হিংসা এমন এক আগুন যে নিজেকেই আঙ্গার করে দেয়

প্রকাশিত: ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২০

হিংসা এমন এক আগুন যে নিজেকেই আঙ্গার করে দেয়

মারুফুল হক চৌধুরী♦ কেউ হিংসা করলে তার আগুনে সে নিজেই পুড়ে আঙ্গার হয়। নিচের ঘটনাটি তা ই প্রমাণ করে।
এক লোক ছিলো। এক বাদশাহর দরবারে সে যাওয়া আসা করতো। বাদশাহর দরবারে যেয়ে সে প্রত্যেকদিন একটা ঘোষণা দিত। বাদশাহর সামনেই দূরে থেকে সে বলত- দেখ, নেক লোকদের সাথে তোমরা সদ্ব্যবহার কর আর যারা দুষ্ট, দুরাচার, ফাসেক-ফুজ্জার তাদেরকে তাদের আমলের উপর ছেড়ে দাও। তাদেরকে বিচারের কোশেশ করোনা। তাদের আমলই তাদের বিচার করবে। এটা সে বাদশাহর দরবারে গিয়ে প্রত্যেকদিন ঘোষণা দিত। এ ঘোষণা দেয়ার কারণে বাদশাহ লোকটাকে খুব পছন্দ করতো এবং পুরস্কার দিত। বাদশাহর সভাসদের কিছু লোকদের মধ্যে হিংসা হলো। এ লোকটাকে বাদশাহ এত এনাম দেয়, পুরস্কার দেয় অথচ সে কিছুই করেনা, সে শুধু এ কথাটা বলে।

তাকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এক লোক বাদশাহর সভাসদদের মধ্যে ঐ লোকটা চলে যাওয়ার পরে বাদশাহর কানে কানে যেয়ে বলল, হে বাদশাহ! এই যে লোকটা আপনার এখানে আসে, এখানে এসে সে বের হয়ে আপনার দুর্ণাম করে। আপনার দুর্ণাম করে সে বলে, বাদশাহর মুখে দুর্গন্ধ। বাদশাহ বললেন, এর প্রমাণ কি? প্রমাণ যদি আপনি চান, তাহলে কালকে আপনি তাকে ডাকান, দেখবেন কালকেই সে মুখে রূমাল দিয়ে আসবে। বাদশাহ পরের দিন তাকে সংবাদ দিল। সত্যই দেখা গেল লোকটা তার মুখ রূমাল দিয়ে ঢেকে বাদশাহর কাছে আসল।

বাদশাহ তার ক্রোধকে এবং গোস্বাকে হজম করে কিছুই বললেননা। একটা চিঠি লিখে দিলেন। চিঠি লিখে দিয়ে ঐ লোকটাকে বললেন, তুমি এ চিঠিটা অমুক লোকের কাছে পৌঁছিয়ে দিও। লোকটা চিঠি নিয়ে বের হয়ে গেল। সাধারণত বাদশাহ কাউকে চিঠি লিখেননা, বাদশাহ যদি কাউকে চিঠি লিখেনই তাহলে তাকে পুরস্কার দিয়ে থাকেন। ঐ সভাসদ (যে হিংসা করত) দূর থেকে দেখল বাদশাহ তাকে একটা চিঠি লিখে দিল। ঐ সভাসদ তাড়াতাড়ি বের হয়ে যেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ভাই! তোমাকে যে চিঠিটা বাদশাহ দিয়েছেন, সে চিঠি তুমি কোথায় নিয়ে যাবে? লোকটা বলল, এ চিঠি আমাকে অমুক লোকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সেই হিংসুক ব্যক্তিটি বলল- ঠিক আছে, তোমার পৌঁছানোর দরকার নেই। আমার কাছে দিয়ে দাও, আমি এটা নিয়ে পৌঁছায়ে দেব। সে চিঠিটা নিয়ে গেল।

আরও পড়ুন  এবারও শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত হচ্ছে না

পরের দিন সকালে আবার সেই লোকটা আসলো বাদশাহর দরবারে। বাদশাহ তাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কি ব্যাপার! তুমি আসলে কি করে? সে বলল- হুযূর! আমি প্রত্যেকদিন যেভাবে আসি আজকেও সেভাবে এসেছি। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে আমি যে চিঠিটা দিয়েছিলাম সে চিঠিটা কোথায়? সে বলল- হুযূর! আপনার সভাসদ অমুক ব্যক্তি চিঠিটা নিয়ে গেছে এবং সে চিঠিটা সঠিক জায়গায় পৌঁছিয়ে দেবে। বাদশাহ বললেন- হ্যাঁ, সে তার সঠিক জায়গায় পৌঁছিয়ে দেবে সত্যিই, তবে জিনিসটা অন্যরকম হয়ে গেল।

লোকটি বলল, কেমন? বাদশাহ বললেন, চিঠিটা লিখেছিলাম তোমার সম্পর্কে। আচ্ছা! তুমি একটা কথা বল দেখি, তুমি কি বাহিরে একথা বলে থাক বাদশাহর মুখে দুর্গন্ধ? সে বললো- না, আমিতো কখনও একথা বলিনি। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যদি একথা নাই বলে থাক তাহলে গতকাল তুমি যখন আমার কাছে আসলে, তখন তোমার মুখ রূমাল দিয়ে ঢাকা ছিল কেন? সে বলল- হুযূর! মূলতঃ কথাটা এরকম নয়। এ লোকটা (আপনার সভাসদ) আপনার এখানে আসার পূর্বে তার বাড়ীতে আমাকে দাওয়াত করেছিল। কিছু রসূন মিশ্রিত তরকারী আমাকে খেতে দেয়, যার কারণে আমার মুখে দুর্গন্ধ হয়। আমার মুখের দুর্গন্ধটা যেন আপনার নাকে না যায়, সে জন্য আমি রূমাল দিয়ে আমার মুখ ঢেকেছিলাম।

আরও পড়ুন  মা-বাবার জন্য সন্তানের দোয়া

বাদশাহ বললেন, তাহলে তো তোমার কথা সত্যে পরিণত হয়েছে। কি কথা হুযূর? বাদশাহ বললেন, তোমার প্রতি গোসসা হয়ে চিঠিতে লিখেছিলাম, জল্লাদ! এ ব্যক্তি ঢোকা মাত্রই তাকে হত্যা করবে এবং তার চামড়াগুলির মধ্যে ভুষি পরিপূর্ণ করে আমার কাছে পৌঁছিয়ে দেবে।কিন্তু সে ঠিকই পৌঁছিয়ে দিয়েছে তবে তোমার লাশ নয়, সেই সভাসদের লাশ। তুমি যে বলতে প্রত্যেকদিন, নেককারদের সাথে সদ্ব্যবহার কর আর যে দুষ্ট দুরাচার তাকে ছেড়ে দাও তার আমলের প্রতি। তার বিচারের জরুরত নেই, তার আমলের দ্বারাই তার বিচার হবে।’ সত্যিই তার আমলের দ্বারাই তার বিচার হয়েছে। সে যে তোমার দুর্ণাম করেছিল,তোমায় দোষারূপ করেছিল; তোমাকে হিংসা করেছিল,তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছিল; এই বিদ্বেষের কারণে তার মৃত্যুদন্ড হয়ে গেছে।
সে সভাসদ যখন চিঠিটা নিয়ে পৌঁছাল সেই জল্লাদের কাছে, তখন জল্লাদ খুলে দেখল তার মৃত্যুদন্ড। জল্লাদ বলল, হে ব্যক্তি তোমার তো মৃত্যুদন্ড। সে বলল, এ চিঠি তো আমাকে নয় অমুক ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছিল, তুমি বাদশাহকে জিজ্ঞেস করে দেখ। জল্লাদ বলল, না বাদশাহকে আর জিজ্ঞেস করতে হবে না, বাদশাহর দস্তখত এখানে রয়ে গেছে। কাজেই তোমার মৃত্যু হবে। তার মৃত্যু দেয়া হল, তার গর্দান ফেলে দেয়া হল। তাকে কেটে চামড়াটা ছিলে তার মধ্যে ভুষি ভরে বাদশাহর কাছে প্রেরণ করা হলো।
এখন চিন্তা করুন, যারা হিংসুক তাদের সাজা, বদলা সে নিজেই পায়।
মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে হিংসার আগুন থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক্ব দান করুন।

মারুফুল হক চৌধুরী, কলাম লেখক, সমাজকর্মী।

সর্বশেষ সংবাদ