভাষা বিষয়ক এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আমাকে আশাবাদী করছে। কবি ও ছড়াকার রেজুয়ান মারুফ বলেন, আহমদ ময়েজ কবিদের এক নেপথ্য কারিগর। কবি আব্দুল মুকিত অপি সুন্দর আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, সকাল দেখে বোঝা যায় দিনটি কেমন হবে। অধ্যায়ের প্রথম প্রোগ্রাম সেটিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবৃত্তিকার আবু সাঈদ আনসারী বলেন, আহমদ ময়েজ ছড়া কিংবা কবিতা যেটাতেই হাত দেন তাতেই তিনি সার্থকতা লাভ করেন।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 4
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ