সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তণ প্রিন্সিপাল মুহতারাম মাওলানা আজিজুর রাহমান মরহুমকে নিয়ে লিখছিলাম। শাহবাগী হুজুরের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮২ সালে, যখন আমি ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম সুজাউল মাদ্রাসাতে। টানা ০৩ বছর ওখানে পড়ার পর অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে। তখন শাহবাগী হুজুরকে দেখেছি দূর্দন্ড প্রতাপশালী একজন প্রিন্সিপাল হিসাবে। বিশাল জনসমাবেশ বা ছাত্র সমাবেশে যার উপস্থিতির কারণে নামতো পিনপতন নিরবতা। আমার আব্বা সব সময়ে ফুলতলী মাসলাকের বিরুধী লোক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। যদিও ফুলতলী সাহেবের অনেক খাতির যত্ন আমার আব্বার যৌবনে দেখেছি। সেই আব্বার অতি আগ্রহে আমাকে চান্দগ্রাম মাদ্রাসা ছেড়ে চলে আসতে হয় সুজাউল মাদ্রাসায়। আর ‘অজুহাত’ ছিল পরিবারে আমার সীমাহীন দুষ্টামী। আমি নাকি ছিলাম দুষ্টুর শিরোমনি। আমার আব্বার সাথে সম্পর্কের কারণে আমার প্রতি শাহবাগী হুজুরের একটা নেক নজর ছিল। যে নেক নজরের প্রভাব পড়লো আমার উপর মাত্র ২সপ্তাহ পর তার অফিসে প্রচন্ড রকমের বেত্রাগাতের মাধ্যমে। এরাশাদ সাহেবের ক্ষমতাসীন হওয়ার সুবাদে শুক্র শনি দুই দিন মাদ্রাসা ছুটি ছিল। মুড়াউল এলাকায় আমার লজিং ছিল। বৃহস্পতিবার মাদ্রাসার সাপ্তাহিক তামাদ্দুনিক সভার নিয়মিত পলাতক আসামী হিসাবে তাড়াতাড়ি লজিংএ গিয়ে বই রেখে খাওয়া দাওয়া সেরে দৌড় দিতাম চান্দগ্রামের উদ্দেশ্যে। ফিরে আসতাম রবিবারে। চান্দগ্রাম থেকে পায়ে হেটে মাদ্রাসায় যখন পৌছলাম, তখন মাদ্রসার ক্লাস শুরু হয়ে গেছে ১০ মিনিট আগে। মাদ্রাসার বারান্দায় অফিসের সামনেে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন প্রিন্সিপাল মাওলানা আজিজুর রাহমান শাহবাগী। তাকে এক পলক দেখে নিয়েই ক্লাসে ঢুকলাম। কেবলমাত্র বই রেখেছি ডেস্কের উপর, এমন অবস্থায় সাজু মিয়া হাজির। সাজু মিয়া মাদ্রাসার দফতরী। “নজরুল ইসলাম কে, শায়বাগী হুজুরে ডাখছইন”। আমার বাবার সাথে বন্ধুত্ব হিসাবে হয়তো তার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবেন ভাবনা নিয়ে যখন হাজির হলাম প্রিন্সিপাল অফিসে, তখন কোন কিছু বুঝার আগেই নিজেকে আবিস্কার করলাম দীর্ঘ “মাখাল বাশর কঞ্চি”র বেষ্টনীতে। অতি ক্ষিপ্র গতিতে আমাকে বেত মারছেন আর বলছেন “ঘুম ছাড়েনা!” “মুহমল” ইত্যাদি। শাহবাগী হুজুরের সেই বেত খাওয়া চিরদিন স্মরণে থাকবে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়ার পর ১৯৯১-৯২ সালে আবার সেখানে কামিল পড়েছি। কিন্তু এই দিনের পর আর কোন দিন আমি মাদ্রাসায় দেরী করে উপস্থিত হইনি। ওটা শাহবাগী হুজুরের মার ছিলনা, ছিল আমার জীবনে বড় একটি দোয়া। যথা সময়ে উপস্থিত হওয়া-বিষয়টি আসাতে আরেকটি কথা মনে পড়ে গেলো, যা আমার জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিষয়টা একজন আধ্যাত্মিক উস্তাদকে নিয়ে। তিনি হাফেজ মাওলানা আনোয়ার হোসাঈন খান। নামটা অনেকের জানা। তিনি তখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সাংগঠনিক জেলা সভাপতি। বর্তমানে তিনি সিলেট উত্তর জেলা জামায়াতের আমীর। আমি তখন শিবিরের নতুন সাথী হয়েছি মাত্র। কোন কারণে আমি সুজাউলে এসেছিলাম। ফিরতে হবে মুড়াউল স্টেশন থেকে ট্রেইন যোগে দক্ষিণ ভাগে। সেখানে টিলাবাজার মসজিদে সাথী বৈঠক। বৈঠকের মেহমান জনাব হাফেজ আনোয়ার হোসাঈন খান। আমি যখন মুড়াউল স্টেশনে পৌছলাম, তখন দেখলাম ট্রেনটা তার পিছন দেখাতে দেখাতে এইমাত্র চলে গেলো। যেমন ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মরিয়া গেল। আমি তখন নতুন সাথী, শরীরের রক্তে দারুন উত্তাপ। আশে পাশে আমার তৎপরতার প্রশংসা শুনতে খুবই ভাল লাগে। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম দক্ষিণভাগে চলে যাবো পায়ে হেটে। তখনকার সময়ে এই অঞ্চলে ট্রেন ছাড়া আর কোন বাহন ছিলনা। দীর্ঘপথ পায়ে হেটে আমি যখন দক্ষিণ ভাগে টিলাবাজারে পৌছলাম, তখন শারিরিক ভাবে আমি অনেক কাহিল হয়ে পড়েছি। গিয়ে দেখলাম আমি যে সাথী বৈঠকের জন্য এখানে এসেছি, সে বৈঠকের মুনাজাত চলছে। আমি মুনাজাতে শামীল হলাম। মনের মাঝে পুলক অনুভব করছি একথা ভেবে যে, মুনাজাত শেষ হলে জেলা সভাপতি দেরীর কারণ জানতে চাইবেন। আমি বলবো সূদীর্ঘ পথ পায়ে হেটে এখানে হাজির হয়েছি। তিনি আমাকে বাহবা দেবেন, মুবারকবাদ বলবেন। যথারীতি মুনাজাত শেষ হলে সত্যিই প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। আগের ঠিক করা উত্তরটা সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলাম। আর আগ্রহ ভরে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম প্রশংসা সূচক বক্তব্য শোনার জন্য। হাফেজ আনোয়ার হোসাঈন খান আমার দিকে স্নেহ মাখা দৃষ্টি ফেললেন। তার কন্ঠ অত্যন্ত মধুর। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো যেন আগুন বের হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি যে ট্রেন মিস করেছেন, সেই ট্রেনটা কি খালি এসেছে, না ট্রেনে আরো পেসেঞ্জার ছিল? আমি বললাম, আলবৎ আরো পেসেঞ্জার ছিল। তিনি বললেন, তা কতজন হবে-যারা মুড়াউল রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে সওয়ার হয়েছে? আমি বললাম, দেড়শ থেকে দুইশ। তিনি বললেন, এই দেড় থেকে দুইশ জন লোক-তারা যে কাজে যাচ্ছে সেই কাজটাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে, ট্রেন ছাড়ার আগে তারা স্টেশনে পৌছেছে। আর আপনি আপনার কাজকে ততটুকু গুরুত্ব দেননি বলে আপনি যথা সময়ে স্টেশনে পৌছেননি। অথচ তাদের কাজের চেয়ে আপনার কাজটা গুরুত্বের দিক দিয়ে অনেক বেশী ছিল। আমি অনুশোচনায় চুপ হয়ে গেলাম। অত্যন্ত মোলায়েম সুরে অগ্নিবর্ষিত হলো। আমার জীবনের জন্য বিরাট একটা শিক্ষা হয়ে গেল। আমার ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক জীবনে কোন মিটিং বা এপোয়েন্টমেন্টে কোন ইনফরমেশন ছাড়া আমি দেরী করে উপস্থিত হয়েছি, আমার স্মরণে নাই। আমার উস্তাদ হাজার হাজার আলেমের উস্তাদ জনাব মাওলানা আজিজুর রাহমানের একটু খানি বেতের আঘাতও আমাকে এমনই সহীহ করেছিল, যা আজো ভূলতে পারিনা। এমনি অনেক স্মৃতি আছে আমার শ্রদ্ধেয় হুজুরকে নিয়ে, যা আমাকে এখন খুবই যন্ত্রনা দিচ্ছে।