রবীঠাকুরের কাদম্বিনী বনাম আধুনিক সমাজের খাদিজা

প্রকাশিত: ১:১৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

কবীর আহমদ সোহেল: “ মৃত মনে করে কাদম্বিনীকে পোড়াতে পাঠান হয়েছিল, মৃতকল্প অবস্থা থেকে তার জেগে ওঠার পর তার মনস্তত্ত্ব এবং লৌকিক পৃথিবীর সঙ্গে তার ব্যবহারকে ভিত্তি করে এই গল্পের পত্তন।
সারদা শঙ্করের বিধবা পুত্রহীনা ভ্রাতৃবধূ কাদম্বিনীর হৃদয়স্পন্দন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন লোক মৃতদেহটিকে পোড়াতে নিয়ে গিয়েছিল দূর শ্মশানে। কিন্তু শ্রাবণ রাত্রের দুর্যোগের মধ্যে মৃত দেহকে শ্মশানে রেখে তারা দূরে সরে গেল। তাদের অনুপস্থিতকালে মৃত দেহটি খাঁড়া হয়ে দাঁড়াল, কিন্তু তখন সে আর নিজকে জীবজগতের অধিবাসী বলে মনে করতে পারল না। কাদম্বিনীর আর ঘরে ফেরা হলো না। এক পর্য়ায়ে সে আশ্রয় নিল তার সইয়ের বাড়ি। কিন্তু সেখানে কিছুর সাথে সে কোন রকম যোগ অনুভব করতে পারল না। সেখান থেকে গোপনে এক রাতে সে ফিরে এল সারদা শঙ্করের অন্তঃপুরে। সেখানে তার পৃথিবীর একমাত্র বন্ধন সারদা শঙ্করের পীড়িত ছেলেটিকে কোলে নিয়ে তার স্নেহকণ্ঠের ‘কাকীমা’ ডাকটুকু শুনেছিল তখন শুধু মুহূর্তের জন্য চারদিকের সংসারটি সেই স্নেহসূত্রে ঘিরে তার কাছে আবার পরিস্ফুট ও সত্য হয়ে উঠেছিল। খোকা ঠিকই তার কাকী মাকে চিনতে পেরেছিল, কাদম্বিনী এই মায়ার সংসারেও টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষায় ‘ব্যাকুলভাবে কহিল, ‘‘দিদি, তোমরা আমাকে দেখিয়া কেন ভয় পাইতেছ। এই দেখ, আমি তোমাদের সেই তেমনি আছি।’’ কিন্তু না, কেউই তার কথা বিশ্বাস করল না। ‘তখন কাদম্বিনী আর সহিতে পারিল না; তীব্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ‘‘ওগো, আমি মরি নাইগো, মরি নাই। আমি কেমন করিয়া তোমাদের বুঝাইব, আমি মরি নাই। এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি।’’ বলিয়া কাঁসার বাটিটা ভূমি হইতে তুলিয়া কপালে আঘাত করিতে লাগিল। কপাল ফাটিয়া রক্ত বাহির হইতে লাগিল। তখন বলিল, ‘‘এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি।’’
শারদা শংকর মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিলেন,; খোকা ভয়ে বাবাকে ডাকিতে লাগিল: দুই মূর্ছিতা রমণী মাটিতে পড়িয়া রহিল।
তখন কাদম্বিনী ‘‘ওগো আমি মরি নাইগো, মরি নাই গো, মরি নাই’’ বলিয়া চিৎকার করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া, সিড়ি বাহিয়া নামিয়া অন্তঃপুরের পুষ্করিণীর জলের মধ্যে গিয়া পড়িল। সারদা শঙ্কর উপরের ঘর হইতে শুনিতে পাইলেন ঝপাস করিয়া একট শব্দ হইল।
সমস্ত রাত্রি বৃষ্টি পড়িতে লাগিল; তাহার পরদিনও বৃষ্টি পড়িতেছে, মধ্যাহ্নেও বৃষ্টির বিরাম নাই। কাদম্বিনি মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।’ সে মরে নাই, তা প্রমাণের জন্য কাদম্বিনীর মরণ ব্যতিত দ্বিতীয় কোন উপায় ছিল না। গল্প পড়া শেষ হলে কাদম্বিনীর ট্রাজেডি কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠক মনে একটি বেদনার ঝড় তোলে।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র কাদম্বিনী। ১২৯৯ বাংলায় রবীন্দ্রনাথের অনবদ্য রচনা।এই কাহিনী অনেকেরই জানা। বিশেষ করে যাঁরা মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী পড়েছেন। তাদের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পাঠ ছিল এই গল্প। সংবাদ প্রতিবেদনে পুরোনো উপন্যাসের কাহিনী উপস্থাপন অনেকটা বেমানান। কিন্তু আধুনিক সভ্য সমাজের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ফিরে তাকাতে হয় বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কালোত্তীর্ণ রচনাসমগ্রের দিকে।

ঠিক কাদম্বিনীর মত নয়। কাদম্বিনীর পরিণতির জন্য দায়ী তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ। তবে অনেকট কাদম্বিনীর মত। সিলেটের খাদিজা। আধুনিক সভ্য সমাজের সৃষ্টি। আধুনিক প্রেমের হিং¯্রতার স্বীকার।
সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে চাপাতি দিয়ে এক তরুণীকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার আলোচিত ঘটনা। গণমাধ্যম তোলপাড় করে তোলা এ ঘটনা এখন গণমাধ্যমে আর সরব নেই। এ ঘটনার দুই চরিত্র খাদিজা বেগম নার্গিস আর বদরুল আলম। সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী মৃত্যঞ্জয়ী খাদিজা সাভারের সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)এর অধীনে চিকিৎসাধীন রিহ্যাব আর বদরুল সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে।
দীর্ঘ ৪ মাস হাসপাতালে-চিকিৎসাকেন্দ্রে কাটিয়ে গত ১ ফেবরুয়ারী (বুধবার) নিজগৃহে ফেরেন খাদিজা। । ১ ফেবরুয়ারী দুপুর আড়াইটায় ভাই শাহীন আহমদের সাথে বিমানযোগে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান খাদিজা। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন বাবা মাসুক মিয়া বাবার সাথে সাড়ে ৩টার দিকে গিয়ে সিলেট সদর উপজেলার হাউশায় নিজের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেন খাদিজা। ঐদিন খাদিজার বাবা ও ভাই সাংবাদিকদেও সাথে অসৌজন্যমুলক আচরণ করেন। এমন অভিযোগ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের। অনেকে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ অভিমত প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই খাদিজা-বদরুল ঘটনা আড়ালে চলে যায়। এর আগে শুধু গণমাধ্যম নয় অনেক সাংবাদিক নিজস্ব ফেসবুক একাউন্ট থেকে খাদিজার নিউজ আপলোড দিতেন।
মৃত্যুঞ্জয়ী খাদিজা এবং কারান্তরীণ বদরুলের আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী কে বা কারা? এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে আমরা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার সহ¯্রাধিক মানুষের মতামত নিয়েছি। খাদিজা বদরুলের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, খাদিজার চিকিৎসা ব্যয়ভার প্রধানমন্ত্রী করছেন। প্রশ্ন হলো,খাদিজার এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্র বা সমাজ কোন ভাবে দায়ী কি?
অনুসন্ধান ও প্রকাশিত তথ্যমতে, বদরুল খাদিজাদের বাড়ীতে লজিং ছিল। খাদিজাকে ‘উত্যক্ত করতো’। ‘প্রেম প্রত্যাখ্যাত’ হয়ে খাদিজাকে হত্যার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের রসাল প্রতিবেদনের নির্যাস এইটুকুই।
প্রভাতবেলা’র অনুসন্ধান মতে, উত্যক্ত নয় বদরুল প্রেম নিবেদন করতো। একটা সময় খাদিজা-বদরুলের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এ সম্পর্কে ফাটল ধরলে বদরুল বেপরোয়া হয়ে উঠে।
মতামত দানকারীদের ভাষ্যমতে,বদরুল যদি উত্যোক্ত করেই থাকে তাহলে খাদিজার পরিবার এ ব্যাপারে আইনী, সামাজিক বা পারিবারিক কোন পদক্ষেপ নেয়নি কেন?
২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারী বদরুলকে গণপিঠুনি দেয়া হয়। কেউ বলছেন ইভটিজিং করতে গিয়ে ধরা পড়ে বদরুল। কেউ বলছেন খাদিজার সাথে ডেটিংয়ে গিয়ে কুপোকাত বদরুল। আবার এও বলছেন কৌশলে বদরুলকে শায়েস্তা করেছে খাদিজার স্বজনরা। প্রাপ্ত তথ্য মতে বদরুল পিঠুনি খেয়েছে, গুরুতর আহত হয়েছে। নেপথ্যে নারীঘটিত কারণ। এখানে কোন সন্দেহ বা সংশয় নেই। ঐসময় বদরুলের পক্ষে একটা মামলা হয়। মামলার আসামী করা হয় জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীকে। খাদিজার পরিবার এখানে চাতূর্যতা ও শঠতার আশ্রয় নিয়েছিল এমন অভিমত এলাকাবাসী অনেকের। আর বদরুল সরকারী ছাত্র সংগঠনের নেতা হবার সুবাদে ফায়দা লুটের মানসিকতায় ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রুপ দিয়েছিল।
একই সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কতিপয় গণমাধ্যম কোন রকম যাচাই বাচাই না করেই জামায়াত- শিবির জিকির তোলে বদরুল খাদিজার অপকর্মকে আড়াল করে রেখেছিল। সেদিনের সেই গণমাধ্যমগুলিই খাদিজা আহত হবার পর তাকে ‘হিরোইন’ বানাতে মরিয়া হয়ে উঠে। কেউ প্রশ্ন রাখেনি, শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া মেধাবী বদরুল বিপথগামী হল কিভাবে?
গণমাধ্যম যদি সেদিন প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতো তাহলে ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ ক্যাম্পাস কোন তরুণীর রক্তে রঞ্জিত হতনা।
২০১২ সালে আহত হবার পর বদরুল শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থায়নে চিকিৎসা ও আবাসিক সুবিধা গ্রহণ করে। ক্ষমতার দাপটেই তা করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন বদরুল ছাত্রলীগের কেউ নন। অথচ ২০১২ সালে এ কথা বলে তাকে শেল্টার না দিলে ২০১৬ সালের ঘটনা হয়তো ঘটতো না।
রদরুলের হামলায় গুরুতর আহত খাদিজার জীবন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। ঘটনাকারী বদরুল কারান্তরীণ।
সচেতন মহলের মতে, খাদিজা – বদরুলের আজকের এ অবস্থার জন্য প্রথমত: দায়ী তারা নিজেরাই। দ্বিতীয়ত: তাদের পরিবার। কেননা যথাসময়ে সন্তানের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। তৃতীয়ত: মিডিয়া।শুরুতে মিডিয়া বদরুল-খাদিজার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তৃতীয়ত: ক্ষমতাসীন মহল। ক্ষমতার মোহে তাঁরা কেবলই বদরুলকে আস্কারা দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ কেন্দ্রে স্নাতক পরীক্ষা শেষে বের হয়ে হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের ধারালো চাপাতির এলোপাতাড়ি আঘাতে খাদিজার মাথার খুলি ভেদে করে মস্তিষ্ক জখম হয়। হামলার পরপরই বদরুলকে আটক করে পুলিশ। বদরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন। খাদিজার ওপর হামলার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ৮ নভেম্বর খাদিজা হত্যা চেষ্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিলেট নগরীর শাহপরাণ থানার এসআই হারুনুর রশীদ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। পরে ৫ ডিসেম্বর, ১১ ডিসেম্বর ও ১৫ ডিসেম্বর বদরুলের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেন ৩৩ জন।
হামলায় আহত খাদিজাকে প্রথম দিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তিন দফা অস্ত্রোপচার হয়। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গত ১৩ অক্টোবর তার লাইফ সাপোর্ট খোলা হয়। এর সাতদিনের মাথায় খাদিজাকে হুইল চেয়ারে করে কিছুক্ষণ ঘোরানো হলেও সে সময় তিনি কাউকে চিনতে পারছিলেন না বলে তার স্বজন ও চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন। পরে ধীরে ধীরে খাদিজার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ২৮ নভেম্বর তাকে রিহ্যাব ফিজিওথেরাপি দেয়ার জন্য সাভারের সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজডে (সিআরপি) স্থানান্তর করা হয়।
কে এই খাদিজা:-খাদিজা বেগম সিলেটের এম.সি. কলেজের ডিগ্রী ২য় বর্ষের ছাত্রী। সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ আউশা গ্রামের জম্মগ্রহন করেন খাদিজা বেগম।খাদিজা বেগমের পিতা মাসুক মিয়া সৌদি আরব প্রবাসি।
কে এই বদরুল: বদরুল আলম সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের মনিরগাতি গ্রামে। বদরুল ছাতক উপজেলার মুনিরগাতি গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে। শাবি ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক পদবীও পেয়ে যায় সে। জানা যায়, চার ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সে। চার বছর আগে তার বাবার মৃত্যু হয়। টানাপোড়েন সংসারের হাল ধরে রেখেছেন দর্জি দোকানি বড়ভাই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ