আ ন ম শফিক || পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিবিদ

প্রকাশিত: ৪:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২২

আ ন ম শফিক || পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিবিদ

আ ন ম শফিক || পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিবিদ। আজ ১৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যুদিবস। ২০১৯ সালের এই দিনে তিনি এ পৃথিবীর মায়া মমতা ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। মুক্ত চিন্তা চেতনায় ভাস্বর,মরহুম এই রাজনীতিবিদের স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। চিরশান্তিতে থাকুন প্রিয় নেতা। তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রার্থনা, পরম করুণাময় যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।- প্রভাতবেলা♦

 

আ ন ম শফিকুল হক । সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালের ১৪ আগষ্ট মৃত্যুকালীন সময়ে ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য। একজন পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য। রাজনীতির বাইরেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর ছিল দীপ্ত পদচারণা। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের তিনি ছিলেন সভাপতি। আবাহনী ক্রীড়া চক্র, সিলেটের সহ সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পানুরাগী শফিক ছিলেন একজন পড়ুয়া রাজনীতিবিদ, সৃজনশীল জননেতা ও দক্ষ সংগঠক।

 

১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মৌলভির গাঁও গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী তবারক আলী ও মাতার নাম মোছা.খয়েরুন নেছা। তাঁর বাবা মৌলভী তবারক আলী বিশ্বনাথ উপজেলার দশপাইকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।পিতাকে অনুসরণ করে আ.ন.ম শফিকুল হকও শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। বিশ্বনাথের মৌলভীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা পেশায়ও কিছুদিন জড়িত ছিলেন। শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে রাজনীতির পাশাপাশি চাকুরি ও ব্যবসাও করেছেন সদালাপী ও কর্মতৎপর এই মানুষটি। কিন্তু সর্বাগ্রে ছিল রাজনীতি। একজন আপাদমস্তক রাজনীতিক ছিলেন। মুক্ত চিন্তা চেতনার অধিকারী আ ন ম শফিক  দলীয় নেতা হয়েও রূপান্তরিত হয়ে উঠেছিলেন সর্বদলীয় মানুষে।

 

১৯৬৫ সালে এমসি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনমত সংগঠনে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ৫ নম্বর সেক্টরে তখনকার জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল ইসলাম খান, শাহ মোদাব্বির আলী প্রমুখ সিলেট শহরে এসে তাঁকে স্থায়ী হতে ও রাজনীতি করার আহবান জানান। এ সময় তিনি বিশ্বনাথের দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত হন।

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতির দায়িত্ব পান দেওয়ান ফরিদ গাজী আর সাধারণ সম্পাদক হন ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল। ১৯৭২ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি হলে দেওয়ান ফরিদ গাজী সভাপতি থাকেন আর শাহ মোদাব্বির আলী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এসময়ই সিলেট শহরে বসবাসের জন্য আসেন তিনি। অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম, ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলসহ স্থানীয় নেতারা তাঁকে জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন।

 

দক্ষ সংগঠক হিসেবে এক সময় সিলেটের আওয়ামী লীগ রাজনীতির অপরিহার্য মুখে পরিণত হন। হয়ে উঠেন সিলেটের প্রগতিশীল রাজনীতির প্রিয় মুখ। নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য না খুঁজে রাজনীতি ও সংগঠনের জন্য ছিলেন নিবেদিত। মূল্যবোধের রাজনীতির ধারক, বাহক শফিক  কর্মীদের কাছে ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। নীতি, নৈতিকতা বজায় রেখে সাংগঠনিক কর্মকান্ড গতিশীল রাখা ও দলের নেতাকর্মীদের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। স্বচ্ছ ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সংগঠনের কল্যাণে মৃদুভাষী এই মানুষটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন।

 

 

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন কর্মসূচিতে। এ সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। কঠিন দুসঃসময়ে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন।

 

১৯৭৭ সালে সিলেট আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এডভোকেট আবু নসর। এসময় তিনি জেলা কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হন। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্বে আসেন অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এডভোকেট আবু নসর। এসময় সম্পাদকমন্ডলীতে স্থান পান আ ন ম শফিক।

 

১৯৮৬ সালের সম্মেলনে সভাপতি অপরিবর্তিত থাকেন আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন আ.ন.ম শফিকুল হক। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন করার কারণে ৫ মাস কারান্তরীন ছিলেন তিনি। এরই মাঝে সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহিমের মৃত্যু হলে সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবু নসর সভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ সালের সম্মেলনেও শীর্ষ পদে পুরনোরাই বহাল থাকেন। ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালের সম্মেলনে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন আ.ন.ম শফিক। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান ইফতেখার হোসেন শামীম। পরবর্তীতে আ ন ম শফিকুল হককে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য করা হয়।

 

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটিতে তিনি ছিলেন সম্মুখ সারির নেতা। সিলেটের প্রগতিশীল জাতীয় নেতৃবৃন্দের আস্থাভাজন হিসেবে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন মেধাবী এ রাজনীতিবিদ।

 

২০০০ সালে জাতিসংঘ মিলেনিয়াম শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারন পরিষদে যোগদান করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থবিত্তের পেছনে না ছুটে রাজনীতিকে সমাজসেবা হিসেবে মেনে নিয়ে অাজীবন রাজনীতিতে কলুষতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন অবস্থান ধরে রেখেছিলেন বিচক্ষণ এ রাজনীতিবিদ।

 

দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে দেশে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেন রাজনৈতিক পরিক্রমায়। অনেক অবমূল্যায়িত হয়েছেন,অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন কিন্তু রাজনীতিকে পুঁজি করে অনৈতিক সুবিধা আর প্রভাব প্রতিপত্তির ধার ধারেননি কখনো। একজন আদর্শিক রাজনীতিবিদ হিসেবে সিলেটের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। কর্মীদের কাছে ছিলেন অনুসরনীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর সঙ্গে কত স্মৃতি। সিলেটের এশিয়া মার্কেটের ছোট্ট অফিস থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তিনি যখন শয্যাশায়ী তখনও দেখতে গেলে গভীর জীবনবোধের কথা বলতেন। পরিচিতজনদের খবর নিতেন।

সারাটি জীবন ভাড়া বাসায় থেকেই কাটিয়ে গেলেন এক নিস্কলুষ জীবন। ক্ষমতা পেয়েও আধিপত্য বিস্তার আর নিজস্ব বাহিনী তৈরীর রাজনীতি তিনি করেননি। কর্মীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ছিল তাঁর নীতিবিরুদ্ধ। সৃজনশীল রাজনীতি আর কর্মীদের যথাযোগ্য মর্যাদায় পদায়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। অঙ্গ, সহযোগী সংগঠনের কাছে ছিলেন একজন যোগ্য উপদেষ্টা ও অভিভাবক। এমন দূরদর্শী সম্পন্ন, জনবান্ধব রাজনীতিবিদ ও কর্মীবান্ধব নেতা বর্তমানে সত্যিই বিরল। একজন যোগ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নির্বাচন পরিচালনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। নেতৃত্ব বাছাইয়ে তাঁর বিচক্ষণতা ও উদারতা ছিল প্রশংসাযোগ্য।

লিখেছেনঃ মো. মুহিবুর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ