প্রভাতবেলা : ১০ বছর ধরে লড়াই করছে

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০১৭

 ফায়যুর রাহমান : দৈনিক প্রভাতবেলা দশ বছর  পূর্ণ করছে। এই নিদানের কালে একটি প্রিন্ট পত্রিকার জন্য দশ বছর টিকে থাকা যে কতোটা সংগ্রামের, এটা সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত লোকেরাই কেবল বোঝেন। ইন্টারনেট-প্রযুক্তির এই কালে বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোও যেখানে প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের একটি ছোট্ট শহরে একটি দৈনিকের দশ বছর টিকে থাকা যে বিরাট ঘটনা, সন্দেহ নেই। দৈনিক প্রভাতবেলা সেই বিরাট কাজটি করেছে। অর্থের অপ্রতুলতা ও নানামুখি প্রতিকুলতার মধ্যেও দশ বছর ধরে লড়াই করছে।

দৈনিক প্রভাতবেলার সঙ্গে অনেক স্মৃতি মিশে আছে। স্মৃতিটা সুখের। দুঃখেরও। পত্রিকাটির যাত্রাকাল থেকেই আমি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন দৈনিক শ্যামল সিলেটে কাজ করতাম আমি ও নোমান বিন আরমান। একদিন শুনলাম সিলেটভিত্তিক একটি জাতীয় পত্রিকা আসছে। রঙিন পত্রিকা। ঢাকা থেকে ছাপা হবে। কিন্তু মালিক-সম্পাদক সবাই সিলেটের। আমরা খুব আগ্রহী হলাম। স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলাম। পত্রিকাটির সম্পাদক হলেন কবীর আহমদ সুহেল। বার্তা সম্পাদক চৌধুরী আমিরুল হোসেন।

নতুনদের একটা টিম নিয়ে পত্রিকাটি যাত্রা শুরু করলো। প্রয়াত সাংবাদিক আবদুর রাহমান ভাই এই টিমের লিডার হলেন। তিনি তরুণদের পুরো টিমকে ট্রেইনআপ করলেন। সপ্তাহব্যাপি সাংবাদিকতার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দিলেন। এর পর তিনি চিফ রিপোর্টার হিসেবে এই টিমকে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। দক্ষ সেনাপতির মতো। ফলাফল যা হবার তাই হলো। পত্রিকাটি অল্প দিনেই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করলো। একটা পুরো হাউজ তারুণ্যে ভরপুর হলে যা হয়, গতিশীলতা ও প্রতিযোগিতা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়, প্রভাতবেলার ক্ষেত্রে তাই হয়েছিলো। একটা উদ্যমশীলতার ভিতর দিয়ে তরুণরা কাজ করতো। রাহমান ভাই সবাইকে এ্যাসাইনমেন্ট দিতেন। এ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়ার পর নিজ হাতে সংশোধন করতেন। দুর্বলতাগুলো বুঝিয়ে দিতেন। বকতেনও। কিন্তু কেউ মন খারাপ করতো না। তরুণদেরকে চালিত করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিলো রাহমান ভাইয়ের। আমাকে ভালোবাসতেন সম্ভবত একটু বেশি। ফলে কাজও করাতেন বেশি। তিনি জানতেন, কাজ না করলে শেখা হবে না।

আরও পড়ুন  চলে গেলেন ক্যাপ্টেন আবিদের স্ত্রী

তখন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে। আমাকে বললেন সিলেট নগরীর ২৭ ওয়ার্ডের ওপর ২৭টি প্রতিবেদন করো। কোন ওয়ার্ডের কী সমস্যা, সেটা তোমার রিপোর্টে আসতে হবে। আমি কাজ শুরু করলাম। নগরের প্রায় প্রতিটি গলিতে হাঁটলাম। প্রতিবেদন করা শুরু করলাম। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় পরে অবশ্য আমার কাজে অন্যরাও যুক্ত হয়েছিলো।

পত্রিকাটি প্রকাশনার শততম দিনে সকল স্টাফকে নিয়ে নৈষভোজের আয়োজন হলো। একশো’ দিনের অর্জন-বিসর্জন নিয়ে আলোচনা হলো। এ অনুষ্ঠানে আমাকে শতদিনের শ্রেষ্ঠ রিপোর্টার হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছিলো। দুঃখজনক সত্য হলো আর্থিক কারণে সব গতিশীলতা স্থায়ী হয় না। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। যে ব্যবসায়িক গ্রুপটি প্রভাতবেলার অর্থায়ন করতো, তারা হাত গুটিয়ে নিলো। পত্রিকাটি অর্থসংকটে পড়লো। বাধ্য হয়ে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম।

আমি আবার শ্যামল সিলেটে ফিরে গেলাম। নোমান সম্ভবত সবুজ সিলেটে চলে গেলো। আলমগীর হোসেন, ফয়সল হোসেন বাবুল, মুক্তা, কামাল ও জেবু সাংবাদিকতা ছেড়ে দিলো। দুইএকজন বিদেশে চলে গেলো। এভাবেই একটি উদ্যমী টিম নাই হয়ে গেলো। প্রভাতবেলা যদি তার সূচনালগ্নের গতিশীলতা ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারতো, তাহলো আজ সিলেটের সংবাদপত্রের জগতে অন্য রকম চিত্র থাকতো। কিন্তু সেটা হয়নি। আর্থিক সংকটের কারণে কীভাবে একটা বিপুল সম্ভাবনা মুখ তুবড়ে পড়ে, প্রভাতবেলা তার উদাহরণ।

আরও পড়ুন  ওসমানীনগরে প্রতিপক্ষের সুলফীর আঘাতে একজন খুন

যে ব্যবসায়িক গ্রুপটি পত্রিকার অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিলো, তারা ভেবেছিলো টাকাগুলো অযথা জলে না ফেলে বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবে। সেটা তো পারেই নি, উপরন্তু তারাই নাই হয়ে গেছে। পত্রিকাটিতে তাদের বিনিয়োগ থাকলে হয়তো তাদের অস্তিত্বটা কিছুটা হলেও বিদ্যমান থাকতো। আজ তাও দেখা যাচ্ছে না। তাই আজকের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের একটা সত্য বুঝতে হবে, যে, সংবাদপত্রে বিনিয়োগ শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটায়। বিনাশ নয়।

ফায়যুর রহমান, সাবেক স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক প্রভাতবেলা

সর্বশেষ সংবাদ