প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা হবিবুর রহমান এর জ্যোতির্ময় জীবন ও কর্ম

প্রকাশিত: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা হবিবুর রহমান এর জ্যোতির্ময় জীবন ও কর্ম

 প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা হবিবুর রহমান এর জ্যোতির্ময় জীবন ও কর্ম

—————————————————————————————————————————————-
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা হবিবুর রহমান আর নেই। সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জের আল হাবীব ফাউন্ডেশন মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত এই বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন। ৭ ফেবরুয়ারী(২০২২) সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নশ^র এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন মুহাদ্দিছ হুজুর খ্যাত হবিবুুর রহমান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৯০ বছর। তিনি কয়েক বছর থেকে বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভূগছিলেন।

পরদিন ৮ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার উপমহাদেশের প্রবীন এই আলেমে দ্বীনের জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়। বেলা ৩টায় জকিগঞ্জের রারাই গ্রামের মরহুমের বাড়ী সংলগ্ন উত্তরের মাঠে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে মাওলানা আব্দুল আউয়াল। সোমবার সন্ধ্যা সাডে ৬ টায় জকিগঞ্জের বাড়িতে বার্ধক্যজনিত রোগে দিনি ইন্তেকাল করেন।

জানাযার নামাজে বিপুল সংখ্যক আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার হাজার হাজার মুসল্লী অংশ নেন। জানাযাপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মরহুমের বর্ণাঢ্য জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন উলামা মাশায়েখ ও মরহুমের আত্মীয় স্বজন। বক্তব্য চলাকালে মরহুমের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক বক্তা আবেগাপ্লæত হয়ে পড়েন। এসময় জানাযার মাঠ জুড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজার হাজার মুসল্লীর চোখের জলে প্রবীণ এই আলেমকে চিরবিদায় জানান।
জানাযাপূর্ব সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন, আঞ্জুমানে আল ইসলাহ এর সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী ও মহাসচিব এ কে এম মনোওর আলী, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষাবিদ ড. রইছ আলী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাওলানা শাহান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী, সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, মরহুম আল্লামা হবিবুর রহমানের জামাতা ছাতক গোবিন্দনগর ফাজিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুস সালাম মাদানী।
উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা এমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, সাবেক এমপি সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মাওলানা হাবীবুর রহমান, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা উত্তর জামায়াতের আমীর হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খান, সিলেট জেলা বিএনপির আহŸায়ক কমিটির সদস্য আশিক উদ্দিন চৌধুরী প্রমূখ। এছাড়া জানাযায় আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয়পাটি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জেলা-মহানগর ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। বর্ণাঢ্য জীবন যাপন করে গেছেন জ্ঞানের সাগরতুল্য এই ব্যক্তিত্ব। তাঁর আলোকময় জীবন ও কর্মের আলোকপাত করেই এ প্রতিবেদন গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন প্রভাতবেলা সম্পাদক কবীর আহমদ সোহেল ও সহকারী সম্পাদক মু. মুহিব আলী।
—————————————————————————————————————————————-
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: সিলেটের কিংবদন্তি আলেমে দ্বীন শায়খুল হাদীস হাবিবুর রহমানের জন্ম ১৯৩৪ সালে। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার রারাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। এলাকার খ্যাতিমান আলিমে দীন মরহুম মাওলানা মুমতায আলী ও আমিনা খাতুনের গর্বিত সন্তান হবিবুর রহমান। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। দেশ ও আন্তজার্তিক পরিমন্ডলে তিনি ‘ মুহাদ্দিছ ছাহেব হুজুর’ হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন।

 

শিক্ষাজীবন: এলাকার প্রাইমারি স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করে বাল্য বয়সেই তিনি বড়ভাই মরহুম মাওলানা নজিবুর রাহমান ’র সাথে ভারতের বদরপুর সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে কিছুদিন লেখাপড়া করে ফিরে এসে কানাইঘাট থানাধীন সড়কের বাজার আহমদিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। এখানে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। সড়কের বাজার মাদরাসায় ছাত্র থাকাকালীন শিক্ষকগণের উৎসাহে পার্শ্ববর্তী প্রাইমারি স্কুল থেকে জেলা-ভিত্তিক প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে সিলেটের অন্যতম প্রাচীন ইসলামি বিদ্যাপীঠ গাছবাড়ি জামেউল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা এডুকেশন বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। একই মাদরাসা থেকে ১৯৫৭ সালে ফাযজিল পরীক্ষায় বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান লাভ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৯ সালে হাদীস বিভাগে কামিল পরীক্ষায় বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য যে, গাছবাড়ি মাদরাসার ইতিহাসে বোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান লাভকারী প্রথম ছাত্র তিনি।

 

কর্মজীবন: ১৯৫৯ সালের তিন আগস্ট ইছামতি দারুল উলুম সিনিয়র মাদরাসায় সহকারী মাওলানা পদে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালের ১০ এপ্রিল সিলেটের প্রাচীনতম ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাডড়ি আজিরিয়া মাদরাসায় যোগ দেন। স্বীয় পীর ও মুরশিদ হযরত ফুলতলী ছাহেব’র নির্দেশে ১৯৬৩ সালের ২৩ নভেম্বর সৎপুর দারুল হাদীস মাদরাসায় প্রধান মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানে সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। ১৫ জানুয়ারি ইছামতি দারুল উলুম মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ইতোমধ্যে সৎপুর দারুল হাদীস মাদরাসার অধ্যক্ষ নিয়ে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা নিরসন কল্পে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণের অনুরোধে ১৯৭৬ সালের ১১ অক্টোবর সেখানে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে অল্প দিনের মধ্যে মাদরাসার স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ১৯৭৭ সালের ২ এপ্রিল সেখান থেকে চলে আসেন।

 

রাজনৈতিক জীবন: শিক্ষকতা ও দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশাপাশি একসময় তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নেজামে ইসলামের মনোনয়নে তিনি তখনকার সিলেট ৭ আসনে ( জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও কানাইঘাট) এমএনএ পদে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ মনোনীত ও সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে তিনি জাতীয় নির্বাচনে সিলেট পাঁচ আসনে ( জকিগঞ্জ-কানাইঘাট ) প্রতিদ্বন্দিতা করেন।

নামাজে জানাযার একাংশ- ছবি প্রভাতবেলা

নামাজে জানাযার একাংশ- ছবি প্রভাতবেলা

আরব আমিরাতে বিচারক: ১৯৭৭ সালে সৎপুর মাদরাসা থেকে চলে আসার কিছুদিন পর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গমন করেন। প্রথমে উম্মুল কুওয়াইন শহরে একটি মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অল্প দিনের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সে দেশের বিচার বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি উম্মুল কুওয়াইন কোর্টে বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পূর্বোল্লোখিত মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য যে, আরব আমিরাতের কর্মজীবনে সরকারি ছুটির দিনে তিনি মরুচারী বেদুঈনদের অবৈতনিক শিক্ষাদান করতেন। বিশেষ করে বয়স্ক বেদুঈনদের কুরআন শরিফ সহিহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখাতেন।

ইছামতিতে প্রত্যাবর্তন: ১৯৮২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবারও তিনি ইছামতি মাদরাসার অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের ফলে তিলে তিলে ইছামতি মাদরাসা পূর্ব সিলেটের শ্রেষ্ঠতম ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। তাঁর একক প্রচেষ্টায় মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। আলিম, ফাজিল ও কামিল ক্লাশের সরকারি মঞ্জুরি এবং স্বীকৃতি আদায়ে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মাদরাসার বিল্ডিং এবং সুবিশাল মসজিদ তাঁর নীরব সাধনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ধ শতাব্দীরও অধিককাল ধরে ইলমে হাদীসের খিদমতে নিয়োজিত এ মনীষী অধ্যাপনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে কুরআন-হাদীসের শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন মাহফিলে বয়ান পেশ করে আসছেন।

 

বিভিন্ন দেশে সফর:
যুক্তরাজ্য : ১৯৮১ সালে স্বীয় পীর ও মুরশিদ হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলা রহমতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে তিনি আরব আমিরাত থেকে প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য সফর করেন। মাত্র পনেরো দিনের সফরে তিনি ফুলতলি ছাহেব’র সাথে সে দেশের বিভিন্ন শহরে আয়োজিত মাহফিলে বয়ান পেশ করেন। স্বল্পদিনের সফর শেষে হজ পালন করে আপন কর্মস্থল আমিরাতে ফেরত যান।

এরপর থেকে তিনি প্রায় প্রতি বছরই যুক্তরাজ্য সফর করেন। এসব সফরে তিনি গ্রেট ব্রিটেনের উল্লেখযোগ্য প্রতিটি শহরে বিভিন্ন মাহফিলের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের মহান দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রিটেনে বসবাসরত তাঁর ছাত্রগণের অনুরোধে ২০০৯ সালে তিনি একাধারে প্রায় নয় মাস সে দেশে অবস্থান করেন। সে সময় প্রতি শনিবার লন্ডনস্থ দারুল হাদীস লতিফিয়ায় শামায়েলে তিরমিজি নামক বিখ্যাত হাদীসের কিতাব সম্পূর্ণ দারস পেশ করেন। নিয়মিত সে দারসে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে প্রচুর সংখ্যক উলামা এবং সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতেন। দারস পূর্ণ হলে দুই শতাধিক আলিমকে শামায়েলে তিরমিজির সনদ প্রদান করেন।

ব্রিটেন সফরকালে বিভিন্ন শহরে রিয়াদুস সালিহীন এবং আদাবুল মুফরাদ নামক হাদীসের কিতাবের দারস প্রদান করেন।

যুক্তরাষ্ট্র : ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় অবস্থানরত তাঁর ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের আমন্ত্রণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সে সময় বিভিন্ন শহরে মাহফিল সমুহে যোগদান করেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভন্ন শহরে তাঁর প্রেরণা ও নির্দেশনায় বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সিরিয়া : ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি সিরিয়া সফর করেন। সে সময় দামেস্কের বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদগণের সাথে ব্যাপকভাবে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। সে সফরে দামেস্কের খ্যাতনামা হানাফী আলিম, আল ফিকহুল হানাফী ওয়া আদিল্লাতুহু-সহ বহু মূল্যবান কিতাব প্রণেতা শায়খ ড. আসআদ মুহাম্মাদ সাঈদ সাগিরজি তাঁর কাছ থেকে ইলমে হাদীসের সনদ গ্রহণ করেন। সনদ গ্রহণ উপলক্ষে শায়খ সাগিরজি দামেস্কের উল্লেখযোগ্য উলামার উপস্থিতিতে ২৯ অক্টোবর নৈশভোজের আয়োজন করেন। এ ছাড়া বহু গ্রন্থ প্রণেতা শায়খ ড. আজ্জাজ আল খাতিব, শায়খ হিশাম বুরহানি, শায়খ আবদুর রাহমান হাম্মামি প্রমূখ তাঁর সাথে একান্তভাবে ইলমি আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে শায়খ হাম্মামি পুরো সফরে নিজে ড্রাইভ করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনে নিয়ে যান।
মরক্কো : ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মরক্কো সফর করেন। এ সময় মদিনাতুল আউলিয়া নামে খ্যাত মারাকাশ শহরে দালাইলুল খাইরাত প্রণেতা ইমাম জাজুলি (রা:), ইমাম কাজি আয়াজ (রা:) ও ইমাম সুহাইলি (রা:)প্রমুখের মাজার জিয়ারত করেন।
ভারত : ভারতের আসাম প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক সফর করেন। সেসব সফরে মাহফিলে যোগদান ছাড়াও উলামায়ে কেরামের চাহিদার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্থানে হাদীস শরিফের দরস প্রদান করেন।
মিশর : ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মিশর সফর করেন। সেই সফরে কায়রো শহরে সাহাবি উকবা ইবন আমির (রা:) এর মাজার, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রা:) এর মাজার এবং ইতিহাসখ্যাত আল-আজহার মসজিদে হাদীস শরীফের দরস প্রদান করেন।

 

সম্পাদনায় আল্লামা হবিবুর রহমান: ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর সম্পাদনায় সিলেট শহর থেকে মাসিক শাহজালাল নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। স্বল্প সময়ে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করলেও ১৯৯৩ সালে নানা কারণে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রকাশিত গ্রন্থ: শায়খুল হাদিস হবিবুর রহমানের ১৭টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।(১) আল কাউলুল মাকবুল ফী মিলাদির রাসুল (২) দোয়ায়ে মাসনুনা ও তেত্রিশ আয়াতের ফজিলত (৩) মাসআলায়ে উশর : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ (৪) দুরূদ শরীফের ফযীলত ও ওযীফা (৫) যিয়ারতে মদীনা মুনাওয়ারা (ফযীলত ও নিয়ম)। (৬) আসহাবে বদও (৭) ওযীফা (৮) হজ্জ ও যিয়ারত ( সংক্ষিপ্ত আহকাম ও নিয়ম)। (৯) হাদিয়াতুল লাবীব ফী নাবযাতিম মিন সীরাতিন নাবিয়্যিল হাবীব (১০) যাখীরাতুল আহাদীসিল আরবাঈন ফী ফাদায়িলি সায়্যিদিল মুরসালীন (১১) কানযুল আহাদীসিল আরবাঈন ফী মানাকিবি আহলি বাইতিন নাবিয়্যিল (১২) তুহফাতুল লাবীব বিআসানীদিল হাবীব (১৩) আত তুহফাতুল লাতীফাহ ফী আহাদীসিল মুসালসালাতিল মুনীফাহ (১৪) দালাইলুল খাইরাত (১৫) আল হিযবুল আযম (১৬) দারসে হাদীস-১। (১৭) সালাতুত তারাবীহ

মাদরাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা: ২০০০ সালে থানাবাজার লতিফিয়া ফুরকানিয়া মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে তিনি জমি ক্রয় করে একটি হিফজুল কুরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এ মাদরাসার নামকরণ করা হয় থানাবাজার হাবিবিয়া হিফযুল কুরআন মাদরাসা। ২০১১ সালে তিনি হিফজুল কুরআন মাদরাসার সাথে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন ।উল্লেখ্য, ২০০০ সালে হিফজুল কুরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর তিনি থানাবাজার দাখিল মাদরাসার দুইটি একাডেমিক ভবন, শিক্ষক মিলনায়তন, সুপার ও অফিস সহকারীর পৃথক অফিস রুম, ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং নামাজের কক্ষ নির্মাণ করে দেন।

 

মসজিদ প্রতিষ্ঠা: ইছামতি দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসা পশ্চিম দিকের একাডেমিক ভবনের দক্ষিণ পাশে ছোট মসজিদ ছিলো দীর্ঘদিন। মাদরাসা চলাকালীন নামাজের সময় ছাত্র-শিক্ষকগণের স্থান সংকুলান হতো না। এই চাহিদার প্র্রেক্ষিতে এককভাবে তিনি উদ্যোগী হয়ে ব্রিটেন ও আমেরিকায় অবস্থানরত তাঁর ছাত্র এবং শুভাকাঙ্খীদের অনুদানে মাদরাসার পূর্ব দিকে ইদগাহের জন্য নির্ধারিত স্থানে সুপরিসর মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।২০০০ সালে এলাকাবাসী এবং মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকের চাহিদার প্রক্ষিতে তিনি থানাবাজার লতিফিয়া ফুরকানিয়া দাখিল মাদরাসা সংলগ্ন পুরাতন ছোট মসজিদের স্থলে সুপরিসর বৃহৎ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৬ সালে নিজ বাড়ী সংলগ্ন স্থানে নতুন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এ মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে আল-হাবীব জামে মসজিদ। প্রতি মঙ্গলবার বাদ মাগরিব থেকে এই মসজিদে তিনি হাদীস শরীফের দারস পেশ করতেন।
সংসার জীবন: সংসার জীবনে তিনি চার পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক ।

তথ্যসূত্র:
১. জালালাবাদের কথা (বাংলা একাডেমি প্রকাশিত)দেওয়ান নুরুল আনওয়ার হোসেন চৌধুরী ।(২) হাদীস চর্চায় বাংলাদেশী মুহাদ্দিসগণের অবদান ( ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত) ড. মাওলানা মোরশেদ আলম সালেহী(৩) চলমান জালালাবাদ : ইসলামী রেনেসাঁর অনন্য যারা শায়খ তাজুল ইসলাম আউয়ালমহলী (৪.) প্রসঙ্গ জকিগঞ্জ : ইতিহাস ও ঐতিহ্য মো : হান্নান মিয়া (সম্পাদক)(৫) জকিগঞ্জ মনীষা,মো. আবদুল আউয়াল হেলাল, অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল হাকীম (যৌথ সম্পাদনা)(৬) আহবাব (সনদ বিতরণ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক ২০০৮) অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুন নূর (সম্পাদক)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ