কি কারিশমা দেখাবেন মেয়র আরিফ?

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২২

কি কারিশমা দেখাবেন মেয়র আরিফ?

কবীর আহমদ সোহেল♦ দু:সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ এক যুগের অধিক সময় ধরে রাজনৈতিক ‘বেডপ্যাচ’- এ বিএনপি। তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত হামলা, মামলা, হুলিয়া, নির্যাতন, নিপীড়ন, উৎপীড়নের যাঁতাকলে নিস্পিষ্ট। তার ওপর বেগম জিয়ার অসুস্থতা দলের নেতাকর্মীকে অনেকটা ‘ব্যাকফুট’-এ ঠেলে দিয়েছে। ঠিক এই সময়ে সিলেট জেলা বিএনপি’র সম্মেলন ও কাউন্সিল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল ২১ মার্চ সোমবার এই সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবার কথা।

সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে এ সম্মেলনে বিএনপি’র মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসেব উপস্থিত থাকবেন। নানা কারণে সিলেট জেলা বিএনপি’র এই কাউন্সিলকে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিটি অর্জনের প্রেক্ষাপটে সিলেটের ভূমিকা ছিল অগ্রনী। ১৯৪৭ এর রেফারেন্ডাম, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ অভ্যূত্থান, ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সবকটিতে সিলেটের ভূমিকা ছিল অনবদ্য, অগ্রনী। সঙ্গত কারণে রাজনৈতিক এই দু:সময়ে সিলেট জেলা বিএনপি’র কাউন্সিল গোটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিপরিবর্তনের ‘সবুজ সংকেত’- বলে বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল।

 

সিলেট জেলা বিএনপি’র কাউন্সিলকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে যেন প্রাণের সঞ্চার বইছে। দীর্ঘদিনের নির্জিবতা কাটিয়ে সজিব সক্রিয় নেতাকর্মী মাটঘাট, হাটবাজার, প্রান্তর সরব করে রেখেছেন। প্রায় দু’হাজার (১৮১৮) কাউন্সিলর ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচিত করবেন। কিন্তু লাখো নেতাকর্মী এই নেতৃত্ব নির্বাচনের পেছনে সক্রিয় রয়েছেন।

সিলেট জেলা বিএনপি’র কাউন্সিলকে নিয়ে এত প্রাণ চাঞ্চ্যল্যের প্রধাণ কারণ সভাপতি পদে আরিফুল হক চৌধুরীর প্রার্থীতা। তাঁর প্রার্থীতা ঘোষণার পর থেকেই বদলে গেছে আবহ। বেড়ে গেছে এই কাউন্সিলের গুরুত্ব। দেশ- বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকমহল চোখ রাখছেন বিএনপি’র জেলা পর্যায়ের এই কাউন্সিলে। কারণ একটাই । জেলা বিএনপি’র সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় রয়েছেন আবুল কাহের চৌধুরী শামীম ও আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

কাউন্সিলরদের ভাষ্যমতে সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি প্রার্থী হিসেবে আরিফুল হক চৌধুরী মুলত অপ্রতিদ্বন্দি, অনন্য। অভিযোগ অনুযোগ থাকলেও লীডার হিসেবে আরিফুল হক চৌধুরী স্থানীয় নেতাকর্মীদের ‘ফার্স্ট চয়েজ’। প্রভাতবেলা’র অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায় শুধু বিএনপি ঘরানায় নয়, সকল রাজনৈতিক দল মতের মানুষের কাছে আঞ্চলিক নেতা হিসেবে আরিফুল হক চৌধুরী ‘ফার্স্ট চয়েজ’।

মেয়র আরিফ চৌধুরীর প্রতি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার পেছনে কারণ কি? অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, বহু কারণ। দলীয় নেতাকর্মীদের পছন্দের শীর্ষে থাকার পেছনে প্রধান কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি বিশেষের হাতে কুক্ষিগত থাকা সিলেট বিএনপি’র নেতৃত্ব মুক্ত করতে আরিফের বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত: ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু করা আরিফ চৌধুরী আদর্শ বিচ্যুত হননি আজো। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শে অবিচল রয়েছেন। শহীদ জিয়ার আদর্শবাদি হিসেবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে আরিফ গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষে। চতূর্থত: সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ঘনিষ্ট আস্থাভাজন হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। দলীয় নেতাকর্মীদের বিরাট অংশ সাইফুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরুপ আরিফকে ভালোবাসে।পঞ্চমত: আরিফ চৌধুরী কারিশমা জানেন। অনেকের কাছে তিনি ‘ক্যারিশম্যাটিক লীডার’। দলের ভেতরে- বাইরে তিনি ক্যারিশমা দেখান, দেখিয়েছেন আগামীতেও দেখাবেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ১০ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আরিফ চৌধুরী অনবদ্য ‘ক্যারিশমা’ দেখিয়ে বিজয়ের মালা পরিধান করেন। যা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে অনুসরণযোগ্য। ৬ষ্ঠত: সহনশীল চরিত্র। আরিফ চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য হলো সহনশীলতা। গ্রুপিং রাজনীতি মোকাবেলায় তিনি দক্ষ কারিগর। দলীয় একাধিক সুত্র বলছে, আরিফকে গালি দিলে তিনি পাল্টা গালি দেননা। অসহনশীল, আশালীন আচরণ করেননা।

 

তিনি হজম করে নেন, হজম করতে জানেন। সপ্তমত: আরিফের ‘ফিনিক্স পাখিরুপ’। হারতে হারতে জিতে যান আরিফ। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে ভয়াবহ সড়ক দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া। ১/১১ পরবর্তী সরকারের আমলে কারাবরণ। ২০১৩ সালে সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হবার পর সরকারের নিষ্ঠুর রোষানল, কারাবরণ,মামলা মোকাবেলা করে স্বপদে বহাল থাকা অনেকটা ফিনিক্স পাখির মতোই আরিফ চৌধুরী। প্রভাতবেলা’র অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ২১ টি কারণের মধ্যে ৭টি প্রধান কারণ উপস্থাপন করা হলো। যেগুলো আরিফের অসম্ভব গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করেছে দলের ভেতরে বাহিরে। ২১ মার্চের কাউন্সিলে দলীয় কাউন্সিলররা এসব বিবেচনায় আরিফুল হক চৌধুরীকে তাদের সভাপতি নির্বাচিত করবেন মাঠ পর্যায়ে জরিপে এমনটা নিশ্চিতই বলা যায়।

 

আরিফুল হক চৌধুরী তৃণমূল রাজনীতির অনুপম দৃষ্টান্ত। তাঁর বহু গুণ অনুকরণীয়। তিনি স্বপ্ন দেখতে জানেন। স্বপ্ন দেখেন তা বাস্তবায়নও করতে জানেন। তাঁর স্বপ্নের বুনন সুনিপূণ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু করে তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর বিএনপি’র সভাপতি, বিএনপি কেন্দ্রিয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রিয় নেতৃত্বে স্থান পেয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী।

 

ষাটোর্ধ বয়সি আরিফুল হক চৌধুরী। ১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। শফিকুল হক চৌধুরী ও আমেনা খাতুনের গর্বিত সন্তান। ৬২ বছরের জীবনে প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতি করছেন। তাঁর এক সময়ের স্বপ্ন’র সফল বাস্তবায়ন। শুধু দলীয় রাজনীতি করবেন, বড় নেতা হবেন এমন স্বপ্নে থেমে থাকেননি আরিফ। তিনি স্বপ্ন বুনেন জনগণের সেবা, সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে। সিলেট নগরীর কুমারপড়াস্থ বাসভবনে সিলেট নগরের ইতিবৃত্ত ও উন্নয়ন নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত যে পরিকল্পনা,স্টাডি ও সংগ্রহ আছে , সরকারি বা বেসরকারী কোন সংস্থার কাছেও এমনটি নেই।

 

আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুরু করেন ২০০১ সালে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়ন কার্যক্রমের সুযোগ পান আরিফ। তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ঘনিষ্টজন হিসেবে সিলেটের উন্নয়ন কার্যক্রম দেখভালের সুযোগ পান তিনি। আরিফকে তখন বলা হতো ‘ছায়ামন্ত্রী’। ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে কমিশনার পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন আরিফ। যদিও চারদলীয় জোটের মেয়র প্রার্থী আব্দুল হক পরাজিত হন। ১৮ নং ওয়ার্ডের কমিশনার হিসেবে সিটি করপোরেশনে অভিষিক্ত হন আরিফ। ওয়ার্ড কমিশনার এর পাশাপাশি নগর উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পান আরিফ চৌধুরী। দুর্দান্ত প্রতাপ আর প্রভাবে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেন তিনি। চারদলীয় জোট সরকারের পুরো সময় ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম চালান আরিফ।

 

জোট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবার পর আরিফের জীবনে আসে ছন্দপতন। ১/১১ পরবর্তী সেনা সমর্থিত সরকারের রোষানলে পড়েন আরিফ। শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকায় আরিফের নাম যুক্ত হয়। মামলার পর মামলা দায়ের হয়। ২০০৭ সালে আরিফ আত্মসমর্পন করেন। দীর্ঘদিন কারান্তরীণ থাকেন। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। এক পর্যায়ে জামিনে মুক্ত হন আরিফুল হক চৌধুরী।

 

ধীরে ধীরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হন আরিফ। জয়লাভ করেন। প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্বকাল খুব একটা সুখের ছিলোনা আরিফের। কখনো কারাগারে, কখনো বাহিরে। সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা মামলায় আরিফকে আসামী করা হয়। বেকায়দায় পড়ে যান আরিফ। আদালত, ফৌজদারী কারাগার আর নগরপিতার প্রথম দায়িত্বের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় কেটে যায় ৫ বছর।

 

২০১৮ সালের ১০ জুন সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে দ্বিতীয়বারের মত প্রার্থী হন আরিফ। সরকারী রোষানল- ষড়যন্ত্র, শরীক দলের বৈরিতা মোকাবেলা করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন আরিফ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আরিফের এ বিজয় প্রশংসা কুড়ায়। বিশেষ করে আগের রাতে শাসকেদলের প্রার্থীর ভোট কাস্টিং, নির্বাচনের দিন প্রকাশ্যে দিবালোকে ভোটকেন্দ্র দখল, বিএনপি’র এজেন্টদেও বের করে দেয়ার পরও ফলাফল আরিফের পক্ষে তা ‘ আরিফের কারিশমা’ বলতেই হয়।

এ যাত্রায় মেয়র নির্বাচিত হয়ে আরিফ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। একটি আধুনিক নৈস্বর্গিক নগরী গড়ার উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন দীপ্ত পদে। শাসকদলের রোষানল মোকাবেলায় কৌশলী আরিফ কখনো রক্ষণাত্মক, কখনো আক্রমণাত্মক। আওয়ামীলীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে সংবর্ধনা প্রদান করে পরমতসহিষ্ণু সহনশীল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আরিফুল হক চৌধুরী।

 

একই সময়ে তাঁর আদর্শের রাজনীতি নিয়ে ভাবেন আরিফ। সাইফুর রহমান – ইলিয়াস আলীর ত্যাগ ও সংগ্রামে গড়া সিলেট বিএনপি মহল বিশেষের হাতে কুক্ষিগত। ড্রয়িং-রুমে বন্দি সিলেট বিএনপি। এই অবস্থা আরিফুল হক চৌধুরী মেনে নিতে পারেন না। সেই মানসিকতায় নেতৃত্বে শক্ত ভূমিকা রাখতে চান তিনি। তাইতো তিনি সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী বলছেন,দল আমাকে অনেক দিয়েছে, আমার এখন দেবার পালা। কাউন্সিলররা বলছেন আগামীকালের সম্মেলন ও কাউন্সিলে আরিফুল হক চৌধুরী নতুন ক্যারিশমা দেখিয়ে সিলেট বিএনপি’র নেতৃত্বে আসীন হবেন। সিলেট বিএনপি ফিরে পাবে তার গতিপথ। তৃণমূল নেতাকর্মী পাবে কাংখিত নেতৃত্ব।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ