চলুন গরুর চামড়া খাওয়া শুরু করি

প্রকাশিত: ৩:২৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০

চলুন গরুর চামড়া খাওয়া শুরু করি

♦ ডা. ফাহাদ লিমু ♦ হালাল পশুর যে ৭টি অঙ্গ খাওয়া নিষিদ্ধ (হারাম বা মাকরূহ) সেগুলো হলো-
১- প্রবাহিত রক্ত।
২- নর প্রাণীর পুং লিঙ্গ।
৩- অন্ডকোষ।
৪- মাদী প্রাণীর স্ত্রী লিঙ্গ।
৫- মাংসগ্রন্থি।
৬- মুত্রথলি।
৭- পিত্ত।
এই তালিকায় কিন্তু চামড়া নেই।

অনেকে লিখছেন- “কোরবানীর চামড়া মাটির নিচে পুতে ফেলুন”। আমার মনে হয়- এটা ভুল সিদ্ধান্ত।

যেহেতু ইসলামের বিধান মতে কোরবানীর পশুর চামড়া খাওয়া নিষিদ্ধ নয়; সেহেতু এটি খেয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানো যেতে পারে।

বিশ্বের বহু মুসলিম দেশ যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াতে মুসলমানরা পশুর চামড়া খায়।

চামড়ার স্বাদের সাথে আমরাও কম বেশী পরিচিত। অনেকেই হয়তো চোখ কপালে তুলে বলবেন, ‘আমরা আবার চামড়া খেলাম কখন?’

তাদের জ্ঞাতার্থে- চামড়া না খেলেও গরুর পায়ার নেহারি নিশ্চয় সকলের খাওয়া হয়েছে। এই পায়ার খুরের ওপরের অংশটি কিন্তু চামড়াসহ নেয়া হয়। সেদ্ধ করার পর লোম উঠে যায়, এর পরে খুরের সাথে ওই চামড়াটিও রান্না করা হয়, যা খেতে অতি সুস্বাদু। আমাদের এলাকায় কোরবানীর গরু যারা কাটাকুটি করে এরা গরুর মাথার চামড়াটি রান্না করে খাওয়ার জন্য নিয়ে যায়, এদের জিজ্ঞেস করে জেনেছি এটা খেতে নাকি খুব টেস্টি।

চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার করলে সেই চামড়া সিন্ডিকেটওয়ালাদের কাছে কম দামে বিক্রি না করে খেয়ে ফেলা হবে অধিক লাভজনক। আর একবার যদি বাঙালি এটা খাওয়া শুরু করে দেয়; তখন মাংসের দোকানেই চামড়া কেজি দরে বিক্রি শুরু হয়ে যাবে। ঈদ ম্যাগাজিনে দুই পাতা জুড়ে থাকবে ‘গরুর চামড়ার তিন পদ’ নামের আর্টিকেল আর কেকা ফেরদৌসি টিভি অনুষ্ঠানে নিয়ে আসবেন, ‘গরুর চামড়ার তেহারি’ নামের কোনো মজাদার রেসিপি।

আসলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে চামড়া খাওয়ার কালচার গড়ে উঠেনি বলেই এদেশে ট্যানারি শিল্প দ্রুত বেড়ে উঠেছে। অপরদিকে অন্য মুসলমান দেশগুলোতে চামড়া খেয়ে ফেলা হয় বিধায়, তাদের দেশের ট্যানারি শিল্প তেমন বেশি প্রসার লাভ করেনি। তবে হ্যাঁ, তারাও চামড়ার ট্যানারি নিয়ে কিছু কাজ করে, কিন্তু সেটা অন্য কোন উপায়ে মৃত পশুর চামড়া, ধর্মীয় উপায়ে জবাই করা পশুর চামড়া নয়।

চামড়া খায় কিভাবে ?
হ্যা, চামড়া খাওয়া যায়। উচ্চতাপমাত্রা বা গরম পানিতে চামড়া ডুবিয়ে দিলে পশমগুলো উঠে আসে, তখন পুরো চামড়াটা পাওয়া যায়। আমার কিছু বিদেশী মুসলিম বন্ধুর কাছে বিষয়টি জিজ্ঞেস করেছিলাম স্বাদ কেমন। তাদের বক্তব্য- একেক স্থানের চামড়ার একের রকম স্বাদ। আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্রে গরুর চামড়া দিয়ে অনেক স্পেশাল আইটেম রান্না করা হয়, সেগুলো দেশ বিদেশে প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশেও অনেক এলাকায় গরুর মাথার চামড়া খাওয়ার প্রচলন আছে, যা নেহারীর পায়ার রবারের মত অংশের সাথে তুলনা করা যায়।

চামড়ায় কি থাকে ?
আসলে আমরা চামড়া বলতে বুঝি শুধু উপরের পশমী অংশ। কিন্তু চামড়ার মূল অংশটা কিন্তু থাকে ভেতরে, যেটাকে বলা হয় কোলাজেন। গরুর চামড়ায় কোলাজেনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই গরুর চামড়া বেশি উপদেয়। উপরের পশমী অংশটা (বা চাইলে শক্ত অংশটাও) যদি ফেলে দেয়া যায়, তবে ভেতরে কোলাজেন নামক প্রোটিন পাওয়া সম্ভব, যা মাংসের মতই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য।

চামড়া খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে কি লাভ হবে ?
আমাদের দেশে এতদিন কোরবানীর পশুর চামড়া মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিং এতিমখানা দান হিসেবে ব্যবহৃত হতো । কিন্তু গত বেশ কিছু বছর যাবত চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় মাদ্রাসায় সেই টাকা আসছে না এবং কবে নাগাদ চামড়ার দাম বাড়বে তাও বলা যাচ্ছে না। ট্যানারির মালিকদেরও একটা ধারণা তৈরী হয়ে গেছে, “যদি আমরা চামড়া না নেই, তবে চামড়া পচে যাবে, তাই যত কম দামই দেই না কেন, চামড়া আমাদের কাছে আসবেই, না দিয়ে যাবে কোথায় ?” তাই ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিচ্ছে। এতে তারাও যে খুব একটা লাভবান হতে পারছে তা নয়, বরং এই দাম কমার সুযোগ নিচ্ছে পাশ্ববর্তী ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তারা এই কম দামের সুযোগে প্রচুর পরিমাণে চামড়া কিনে ভারতে পাচার করে দিচ্ছে। এই অবস্থায় জনগণ যদি চামড়া খাওয়া শুরু করে দেয়, তবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে (যারা হাত পেতে মাংস চাইতে পারে না) তারা টাকা দিয়ে চামড়া কেনা শুরু করবে, তখন প্রতি চামড়ার মূল্য দাঁড়াবে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা। তখন সেই টাকা কিন্তু ধনীরা ব্যবহার করতে পারবে না, এতিম বা গরীবদেরকেই দিতে হবে। ফলে এখন যেমন চামড়া প্রতি ট্যানারি মালিকরা ২-৩শ’ টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে, সেই কাজটা আর করবে পারবে না, তাদেরকে চামড়া খাদকদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই চামড়া কিনতে হবে। আর এতে চামড়া নিয়ে যে অপচয়টা হচ্ছে সেটাও হবে না, পাশাপাশি এত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রোটিনের চাহিদাও পূরণ করবে।

ট্যানারি শিল্পের পাশাপাশি জিলেটিন শিল্প:
ট্যানারি শিল্পের পাশাপাশি আমাদের জিলেটিন শিল্প গড়ে তোলা দরকার। কারণ বাংলাদেশের ঔষধসহ অনেক খাদ্যে জিলেটিনের ব্যবহার আছে। উল্লেখ্য চামড়ার ভেতরের অংশে কোলাজেন নামক উপদান থাকে, সেই কোলাজেন থেকে জিলেটিন তৈরী হয়। পাকিস্তান কিন্তু চামড়ার ট্যানারিং থেকে জিলেটিন তৈরীতে বেশি মনোযোগী। বিশ্বব্যাপী হালাল পশু থেকে আগত জিলেটিনের চাহিদাও অনেক। যেহেতু ইউরোপ থেকে আগত জিলেটিনের বড় অংশ হলো শুকর থেকে আহরিত, আবার চীন বা এসমস্ত রাষ্ট্রে গরুর জিলেটিন থাকলেও সেগুলো ইসলাম ধর্মীয় মতে জবাই করা হয় না। তাই মুসলমানরা হালাল পশু থেকে জিলেটিন উৎপাদন করতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু কোরবানীর সময় প্রচুর পরিমাণে হালাল উপায়ে জবাই করা পশুর চামড়া পাওয়া যায়, সেহেতু সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে জিলেটিন পাওয়া সম্ভব, যা দেশ বিদেশে মুসলিমদের মধ্যে প্রচুর চাহিদা আছে। বাংলাদেশে যদি জিলেটিনের কারখানা তৈরী করা যায়, তবে তখন চামড়া বিক্রির জন্য শুধু ট্যানারির উপর নির্ভর করতে হবে না, জিলেটিন কারাখানাগুলোও চামড়া নিয়ে যাবে। এতে চামড়ার দাম আরো বৃদ্ধি পাবে।

এখন চামড়ার কোলাজেনের কি হচ্ছে ?
এখন যেটা হচ্ছে, চামড়াগুলো ট্যানারিতে যাচ্ছে, সেই চামড়া প্রসেসিং করার সময় চামড়া থেকে ঝরে পড়া কোলাজেনসহ প্রোটিন অংশটুকু বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া হচ্ছে। আর চামড়া ধোয়ার সময় ট্যানারিগুলো এমন রং ব্যবহার করছে, যেখানে ভারি ধাতু আছে। সেই ভারি ধাতু মিশ্রিত পানি আর চামড়া থেকে ঝরে পড়া কোলাজেন ও প্রোটিন মিশ্রিত হয়ে ট্যানারি বর্জ্য তৈরী করছে। দেখা যাচ্ছে, সেই বর্জ্যের প্রোটিন অংশটা নিয়ে মাছ ও মুরগীর ফিড কোম্পানিগুলো খাদ্য তৈরী করছে। কিন্তু সেখানে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কিছু ভারি ধাতু মিশ্রিত থাকছে। এটা নিয়ে বিদেশী পরিবেশবাদী গ্রুপগুলোর চিল্লাচিল্লিতে সেই সব ফিড নিষিদ্ধ করছে সরকার। অথচ চামড়া ধোয়ার সময় যদি ভারি ধাতুর রং এর পরিবর্তে পরিবেশ বান্ধব রং এর ব্যবহার করা হয়, তবে কিন্তু সেই ট্যানারির বর্জ্যগুলো আর বিষাক্ত হয় না। এখন দেখা যাচ্ছে, দেশের ট্যানারির বর্জ্য থেকে প্রোটিন নিতে না পারায় মাছ ও মুরগীর ফিড কোম্পানিগুলো থাইল্যান্ড বা তারপাশের দেশ থেকে শুকরের মাংশ, চর্বি, হাড় এমনকি কিছু কিছু সময় বিষ্ঠা পর্যন্ত আমদানি করতেছে। অপরদিকে ট্যানারির বর্জ্যগুলো রিসাইক্লিং না হওয়ায় সেগুলো পরিবেশের মধ্যে থেকে তা পরিবেশকে আরো দূষিত করে তুলছে। ফলে ট্যানারিগুলো সব সময় জনগণের চোখে খারাপই থেকে যাচ্ছে। এতদিন হাজারীবাগ দূষিত হয়েছে বলে সরকার জোর করে ট্যানারিগুলো সাভারে সরিয়ে দিলো। এতে পথে বসে গেলো ট্যানারিগুলো। এখন সাভারে গেছে, ইতিমধ্যে অনেকে বলছে সাভারের পরিবেশও নাকি ট্যানারি দূষিত করা শুরু করেছে। ৫-১০ বছর পর যখন ট্যানারিগুলো কিছুটা হলেও দাঁড়াতে পারবে, তখন দেখা যাবে পরিবেশ দূষণের কথা বলে সাভার থেকেও সেগুলো বিতাড়ন করা হয়েছে।

আমি দেখেছি, এখন যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবি দাবী করে, মিডিয়াতে কাজ করে বা সরকার প্রশাসনে আছে, তারা কেউ কোন কিছুর সমাধান চায় না; শুধু মার মার কাট কাট অবস্থা। তাদের কথা মত না চললেই শেষ করে দাও, মাথা ব্যাথা হয়েছে তো মাথা কেটে ফেলো। অথচ সমস্যাটা সামান্য একটু যায়গায়ই থাকে, সেটুকু সমাধান করলেই কিন্তু পুরো জিনিসটা নষ্ট করতে হয় না।    ( মাহবুবুর রহমান নোমানী, সিনিয়র লেকচারার , শাহজালাল জামেয়া ইসলামীয়া পাঠানটুলা,সিলেট-এর টাইমলাইন থেকে প্রতিবেদনটি সংগৃহিত, সম্পাদিত ও সংক্ষেপিত )

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 41
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ