মেজর (অব.) সিনহা হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আজ

প্রকাশিত: ১:২৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২২

মেজর (অব.) সিনহা হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আজ
জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম♦ মেজর (অব.) সিনহা হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আজ । বহুল আলোচিত  সেনাবাহিনীর চৌকষ কর্মকর্তা মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষনা হবে আজ সোমবার (৩১ জানুয়ারি) । নির্মম রোমহর্ষক এ হত্যকান্ডের দেড় বছরের মাথায় ঘোষণা হচ্ছে দেশব্যাপি ব্যাপক নাড়া দেয়া এ মামলার রায় ।
সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারি এ মামলার সকল কার্যক্রম শেষে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য্য করেছিলেন। দেশের সম্প্রতি সময়ের অন্যতম আলোচিত এই হত্যা মামলার রায়কে ঘিরে সারাদেশের মানুষ ব্যাপক উত্তেজনায় রয়েছেন। সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় দেখার। সংশ্লিষ্টচ আইনজীবীরা বলেছেন, রায় ঘোষণার তারিখ পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা নেই। সব ঠিকঠাক থাকলে সোমবার রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও দেশের স্মরণকালের আলোচিত মামলা হওয়ায় সিনহা হত্যা মামলার কার্যক্রম বেশ গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদন করা হয়েছে। ঘটনার দেড় বছর হলেও মামলার সাক্ষ্য, জেরা, আলামত প্রদর্শন, রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা, ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক, উভয় পক্ষের সমাপনী বক্তব্যসহ মামলার সকল বিচারিক কার্যক্রম মাত্র ৪০ কার্যদিবসে সমাপ্ত করা হয়েছে।
এই নিয়ে বাদি, বাদিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ বেশ সন্তুষ্ট। আদালতে দায়ের করা মামলা সুত্রে জানা গেছে, গত ২০২০ সালের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর মারিশবনিয়া এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।
তখন নিহত সিনহা মো. রাশেদ খানের গাড়ি থেকে কিছু ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধারের কথা বলে পুলিশ। এঘটনায় পুলিশ নিজেরা বাদী হয়ে পরদিন ১ আগস্ট টেকনাফ থানায় ২টি ও রামু থানায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তখন ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরদিনই পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। পাঁচদিন পর নিহত মেজর (অব.) সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৫ আগস্ট পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি করে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ’র আদালতে ৯ জনের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন।
পরে সেটি টেকনাফ থানায় নিয়মিত মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। মামলাটি আমলে নেয়ার পর কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ র‌্যাব-১৫ কে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে বিচারকের এ নির্দেশ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমে র‌্যাব-১৫ তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) হিসাবে সহকারী পুলিশ সুপার মো: জামিলুল হককে নিয়োগ দেন। এএসপি মো: জামিলুল হক ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত শুধুমাত্র ৮ দিন এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পালন করেন।
মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট থেকে অভিযোগপত্র জমা দেয়া পর্যন্ত তদন্ত কাজ করেন। সুত্রে প্রকাশ, এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীসহ আলোচিত মামলাটির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরদিকে, পুলিশের দায়ের করা ৩টি মামলা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায়, বিচারের জন্য কোন উপদান না থাকায় আদালতে মামলাগুলোর ‘চূড়ান্ত রিপোর্ট’ দেওয়া হয়। র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) বিভিন্ন ধরনের আলামত ও ডিজিটাল কন্টেন্ট আমলে এনে আদালতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের মামলায় চার্জশিট দেন।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালের ৭ জুলাই সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফতি নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহাকে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা পীড়িত হন। সিনহা আরো জেনেছিলেন, কক্সবাজারের টেকনাফ ওসি প্রদীপ কুমার দাশের কথিত রাজ্য ছিল। মূলত তার স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সিনহা ও তার সঙ্গীরা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওসি প্রদীপ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করতেন এবং ইয়াবাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানতে ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত থানায় যান। র‌্যাবের অভিযোগপত্রে বলা হয়, থানায় তাদের অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলে হুমকি দেন প্রদীপ। ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে জানায় র‌্যাব।
চার্জশিটের বক্তব্য মতে, ঘটনার দিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। শামলাপুর এপিবিএন পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর (অব:) সিনহা জীবিত ছিলেন।
এ সময় ওসি প্রদীপ সিনহার ‘মুখমন্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে’ বিকৃত করার চেষ্টা করেন। এর পরই সিনহার মৃত্যু হয়। পরে লোক দেখানোভাবে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে নয়জনকে আসামি করা হলেও তদন্তের পর তিন স্থানীয়সহ আরো ছয়জনকে অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার ১৫ আসামিরা হলেন- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ