করোনা: আমরা যা করেছি এবং করছি

প্রকাশিত: ১১:২৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২০

করোনা: আমরা যা করেছি এবং করছি

সমগ্র বাংলাদেশ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ । গত ১৬ এপ্রিল  বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদফতর  আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেয়।  ঘোষণাপত্রে বলা হয়, যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে বিস্তার লাভ করে লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েছে। লক্ষাধিক লোক মারা গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। হাঁচি, কাশি ও পরস্পর মেলামেশার কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। এ পর্যন্ত বিশ্বে এ রোগের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশনা অনুযায়ী এ রোগের একমাত্র পথ হলো পরস্পরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা বা অবস্থান করা।

 যেহেতু জনসাধারণের একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা নিষিদ্ধ করা ছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় এবং যেহেতু বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে, সেহেতু সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মল) আইন ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১ নং আইন) এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলো।

সংক্রমিত এলাকার জনসাধারণকে কঠোরভাবে অনুসরণ করার কিছু নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

(১) করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রশমনে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। (২) অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। (৩) এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। (৬) সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। বলা হয় ,এ আদেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে ওপরে বর্ণিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিয়ে আইনের সংশ্লিষ্ট অন্য ধারাগুলো প্রয়োগ করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে। এটা ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সার্কুলার বা পরিপত্র।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল সিলেট জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞাপ্তিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। ফলে ১১ এপ্রিল শনিবার বিকেল থেকে সিলেট থেকে বের হওয়া এবং সিলেটে প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্তঃজেলা সব সড়ক ও নৌপথে এ নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। আভ্যন্তরীন চলচলেও একই নির্দেশনা বহাল থাকবে। নির্দেশনায় বলা হয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সিলেট লকডাউন থাকবে।

প্রায়ই একই নির্দেশনা দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

রাস্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ নির্দেশনাগুলো মোটামোটি সবার জানা। রাস্ট্রীয় প্রতিষ্টান জনস্বার্থে এ ধরণের নির্দেশনা জারি করে থাকে। তাও সচেতনমহল ওয়াকিবহাল। প্রশ্ন হলো এসব নির্দেশনা আর বাস্তব চিত্রের এত ভিন্নতা, বিদ্যমান সরকার ব্যবস্থায় কোন রাস্ট্রে কী কাম্য ?

বাস্তবচিত্র কি? আজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৫টায় ১’শ যাত্রী নিয়ে সিলেটে এসে পৌছেছে একটি ট্রেন। ‘লকডাউন’ অমান্য করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে যাত্রী নিয়ে সিলেটে ট্রেনটি প্রবেশ করে।ট্রেনে আসা কয়েকজন যাত্রী প্রভাতবেলাকে বলেছেন- তারা ঢাকা থেকে আসছেন। এ ব্যাপারে আরো জানতে, সিলেট রেল স্টেশনের ম্যানেজার খলিলুর রহমানের সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। পরে তাঁর মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবুও কোন উত্তর মেলেনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে যে নির্দেশনা প্রদান করেছে তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। একইভাবে সিলেটের জেলা প্রশাসক লকডাউন ঘোষণা করে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তাতেও স্পষ্ট করে বলেছেন, সিলেট থেকে বের হওয়া এবং সিলেটে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। তাহলে ট্রেন প্রবেশ করলো কিভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেবে কে? ১শত যাত্রী দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সিলেট এসে প্রবেশ করলো কোন ধরনের প্রটেকশন চেক আপ ছাড়াই। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ অতি সংক্রমিত এলাকা। তাদের মাধ্যমে করোনা যে সিলেটে মহামারী রুপ ধারণ করবে না তার নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন?

এখানেই শেষ না আজ শনিবার দুপুরে ব্রাম্মনবাড়িয়ার লাখো মানুষের  যে জমায়েত হয়ে গেল তাতে সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সামর্থ বা সক্ষমতা কিংবা সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় লাখো মানুষের জমায়েত হয়েছে। এই জমায়েতে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক সমবেত হয়নি। বাইরে থেকে প্রচুর মানুষ শরিক  হয়েছেন। আশেপাশের জেলা এমনকি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে পুলিশ স্বীকার করেছে ঢাকা থেকেও বিপুলসংখ্যক লোক এতে জমায়েত হয়েছে। এটা কোন গোপন জমায়েত নয়। শুক্রবার বাদ মাগরিব থেকে জুবায়ের আনসারীর মৃত্যু সংবাদ এবং জানাযার সময় সূচী জানিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়েছে। জুবায়ের আহমদ আনসারী পাবলিক স্পিকার, সমস্ত বাংলাভাষী গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় বক্তা। শুধু তাই নয়, খেলাফত মজলিসের মত প্রাচীন ও নিবন্ধিত সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি। তার জানাযায় লোক সমাগম হবে। তার  দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগীরা নানাপ্রান্ত থেকে এতে শামিল হবেন। এটাই স্বাভাবিক। ওয়াইজদের ভক্তরা স্বাভাবিকভাবেই থাকে আবেগপ্রবন। তাদের কাছে করোনা ভাইরাস সংক্রমন, লকডাউন এসবের চেয়ে ‘হুজুরের জানাযা’ বড়। জাতির জন্য বির্যৃয়কর এ পরিস্থিতি রোধ কল্পে আইন শৃঙ্খলারক্ষক বাহিনী কি ভূমিকা নিল? জুবায়ের আনসারির জানাযায় লোক উপস্থিতির সম্ভাবনাকে আন্দাজ কি দুরূহ ছিল?  প্রশাসনের বলছে এত সংখ্যক লোকের উপস্থিতি তারা ‘ধারণা করতে পারে নাই’।

ইন্টিলিজেন্স তাহলে কেন আছে? আমরা এ প্রশ্ন করতেই পারি।

আইনের অনুশাসন ও অন্যায় বন্ধ করতেই  রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রবর্তন। আর এজন্যেই মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের কাছে সোপর্দ করেছে। এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বতসিদ্ধ নীতি। মহামারী জনিত ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ‘লকডাউন’ তো জীবন রক্ষার জরুরি ব্যাপার। ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘লকডাউন’ জনগণ ঘোষণা করতে পারেনা। রাস্ট্রের  যথাযথ কর্তৃপক্ষকেই করতে হয়। তেমনই সেটা ঘোষণার পর তা ‘এনফোর্স’ করার দায়িত্বটাও প্রশাসনের। রাষ্ট্রের , সরকারের। ব্রাম্মণবাড়িয়ার প্রশাসন কি করলো? বাংলাদেশের আইন শৃংখলা বাহিনী যেখানে গোপন মিটিং থেকে রাজনৈতিক কর্মী ধরে বাহবা কুড়ায়। তারা জাতি বিধ্বংসী একটি জানাযা ঠেকাতে পারলোনা?  জানাযার জমায়েত ঠেকাতে তারা  কি পদক্ষেপ নিয়েছিল? তারা কি ১৪৪ ধারা জারি করতে পারত না?  ‘লকডাউন’ থাকার পরও রাস্তা কেন ব্লক করা হয়নি। কেন সরাইলের কোথাও গতকালই ব্যারিকেড বসানো হয় নাই? সংক্রামক ব্যাধি আইনে যানবাহন ভাইরাসের জন্য ঝুঁকি মনে হলে জব্দ করার সুযোগ আছে। একটা গাড়িকেও কেন জব্দ করা হলো না।

স্থানীয় ফোর্সে না কুলোলে প্রয়োজনে সেনা মোতায়েন করা যেত। এই সুযোগ আইনে রয়েছে। আশি কিলোমিটারের মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট ছিল।

অনেকেই বলেছেন, ভায়োলেন্স হত। সেরকম কিছুর আশঙ্কা ছিল না। এখানে কেউ মারমুখী ভঙ্গিতে সংঘবদ্ধভাবে বড়ো বড়ো দল পাকিয়ে আসেনি।  বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে। এই লোক স্রোত ঠেকিয়ে দেয়া কঠিন ছিল না।আমরা মনে করি।

আজকে এইরকম অরাজনৈতিক জটলা না হয়ে যদি কোনও রাজনৈতিক প্রতিবাদ সমাবেশ হত। সেক্ষেত্রে কি এইরকমই লোক জমায়েত হতে পারত? সাম্প্রতিককালের অভিজ্ঞতা কি বলে?ফলে এই সমাবেশ চাইলেই ঠেকিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু তা করা হয়নি।  এ অবস্থায় সরকারের সদিচ্ছা, ও সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যায়।

 

প্রশ্ন থেকে যায়, লকডাউন অমান্য করা বেআইনি। হুজুর, মোল্লারা তা কেন করলো। এখানে যারা গেছেন তারা আইন অমান্য করেছেন। ফলত এটা একটা বেআইনি সমাবেশ।বলা যায় এখানে যারা ছিলেন, তারা ক্রিমিনাল অফেন্স করেছেন। তাহলে এইরকম একটা বেআইনি কর্মসূচী মোকাবিলা করার দায়িত্বটা কার? অবশ্যই প্রশাসনের।

এটা অজানা থাকবার কথা নয়,  পৃথিবীতে শতভাগ শুদ্ধতার, সচেতনতার সমাজ কোথাও পাওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই জনগণকে আইন মানতে বাধ্য করতে হয়। অথবা অমান্যকারীকে আইনের আওতায় আনতে হয়। ভারতের নিজামউদ্দিনে মসজিদে সমবেত হয়ে অবস্থান নেয়ায় তাবলীগ জামাতের একাংশের প্রধান মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃটেনে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের গণজমায়েতে শরিক হওয়ার দায়ে লেবার পার্টির এক এমপিকে জরিমানা গুণতে হয়েছে। কাজেই মাদরাসা শিক্ষিত , ওয়ায়েজ ভক্ত এসব লোক বেআইনী কাজ করেছে, ঘৃণ্য কাজ করেছে। এটা ঠিক। কিন্তু শতভাগ দোষ তাদের উপর চাপানো কি যায়?

এই জানাযার গণজমায়েত বা আইন লঙ্ঘন কি প্রথম। আমরা দেখেছি সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর ঢাকা থেকে গ্রামমূখী মানুষের স্রোত। দেখেছি হাজার হাজার পোশাক শ্রমিকের ঢাকামূখী পদব্রজ। ত্রাণের জন্য মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ। বেতনের জন্য শ্রমিকের রাস্তা অবরোধ। টিসিবির গাড়ীর সামনে শতশত মানুষের সারি। ‘ঝুকিপূর্ণ’ আর ‘লকডাউন’ নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাষ্ট্র কি বলবে? প্রশাসন কি করছে?

শাসকগোস্টী বা জনগন আমরা যা করেছি বা করছি তার প্রকৃত দায় যাদের উপর বর্তায়- তাদের কে সতর্ক না করে , তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে চুপ থাকার যে সংস্কৃতি এ দেশে চালু হয়েছে এর ফলে শাসনযন্ত্রের কাছে জবাবদিহিতা চাইবার শেষ জায়গাটাও ক্রমশ ক্ষীণ করে দেওয়া হচ্ছে। কাজেই নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করুন আমরা যা করেছি এবং করছি তা কী ঠিক ?

কবীর আহমদ সোহেল

১৮ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ