‘ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, কথাটা ঠিক নয়’

প্রকাশিত: ১:১৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

‘ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, কথাটা ঠিক নয়’

জয়নাল আবেদীন জুয়েল লোকটার কথাগুলো এখনো কানে বাজে। তার বাড়ি সাউথ আফ্রিকায়। বর্ণ পরিচয়ে সে কালো নয়, স্বেতাঙ্গ। ধর্ম পরিচয়ে সে খ্রীষ্টান নয়, মুসলমান। আমার সাথে তার পরিচয় ক্ষণিকের হলেও দুজনের চিন্তার ঐক্য দু’জনকে দু’জনের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলো। তার কথাগুলো ছিলো খুবই পরিশীলিত; খুব গুছিয়ে কথা বলতেন তিনি। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। তিনি ইংরেজীতে কথা বলেন। তার কাছ থেকে সাউথ আফ্রিকার অনেক তথ্য জেনে মুগ্ধ হয়েছি। আর অবাক হয়েছি ঐ দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৈন্য দশার কথা শুনে। ঐ দেশে কে কার প্রাণ কখন যে কেড়ে নেয় তার কোন ঠিক নেই। প্রতিটা বাড়িতে উঁচু উঁচু দেয়াল, শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, আর হিংস্র কুকুরতো আছেই। তারপরও কোন মানুষের স্বস্থি নেই, কোন মানুষের ঘুম নেই। সব সময়ই একটা আতংক কখন বিপদ নেমে আসে। সাউথ আফ্রিকার এমন নরক দশার বিবরণ শুনে চুপ মেরে বসে আছি। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন-আপনাদের দেশের এক গাড়িতে লেখা দেখলাম-শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, কথাটা ঠিকনা। আমি তাকে জিজ্ঞ্যেস করলাম আমাদের গাড়ির লেখাতো বাংলা। আপনি পড়লেন কিভাবে? তিনি বললেন-গাড়িতে যেহেতু লেখা, তাই এটার গুরুত্ব বিবেচনা করে পাশের একজনকে জিজ্ঞ্যেস করে জেনে নিয়েছি। তিনি বলতে থাকলেন–কথাটা ঠিক নয়, তার কারণ হলো শিক্ষা দুই প্রকার সুশিক্ষা ও কুশিক্ষা। সু শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, এরকম লিখলে ভুল ধরার সুযোগ থাকতো না। আমি তার কথা যতই শুনছি ততই মুগ্ধ হয়ে চিন্তার গভীরতায় হারিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে পড়তে লাগলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা। আমাদের দেশের বড় বড় মাথাওয়ালা বুদ্ধিজীবিদের কথা। মনে পড়তে লাগলো বড় বড় আমলার কথা। মনে পড়তে লাগলো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের কথা। এদের সবাই তো শিক্ষিত। মুর্খ হলেতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কথা না। লেখাপড়া না করেই কি ডাক্তার হয়েছে? কিংবা ইঞ্জিনিয়ার? রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় কর্ণধার হয়েছে কি লেখাপড়া না করেই? আমাকে মানতেই হবে তারা শিক্ষিত। কিন্তু তাদের সবাই সুশিক্ষা পেয়েছেন, এটা বলা কষ্টকর। বাংলা সাহিত্যের একজন বড় লেখক যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও, তিনি যদি উঠতি যুবতিদের দেহকে চুইংগামের মত চিবিয়ে খেতে চান, তাহলে তার শিক্ষাকে কি সুশিক্ষা বলবো? রাষ্ট্রের একেকটা সম্মানীত পদ দখল করে যারা চৌর্যবৃত্তির ধান্ধায় থাকেন তাদের শিক্ষাকে কি বলবো? আরেক ডাক্তার নামধারী যিনি একই সাথে একজন লেখিকাও। তিনি তো মেয়েদেরকে উলংঙ্গপনার উস্কানী দেন, তার শিক্ষা কি সু-শিক্ষা? অবশ্যই তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মহিলা। আমার ভাবনা ডালপালা মেলে শুধু বিস্তৃতই হচ্ছিলো। কোন কথা বলছিলাম না, আমার নীরবতা দেখে বিদেশী বন্ধুটা বললেন-পছন্দ হচ্ছেনা আমার কথা? আমি বললাম- বলেন। তিনি বলতে লাগলেন আবারও। বললেন- কাউকে দান করলে টাকাই দেবেন। জানতে চাইলাম- কেনো? তিনি বললেন- ধরেন, আপনি এক কেজি গোশত পাশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। আপনি তো তাকে মুশকিলে ফেলে দিলেন। এখন ঐ লোকটাকে তেল যোগাঢ় করতে হবে। মসলা-আনাজ পাতি যোগাঢ়ের ঝামেলা পোহাতে হবে। এজন্য টাকা দেয়া কি উত্তম নয়? কারো বিয়েতে উপহার দিলেন ঘড়ি। আপনার মত আরও একশ জন ঘড়ি উপহার দিলো। একশ ঘড়ি পেয়ে বেচারা মুসিবতে পড়ে গেলো। সাহাবাদের সময়ে নুতন দম্পতিকে পরামর্শের ভিত্তিতে সাহায্য করা হতো। এতে করে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারতো। তিনি বললেন- আপনাদের দেশে জাকাত গ্রহণ করতে গিয়ে প্রাণ হানীর ঘটনা ঘটে। এটা হচ্ছে জাকাত নিয়ে মশকরা। জাকাত যিনি দেবেন তিনি সুশিক্ষিত হবেন অবশ্যই। কুশিক্ষা জাকাতের মত একটা ভাল কাজকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। কথা বলার সময় হঠাৎ বিদ্যুত চলে গেলো। সারা ঘর অন্ধকারে ঢেকে গেলো। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনি বললেন- কেনো আলো নেই, জানেন? আমি বললাম-বিদ্যুত নেই। তিনি বললেন-বিদ্যুত অফিসের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। এই যোগাযোগ পুনস্থাপন না হওয়া পর্যন্ত আলো আসবেনা। এভাবে মানুষ পাপ করার সাথে সাথে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। তখন মানুষের ক্বলবে একটা কাল দাগ পড়ে। আর য়খনই মানুষ তওবা করে, সাথে সাথে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক পুনস্থাপিত হয়। তিনি বললেন- ক্ষমা একটা বড় গুণ, মানুষকে ক্ষমা করতে শিখুন। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। একটা ঘটনা তিনি তুলে ধরে বললেন- এক বুযুর্গ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। দুষ্ট ছেলেরা বুযুর্গকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ছিলো। বুযুর্গের মনে রাগের সঞ্চার হলো, তিনি ছেলেদেরকে বদদোয়া করতে যাবেন অমনি তার চোখ পড়লো আরেক জায়গায়। দেখলেন একদল ছেলে আম গাছে ঢিল ছুঁড়ছে আর আম গাছ তাদেরকে মজার মজার আম উপহার দিচ্ছে। বুযুর্গের মনে ভাবান্তর এলো, তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন আমি কি আম গাছের চাইতেও নিকৃষ্ট? আম গাছ ঢিল খেয়ে বিনিময়ে দিচ্ছে ভাল কিছু, আর আমি ঢিল খেয়ে দিচ্ছি বদ দোয়া। না, তা হবে না, আমি ছেলেদের জন্য দোয়াই করবো। মহান আল্লাহ বুযুর্গের দোয়ায় ছেলেদেরকে ভাল মানুষে বদলে দিয়েছিলেন। এতটুকু বলতে বলতে তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন- ভাই, আমরা কি এরকম দাতা হতে পারিনা? শুধু কোন কিছু কারো হাতে তুলে দেয়াই কি দান? খালেস অন্তরে কারো জন্য দোয়া করা কি দান নয়? তিনি বললেন মানুষের জন্য দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তুলা উচিত। আপনার দোয়া কারো সুস্থতার কারণ হয়ে যেতে পারে। আপনার দোয়ায় কেউ ঋণমুক্ত হয়ে যেতে পারে। আপনার দোয়ায় কেউ কবরের শাস্তি থেকে নাজাত পেয়ে যেতে পারে। আপনার দোয়ায় যারা কল্যাণ লাভ করলো, যে পরিমাণ কল্যাণ লাভ করলো, আপনি নিজেও সে রকম কল্যাণের ভাগীদার অবশ্যই হবেন। একটা ঘটনা তিনি বলতে শুরু করলেন। বললেন-এক ব্যক্তি শরাব খেতো। সে নামায পড়তো না, রোজাও রাখতো না। কিন্তু আজানের সময় শরাব লুকিয়ে ফেলত আর আজানের জবাব দিতো। ঐ লোকটা একসময় মৃত্যুর প্রহর গুণছে। কঠিন অবস্থায় তার মুখ দিয়ে পবিত্র কালেমা বের হচ্ছেনা। বারবার তাকে কালেমা পড়ানো হচ্ছে আর সে না, না বলছে। এক বুযুর্গ শুনলেন লোকটার কথা। তিনি তার শিয়রে গিয়ে বসলেন এবং তার স্ত্রীকে বললেন তোমার স্বামীর একটা ভাল অভ্যাসের কথা বলো। স্ত্রী বললো তার কোন ভাল অভ্যাস নেই, তবে তিনি আজানের জবাব দিতেন, এসময় তিনি মদ খেতেন না। বুযুর্গ এবার আজান দিতে শুরু করলেন। মৃতপ্রায় লোকটার ঠোঁট কেঁপে উঠলো। সে বিড়বিড় করে আজানের জবাব দিতে থাকলো। আজানের শেষ বাক্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার সাথে সাথে লোকটা বলে উঠলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আর মালাকুল মাওত ঠিক তখনই তার রুহ বের করে নিলেন। তার পাড়া পড়শীরা জানলো একজন মদখোর দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আর ঐ বুযুর্গ ঘোষণা দিলেন -একজন আল্লাহর ওলী পবিত্র কলেমা পড়ে পড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।

কি বুঝলেন? কাউকে ঘৃণা করতে নেই।

জয়নাল আবেদীন জুয়েল ◊ বিশিষ্ট ছড়াকার ◊ সরকারী চাকুরীজীবি। লেখাটি তাঁর টাইমলাইন থেকে নেয়া।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 17
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ