নিজামীর ফাঁসি নিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৯:৪০ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০১৬

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদের সর্ববৃহৎ ইসলামি রাজনৈতিক দল জামায়াতের ইসলামীর শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসীর রায় কার্যকর করার এক দিন পর দলটি বৃহস্পতিবার এক দিনের হরতালের ডাক দিলে সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

চলমান হরতালের মাঝে সারাদেশে পুলিশি নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। তারপরও দেশের বিভন্ন জায়গায় জামায়াতের ইসলামির সমর্থকরা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল প্রদর্শন করছে। ফাঁসির রায় কার্যকর করায় তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

রাজশাহী শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা এমন একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করলে বিক্ষোভকারীদের উপর রাবারের বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। প্রায় ২০ জন বিক্ষোভকারীকে গেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বন্দরনগর চট্টগ্রামে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামির কর্মীদের মধ্যে এক সংঘর্ষের খবর জানা গেছে যেখানে জাময়াতের প্রায় ২৫০০ কর্মী বিক্ষোভ মিছিলে যোগদান করে।

বিক্ষোভ মিছিল ও সংঘর্ষ প্রতিরোধ করতে নিরাপত্তা আরো কঠোর করা হয়েছে। ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে পুলিশের চেকপয়েন্ট বসানো হয়েছে এবং রাজধানী জুড়ে হাজার হাজার পুলিশ টহল দিচ্ছে।

বুধবার দেশের বিভিন্ন শহরে নিজামীর গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জামায়াতের ইসলামীর কর্মীরা কোনো ধরণের প্রতিবাদ সমাবেশ করতে সক্ষম হয়নি। বিশেষ করে নিরাপত্তার বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে।

এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছে। ২০১৩ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি দলটিকে ইতোমধ্যে সব ধরণের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বুধবার মধ্যরাতের পরপরই মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর আগে বিশেষ ট্রাইবুনালের ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে নিজামীর শেষ আবেদনও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন  পাবনার পথে নিজামীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স

এক বিবৃতিতে ফাঁসির নিন্দা জানিয়ে জামায়াত বৃহস্পতিবার সারাদেশে এক সাধারণ হরতালের ডাক দেয়।

অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা শেখ হাসিনার সরকারের জন্য একটা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজামীর মতো অভিযুক্তদের ফাঁসি কার্যকর থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় ধরণের চাপের মধ্যে রয়েছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু শেখ হাসিনা ও তার সরকার বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রশ্নবিদ্ধ বিচার
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, নিজামীর বিচার প্রক্রিয়া না মুক্ত না স্বচ্ছ। ট্রাইবুনালে মানসম্মত স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের এই বিচারগুলোতে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। ট্রাইবুনালের বিচারক বিচার কৌশলের ব্যাপারে ট্রাইবুনালের বাইরের উপদেষ্টাও আইনজীবীদের সাথে এমনভাবে আলোচনা করছেন তা ট্রাইবুনালের প্যানেলের ব্যাপারে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে’।

৪৮০ জন লোককে হত্যাসহ ১৯৭১ সালে সংঘটিত তিনটি বড় ধরণের অপরাধে নিজামীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই দিন আগে শিক্ষক,সাংবাদিক ও ডাক্তারসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বলছে, নয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোহিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা করে, ২ লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে এবং আরো এক কোটি লোককে দেশ ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য করে।

তবে সরকারের দেওয়া আহত-নিহতদের সংখ্যা নিয়ে দেশেরে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য ২০১৩ সাল থেকে বিরোধী দলগুলোর অন্তত পাঁচজন নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন এদের মধ্যে পঞ্চম।

আরও পড়ুন  শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ফল প্রকাশ

হয়রানির অভিযোগ
ইতিপূর্বে জামায়াতে ইসলামীর আরো তিন জন নেতা এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক অনুসনদ্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ করা হচ্ছিল।

বার্গম্যান বলেন, সুতরাং সত্য ঘটনা হচ্ছে যে, যে বিচার হয়েছে যাতে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের এই অভিযোগ করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক নয়।

তিনি আরো বলেন, ‘সন্দেহ নেই যে জামায়াতে ইসলামির অনেক সদস্যই দলটির নেতাদেরকে টার্গেট করে বিচার ও ফাঁসির ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন এবং দলটি বর্তমানে তাৎপর্যপূর্ণ নিপীড়নের শিকার’।

বিদেশে অবস্থান করছেন জামায়াতে ইসলামীর এমন একজন শীর্ষ নেতা স্বীকার করেছেন যে, ১৯৭১ সালে নিজামী পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণের অভিযোগগুলো সত্য নয়। ট্রাইবুনাল নিজেই সেগুলো প্রমাণ করতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশের নেতারা সাংবাদিকদের কোনো সাক্ষাৎকারও দিতে পারছেন না। কারণ তাদের ফোনগুলোতে আড়ি পাতা হয়েছে এবং গণমাধ্যমের সাথে কথা বললে তাদের পরিবার- পরিজন হয়রানির শিকার হচ্ছেন’।

শুধুমাত্র নেতারাই নন, পুলিশের নির্যাতন ও হয়রানির ভয়ে মাঝাররি মানের নেতা এমনকি সাধারণ কর্মীরাও তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এই সরকারের হিংসাপরায়ণ আচরণের কারণে তারা আজ নিজ দেশে শরণার্থীর মতো’।

‘আস্তে আস্তে ইসলামের মূলোৎপাটন করাই তাদের একমাত্র এজেন্ডা এবং যারাই তাদের এই নীতির বিরোধীতা করছে বলে তারা মনে করছে তাদেরকে তারা টার্গেট করছে।’

বৃহস্পতিবার আলজাজিরার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদন

সর্বশেষ সংবাদ