মানুষ কতটুকু নির্মম ও বর্বর হতে পারে!

প্রকাশিত: ১:২৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০২০

মানুষ কতটুকু নির্মম ও বর্বর হতে পারে!

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক♦

জন্মের কিছুদিন পরই বাবা মারা যান। মা-ও কোনো এক অভিযোগে কারাগারে। ফলে শিশুটি বেড়ে উঠছিল দাদির কাছে। অভাবের সংসারে হয়তো শিশুটির সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তায় দাদিও চেয়েছিলেন তার নিরাপদ আশ্রয়। এজন্য বাচ্চাটিকে তুলে দেন এলাকার পরিচিত মঈনুল-সুরমা দম্পতির হাতে। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ের পরিবর্তে কপালে জুটেছে শুধুই নির্যাতন। ঐ দম্পতির অসহনীয় নির্যাতনে শিশুটির চিৎকার আশপাশে বসবাসরত অনেকের কানে পৌঁছেছিল। কিন্তু দুই বছরেও সেই কান্না কারো হূদয়ে সহানুভূতি তৈরি করতে পারেনি। তবে শেষ পর্যন্ত এক মানবিক হূদয়ের নারী ৯৯৯-এ ফোন করে শিশুটিকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন।

 

 

 

রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুরের মোড়লবাজার এলাকার বাসিন্দা সানজিদা আক্তার নিশো। শিশুটির ওপর নির্যাতন চলতে থাকায় অন্যদের মতো তিনি চুপ করে থাকেননি। তার কাছ থেকে ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’-এ কল পেয়ে গুলশান থানা পুলিশ সোমবার রাতেই শিশুটিকে উদ্ধার করে। রাতেই গুলশান থানা পুলিশ ঐ দম্পতিকে গ্রেফতার করে।

 

 

 

শিশুটির ওপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরে সানজিদা বলেন, ‘আমরা এখানে (কালাচাঁদপুর) বাসা নিয়েছি প্রায় আট মাস। এখানে আসার পর থেকেই প্রতিদিন কোনো না কোনো সময় শিশুটিকে মারধরের শব্দ শুনতাম। প্রথম প্রথম কয়েক দিন চেষ্টা করেছি ঘটনা জানার। কিন্তু আমরা যে বিল্ডিংয়ে থাকি তার পাশের বিল্ডিংয়ে থাকেন বসুন্ধরা গ্রুপের কর্মকর্তা ঐ দম্পতি। তাই যেতে পারতাম না। কিন্তু আমাদের বারান্দা থেকে তাদের ফ্লোরের কিছু অংশ দেখা যেত। শিশুটিকে মারধরের পর সে যখন বারান্দায় এসে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদত তখন ভীষণ মায়া হতো। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে ঐ ভবনের কয়েক জনকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তারা জানত, শিশুটি তাদেরই সন্তান। তাই এ বিষয় নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। কিন্তু এক দিন আমি শিশুটির সঙ্গে একটু কথা বলতে পেরেছিলাম। তখন জানতে পারলাম, সে এখানে কাজ করে। ঐ দম্পতি তাকে অমানবিক নির্যাতন করে।’

 

 

 

সানজিদা বলেন, এইটুকু বাচ্চা। বয়স বড়জোর ৮ বছর হবে। তাকে দিয়ে কিনা দুহাতে ঘর মোছা থেকে শুরু করে সব কাজ করানো হতো। হয়তো কোনো কাজে ভুল হলে পৈশাচিক নির্যাতন করতেন। বিষয়টি একজন মা হিসেবে আমাকে ভীষণ কষ্ট দিত। দীর্ঘদিন ধরে আমি চেষ্টা করছিলাম শিশুটিকে উদ্ধারের। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণের ব্যবস্থা করতে পারিনি। তাই এতদিন কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

 

 

 

তিনি বলেন, সপ্তাহখানেক আগেও ওরা শিশুটিকে মারধর করেছিলেন। শুনলে অবাক হবেন, ওনারা দেওয়ালের সঙ্গে তার মাথা ঠেসে ধরে তাকে মারতেন। আর শিশুটিকে যখন ঐ নারী (সুরমা) মারতেন তখন তার স্বামী সোফায় বসে আয়েশ করে টিভি দেখতেন, যেন এটা একদম স্বাভাবিক ঘটনা!

 

 

 

সোমবার বিকাল ৩টার দিকে আবারও ওনারা শিশুটিকে মারছিলেন। দেওয়ালে ঠেকিয়ে মারধর করার কারণে শব্দ পেয়ে আমি বারান্দায় গিয়ে ভিডিও করি। কিন্তু ঐ দিকটা বেশ অন্ধকার হওয়ায় তেমন কিছু ধারণ করতে পারিনি। কিন্তু নির্যাতনের প্রমাণ নিয়েছি। পরে তাত্ক্ষণিক ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের অনুরোধ জানাই। পরে গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

 

 

 

সানজিদা বলেন, আমি সকালে শিশুটিকে দেখতে হাসপাতাল গিয়েছিলাম। তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছি। অবাক করা বিষয় হলো, ঐ দম্পতি শিশুটির শরীরের ওপরের অংশে যে শুধু মারধর করতেন তা কিন্তু নয়। এই বাচ্চা মেয়েটার গোপানাঙ্গেও নির্যাতন করতে করতে কালো দাগ বানিয়ে ফেলেছে!

 

 

 

গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান প্রভাতবেলাকে বলেন, থানায় খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গিয়ে বাচ্চাটাকে উদ্ধার করি। রাতেই তার নাক-কান-গলাসহ যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিত্সার ব্যবস্থা করি। আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন হয়েছে। ঐ দম্পতির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে।

 

 

 

ওসি বলেন, শিশুটি তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে অভিযুক্তরা বলছে, শিশুটিকে কিশোরগঞ্জ থেকে আনা হয়েছে। তার বাবা মারা গেছে, মা জেলে। তাই এই দম্পতি শিশুটিকে লালন-পালন করার কথা বলে তার দাদির কাছ থেকে এনেছেন।

 

 

 

মামলার বাদী সানজিদা বলেন, আমি জানি মামলা মানেই হয়রানি। নানান ঝামেলা। কিন্তু যত ঝামেলা, যত বিপদই আসুক—আমি মোকাবিলা করব। এই নির্মমতার কাহিনী যে কারো চোখে পানি আনবে, কেবল ঐ দুজন ছাড়া। আর শিশুটির দায়িত্ব কেউ যদি নিতে না চায়—আমিই নেব।

 

 

 

এদিকে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক’।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 13
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ