যে গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল লেখকের মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর

প্রকাশিত: ৫:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২২

যে গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল লেখকের মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর
যে গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল লেখকের মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর।
জয়নাল আবেদীন জুয়েল♦ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার জীবদ্দশায় একটা বই প্রকাশ করার সাহস করেননি। বইটা বের হয়েছিলো তার মৃত্যুর তিরিশ বৎসর পরে। তার কারণ হলো অনেক সত্য প্রকাশ করা যায়না। যেমন আমাকে কেউ যদি এক কোটি টাকা দিয়ে বলে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু লেখো। আমি এক কোটি টাকার লোভ সংবরণ করতে পারবো। কিন্তুু রাজনীতি নিয়ে দু’কলম লেখার সাহসও আমার নেই। তার কারণ হলো অনেক সত্য আমি বলতে পারবোনা। আর যা লিখবো তার বেশীর ভাগই মিথ্যা হবে। অনেকে হয়তো বলবেন মিথ্যা লিখবেন কেনো, সত্যই লিখুন। আমি পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে বলতে পারবো বাংলাদেশের মাটিতে বসে সত্য কথা প্রকাশ করা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। সুতরাং যে বিষয়ে সত্য বলা কঠিন, সে বিষয় থেকে দূরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি?
ছাত্র জীবনে কখনো কখনো রাজনীতি নিয়ে দু’এক কলম লেখার চেষ্টা করেছি। যখন আমার আব্বা আমাকে বললেন রাজনৈতিক চিন্তা মাথায় জায়গা দিলে তিনি আমাকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবেন, তখন থেকেই আমি রাজনৈতিক অঙ্গনের এক দর্শক মাত্র। আমার আব্বা বলেছেন-” রাজনীতি সবার জন্য নয়। পৃথিবীতে মানুষের সেবা করার আরও অনেক মাধ্যম আছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করে মানুষের সেবা করো। তা না পারলে সাহিত্য দিয়ে মানুষের কাছাকাছি যাও। তাও যদি না পারো তবে অর্থ উপার্জন করে হাজী মহসিন হও। তারপরও তোমাকে যেন কখনো রাজনৈতিক আলাপচারিতায় না দেখি”। আমি আমার পিতার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে যখন পালন করছি, তখন তিনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন উন্নত দেশগুলোর রাজনীতি হলো আসল রাজনীতি। আর গরীব দেশের রাজনীতি হলো ছায়া। ছায়া কখনো আসল হয়না। যা আসল নয় তাতে তুমি জড়াবে কেনো? এর একদিন পরেই আমার আব্বা মারা যান।
আমার জীবনে আমার আব্বা ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষক। আব্বা বলেছিলেন গরীব দেশগুলোর রাজনীতি হলো ছায়ার মত। আমি এত বৎসর পর তার কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারছি। আমি এখন বুঝতে পারছি চীনাদের রাজনীতি হলো আসল রাজনীতি, রাশিয়ার রাজনীতি হলো আসল রাজনীতি, আমেরিকার রাজনীতি হলো আসল রাজনীতি। তারাই সারা পৃথিবী চালায়।
তারা পারমানবিক বোমা বানাতে পারবে। আর কেউ পারবেনা। কারণ তারা সমঝদার, তুমি অবুঝ, তুমি পারমানবিক বোমার ভুল প্রয়োগ করবে। অথচ এই এই পারমানবিক বোমার ভুল প্রয়োগও আমরা দেখেছি। জাতিসংঘ প্রতিষ্টিত হয়েছিলো পৃথিবীতে হানাহানি বন্ধের জন্য। পৃথিবীর হানাহানি কি বন্ধ হয়েছে? যে ইহুদীরা জার্মান থেকে বিতাড়িত হয়ে ইংল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিলো। যে ইংল্যান্ডে তারা কিল-ঘুষি-লাথি খেয়ে ফিলিস্তিনে আশ্রয় নিয়েছিলো। ফিলিস্তিনের মুসলিম ভাইয়েরা সাপকে সাপ না ভেবে নিজেদের ঘরে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলো। সেই সাপ আজ অজগর হয়ে পুরো ফিলিস্তিনকে দংশন করছে।
আর এই কাল সাপকে মদদ দিচ্ছে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যে কি রাজনীতি আছে? হ্যাঁ আছে, তবে তা আসল রাজনীতি নয়, এটা ছায়া। আসল রাজনীতি যদি তারা করতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে দখলদার শক্তি এত বিস্তার লাভ করতোনা। আফগানিস্তানের বেশীর ভাগ লোক আসল রাজনীতি করে। ছায়া রাজনীতির সাথেও জড়িত আছে কেউ কেউ। এরা বিদেশীদের কথায় কান ধরে উঠবস করে। আফগানিস্তানে আসল রাজনীতির ধ্বজ্জ্বাধারী ইসলাম পন্থীরা ক্ষমতা নেওয়ার সাথে সাথে ছায়া রাজনীতির কুশীলবরা প্লেনের চাকায় ধরে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলো, অনেকে পালিয়েও যায়। আর আফগান প্রেসিডেন্টকে তো কেউ সরায়নি। তিনি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারতেন। কিন্তুু প্রাণের ভয় যে কী মারাত্মক ভয়। বেচারা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
ইরানকে আমাদের দেশের কাঠমোল্লারা সহ্য করেননা। বলেন- তারা শিয়া। কিন্তুু এই ইরানীরাও আসল রাজনীতি করে, ছায়া রাজনীতিতে তারা নেই। ইরানের বিরুদ্ধে কত অভিযোগ পশ্চিমাদের। কিন্তুু আদর্শিক প্রশ্নে ইরান অটল। সালমান রুশদী স্যাটানিক ভার্সেস লিখেছিলো। এত জঘন্য একটা বই কোন মুসলমান সমর্থন করতে পারেনা। মুসলিম বিশ্বের সরকার প্রধানরা যখন নীরব। তখন ইমাম খোমেনী রুশদীর মাথার দাম ঘোষণা করলেন। আর তখনই সারা পৃথিবীর মুসলমানরা জেগে উঠলো । আর সেই থেকে মুসলমানরা বুঝতে পারে রুশদীর বিরুদ্ধে কথা বলা ঈমানী দায়ীত্ব।
মধ্যপ্রাচ্যে যদি আসল রাজনীতি থাকতো তাহলে তারাও রুশদীর ব্যাপারে বলিষ্ট ভুমিকা রাখতে পারতো। ইমাম খোমেনী আসল রাজনীতি করতেন, কারো শেখানো পথে তিনি চলতেননা। বাংলাদেশের হাফেজ্জী হুজুর দেখা করেছিলেন ইমাম খোমেনীর সাথে। পঁচিশ মিনিটেরও বেশী সময় তিনি অবস্থান করেছিলেন খোমেনীর সাথে। এত বেশী সময় কোন রাষ্ট্রপ্রধানকেও দেননি ইমাম খোমেনী। হাফেজ্জী হুজুরের ভাষ্যমতে তেহরান থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে এক শহরতলীতে থাকতেন ইমাম খোমেনী। একটা মাত্র রুম, একটা ছোট বিছানা, একটা জায়নামাজ, একটা তসবি জপার মালা। এই ছিলো খোমেনীর সম্পদ। পেশায় ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। কোন ব্যাংক ব্যালেন্স ছিলোনা তার। অথচ এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন তিনি, তার হুংকারে সারা পৃথিবী কাঁপতো। আর প্রশাসক হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল। ইরান থেকে তিনি শত বৎসরের জঞ্জাল দূর করে দিয়েছিলেন।
আমি গভীর ভাবে রাজনৈতিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করি। ডান -বাম সবার বই পড়ি। সবাই সবার দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখে। সবার বইয়ে দু’একটা সত্যের পাশাপাশি হাজারওটা মিথ্যা হজম করতে হয়। বিশেষ করে উপমহাদেশের রাজনীতির গোড়া নিয়ে কেউ লেখেনা। এক না গুণে দুই থেকে শুরু করা হয়, যা মুলতঃ ইতিহাস নয়, আবর্জনা। আরও আছে বিদ্বেষ, সমালোচনা মানে সব দিক নিয়ে আলোচনা। কিন্তুু সমালোচনার গ্রন্থ নেই বললেই চলে। যা আছে তা একপেশে আলোচনা।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জীবদ্দশায় যে বই বের করার সাহস করেননি, সে বই আমরা পড়লাম তার মৃত্যুর তিরিশ বৎসর পর। এতদিন যে মানুষটা ছিলেন অনেকের কাছে হিরো। বই প্রকাশের পর তারাই তার সমালোচনায় মাঠ কাঁপাতে শুরু করলেন।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সব বই-ই আমি পড়েছি। তার অমর এক গ্রন্থের নাম মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা। এই গ্রন্থে হযরত মাবিয়া প্রসঙ্গ এসেছে, এসেছে এজিদ প্রসংগও।
তিনি উপমহাদেশের এক বড় রাজনীতিবিদ। নেহেরুর সাথে, গান্ধির সাথে রাজনীতি করেছেন। তিনিও অনেক সময় প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে পারেননি। জীবনে অনেক সাপের কামড় খেয়েছেন, কিন্তুু উফ বলেননি। আসলে জীবনটা এরকমই। সত্য বলার জন্য একটা বিশাল প্লাটফর্ম তৈরী না করে সত্য বলা বোকামী। আমি এটা বুঝি। আর বুঝি বলেই নিজের মুখে কুলুপ এঁটে আছি। আর কলমকেও অনেক ফালতু বিষয় থেকে দূরে রেখেছি। জানিনা কখনো, কোনদিনও সত্য প্রকাশের সুযোগ আসবে কিনা। আপাততঃ আল্লাহর কথাই হোক আমার কথা। রাসুলের কথাই হোক আমার গলার মালা। আর ইসলামের প্রচারই হোক আমার জীবনের সাধনা। কেউ আমাকে পছন্দ করুক বা করুক, আমার সাধনা চলবেই।
জয়নাল আবেদীন জুয়েল, বিশিষ্ট ছড়াকার, বিশ্বাসের সপক্ষের লেখক।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ