রাসেলের কারামুক্তি’তে ডেপুটি জেলারের বানরভেল্কি

প্রকাশিত: ২:১৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০২০

রাসেলের কারামুক্তি’তে ডেপুটি জেলারের বানরভেল্কি

♦ কবীর আহমদ সোহেল ♦  বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০। অপরাহ্ন ৩টা ১৫ মিনিটি থেকে রাত ৮টা ৪০। শ্বাসরুদ্ধকর ৫ ঘন্টা ২৫ মিনিট। প্রজাতন্ত্রের এক কর্মচারীর বানরভেল্কী এবং এক গণমাধ্যমকর্মী,মেধাবী ছাত্রনেতার কারামুক্তি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মূল অন্তরায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাই। মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার হরণকারীও এরাই। কিন্তু এরা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। চিরকাল থাকতে পারেনা। সবার চোখকে ফাঁকি দিতেও পারেনা। যতেই ক্ষমতা ভাবুক নিজেকে। এক সময় এরা ধরা খায় কারো না কারো কাছে। তার অজস্র প্রমাণ  দৃশ্যমান। সেদিকে যেতে চাইনা।

 

মাসরুর রাসেল সিলেট নগরীর পরিচিত মুখ। গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও রয়েছে আলাদা পরিচিতি। তার একটা রাজনৈতিক পরিচিতিও রয়েছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সিলেট জেলা শাখার সহ সভাপতি। বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকের রাজনীতি করবার অধিকার তার সাংবিধানিক অধিকার। ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মাসরুর রাসেলকে গ্রেফতার করে শাদা পোষাকধারী পুলিশ। ২০১৮ সালের মিথ্যা ভিত্তিহীন একটি গায়েবী মামলার পরোয়ানাভূক্ত আসামী হিসেবে।

 

২৮ অক্টোবর, ২০২০  তাকে জামিন দেন আদালত। যথারীতি জামিনের ছাড়পত্র নিয়ে আমরা কারাগারে যাই। বিকেল সোয়া তিনটায় কারাগারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজপত্র জমা দেই। সাড়ে ৫টার দিকে জেল গেটের দেয়ালে জামিনপ্রাপ্তদের নাম লেখা নোটিশ টানানো হয়। সেখানে মাসরুর রাসেলের নাম ১৩ ক্রমিকে রাখা হয়। আমার সাথে রাসেলের ৩০/৩৫ জন বন্ধুবান্ধব। আমরা জেল গেটের সামনেই পাঁয়চারী করছি। পৌনে ৬ টার দিকে ডেপুটি জেলার সালাম তালুকদার আমার সেল ফোনে কল দেন। আমাকে জানান রাসেলের ‘কাস্টডি লেটার’ আসেনি। আমি বল্লাম আমাকে কি করতে হবে। তিনি বল্লেন, অপেক্ষা করতে হবে। কাস্টডি থেকে শেষ গাড়ীর সাথে এটা আসে। অনন্যপায় আমি বল্লাম ‘ঠিক আছে’।

 

৬টা ৪০ মিনিটে কাস্টডি থেকে গাড়ী পৌঁছলো কারাগারে। ইতোমধ্যে অন্যান্য জামিনপ্রাপ্তরা বেরিয়ে গেছে। কারাগারের চারপাশ ঘোর আধারে ছেয়ে পড়ছে। মাঝে মধ্যে দু’ একজন কারারক্ষী এসে শান্তনার বাণী শোনায়। ৭টার দিকে আমি কল দিলাম সালাম তালুকদারকে। জানতে চাইলাম ‘কাস্টডি লেটার’ কি পেয়েছেন? সাবলীল জবাব দিলেন হ্যাঁ পেয়েছি। আমরা আশান্বিত হলাম।

 

তারপর। আরো ঘন্টাখানেক গড়িয়ে গেল। কোন খোঁজ খবর পাচ্ছিনা। জেলগেটে পায়চারী করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। সাথে থাকা অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন আমার বড়ভাই। বাকীরা সব রাসেলের বয়সী, জুনিয়র। একটু পরপর তারা জানতে চায়, ভাই ‍কি হলো? একটু খবর নেন। এক পর্যায়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম। মূল গেটে যাবার আগেই জেলার গাড়ী যোগে বেরিয়ে গেলেন। আমি কথাই বলতে পারলামনা। মুলগেটের সামনে প্রহরারত রক্ষীরা জানতে চাইলো ভেতরে যাবো কি না। আমি বল্লাম ‘না’। এখানেই দাাঁড়াই। রাত ৭টা ৫০। গেট দিয়ে বেরুলেন ডেপুটি জেলার সালাম তালুকদার। আমাকে দেখেই বল্লেন , একটু ঝামেলা হয়ে গেছে। বলেই জেলার এর সাথে কথা বল্লেন, রাসেল বিষয় নিয়ে। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কি এমন সমস্যা দেখা দিল?

 

ডেপুটি জেলার ফোনে কথা বলছেন আর হাটছেন। আমি তার সাথে হাটছি। এক সময় বল্লেন, তার কাস্টডিতে লেখা সে ছাত্রদলের  সহ- সভাপতি। আমি তাতে হয়েছে কি? জানালেন ক্লিয়ারেন্স লাগবে।  আপনি থাকুন , আমি আসছি বলে আরেকজনকে নিয়ে মোটর সাইকেল চড়ে বেরিয়ে গেলেন। কথার ধরণ আমার কাছে কেমন জানি মনে হলো। কতক্ষণ অপেক্ষা করবো? এই যখন ভাবছি তখন আমার নিজস্ব সোর্স থেকে মেসেজ এলো ডেপুটি জেলার এসএমপি, ডিজিএফআই, এনএসআই সহ বিভিন্ন সংস্থায় ইনফরমেশন পাঠিয়ে দিয়েছেন। শ্যন এরেস্ট অথবা জেল গেট থেকে রাসেল আবার গ্রেফতার হবে এমন আভাস আমাকে দেয়া হলো। ডেপুটি জেলার বুঝতে পারলেন না, উনি চাকরী করেন, তার ডিমোশন প্রমোশন আছে। আছে ট্রান্সফার। আমি চাকরী করিনা। সাংবাদিকতা করি। সম্পাদক এর পর আর প্রমোশন নেই। নিজে প্রকাশক হলে ডিমোশনের আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশের কোন থানায় আমার বিরুদ্ধে মামলা তো দুরে কোন জিডিও নেই। বুকে বল নিয়ে দাঁড়ালাম।

 

ডেপুটি জেলার কোথায় গেলেন। পেছনে সোর্স লাগিয়ে দেলাম। আমি নিজে এত বড় মানুষ নই। কিন্তু হাত তো একবারে খাটো নয়। উপর মহলের ২/১ জনকে অবহিত করলাম সিচ্যুয়েশন। কথা বল্লাম সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে। তিনি সরাসরি রাসেলের গ্রেফতার পরবর্তী সব বিষয় দেখভাল করছিলেন। মেয়রকে ডেপুটি জেলারের এমন আচরণের কথা জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। আমাকে লাইনে রেখে অন্য ফোনে কথা বলেন জেলারের সাথে। জানতে চান রাসেলকে ছাড়া হচ্ছেনা কেন? জেলারকে ১৫ মিনিট সময় দেন মেয়র আরিফ। ১০ মিনিট পেরুতে না পেরুতেই ডেপুটি জেলার ফিরে এলেন। গেইট থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

 

ডেপুটি জেলারের কক্ষে ঢুকেই রাসেলকে দেখলাম। মলিন মুখ, খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। ডেপুটি জেলার এরমধ্যে ব্যখ্যা দিতে শুরু করলেন। সাংবাদিকদের গোস্টী উদ্ধার করলেন। বারবার বল্লেন, সে যে ছাত্রদলের সহ সভাপতি তা তিনি জানতেন না। তিনি জানতেন সাংবাদিক। জানলে না জানি কি করতেন? তাকে জামায়াত- বিএনপির লোক বলা হবে। ইত্যাদি নানান অগোছালো কথাবার্তা। আমি বুঝলাম অতি সাধু বনতে গিয়ে ‘চিপায়’ পড়ছেন সালাম সাহেব। এবার শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা। উনি বুঝতে চাইলেন না রাসেল কতটুকু ক্লিন ইমেজের হলে পরে রাস্ট্রপক্ষের আইনজীবি (পিপি) বলতে পারেন, সে সাংবাদিক, রাজনীতি করতে পারে। তাকে জামিন দিলে আমার কোন আপত্তি নেই।

 

সালাম সাহেব বল্লেন, আমি বন্ড সাইন দিতে হবে। বল্লাম দেব। কি লিখবো বলেন। আমি আমার ভাইকে সমজিয়ে নিলাম-লিখে সাইন দিলাম । তখনও দুই ভাই জেলের ভেতরে। বল্লেন মেয়র সাহেবকে বলতে রাসেলকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমি কৌশলে উঠে গিয়ে অন্য কথা বল্লাম। বুঝলাম জেল গেট থেকে তুলে নেয়া হবে রাসেলকে। এ ব্যবস্থা ডেপুটি জেলার করে ফেলেছেন। আমি ডেপুটি জেলারের সামনে চেয়ারে বসা। রাসেল একটু দুরে দাঁড়ানো। তাকে এ বিষয়টা ইনফর্ম করতে পারছিনা। ইশারায় বুঝাতে চাইলাম। তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে আসতে বুঝলাম, সে বুঝে গেছে এবং প্রিপেয়ার্ড। ডেপুটি জেলার বল্লেন, আমি ছেড়ে দিলাম গেইট থেকে তাকে কেউ ধরে নিলে দায় দায়িত্ব আমার না।

 

ভাবলাম এরা এইটুকু ক্ষমতাতে এতটুকু দেখায়। জানেনা আমাদের ক্ষমতা কতটুকু আর তার উৎস কোথায়? সালাম তালুকদারকে বল্লাম সে দাযিত্ব আমার উপর ছেড়ে দিন। জেল গেইটে আমার হাত থেকে আমার ভাইকে কেউ নেবেনা, নিতে পারবেনা। ইনশাআল্লাহ। সালাম সাহেব বারবার তাকে সহযোগিতার কথা বলছিলেন। অভয় দিলাম। যেকোন প্রয়োজনে ডাকবেন। সহযোগিতা পাবেন।রাত ৮টা ৪০ মিনিটে কারাগার থেকে রাসেলকে নিয়ে বেরুলাম। সাড়ে ৯ টায় বাসায় পৌঁছলাম। শ্বাসরুদ্ধকর ৫ ঘন্টা ২৫ মিনিট অতিক্রান্ত করলাম।কোন শক্তিতে?

 

বিশ্বাসের শক্তি। সৃষ্টিকর্তাতেই বিশ্বাসী আমরা। আরো শক্তি আমাদের মা বাবা। আমরা যখন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে। তখন সেজদায় আমাদের মা। দু’হাত তুলে চোখের জল ফেলছেন অশীতিপর বাবা। এই আকাশ আর জমিনের মালিকের সরাসরি হেফাজতে আমরা।

দুনিয়ার ক্ষমতাধরদের তোয়াক্কা তেমন একটা করিনা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 551
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ